কবিতা লেকতে পারো? //(৪)

বন্যা লিপি ১৯ এপ্রিল ২০১৯, শুক্রবার, ০১:০৩:৩১পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১১ মন্তব্য

দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়াকালীন বার্ষিক প্রতিযোগিতায় ছড়া কেটে দ্বিতীয় হওয়া আর বড় বেলায় আবৃত্তি’র সাহস করা দু’টো ভিন্ন বিষয়। নাম লেখানোর কথা মনেও আসেনি একবারের জন্যও। বাবা’র কি মনে হলো কে জানে!! সিলেকশন পর্বের দিন ডাক পড়লো,অপার বিষ্ময় নিয়ে দশম শ্রেনীর ছেলেদর বিশাল কক্ষে গিয়ে বসা। হল ভর্তি সব সম্ভাব্য প্রতিযোগী।সিলেকশন টেবিলে স্বয়ং পিতা মহোদয়, শামসুল হক স্যার,ফখরুল আলম স্যার উপবিষ্ট। নির্বাচিত কবিতা খ গ্রুপের জন্য।
সদ্য নতুন ক্লাশের বাংলা পাঠ্যবই থেকে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ ‘র “কোনো এক মা’কে আবৃত্তি’র জন্য নির্ধারিত হলো। প্রচন্ড জড়তা আর বুকের ধুকপুকানি সহ একবার রিহ্যার্সাল দিতে গিতে গিয়ে বাবা’র ব্যাঙ্গাত্বক টিপ্পনী খেতে হলো। চোখ ফেটে পানি এসে গেলো। নাইন টেনের ছেলেগুলা ভারি বজ্জাতের হাড্ডি। একটা আরেকটার গায়ে হেসে লুটিয়ে পড়ছিলো!! মাথা নিচু করে চোখের পানি লুকানো ছাড়া কিছু করার নেই। বাবা’র নির্দেশ ছাড়া দৌড়ে পালানো তো দূরের কথা!হেঁটে এক পা’ও বাড়ানো যাবেনা।
শামসুল হক স্যার খুব সম্ভবত বুঝে গেলেন!
নিচু গলায় কিছু বাবা’কে কিছু বললেন।
মাথা তুলে স্যার বললেন —” তুমি এখন যাও, বাসায় গিয়ে ভালো করে প্রাকটিস করলেই হবে। ” আটকে থাকা নিঃশ্বাস ছেড়ে ভোঁ দৌড়। ত্রাহি অবস্থা করে কবিতা মুখস্ত থেকে প্রত্যেকটা লাইনের আবৃত্তি’র পুরো কৌশল শিখিয়ে ছাড়লেন।
হেড স্যারের ছেলে, সহপাঠি পলাশ,এসিস্ট্যান্ট হেড স্যারের ছেলে অভিজ্ঞান(অভি)নিরঞ্জন স্যারের ছেলে তপন (জুনিয়র) ধরেই নেওয়া প্রথম,দ্বিতীয়, তৃতীয় হবার যোগ্যতায় সর্বাগ্রে অগ্রাধিকারে আছে। সেখানে চতুর্থ হবার যোগ্যতাটুকুও আছে কিনা ঢের সন্দেহ ছিলো। তপন খুব ভালো আবৃত্তি করে। রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী ‘তে “মোটে বিঘে দুই… আছে মোর ভুঁই,নজরুল জয়ন্তী’তে “গাহি সাম্যের গান ” কি ভালোই না আবৃত্তি করলো!! তপনের প্রথম হওয়া আর রবীন্দ্র গিতী গাওয়া অভি দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থানে নির্ঘাত পলাশ, কোনো সন্দেহ নেই। বাবা’যে কেন সেখানে আমার নামটাই দিতে গেলেন? না ও তো করা যাবেনা!! সেই সাহসই নেই!! যা শিখিয়ে দেবেন…. তাই করতে বাধ্য।
নির্ধারিত দিনে যথারিতী সকালের পর্বগুলো শেষ হয়ে বিকেলে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। খেলাধুলা পর্বের বিচারিক ফলাফল ঘোষনা শেষ হয়ে গ্যাছে সেই কখন। বন্ধু হাসি’র সাথে নিশ্চিন্ত মনে গল্প করতে করতে গার্লস সেকশনের বাউন্ডারিতে ঘোরাফেরা। শামসুল হক স্যারের তলব পরাতে মঞ্চের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে উপস্থিত।
ততক্ষনে আবৃত্তি পর্ব শুরু। যতই ক গ্রুপের প্রতিযোগী একজন একজন করে নেমে যাচ্ছে। হৃদস্পন্দনের সজোড়ে ড্রাম পেটানো ধরফড়ানী বাড়ছে। খ গ্রুপও শুরু হয়ে গেলো। উপস্থাপনায় হক স্যার। গ্রুপের প্রতিযোগীদের এক এক করে তৈরী থাকতে বলছেন। অতি ধরফড়ানী ‘কবলে পড়ে না কি টেনশনের কারনে কে জানে, ২/১জনের আগেই পায়ের জুতো জোড়া গেলো ছিঁড়ে। এখন কি হবে? সময়ও নেই! কিছু করার। ব্যাক স্টেজে স্যার উঁকি দিয়ে বললেন —-“বন্যা, এরপর তুমি তৈরী হও”।আরেক ভয় জন্ম নিলো। মনে করতে পারবো তো??? ইতিমধ্যে কয়েকজন মাঝপথে ভুলে গিয়ে মঞ্চ ছেড়ে দিয়ে দৌড়। এমন হলে রেহাই নেই।। অতিমাত্রায় ঘাবড়ে গেলে ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক তো কিছুনা! কিন্তু বাবা?।
যা থাকে কপালে…. নাম ঘোষনা হয়ে গেছে ;জুতো জোড়া ক্লাশ টেনে’র হল রুমে ছুঁড়ে মেরে মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো। লক্ষয় করলাম বাবা মঞ্চের পাশেই দাঁড়িয়ে প্রম্প করছেন নিচু স্বরে।

যেই যেই পস্ গুলোতে বিরাম দেবার কথা ছিলো, কাকতালীয় ভাবে সেই জায়গাগুলোতেই ভুলে যেতে হতো….. পাশে থেকে বাবা প্রম্প না করলে……!!!!! কি যে হতো???

যখন কেউ কোনোকিছু আশা করেনা, আশ্চর্যজনক ভাবে ঘটে যায় এমন কিছু!!
তখন হতবিহ্বল হয়ে পড়তে হয়। কি করে হলো এমনটা? বাবা’র শেখানো আর নিজ কর্ম, তারপরও তপনকে টেক্কা দেয়াটা ছিলো আশাতীত চমৎকৃত সাফল্য পাওয়া।
পরবর্তিতে বাবার শেখানো আবৃত্তি উপস্থাপন করে শহরের অনেক ছাত্র ছাত্রী জাতীয় পর্যায়ে কৃতিত্বের সাথে সন্মান বয়ে এনেছে। পরের বছরে এরকম আরেক আচমকা কথায় বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম?

সময় তখন বদলে যেতে শুরু করেছে।প্রচন্ড গান শুনতে ভালো লাগে।ইমদাদুল হক মিলনের গল্পের নায়িকা হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে যখন তখন ঘরথেকে বেরিয়ে গিয়ে বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে।
বিকেল হলে বন্ধুদের সাথে নদীর ধারে বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে।সুযোগ পেলেই মা চাচি’র শাড়ি পড়ে চোখে মোটা করে কাজল পড়তে ইচ্ছে করে। কত কত ইচ্ছেকে বইয়ের পাতায় গোলাপের মতো ভাঁজ করে রেখে রেখেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতাম……..

বিদ্রঃ আজো সমাপ্তি টানা হলোনা।
আশা করি ক্ষমা সুন্দর চোখে পার পেয়ে যাবো।

চলবে………

কবিতা লেকতে পারো?// ১ 

কবিতা লেকতে পারো?(২)

কবিতা লেকতে পারো? (৩)

৫২৬জন ৩৬১জন
17 Shares

১১টি মন্তব্য

  • প্রহেলিকা

    পড়তে কিন্তু ভালোই লাগছিল স্মৃতিকথা। এমনভাবে বর্ণনা করেছেন মনে হচ্ছে যেন গতকালের ঘটনা। ফেলে আসা জীবনটা এতটাই সজীব হয়ে থাকে দূরে চলে গিয়েছে মনেই হয় না। একদিন আপনার আবৃত্তি শুনার ব্যবস্থা করা উচিত সোনেলায় সে যেমনি হোক।

    চলবে বলে চালিয়ে নেন, বেশি অপেক্ষা মানব না।

  • জিসান শা ইকরাম

    স্মৃতি কথা কিভাবে লিখতে হয় তা তুমি জানো।
    অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীল উপস্থাপনা।

    অনেক সময় অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যায়,
    তপনকে টপকে যাওয়া তেমনই।
    লেখো নিয়মিত।

  • তৌহিদ

    আপু আপনার এই ধারাবাহিক স্মৃতিকথা সেই প্রথম থেকেই পড়ছি। ভীষণ ভালো লাগছে।

    মঞ্চে এরকম সাহস করে উঠেছেন, আর বাবা ছিলেন পাশে। আমিতো ছেলেবেলায় ভয় পেতাম মঞ্চের আশেপাশে হাঁটলেও।

    চলুক লেখাটি, সুন্দর স্মৃতিকথন।🌹

  • নীলাঞ্জনা নীলা

    আপনার স্মৃতিগুলো যেনো আমার নিজেরও হয়ে যাচ্ছে। এতো মিল কী করে যে হয়! কবিতা পাঠ করা শিখেছি বাপির থেকে। আমারও একজন শামসুল হক স্যার ছিলেন। অবশ্য তিনি ছিলেন গণিতের শিক্ষক। আবৃত্তি এখনও পারিনা, তবে হ্যাঁ কবিতা পাঠ করি এখনও নিজেকে শোনাই।
    আরোও লিখুন। নিজেকে দেখি। যেনো খুঁজে পাচ্ছি সেই আমাকেই।

    • বন্যা লিপি

      আবৃত্তি কথাটা আসলে আব্বা’র সন্মানেই লেখা। আবৃত্তি আসলে আমিও পারিনি কখনো। যতদিন করেছি, পাঠই করে গেছি। দেখুননা,,, কেমন ভাবে আত্মিক বন্ধনে গাঢ়ো থেকে গাঢ়তর হয়ে যাচ্ছি আমরা!! আমাদের যে অনেক কিছুতেই মিলে যাচ্ছে!! সবসময় পাশে পাচ্ছি….. পরম পাওয়া আমার। ভালো আছেন তো? খুব ভালো থাকবেন 💓💓💓🌹🌹🌹

  • সাবিনা ইয়াসমিন

    ” বিঘে দুই ছিলো মোর ভুঁই….বাবু কহিলেন বুঝেছো উপেন এ জমি লইবো কিনে ” কতোবার পড়া, আবৃত্তি করা রবী ঠাকুরের এই কবিতা। মনে পড়ে গেলো ঝকঝকে এক ছবির মতো ! কিছু স্মৃতি কখনো ম্লান হয়না, কিছু অতীত কখনো স্মৃতি হয়না।

    ছোটোবেলা থেকেই তোমার চিন্তাধারা কতো উন্নত ছিলো তা জানিয়ে দিলে। সহপাঠিদের গুন গুলো তুলে ধরেছো অকৃত্রিম ভাবে। আমি ভালো পারি কিন্তু ওরটা আরো ভালো হয়- এই স্বীকাক্তি সবার দ্বারা হয়ে উঠেনা। সুন্দর মনের মানুষেরাই কেবল পারে এমনটি বলতে/ লিখতে।

    অনেকদিন পরপর ব্লগে আসো, তাই আমিও ইচ্ছে করেই লেখাটির মন্তব্য দেরিতে দিলাম। আমার মন বলছিলো তুমি কমেন্ট দেখার জন্যে হলেও প্রতিদিন একবার করে আসবেই। 😊

    স্মৃতিকথার পাশাপাশি অন্যকিছু লেখাও দিও বন্যা। কতোদিন হলো তোমার লেখা রোমান্টিক/ আন রোমান্টিক কবিতা পড়িনা।

    ভালো থাকো অনাবিল ভালোবাসায় ❤❤

    • বন্যা লিপি

      ব্লগে প্রতিদনই আসা হয়না যদিও, তবে মাঝে মাঝেই আসি, লেখা পড়ি, কিন্তু মন্তব্য করার মতো সময় হলেই দেখা যায় বের হয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছি।
      কখনো নিজেকে মনে হয়নি কোনো কাজে, “আমি ভালো পারি “বরং সবসময় মনে হয় কেমন করে আরো ভালো কোনটা কি করতে পারবো? সত্যি সত্যি ভালো কিছু করতে/পারতে ভীষণ ভীষণ ইচ্ছে করে। কি দুঃসাহসে আসি কিসব ছাঁইপাশ নিয়ে। তোমরা তা ভালো বলো বলেই আরো ভালো কিছু পারতে ভীষণতরো ইচ্ছে করে। শুধু তোমার কথা ভেবেই রেখে গেলাম একটা এলেবেলে লেখা, যদি মনে করো ভালো ” তবে রেখে দিও ম্যগাজিনের জন্য।

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য