কঙ্কাল-৩

সাতকাহন ৩০ জুলাই ২০১৩, মঙ্গলবার, ০৪:৪৮:২৮অপরাহ্ন গল্প ১৪ মন্তব্য

লোকটার কথার মধ্যেই একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি টের পায় সালেহা। সে মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে পা বাড়ায়। ঘরে এসে দেখে, শহীদুলের বাপ ফিরেছে। চোখের সামনে সালেহাকে দেখে মাথায় রক্ত উঠে যায় তার। এক শুষ্ক গরম অনুভূতি রক্তের মত গলগল করে তার মুখ থেকে উত্তপ্ত লাভার মত বেরিয়ে আসে, ‘কই গেছিলি এই সন্ধ্যারাইতে, তোর কোন্ ভাতারের কাছে গেছিলি। পানি আনতে বিকালে বাইরাইছস। এইটুকু পথ। পানি আনতি এত সময় লাগে?’

সালেহা স্বামীর কথার কোনও উত্তর দেয় না। তাতে রহমতের রাগ আরও ঘন হয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ক্রমশ উত্তপ্ত করে থাকে। সে এসে দ্রুত সালেহার চুলের মুঠি  ধরে পিঠের ওপর কয়েক ঘা বসিয়ে দিয়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘ক, কই গেছিলি মাগী, ঠিক কইরে ক ?’ চীৎকার শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে অন্যান্য ভাই ও ভাইয়ের বউয়েরা। ছোট ভাইয়ের এই অবিশ্বাস্য আচরণে তাদের চোখে ও মনে বিস্ময়ের ঝিলিক লাগে। বড় ভাই গিয়ে সালেহাকে ছোট ভাইয়ের হাত থেকে উদ্ধার করে। সালেহা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। ততক্ষণে শহীদুল এসে মার আঁচল ধরে দাঁড়িয়েছে। মার কান্না দেখে সে-ও চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। বড় বউ এসে সালেহা আর শহীদুলকে ধরে তাদের ঘরে নিয়ে যায়। সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু তাদের মনেও একটা তীব্র কৌতূহল ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকে। সত্যিই তো এই ভর সন্ধ্যাবেলায় পানি আনার নাম করে সালেহা কোথায় গিয়েছিলো ? কান্নার বেগ কমলে বড় বউ সালেহাকে জিজ্ঞেস করে, ‘ছোট বউ, আমারে ক দিহি, তুই কুতায় গেছিলি।’

সালেহা কোনও কথা বলে না। তাতে করে বড় বউয়ের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। নানা ধরনের চিন্তা এসে মাথার ভেতর ঘুরপাক থেকে থাকে। মেয়েটা কি তা হলে সর্বনাশের দিকে পা বাড়াল ?

মাথা খানিকটা ঠাণ্ডা হলে দাওয়ায় বসে রহমত নিজের চুল টানতে লাগলো। এটা সে কী করলো ? বউকে ধরে মারল ? এতটা বছর বিয়ে হয়েছে, কখনও বউকে সে একটা কটু কথাও বলেনি। অথচ আজ যে তার কী হলো ? সে জানে, সালেহা  কোনও অন্যায় কাজ করতে পারে না। বউ তার সুন্দরী, একথা সত্যি। সেজন্য পাড়ার ছেলে-ছোকরাদের নজর আছে। সেসব সামাল দেয়ার ক্ষমতাও আছে সালেহার। কিন্তু আজ যে কী হলো ? কখনও তো সালেহা সন্ধ্যা গড়িয়ে বাড়িতে ফেরে না। পানি আনতে গেলে বেলাবেলিই সে ঘরে ফিরে আসে। আজ এমন কী ঘটেছিলো যে, সন্ধ্যার পিঠে ভর দিয়ে তাকে ঘরে ফিরতে হলো ? অবশ্য তার নিজেরও উচিত ছিলো, সালেহাকে ভালভাবে জিজ্ঞেস করা, কেন তার দেরি হলো। তা না করে সালেহার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করা তার মোটেই উচিত হয়নি। আর যাই হোক, সালেহা তার ছেলে শহীদুলের মা। সারাদিনরাত ঘরের কাজ করতে করতে ক্লান্ত হলেও স্বামীর সেবাযত্নে তার সামান্যতম ক্রটি কোনওদিনই লক্ষ্য করেনি সে। তাই কারণ না জেনে বউয়ের ওপর এ ধরনের অত্যাচার করা মোটেই উচিত হয়নি। আফশোস হয় তার।

রাতে বিছানায় শুয়ে বউকে বুকের কাছে টেনে নেয়। মাথায়-পিঠে হাত বুলায়।

‘অন্যায় হয়ে গেছে বউ। তুই আমারে মাফ কইরে দে।’

স্বামীর মুখ চেপে ধরে সালেহা।

‘তুমার কী দোষ, দোষ তো আমারই। আমিই তো দেরি কইরে বাড়ি ফিরিছি।’

‘তা তুই দেরি কইরে বাড়ি ফিরলি ক্যান-ক দিনি।’

‘তুমারে কব না তো কারে কব। ভেবেছিলাম, আইজ ঘরে ফিরেই তুমারে কথাডা কব। তা…।’

‘কী অইছিলো ক, আমারে-সব গুছাইয়া ক।’

সালেহা স্বামীর কাছে সব খুলে বলে। শুনে একলাফে তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে রহমত। পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অব্দি একটি সরীসৃপ মুহূর্তেই কয়েক লক্ষ বার নেচে ওঠে। জিঘাংসায় তার সারা শরীর থর থর করে কাঁপছে। উত্তেজিত কণ্ঠে চাপা স্বরে সে বলে, ‘বউ তুই শালারে কাইল আমারে একটু দেখ্যায়া দিবি। অরে আমি মাটির মধ্যি পুঁইতা ফালামু।’

সালেহা এবার বিজ্ঞের মত কথা বলে, ‘শোন, মাথা গরম কইরে কোনও কাজ করলি চলবি না, মাথা ঠাণ্ডা কইরেই কাজ করতি অবি।’

‘আরে কী কস তুই বউ। শালার পুতের সাহস কত। আমাগের বাড়ির বউয়ের ওপর ওর নজর পড়িছে, ওর চোখ দুইডা ঘুইটে দিয়ে আমি ওরে কানা বানাইয়া ফালামু, যাতে জীবনে আর চোখে দেখতি না পায়।’

‘শোন, শোন, আমি একটা কথা কই। বিটা খাঁ সাহেবের বাড়ির লোক। বুঝিশুনি কাজ করতি অবি। তুমি একা একা কোনও সিদ্ধান্ত নিতি যাইও না। ভাইদের সঙ্গে পরামর্শ কইরে যা হোক একটা কিছু কর।’

সালেহার কথা মনে ধরলেও রাগ কমে না রহমতের। ঘরের মধ্যে নড়েচড়ে আর একা একাই গজ গজ করতে থাকে, ‘শালা খাঁ সাহেবের গুষ্ঠি মারি।’

সালেহা বলে, ‘এবার ঘুমাতে যাও দিনি। কাইল সকালে উইঠে পরামর্শ কইরে যা হোক একটা কিছু করা যাবিনি।’

সালেহার কথামত বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে রহমত। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসে না। তার দু চোখে বারবার একটা কম্পিত ছায়ামূর্তি এসে উঁকি মারতে থাকে। সেই ছায়ামূর্তির মুখটা খুব স্পষ্টভাবে দেখার চেষ্টা করে রহমত, কিন্তু কিছুতেই তা স্পষ্ট হয় না। আধো ঘুম-আধো জাগরণের মধ্যেই বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে রহমত। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়ে, নিজেও তা টের পায় না।

অভ্যেসমত খুব সকালেই ঘুম থেকে ওঠে। মাঠে যাওয়ার আগে দু’ভাইকে ডেকে পরামর্শ করে। ঘটনা শুনে ভাইদের চোয়ালও শক্ত হয়ে ওঠে, শরীরের রোমকূপে উত্তেজনার পারদ ওঠানামা করে। তিনজনে মিলে পরামর্শ করে, শালার পুতেরে জাহান্নামের আগুনে তিলে তিলে পুড়িয়ে মারার ব্যবস্থা করবে; ওকে এমন শাস্তি দেবে, যাতে ও কোনওদিন আর পৃথিবীর আলো দেখতে না পায়।

তিন ভাই মিলে সালেহাকে ডাকে। ওর মুখ থেকেই সব কথা শুনতে চায়। সালেহা সব কথা খুলে বলে। ছোট বউ। সকলের কাছেই ওর একটা আলাদা মর্যাদা আছে। এই বাড়ির প্রতিটি মানুষের ভালবাসায় সিক্ত সালেহা কোনওকিছুই লুকোতে পারে না। বড় ভাই সালেহাকে কিছু পরামর্শ দিয়ে ঘরে যেতে বলে। তারপর তিনভাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, আজ রাতেই চূড়ান্ত কাজটা সেরে ফেলতে হবে। পরামর্শ শেষ করে যার যার মত ক্ষেতে কাজ করতে চলে যায়।

বিকেল হওয়ার আগেই সালেহা সুন্দর করে সাজতে বসে। মুখে ভালো করে স্নো-পাউডার মাখে। পায়ে আলতা মাখে। গত ঈদে স্বামীর আনা টকটকে লালরঙের একটা শাড়ি পরে। এই সাজে এখন সালেহাকে জ্যোৎস্নার পরীর মত মনে হয়। যেন এক্ষুণি ডানা মেলে মহাশূন্যে উড়ে চলে যাবে। মাথার চুলে বিনুনি কাটে। কপালের দু’পাশের চুল ছোট্ট দু’টি ঢেউয়ের মতো উঁচু হয়ে থাকে।

(চলবে…)

আগের পর্বগুলোর লিংক

প্রথম পর্বের লিংক :

http://www.sonelablog.com/archives/3693

দ্বিতীয় পর্বের লিংক :

http://www.sonelablog.com/archives/3840

২৮২জন ২৮২জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য