ঐতিহ্যবাহী পান

পপি তালুকদার ২ ফেব্রুয়ারী ২০২১, মঙ্গলবার, ১০:৩৯:৪৪অপরাহ্ন ইতিহাস ঐতিহ্য ২৯ মন্তব্য

“পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম বন্ধুর খবর পাইলাম না”
“মহেশখালীর পান এর খিলি তারে বানাই খাওইতাম”

খুব জনপ্রিয় এই গান কিংবা নানা ছন্দের মধ্যে দেশের জনপ্রিয়্ একটি খাবারের নাম রয়েছে সেটা হলো অতি পরিচিত প্রচলিত খাবার পান।পান নিয়ে আছে নানা ছন্দ আছে জনপ্রিয় গান। দিন বদলাইছে৷ সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে প্রচলিত ধরন তবে সেই প্রাচীন কাল হতে আজ অবধি এর জনপ্রিয়তা একি রকম রয়েছে। বনেদিয়ানা মোঘল আমল থেকে শুরু করে বাংলার সর্বশেষ নবাব সিরাজ-উদ- দৌলা পর্যন্ত সবারই ছিলো আজও  তার রসিয়ে পান খাওয়ার প্রচলন।খাবারের পরে পান দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন বাঙ্গালী  জাতির প্রাচীন ঐতিহ্য।

# ## সুপরিচিত এই খাবার পান যার বৈজ্ঞানিক নাম “পাইপার বিটল” আর সংস্কৃত ভাষায় “ভূজঙ্গলতা পত্র” অহমিয়া ভাষায় এর নাম “তাম্বূল ” বাংলা ও হিন্দি ভাষায় “পান” বলে পরিচিত। পান সংস্কৃত পর্ণ যার অর্থ “পাতা” এটা সুপারি ও অন্যান্য মসলার সাথে সংমিশ্রনের একটি প্রস্তুতি প্রত্নতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক এবং উদ্ভিদ্বিদ্যা সংক্রান্ত প্রমানের উপর ভিত্তি করে পান চিবানো অস্টোনেশিয়ানের সাথে জোরালোভাবে জড়িত,অনেক ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের  উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।পান চিবানোর প্রাচীনতম দ্ব্যর্থহীন প্রমান ফিলিপাইনের।

সারা পৃথিবীতে প্রায় আট কোটি বর্গকিলোমিটার এলাকায় পানের চাষ হয়ে।দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া,পূর্ব এশিয়া প্রধানত তাইওয়ান এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে পান ব্যবহৃত হয়। তবে ভরতে এবং বাংলাদেশ এর চাষাবাদের প্রচলন সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে।

খাবার ছাড়াও ঔষধ তৈরি এবং হিন্দু ধর্মের পূজাপার্বনে এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।পুরান অনুসারে দেবতা ও অসুর সমুদ্র মন্থন করার পরে যখন অমৃত উঠে আসে তখন কয়েক ফোঁটা অমৃত পাতালে নাগরাজ্যে গিয়ে পড়ে আর সেখান থেকে এক লতার জন্ম হয়। যে কারনে এ-ই লতাকে পুরাণে নাগবল্লী বলা হয়।ধন্বন্তরি পান পাতার ঔষধ গুন জানতে পারেন।পরবর্তী কালে ও-ই লতার পাতাই “পান” পাতা হিসাবে পরিচিত হয়।

#~# পান  চাষ পদ্ধতি এক বিশেষ রকমের যা “বরজ” নামে পরিচিত । এই বরজ হল ভালো ভাবে ঘেরা ও উপরে ছাউনি দেওয়া বিশেষ ভাবে প্রস্তুত একটি ঘর।পান চাষে সাধারনত অন্যান্য ফসলের ন্যায় অনেক সমস্যা রয়েছে তাই এ-র চাষাবাদে যত্নশীল হতে হয়।

সাধারনত উঁচু অবস্থানের জল নিকাশি যুক্ত দোযাশ বলা এঁটেল দোঁয়াশ মাটি পান চাষের জন্য উপযুক্ত। জমির পি.এইচ  ৬.৫–৭.৫থাকা৷  বাঞ্ছনীয়। নোনা বা ক্ষার জাতিয় মাটি পান চাষের জন্য৷ ছায়াযুুক্ত আর্দ্র্র্র বা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া৷ ও রসযুক্ত মাটি পান চাষের উপযুক্ত।বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১৫০০-১৭৫০ এবং তাপমাত্রা ১0০-৪০সেলসিয়াস এই ফসলের জন্য৷ প্রয়োজন।বরজের উচ্চতা ২মি বেশি হওয়া উচিত।।

# #পানের রয়েছে নানা নানা জাত যেমনঃ–বাংলা পান, সাঁচি, মিঠা, কর্পূর, গ্যাচ, উজানী,মাঘী,দেশী,বরিশাল ও ঝালি প্রভৃতি

## পানের রয়েছে কিছু উপকারী গুন।চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে,পান বলকারক,কামোদ্দীপক, রাতকানা রোগের নিরাময়ের সহায়ক। এছাড়া মুখের দুগর্ন্ধ দূর করে, হজমশক্তি বাড়ায় ও উকুননাশক হিসাবে কাজ করে। সুপারিশে রয়েছে জীবানু নাশক,কৃমিনাশক শক্তি।চুনে রয়েছে ক্যালসিয়াম, রক্ত পরিষ্কার শক্তি তবে সেটা যদি ঝিনুকের চুন হয়।

তবে পানের কিছু অপকারিতা রয়েছে যেমন :- মাথা ঘোরা, ঘাম বের হওয়া ইত্যাদি।অনেক অনেক ক্ষেত্রে হাঁপানি,রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।আবার মাত্রা অতিরিক্ত পান খেলে মুখে, জিহবায়, গ্রাসনালিতে এবং পাকস্থলিতে ক্যান্সার হয়।চুনের ক্ষার পিওথলিতে পাথর এবংসুপারিতে নেশা তৈরি করে থাকে।

# #পান বাংলাদেশের একটি অর্থকারি ফসল।বিয়ে -শাদিসহ বিভিন্ন উৎসবে পানের খুব চাহিদা রয়েছে বিধায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানের চাষ করা হয়।দেশের বরিশাল,চট্রগ্রাম,রাজশাহী, যশোর, জামালপুর, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে পান চাষ করা হয়।এই পান বাংলাদেশ হতে ভারত,সৌদি -আরব,আরব-আমিরাত,ইংল্যান্ড, ইতালি,জার্মানি সহ এশিয়া, ইউরোপের অনেক দেশে পান রফতানি করা হয়।

বাংলাদেশের মহেশখালি পানের যেমন পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা আছে তেমনি ভাবে বরিশালের পানের গুনগত মানের জন্য এর রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি ও চাহিদা।সেই প্রাচীনকাল হতে এখানে পান চাষ করা হয়।বরিশালের  গৌরনদী,আগৈলঝাড়া,বাবুগঞ্জ, উজিরপুর ব্যাপক পান চাষ করা হয়।ঢাকা- বরিশালের মহাসড়কের দুপাশে দেখাযায় সারি সারি পানের বরজ এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় ও পানের বরজ দেখা যায়।বরিশালের পান সাধারণত মিষ্টি পাতা বড়ো ও বোঁটা মাজারি হওয়ায় এর বেশ কদর রয়েছে।।

বাটা জোর,ইচলাদি,মহিলারা সহ ৫টি বাজারে সপ্তাহে শনিবার, রবি,মঙ্গলবার বুধবার বড়ো আকারে পানের হাট বসে। বছরের পরে বছর এই নিয়ম চলে আসছে।বরিশালের পান রাজধানী ঢাকা সহ সিলেট,মৌলভীবাজার, চৌমুহনী,আখাউড়া সহ বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়ে থাকে।

হাটে পান গুলো করে বিড়ায় সাজানো হয়।হাটে ৭২টি পাতার সংযোজনে এক বিড়া করে পানের আঁটি কলা পাতায় তৈরি অস্থায়ী সাজিতে সাজিয়ে কখন ও আবার ২শ বা ৫শ বিড়া এক সাথে করে বাধাঁ  হয়। সাধারনত বিড়ার দাম২৫- ৭০ টাকা কখন বিশেষ করে মৌসুমে ৫-৭ করে বিড়ার দাম নেমে আসে।

বরিশালে অনেক পান ব্যবসায়ী দেশে পান ব্যবসার মাধ্যমে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেছে।গৌরনদীর মোবারক ভুইয়া পান ব্যবসায়ী হিসাবে অনেক পরিচিত।

##পান একটি উপকারী পাতা। নানা ঔষধী গুনে গুণান্বিত এ-ই পাতা।ঔষধী গুন ছাড়াও পান চিবানোর মাধ্যমে ঠোঁট লাল করা যার রয়েছে অনেক জনপ্রিয়তা যা গানের মাধ্যমে বা ছন্দের মাধ্যমে বহুযুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত।

 

তথ্যসূত্রঃ- উইকিপিডিয়া, নিজ অভিজ্ঞতা

ছবিঃ- গুগল

২৮২জন ২৯জন
0 Shares

২৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য