ওপারে ভালো থেকো কৌশিক!

তৌহিদ ১৬ নভেম্বর ২০১৯, শনিবার, ১২:২১:১৪অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩৩ মন্তব্য

কৌশিক মারা গিয়েছে। আজ সকালে যখন এই সংবাদটি শুনি তখন থেকেই এক চরম বিমর্ষতায় আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। ছোট্ট টগবগে কিশোর ছেলে কৌশিক সবাইকে ফেলে অনেক অভিমান নিয়ে চলে গিয়েছে না ফেরার দেশে। ছোট্ট ছেলেটি নাকি আত্মহত্যা করেছে!

কৌশিক আমার পূর্ব পরিচিত ছিলো। দু’বছর থেকে তাকে চিনি। আমার সাথে ছিলো প্রায় পনেরো দিন, এরপর দেখা হয়েছে মাত্র দু’বার। এই কিছুদিনের দেখাতেই সে আমার মাঝে খুঁজেছিল সামান্য আশ্রয়। এ আশ্রয় মাথাগুঁজে থাকার জন্য নয়, এটি ভালোবাসা পাবার আশ্রয়। নিজের শিশুসুলভ মনকে আমার কাছে সঁপে দিয়ে সে পেতে চেয়েছিল একটু আদর।

একজন পিতৃতুল্য বড়ভাইয়ের কাছে দুষ্টামিপনা আর আবদারের দাবী নিয়ে এক সন্ধ্যায় কৌশিক মেলে ধরেছিল তার জীবন খাতা। সেদিন প্রথম দেখাতেই দু’ঘন্টা একনাগাড়ে সে বলে গিয়েছিলো তার লোমহর্ষক জীবনের করুণ গল্প। আমি হতভম্ব হয়েছি, গা শিউরে উঠেছে বারবার। আমার মনে আছে, তার যন্ত্রণাময় পারিবারিক এবং মানসিক জীবনের কথাগুলো বলার সময় কৌশিকের দু’গাল বেয়ে নেমে এসেছিলো অঝোর ধারায় নোনা অশ্রু।

ছোটবেলায় তার মা মারা গিয়েছে, পিকনিক করতে গিয়ে কে বা কারা তার মাকে গুলি করেছিল তা আজও রহস্যময় থেকে গিয়েছে। ছোট্ট শিশু কৌশিক সেদিন মা মা বলে চিৎকার করে বলেছিল- আমার মাকে তোমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? কেন মাকে মাটি দিয়ে ঢেকে রাখছ? আমিও মায়ের কাছে যাবো, আমাকে যেতে দাও। মা, মা তুমি কথা বলছোনা কেন আর? আমাকে কুশি আমার আদরের কুশি বলে ডাকোনা মা।

এরপর কৌশিক তার ফুপু’র কাছে মানুষ হতে থাকে। তার বাবার সরকারি চাকরী, দূরে থাকেন। সপ্তাহে একদিনের জন্য আসেন ছোট্ট কৌশিককে দেখতে। মা বিহীন কৌশিকের দিন কাটে আদর-শাসনহীন। আদরে অনাদরে ধীরে ধীরে কৌশিকের মাঝে জন্ম নেয় ক্ষোভ, প্রতিহিংসা। জগৎসংসারের সমস্ত খারাপ জিনিসগুলিকে সে আত্মস্থ করতে শেখে। অথচ কৌশিকের ফুপুর আদরযত্নের কমতি ছিলনা বলেই শুনেছিলাম।

এমন অবস্থা দেখে কৌশিকের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন যাতে তার আদরের সন্তানটি মানুষ হয়ে ওঠে। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হয়। কৌশিক তার সৎমাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা শুরু করে। তার বাবাকে, বাবার আদরকে ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে এরকম ভাবা শুরু করে সে। কিশোর মনের হেয়ালীপনায় আক্রান্ত হয় কৌশিক। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত কৌশিকের শিশুসুলভ অস্বাভাবিক অনেক আচরণ নতুন মা মেনে নিতে পারেননা। অগত্যা বাধ্য হয়ে কৌশিকের বাবা অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলেই নালিশ করা শুরু হয় ছোট্ট ছেলেটির বিরুদ্ধে। সেসব অভিযোগ তার বাবাকে ত্যক্তবিরক্ত করে তুলেছিল। রাগ করে কৌশিককে কয়েকদিন মারধর করে শাসন করেছেন তার বাবা।

এসবের ফলে কৌশিকের মনে হচ্ছিলো, এই পৃথিবীতে তাকে বোঝার আর কেউ নেই। বারুদের মধ্যে ফস্ করে আগুন জ্বলে ওঠে সেদিন। রাগে অভিমানে বাসা থেকে বের হয়ে যায় কৌশিক। দেশান্তরি হবার কৈশোরসুলভ আচরণ তাকে প্রতিবাদী করে তোলে। ভারতগামী একটি ট্রেনে উঠে পড়ে সে। যখন ঘুম ভাঙে তখন তার চারপাশে মানুষের জটলা। এত ছোট একটি ছেলে হিলি সীমান্তের ভারতগামী একটি ট্রেনে কি করছে একা একা? ট্রেনের টিটি তাকে আদর করে স্টেশনমাস্টারের ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ছোট্ট কৌশিক ভয় পেয়ে তার বাসার ঠিকানা বলে দেয়।

কৌশিক যখন তার বাবার সাথে আমাদের কাছে আসে তখন তার ডানহাত রক্তারক্তি। বাবার শাসনের অভিমানে রাগে কৌশিক ডান হাত দিয়ে কাঁচের শোকেজে সজোরে আঘাত করে কাঁচ ভেঙে ফেলে। হাতের চামড়া মাংসসহ উঠে আসে। এ অবস্থাতেই তার বাবা আমাদের কাছে এনেছেন কৌশিকের মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত মস্তিষ্ক আর মনকে সুচিকিৎসার উদ্দেশ্যে। মটিভেশনাল কাউন্সিলর তাকে আমাদের কাছেই পাঠিয়েছিলেন মোটিভেশন সেশন শুরু করার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। আমি নিজেও মাঝেমধ্যে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত মানুষদের উৎসাহমূলক কথা বলে তাদের মোটিভেট করতে চেষ্টা করি টুকটাক।

আমার টেবিলের সামনে বসা কৌশিক নিজের হাতের ক্ষতস্থানে সেলাই আর ব্যান্ডেজ নিয়ে তার বাবাকে বলেছিল- বাবা, আমার ঘর আলাদা করে দাও। নতুন মা মাঝেমধ্যে আংকেলকে দিয়ে তার শরীর ম্যাসাজ করিয়ে নেয়। আমার মোটেও ভালোলাগেনা। আমি মাকে বাধা দিলে তখন সাথে থাকা ঐ লোকটি আমাকে খুব মারে। এসব শুনে কৌশিকের বাবা আমার সামনেই চিৎকার করে ওঠে- তোকে কতবার বলেছি এইসব কথা কারও সামনে বলবি না? এমন হিংস্র চিৎকারে চুপ হয়ে যায় ছোট্ট কৌশিক।

অনেক কথার মাঝে তার এই একটি কথা শুনেই আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। মাথার বিস্ময়কর মনোজগতের নানান কথা ঘুরপাক খেতে থাকে আমার। আমি হয়তো কৌশিকের সমস্যা বুঝতে পারছি একটু করে। তার বাবা যখন কৌশিককে আমাদের কাছে রেখে চলে যায় তাকে বলি- আপনার দ্বিতীয় বিয়েতে কৌশিকের মত ছিলো? সে বলে, আমি বিয়ে করেছি তার ভালোর জন্যই। ছোট ছেলের আবার মতামত নিতে হবে কেন? আপনি কি সুখী? আমার এই প্রশ্নের সে কোন উত্তর দিতে পারেনা। ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। হয়তো অনুশোচনায় ভুগছে। বললাম- আগে কৌশিক কিছুটা সুস্থ হোক তারপরে আপনার সাথে কথা বলবো কেমন? তবে আগেও দেখেছি, এসবক্ষেত্রে পেশেন্ট দীর্ঘদিন একরকম ঘোরের মধ্যে থাকে, আপনার আদরই পারে তার পূর্বের সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে।

দীর্ঘদিন আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে কৌশিক ধীরেধীরে মানসিক ভারসাম্য ফিরে পেতে শুরু করে। তার বাবা তাকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মাঝেমধ্যে ফলোআপে আসত সে। ভালোই চলছিল দিনকাল, ইদানীং তার সৎমাও নাকি ভালো আচরণ করছে তার সাথে। কিন্তু আজ হঠাৎকরেই খবর পাই কৌশিক মারা গিয়েছে। তবে তাকে নাকি চেনা যাচ্ছিলো না, সমস্ত শরীর আগুনে ঝলসে বিকৃত হয়ে গিয়েছে।

খবর নিয়ে জানতে পারলাম- সারাদিন বাসায় একাই ছিলো কৌশিক। তার সৎমা বাসার ফ্রিজ, আলমারি, খাবারের মিটশেফ সবকিছু তালাবন্ধ করে রেখে বাইরে গিয়েছে। ঘুম থেকে প্রচন্ড ক্ষুধা নিয়ে বাসায় কাউকে দেখতে না পেয়ে সে তার বাবাকে ফোন দেয়। বাবা, মা বাইরে গিয়েছে। আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে কিন্তু সবকিছুতেই তালা মারা। আমি বাইরে যেতে পারছিনা বাবা, তুমি তাড়াতাড়ি এসো। বাবা বলে- তার কাছে শুধু ফ্রিজের চাবি আছে একটা। ফ্রীজে ইলিশ মাছ আসে। আর কিছুক্ষণ পরে দুপুর একটার মধ্যেই সে চলে আসবে। তখন নিজে রান্না করে কৌশিক আর সে মিলে কড়কড়ে ইলিশমাছ ভাজা দিয়ে গরম ভাত খাবে। এইতো আর একঘণ্টা, আসছি বাবা কৌশিক।

তার বাবার বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় দু’টো বেজে যায়। তালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে তিনি দেখেন- কৌশিকের শরীর গ্যাস সিলিন্ডারের সাথে চিকন চেইনের শেকল দিয়ে বাঁধা। পুরো শরীর আগুনে ঝলসে গিয়েছে। হাউমাউ করে চিৎকার দিয়ে কান্নার শব্দ শুনে আশেপাশের মানুষজন এসে পরিস্থিতি সামাল দেন।

মনে অনেক প্রশ্ন আসছে কিন্তু উত্তর দেবার জন্য কৌশিক বেঁচে নেই। কৌশিকের সৎমা বাসায় ছিলোনা কেন? এত চিকন চেইনের শেকল কৌশিক ইচ্ছে করলেই টান মারতে পারতো, কিন্তু তা করেনি কেন? এমনকি সে চিৎকারও দেয়নি। নিজের শরীরে আগুন লাগানো, সে আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে মারার যন্ত্রণা এতটুকু ছেলে নীরবে সহ্য করতে পেরেছে? এটা কি করে সম্ভব? আচ্ছা এমন নয়তো তাকে কেউ মেরে তারপরে শরীরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে? আহা! ছোট্ট ছেলেটির মাকেও কেউ মেরেছে, এখন ছেলেটিও মরলো। পৃথিবীটা চরম নিষ্ঠুর!

পরবর্তীতে এখন পর্যন্ত কোন মামলা হয়েছে বলে শুনিনি। কৌশিকের বাবা চুপচাপ মৃত সন্তানের লাশ দাফন করেছেন। কেউ কোন প্রতিবাদ করেনি। ওপারে তুমি ভালো থেকো কৌশিক, খুব ভালো থেকো। অসীমের পথে তোমার এই যাত্রা, আমাদের সবাইকে আত্মগ্লানিতে নিমজ্জিত করে রাখবে অনেকদিন।

কৌশিক তোমার জন্য-

বিমূর্তায়নের সন্ধিক্ষণে-
আত্মগ্লানির বিদগ্ধতায় নিমজ্জিত বেদুঈন,
ভারাক্রান্ত হৃদয়ের যাঁতাকলে পিষে
আজ হয়েছে শ্রান্ত-ক্লান্ত; নিষ্পেষিত।
মরুর বেদুঈনের চোখের গহীন অন্ধকারে খেলাকরে,
কৈশরের চোখে ভাসা একরাশ গোধূলি দুঃস্বপ্ন।

বিস্বাদের তেঁতো প্রাপ্তি নিয়ে-
পশ্চিমাকাশের রক্তিম ভেলায় লুকোচুরিতে ব্যস্ত পানকৌড়ি,
বারংবার উড়ে যায় দিগন্তবৃত্তের অসীমপাণে।
ঈশানী নক্ষত্রের মৃদুমধুর আলোতে,
বেদুঈনের টোলপড়া গালের স্ফীত হাসি বলে দেয়-
বিক্ষিপ্ত মনের অনেক অজানা অতৃপ্তির গল্প।

মনেরেখ হে পথিকবর,
আমিও ছিলাম আছি থাকবো-
আক্ষেপতায় নির্লিপ্ত ব্যস্ততার ছায়াসঙ্গী হয়ে,
নীলাভ মরুপ্রান্তরের এককোণে; বিস্তৃত রক্তিম সীমারেখায়।

৩১৫জন ৪জন
39 Shares

৩৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য