কুকুর আসিয়া এমন কামড় দিল পথিকের পায়,

কামড়ের চোটে বিষদাঁত ফুটে বিষ লেগে গেল তায়- খুব জনপ্রিয় একটি কবিতার লাইন।এ কবিতায় বলা হয়েছে কুকুর কামড়ালেও আমাদের কামড়ানো যাবেনা। কারন আমরা মানুষ। আমার তো মনে কয় আমিও মানুষরুপী কুকুরদের আমিও কামড় মারি। কুকুরের চেয়ে জোরে সোরে কামড় মারি কিন্তু মারতে তো পারিনা,কি যে করি?

পাশাপাশি দুটো পরিবার। একটি স্বনামধন্য,নামডাকঅলা, অল্পশিক্ষিত। এদের লোকে চেনে, ভয় পায়, সম্মান করে। আর একটি অতি সাধারন! শিক্ষিত পরিবার। যাদের সমাজে নামডাক, ডরভয় কিছু নেই। সবাই জানে এরা সরকারের গোলাম। লেখাপড়া করে চাকরী করে পেট চালায়। কথায় আছে-“জীবনযাপন ভালো করতে চাইলে হয় হবেন অতি বিখ্যাত, না হয় অতি কুক্ষ্যাত। মাঝামাঝি হলেই বিপদ”। মধ্যবিত্ত জীবিরা কোনটাই না শুধু বিপদ!

সরকার ঘোষণা দিয়েছেন শতভাগ বিদ্যুতায়নের।পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিসে গেলেই মাইকে ঘোষণা শোনা যায়। যারা এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ পাননি, অতিসত্বর অফিসে যোগাযোগ করুন। একটা একটা করে উপজেলা গুলোতে কাজ শেষে শতভাগ ঘোষণা করা হচ্ছে। বারবার মাইকে রাস্তায় ঘোষণা হচ্ছে যারা এখনও আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ পাননি তারা অতিসত্বর অফিসে যোগাযোগ করুন!

আমাদের গ্রামের বাড়ীতে অনেক বছর ধরেই বিদ্যুৎ দেখছি। কিন্তু সেটা নাকি আবাসিক নয়, সেচ সংযোগের মাধ্যমে চলছে। একসময় শতভাগ হয়ে গেলে সেচের লাইন ছমাসের জন্য হয়ত বন্ধ করে দেয়া হবে। তখন আবাসিক বিদ্যুৎ ছাড়া সমস্যা হবে। আশেপাশের সবাই সদস্য হচ্ছিলেন। আমাদের বাড়িতে ও একজন ইন্জিনিয়ার এলেন। নামধাম সব লিখে নিয়ে গেলেন। গ্রামে জমিজমা থাকায় আমার নামটাও লেখা পরে গেল। মানে আমিও একজন সদস্য হয়ে গেলাম।

যথাসময়ে তাদের কার্যক্রম শুরু হল। স্ট্যাকিং সিট অনুযায়ী অফিস খুঁটি পুঁতেও ফেলল। আশেপাশের মোটামুটি সব বাড়িতেই খুঁটি, তার সব লাগানো শেষ। কিছু বাড়িতে নতুন সংযোগের বাতিও জ্বলল। আমাদের বাড়িটা রাস্তা থেকে একটু দুরে। তাই তখনো লাইন এলনা। এটা দিয়েই হয়ত কাজ শেষ হবে আমরা এটাই ভাবছি। পরে দেখা গেল ঘটনা অন্য।

আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ লাইনটি আসবে পাশের বাড়ির স্বনামধন্যের পুকুর পাড় ও বাঁশ ঝাড় দিয়ে। স্বনামধন্যের তাতে ঘোর আপত্তি। বিদ্যুতের মেইন তার তার বাড়ির আশেপাশে দিয়ে আসলে তার ও পরিবারের জীবননাশের হুমকি হতে পারে। তাই তিনি বাঁধা দিলেন।

বাড়িতে আমার যেভাই থাকে সে অফিসে গিয়ে দরখাস্ত দিয়ে এল। অফিস থেকে টিম এসে নকশাটা একটু চেন্জ করে বাড়ির বাঁশঝাড়ের পরিবর্তে পাশের রাস্তা দিয়ে লাইনটা টানার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেঅনুযায়ী লোকজন, খুঁটি, তারসমেত চলে এল। আমাদের বাড়িতে আটদশজন লোকের রান্না করা হল। তাদের অটোভাডা, গাড়ি ভাড়া সব দিয়ে দেয়া হল। আবারও স্বনামধন্য বাধা দিলেন। রাস্তায় একটি পুরোনো তালগাছ এটি তার বাবার লাগানো। এটি কাটা পরবে তাই সম্ভব নয়। রাস্তাটি সরকারী হওয়ার পরও স্বনামধন্যের ছেলের পালিত বাহিনী লাঠিসোটা নিয়ে বসে রইল। পল্লী বিদ্যুৎ এর লোকজন আবার ফেরত গেল। অফিস পুরো ব্যাপারটা অবগত থাকার পরও চুপচাপ। প্রথম কারন কেউ বাধা দিলে সেখানে তারা কাজ করেনা। দ্বিতীয় স্বনামধন্যের রাইসমিল আছে। তাই তিনি একজন বড়মাপের সম্মানিত কাষ্টমার। চুনোপুঁটিদের জন্য তাকে কোনভাবেই অখুশি করা যাবে না।

এরপর মজার মজার কিছু ঘটনাও ঘটতে থাকল। একসকালে দেখি পুকুরের সব মাছ মরে ভেসে বেড়াচ্ছে। গন্ধে গ্রামময় মৌ মৌ করল। আমরা বাড়ীতে বাচ্চা বুড়ো সবাই মাছের জন্য হাহাকার করলাম। মা তার প্রিয় মাছের গা বুলিয়ে কাঁদল। আর স্বনামধন্য মুচকি মুচকি হাসল।এরপর সেচ পাম্পের সব কিছু একরাতে তুলে নিয়ে গেল কে বা কারা। সুপারী বাগানের সুপারী নিয়ে গেল। নারিকেল গাছের নারিকেল।

স্হানীয় প্রশাসন বলতে চৌকিদার, মেম্বার, চেয়ারম্যান সবাইকে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য জানানো হল। চৌকিদার আমাদের টাকার বেতন খায়। মেম্বার, চেয়ারম্যানকে ভোট দিয়েছি এটা আমাদের অধিকার। তারা কিছুই করলনা। বরং বলল আপনারা তো কাউকে দেখেননি। অযথা সন্দেহে কাউকে বদনাম করা ঠিক না। মা ওযু করে জায়নামাজ পেতে আল্লাহকেই বিচার দিলেন।

আবারও দরখাস্ত দেয়া হল অফিসে। সেদিন  আমিও গেলাম। এডি হালকা দাডিঅলা মধ্যবয়সী একজন ভদ্র মানুষ। আমাদের কথায় ভীষন কষ্ট পেলেন। বললেন বিষয়টি দেখার জন্য তিনি নিজেই আসবেন। পরদিন এলেন আমরা তাকে স্বনামধন্যের কাছে নিয়ে গেলাম। পাশের বাড়ির স্বনামধন্য তাকে আমরা ভাই বলি। তার সাথে আমাদের কোন দ্বন্দ্ব নেই কিন্তু কি এক অজানা কারণে আমাদের দেখতে পারেন না। এডি সাহেব শিখিয়ে দিয়েছিলেন তাকে অনুরোধ করতে। ভাইয়া তার হাত ধরে অনুরোধ করল। আপনি আমার বড় ভাই হন আপনাকে অনুরোধ করছি ভাই রাস্তায় খুঁটি বসলে আপনের কোন সমস্যা হবেনা। আপনি এ উপকারটুকু করেন।

কিছুতেই তাকে গলানো গেলনা। তার যুক্তি ছাড়া কথা আমি দেবনা। তুই অন্যদিকে দেখ। পরদিন থেকে স্বনামধন্যের রাইসমিলের চাতালের কাজ শুরু হল একদম রাস্তা বরাবর। আর কোন উপায় রইলনা। সরকারী রাস্তার এতটুকু জায়গাও ফাঁকা থাকল না একদম ঘেঁসে চাতাল বানালেন। তাতে কারও তেমন প্রতিবাদ বা মাথাব্যথা নেই। কারন তার ছেলের বিরাট পোষ্য বাহিনী আছে। গ্রামের এই ছেলেরা পল্লীবিদ্যুতের লোকজনের কাছে মোটা অংকের টাকা চাঁদা ও নিচ্ছে। এবং বাড়ি প্রতি দশহাজার করে টাকা বিদ্যুৎ সংযোগ বাবদ। তাদের লক্ষ লক্ষ টাকা ইনকাম। একদিন একটি কমবয়সী ছেলে এসে বেশ বিনয়ের সাথে প্রস্তাব দিল মাত্র একলক্ষ টাকা দিলে সে বিষয়টি দেখতে পারে। ভাইয়া না করে দিল। কারন সরকারের কাজ টাকা কেন? কোন একটা ব্যবস্থা তো হবেই!

হঠাৎ যিনি নকশা করেছিলেন সেই ইন্জিনিয়ার ওয়াজেদ ভাই অন্যখানে চলে গেলেন। আবার কাজে ভাটা পড়ল। আমি ভাবলাম শুধু তো একদিক বন্ধ হল।আমাদের চারিদিকে বিদ্যুৎ, অন্য দিক থেকে দেবার জন্য অনুরোধ করে আবার দরখাস্ত দিলাম। অফিস থেকে জানানো হল, মাত্র একটা পরিবারের জন্য নতুন করে স্টেকিং করা , নকশা করা, বাজেট বানানো অতি ঝামেলার কাজ। সময় লাগবে। পরের একবছরেও কোন ফল হলো না। ভাইয়া হাল ছেড়ে দিয়ে যা হয় হোক এমনভাবে বসে রইল।

আমি কোনভাবেই এ পরাজয় মানতে পারছিলাম না। হঠাৎ আমার কলেজের এক বন্ধুর কথা মাথায় আসল। শুনেছি সে এসব কাজ করে দেয়। আমি তাকে খুঁজে বের করে সব খুলে বললাম। সে নেমে পড়ল কাজে। কিছু টাকা লাগবে। লাগুক, তবুও কুকুর খাওয়াবো না। প্রথমেই আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকা নিল। সাথে ছবি, ভোটার আইডির ফটোকপি এসব। আগে মিটার এর কাজ করে ফেলবে তারপর এমনিতেই  অফিস লাইন দিয়ে দেবে। মিটার হয়ে যাবার পর লোকজন এল মিটার লাগাতে।কাজ  সামান্য একটা খুঁটির দুরত্ব। তারসব গোছানোই অন্যখুটির মাথায়। শুধু টেনে সংযোগ দেবে। স্বনামধন্যের ছেলের বাহিনী এ দিকেও লাঠি নিয়ে বসে রইল। মিটার লাগানো লোকজন চেষ্টা করল মিটমাটের কিন্ত হলনা। আবারও ব্যাপারটা অতি হাস্যকর হয়ে গেল।

এবার আমার সেই বন্ধুটি এল স্বনামধন্যের ছেলেকে বোঝাবে। কে যে কাকে, কি বোঝালো। শুধু বন্ধু বলল কিছু টাকা দাও কাজ হয়েছে। এই বলে সে সেই যে গেল, আর কোনদিন এলোও না। আমার ফোনও ধরলনা।

আমার বোনজামাই পিডিবির এক্স,ই,এন। তার পরিচিত অনেক বন্ধু বান্ধব পল্লীবিদ্যুৎ এ আছেন। তিনি অনুরোধ করলেন বিষয়টি দেখার জন্য। সবাই দেখব বলে, তারপর জানিয়ে দেয় ভাই এটা সম্ভব নয়। এর মধ্যে কন্ট্রাক্টটারের বিলও পার হল। মাইকে ঘোষণা হল রাজারহাট উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায়। অথচ আমাদের বাড়িতে তখনও বিদ্যুৎ আসেনি।

এবার আমি জোরেসোরেই কোমর বাঁধলাম। যেহেতু শহরেই থাকি, সময় পেলেই অফিসে যাই। অন্যলাইন থেকে সংযোগ দেবার জন্য দরখাস্ত দিতে থাকলাম। দেরবছরে দরখাস্তের স্তুপ জমা হল কিন্তু কাজ হলনা। আমি গেলে এডি চা খেতে দিতে বলে। তারপর নানা ব্যস্ততায় অস্হির হয়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে আসি। এভাবে রিক্সায় ডলা খেতে খেতে পাছা শক্ত হয়ে গেল।

একদিন অফিসে ঘুরতে ঘুরতে একজনের সাথে পরিচয় হল। আমরা যাকে দালাল বলি। সে অনেকদিন ধরে আমাকে দেখছে। সে নিয়ে গেল একেবারে বিক্রয়, বিতরণের প্রধানের কাছে। পরিচয়ে জানা গেল তিনি আমার স্টুডেন্ট এর বাবা।তিনি আশ্বাস  দিলেন। আরও কিছদিন অপেক্ষা করলাম। কেন যেন কাজ হয়না। অতঃপর সেই দালালকে ফোনে ডাকলাম। সে বলল কিছু টাকা লাগবে ইন্জিনিয়ার খাবে । অগত্যা তাকে টাকাপয়সা দিয়ে আছি চুপচাপ। তিনমাসের মধ্যে নতুন করে স্ট্যাকিং হল এবং সমস্ত খুঁটি বসল আত্নীয়দের ও আমাদের জমির উপর দিয়ে। একটি খুঁটি হলে যে লাইন হবার কথা সেটি বেশ দুর থেকে চলে এল সারি সারি খুঁটিতে করে।

এবার মিটার নিয়ে আবার একচোট ঝামেলা। মিটার পুরোনো হয়ে গেছে। আমার ছাত্রীর বাবা এবার শিক্ষক হবার সম্মান টুকু দিলেন। তিনি বহু পুরোনো কাগজ ঘেঁটেঘুটে কাগজ বের করে, মিটার লাগিয়ে দিলেন বিনা খরচে।

আমার এক বন্ধু ফেবুতে স্ট্যাটাস দিয়েছে ” নোংরা রাজনীতি কাকে বলে,কত প্রকার ও কি কি যদি জানতে ও শিখতে চান। কিছুদিন অন্তত গ্রামে বসবাস করুন”!

আমার সবসময়ই গ্রাম টানে। বাপ-দাদা চাষা, জমিজিরাত অলা। আমারও তাই বিশুদ্ধ বাতাস, খালডোবা, সবুজ গ্রাম, ধানক্ষেত, তার নানা রঙ-ঢঙ ভালো লাগে। কি দরকার শহরে বসবাস করার। গ্রামগুলো বিদ্যুতের বদৌলতে তরতরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকজন গ্রামেই বেশ সুন্দর সুন্দর বাড়ি করে বসবাস করছে। এতে শহরের উপর চাপও কমে যাবে। শেষ বয়স নিশ্চিতে কাটাবার খুব ইচ্ছে ছিল। এখন দিন দিন সেটা কমে যাচ্ছে কারন যে বিদ্যুৎ ফ্রি হবার কথা তার জন্য কাড়িকাড়ি টাকা গেল। পাছায় কড়া পড়ল। লোফার, চামচারা সমাজপতি। তাদের অন্যায়ের প্রতিকার নেই, আর বিচারই বা কাকে দেব বা কে করবে?

আমরা নাকি স্বাধীনতাপেয়েছি? আদৌ কি সব মানুষ স্বাধীনতা পেয়েছে নাকি কিছু শ্রেণীর/মানুষের সুবিধা বেড়েছে? আমার মনে হয় কিছু শ্রেনীর মানুষ সুবিধা পেয়েছে।

আর কথা না বাড়িয়ে শেষ করছি। গান শুনবেন? আইয়ুব বাচ্চু-

“কেউ প্রেম করে, কেউ প্রেমে পড়ে!

আমার হয়েছে কোনটা জানেনা এই মনটা।”

**রিমিক্স- কেউ দেশ গড়ে, লুটেরা সুবিধায় খেয়ে মরে,

আমার হয়েছে কোনটা,,,,জানেনা এই মনটা,,,

শুভ রাত্রি।🌹🌹

২৯১জন ১১৪জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য