কঙ্কাল-২

সাতকাহন ২৮ জুলাই ২০১৩, রবিবার, ০১:০৩:৫৫অপরাহ্ন গল্প ৯ মন্তব্য

পরের দিনও পানি আনতে যাবার সময় লোকটাকে একই জায়গায় একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মনে একটা আতঙ্ক এসে ভর করে। অথচ দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া লোকটার আচরণে এখন পর্যন্ত কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়েনি। সে জন্য কাউকে কিছু বলতেও পারছে না সে। তা ছাড়া কীইবা বলবে ? নিজের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা এসে সঙ্কুচিত করে দেয় তাকে। একবার ভেবেছিলো, শহীদুলের বাপকে বলবে। কিন্তু তিনি যদি ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ না করেন, সেজন্য বলতে গিয়েও ঠোঁট বুজে যায়, জিভ আটকে আসে। রাত্রিবেলা ঘুমোতে গেলেও এক ধরনের অজানা শিহরনে বুক কেঁপে ওঠে। দু’চোখে ঘুম আসে না। ভয়ের সঙ্গে এক ধরনের কৌতূহলও তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। লোকটা শেষ পর্যন্ত কী করে-এই একটা কৌতূহল তাকে এখন প্রতিদিন খাঁ সাহেবের পুকুরঘাটের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।

একদিন সন্ধ্যা হয়। এ সময়ে পানি আনতে গেলে ফেরার পথে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে লেকটা সালেহার পথরোধ করে দাঁড়ায়। সে চমকে উঠে ছিটকে খানিকটা দূরে সরে যায়। তাকিয়ে দেখে, লোকটা মিটমিট করে হাসছে। মুখে একগোছা অসম্পূর্ণ দাড়ি, মোচ নেই, চোখে সুরমা। চেহারাটা ভালো না মন্দ, ঠিক বোঝা যায় না। হঠাৎ করেই কথা বলে ওঠে, ‘তোমার সঙ্গে আমার দুইডা কথা আছিলো।’

সালেহা এদিক-ওদিক তাকিয়ে ঘোমটাটা সামান্য টেনে বলে, ‘পথ ছাড়েন। আপনি কিডা, আমি চিনি না।’

‘আমি খাঁ সাহেবের বাড়ির মানুষ। নতুন এইসেছি। পুকুরঘাটে তোমারে দেইখে আমার মন মজেছে।’

‘আপনে আমার পথ ছাড়েন। নালি চীৎকার কইরে মানুষ জড়ো করব।’

‘তা তুমি পারবা না। তাতে তুমারই ইজ্জত যাবে। মানুষ জড়ো হলি তেনারা তুমারে ভাল কবে ? এই সন্ধেবেলায় পরপুরুষের সাথে কথা বলতিছ। তুমার ভয় ডর নাই?’

‘আপনি আমার পথ ছাড়েন।’

বলেই সালেহা লোকটাকে পাশ কাটিয়ে উল্কাবেগে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। লোকটা কোনও বাধা দেয় না। সালেহা ছুটতে ছুটতে এসে ঘরে ঢুকে পানির কলসী নামিয়ে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিজেই সে নিজের বুকের ধড়ফড়ানির আওয়াজ টের পায়। জোরে একটা নিশ্বাস টেনে, উঠে ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে ফের বিছানায় শুয়ে পড়ে। ক্ষেত থেকে শহীদুলের বাপ এখনও ঘরে ফেরেনি।

সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে উঠে হ্যারিকেনটা জ্বালে সালেহা, তার আলোর স্থিরতর শিখায় একজন লোকের অসম্পূর্ণ দাড়ির কিছুটা অংশ কাঁপতে থাকে। বাইরে থেকে শহীদুলের বাপের হাঁক শোনা যায়, ‘ও শহীদুলের মা, কনে গেলা। এদিকে আইস।’

ডাক শুনে ত্বরিৎগতিতে বাইরে বেরিয়ে এসে স্বামীর কাঁধ থেকে লাঙলটা নামিয়ে বারান্দার একে কোনায় দাঁড় করিয়ে রাখে। অন্ধকার বলে কারো মুখই ঠাহর করা যায় না। সালেহা মনে মনে খুশি হয়। যদি আলোর মধ্যে শহীদুলের বাপ বুঝতে পারে, তার মনের ভেতর ভয়ঙ্কর রকমের একটা তোলপাড় চলছে, যদি সে ধরা পড়ে যায়, তা হলে স্বামীর কাছে কী জবাব দেবে ? মনে মনে ঠিক করে সালেহা, না, সে আর পানি আনতে খাঁ সাহেবের পুকুরঘাটে যাবে না। কয়েকদিন সে যায়ও না। কিন্তু পুকুর থেকে পানি না আনলে চলবে ? শহীদুলের বাপ ক্ষেত থেকে ফিরে এসে এই পানিতে পা, হাত-মুখ ধোয়। যে কদিন সে পানি আনতে যায়নি, সে কদিন পাশের বাড়ির হুজ্জতের মাকে  অনেক অনুনয়-বিনয় করে কয়েক কলসী পানি আনিয়েছে। বদলে তাকে খুশি করে চাল-ডাল দিতে হয়েছে। কিন্তু এটা তো নিয়মিত করা সম্ভব নয়। স্বামী কত কষ্ট করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, সারাদিন রৌদ্রের মধ্যে দেহের চামড়া পুড়িয়ে ফসল ফলায়, সময় পেলে সে সিরাজগঞ্জের হাটে যায় দু’টো পয়সা রোজগারের জন্য। যা রোজগার হয় তা থেকে যে আহারটুকু জোটে, সেটা দিয়ে নিজেদেরই ভালভাবে চলা মুশকিল। সেখান থেকে অন্য কাউকে ভাগ দিলে নিজেদের পেটেই টান পড়বে। ভেবে মনস্থির করে, নিজেই সে পানি আনতে যাবে। তবে সূর্যাস্তের আগে গিয়ে আগেই তাকে ফিরে আসতে হবে। ভেবেই কলসী কাঁখে করে ঘর থেকে বেরোয় সে। বেরিয়েই দেখতে পায়, আমগাছতলায় লোকটা নিজেকে খানিকটা আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। তার দাঁড়ানোর মধ্যে এরকম একটা উদাসীনতার ভাব আছে, দেখে মনে হয়, সে প্রকৃতি দেখতে বেরিয়েছে, কোনও ব্যক্তি তার লক্ষ্য নয়। সেটা সালেহারও দৃষ্টি এড়ায় না। সে দ্রুত পুকুর থেকে পানি নিয়ে ফিরে আসার পথে লোকটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে। সালেহা সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে দ্রুত তাকে অতিক্রম করে চলে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু লোকটা প্রজাপতির মতো দু’হাত ছড়িয়ে সালেহার পথরোধ করে দাঁড়ায়। এবার সালেহার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সে চাপা কণ্ঠে চীৎকার করে ওঠে, ‘আপনি কী চান?’

‘আমি তুমারে চাই।’

বুকের মধ্যে একটা প্রচণ্ড পাথরের চাঁই এসে ঘাই মারে। বলে কী লোকটা! তবু নিজেকে  সংযত রাখার চেষ্টা করে সালেহা।

‘আমার বিয়া হইছে, আমার একটা ছেলে আছে, স্বামী আছে।’

‘তাতে কি ? তুমার স্বামী তো ক্ষেতমজুর। তুমারে কিছুই দিতে পারে না। আমি তুমারে সব দিমু। তুমি সুখে থাকবা।’

‘এইডা আপনে কী কন ? আপনে যান, আমার পথ ছাড়েন।’

‘আমি তুমারে ভালোবাসি, আমারে ফিরাইয়া দিও না।’

‘না না, আপনি আমারে যাইতে দ্যান। এখনি আমার স্বামী ঘরে ফিরবে। আমারে ঘরে না পালি সর্বনাশ অবি। আল্লার কসম লাগে, আপনি যান।’

‘আচ্ছা, আমি এখন যাইতেছি। কাইল আবার আসব। তুমি মনডারে ঠিক কর। আমার কথাডা ভাইবা দ্যাখো। তুমার মত রাজরানীরে এই ঘরে মানায় না।’

সালেহা অন্ধকারেও টের পায়, তার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠেছে। তার সুখের সংসার। স্বামী তাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। শহীদুল কোল আলো করে রেখেছে। সেখানে এই লোকটা কালো মেঘের অশনিসঙ্কেত হয়ে সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিতে চায়। সালেহা কী করবে ভেবে পায় না। লোকটা অন্ধকারে কথা বলে ওঠে, ‘আইজ যাও। কাইল তুমি পশ্চিম দিকের বাঁশঝাড়ে আইবা। আমি তুমার মতামত জানতে চাই।’

(চলবে…)

আগের পর্বের লিংক :

১ম পর্বের লিংক

http://www.sonelablog.com/archives/3693

৩২০জন ৩২০জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য