নিউইয়র্কে এখন সামার। প্রতি বিকেলে পার্কগুলো শিশুদের ছুটোছুটিতে সরব হয়ে উঠে। এক মা আসেন ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে। আমি যাই আমার পাঁচ বছরের রিহান’কে নিয়ে। আমরা বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসি। বাচ্চাদের অবজারভ করি। আমি কানে ইয়ারফোন দিয়ে গান শুনি। তিনি ফোনে কথা বলেন পুরোটা সময় খুব কাছের কারো সাথে। শেয়ার করেন প্রবাসের কষ্টগুলো, অপ্রাপ্তিগুলো। সূর্য ডুবে গেলে, চারিপাশ আঁধার হয়ে এলে আমি যখন ক্লান্তির আশ্রয়ে ফেরার তাগিদ অনুভব করি, তিনি সিকিউরিটি ম্যান এসে তাগাদা না দেয়া অবধি বসে থাকেন…
কিঞ্চিত হতাশার সাথে ফোনে কাউকে বলে যাচ্ছিলেন___ বিয়ের পর এদেশে তাঁর আনন্দহীন, পরাধীন যাপিত জীবনের কথা। বাবার বাড়ির সুখের সময়গুলোর কথা। প্রতি মুহূর্ত মন আনন্দে ভরে থাকার কথা। অবাধ ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা, বন্ধুদের সাথে আনন্দমুখর সময়, বাবার সাথে রিক্সায় উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো, গলির মোড়ে কাজিনদের সাথে আইসক্রিম খাওয়া… এমনতর আরো নানান সুখের গল্প। সোনালি অতীত হাত্‌রে কখনো সপ্রতিভ হয়ে উঠছিলেন, কখনো দীর্ঘশ্বাসে কণ্ঠস্বর ধরে আসছিলো তাঁর।

 

এসব শুনে শুনে আমি ক্রমশ ভাবনায় ডুবে যাচ্ছিলাম। ক্লাস নাইন কিংবা টেন এর সময়টাতে একদিন স্কুল থেকে দলবেঁধে অনেকের সাথে আমিও এক বান্ধবীর বাসায় যাই। বান্ধবীটি পালিয়ে বিয়ে করে অনেকদিন স্কুলে অনুপস্থিত। হঠাৎ তাঁর একটি ছেলে হয়েছে শুনে আমরা আনন্দে সদলবলে দেখতে গিয়েছিলাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেলে বাসায় ফিরে দেখি থমথমে পরিবেশ। বাবা-মা গম্ভীর। কেমন করে যেন তাঁরা খবর পেয়ে গেছেন আমি ফিরবার আগেই। বকাঝকা করেনি যদিও। মুখের অভিব্যক্তিই অনেক কিছু বুঝিয়ে দিলো সেইদিন। কঠোর, কঠিন, পরাধীন শৈশব কৈশোর আমার ! বিয়ের পর হৈচৈ, উচ্চস্বরে হাসি-ঠাট্টা, রাতভর স্বামীর সাথে, বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো___ আনন্দময়, স্বাধীন এক জীবন এখানে…

 

সৃষ্টিকর্তা সম্ভবত একসময়ের না পাওয়াগুলো অন্যসময়ে পুষিয়ে দেয়। কিংবা একসময় অনেক পেয়ে গেলে অন্যসময় অপ্রাপ্তি সামনে এসে দাঁড়ায়। একজীবনের পুরোটা সময়ই আনন্দের কিংবা বিষাদের হয় না। অনেকটা এমন___ আকাশ অনন্তকাল ধরে মুষলধারে বৃষ্টিপাত করে না… কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি …

 

৪৩১জন ৪৩১জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ