সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

ও কার বোন চিনিস তো? //

বন্যা লিপি ৭ জুন ২০২০, রবিবার, ০৮:০৮:৪১অপরাহ্ন গল্প ২২ মন্তব্য

সক্কাল সক্কাল মেজাজটা বিগড়ে বকর বকর করেই যাচ্ছে মা। সবজিগুলো চটের থলে থেকে বেসিনের পাশে রাখতে রাখতে দীপার সাথে গরম গরম বাক্যব্যায়ে ব্যস্ত হাত চালাচ্ছে। দীপা ও মধ্যম গলায় জবাব দিয়ে যাচ্ছে আর মায়ের কাজে হাত লাগাচ্ছে।
: দীপা
: ও সুতপা দি! এসো না, বসো!
: নারে, কাল যে আচার দিয়েছিলি! বাটি টা দিতে এলাম। নে ধর।

কোলে আট মাসের ছেলেটার কান্না থামাতে থামাতে সুতপা’দি বেরিয়ে গেলো।
: ও কবে এলো রে?
মা জিজ্ঞেস করলো সুতপাকে উদ্দেশ্য করে।

: গত পরশু । বরের সাথে ঝগড়া করে চলে এসেছে।

: ঝগড়া করে চলেই যদি আসবে, তো পালিয়ে গিয়েছিলো কোন সুখে?

: মা! কেউ কি আর আগে থেকে বুঝতে পারে? মেয়েরা প্রেমে পড়লে এতশত ভাবে নাকি?

মা যেন রণমুর্তি হয়ে উঠলো। মুখ আর গলার জোড় বাড়িয়ে দিয়ে দু’কথা অকথ্যকথন ঝেড়ে দিলেন গল গল করে। যোগ করতে ছাড়লেন না-

: আর তুই এত আজকাল প্রেম- ভালবাসা নিয়ে বুলি কপচাচ্ছিস কেন বলতো? তুই যদি এমন পালিয়ে বিয়ে করার কথা ভাবিস তো, মেরে তোর ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে দেবো জেনে রাখ।

দীপা ঘুরে মায়ের মুখের তাকিয়ে হেসে দিলো-

: আমি কি অমন গরীব কারো সাথে পালাবো ভেবেছো? আমি পালালে বড়লোক ছেলের সাথেই পালাবো। গাড়ি হবে, বাড়ি হবে, নিত্যনতুন শাড়ি গহনা!
লাল শাড়ির কালো পাড় গোঁজা কোমড়ের কাছে, মা তখন এক হাতে কিনে আনা টমেটো হাতে নিয়ে ঘোরাচ্ছেন, আরেক হাত কোমড়ে রেখে মাথা উপর নিচে দোলাচ্ছেন, দীপার কথা শেষ হতেই সজোড়ে ছুঁড়ে মারলেন দীপার মুখের উপরে…..

ডানপিটে দীপা মুখ হা করে মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষন, ছুট দিলো বস্তির অন্য ছোটো ছোটো বালক দলের সাথে ডাঙ্গুলি খেলতে। সরু রাস্তার ধার ঘেসে খোলা মাঠে ছুটাছুটি করে পেটাচ্ছে ডাঙ্গুলি। ডাঙ্গুলির ছোট কাঠের টুকরোটা হঠাৎ গিয়ে উড়ে পড়লো রাস্তা দিয়ে চলন্ত মোটরবাইকে রাতুলের গায়ে। বাইক থামিয়ে রাতুল ক্যাবলাকান্তের মতো তাকিয়ে আছে তো তাকিয়েই আছে দীপার দিকে। দীপা পারে তো আধাহাত জিভ বের দুই দাঁতের মাঝখানে কেটে ফেলে। মালকোচা করে দোপাট্টা কোমড়ের কাছে গিট্টু মারা, কমলা হলুদ রঙা সালোয়ার কামিজে দীপাকে জ্বলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ লাগছে। রাতুল যেন দুনিয়ার তাবৎ কোলাহল ভুলে অচেতন হয়ে আটকে গেছে দীপাতে। দীপা সামলে নিয়ে বাইকের কাছে এসে গলা চড়ালো……

: পাঁচশ টাকা ধার নিয়েছি বলে সময় নেই অসময় নেই যখন তখন তাগাদা দিতে আসতে হবে? কাল বিকেলে বাড়ি চলে এসো, দিয়ে দেবো।
রাতুল দাঁত কেলানো হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোফের মাঝখানে। গটগট করে সামনে থেকে চলে গেলো দীপা। রাতুল গমন পথের দিকে চক্ষু বিছিয়ে রাখলো বাইকের হাতলে হাত রেখে। বাড়ি যেতে বলেছে দীপা কাল টাকা আনতে। টাকা গোল্লায় যাক। দীপাকে আবার দেখতে পাবে ভেবেই চোখের তারায় ভীড় করতে শুরু করেছে চঞ্চল প্রজাপতির অগনিত রঙের মেলা। ঝাকড়া চুলো নিমাই সেই চোখের সামনে এসে রঙ ধুয়ে দিয়ে দাঁড়ালো। মাছি তাড়াবার মতো হাত ওড়ালো বাতাসে রাতুল।
নিমাই বলে উঠলো-

: জানে বেঁচে থাকতে চাস তো ভুলেও ও বাড়ি যাসনে কাল। টাকা তো দুরে থাক। দীপার দিকেও আর অমন করে তাকাস না।

রাতুলের কপালের চামড়ায় আগোণা ভাঁজ পরলো। চোখদুটো কুঁচকে গেলো নিমাইয়ের কথায়। কপালের ভাঁজে আর চোখে প্রশ্নের ছবি সেঁটে তাকালো নিমাইর দিকে।

: ও দীপা ভবতোষের বোন। চিনিস তো ভবতোষ কে?

ম্যাটিনি শো দেখে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরছিলো দীপা ওর আরো দুই বান্ধবির সাথে। তাপস, সুভাস, নিরঞ্জন, তপন এরকম আরো কয়েকজন সেদিন দীপা আর তার বান্ধবিদের টিজিং করছিলো পেছন থেকে। যমদূতের মতো হাজির হয়েছিলো সামনে ভবতোষ।
: কার দিকে অমন খিস্তি ছাড়লি রে মদনার দল? গোলাপি জামা পড়া মেয়েটাকে চিনিস তোরা কেউ?
তাপস জবাব দেবার সময় পায়নি। দাঁড়ি কাটা ক্ষুর আচমকা কপালের বাঁপাশ থেকে উপর হয়ে ত্যাছড়া ভাবে নেমে এসেছে ডানপাশের চোঁয়াল চিড়ে দিয়ে। বিভৎস চেহারা নিয়ে তাপস আজো ঘুরে বেড়ায় অন্য পাড়ার সীমানায়। দীপার ছায়া দেখলেও উল্টোদিকে দৌঁড়ে পালায়।
পুলিশ কোর্টকাচারি করার সাহসই হয়নি কারো! ভবতোষের নামে কাঁপে আশপাশের এলাকা।

ঠান্ডা গলায় নিমাই বর্ণনা করে গেলো রাতুলকে। রাতুল চোয়াল শক্ত আর সাপের মতো ঠান্ডা চোখে সব শুনে গেলো মুখে কিছুই বললো না।

দীপার মনে দাগ কাটার মতো চোখ আটকে যায়না যে কাউকে দেখে। স্বপ্ন দেখে যায়… কেউ হয়তো নিশ্চই কোথাও আছে…যাকে নিয়ে পালাবে শাড়ি গহনা বাড়ির বড়লোকি কোনো প্রেমিকের হাত ধরে। দীপা জানেনা প্রেম আর ভালবাসার মধ্যে ভালবাসা কারে কয়!

৪০৬জন ২৭৭জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য