ঐতিহ্যবাহি চট্টগ্রামের মেজবান

ইঞ্জা ৫ ডিসেম্বর ২০১৮, বুধবার, ০৭:১৮:৩২অপরাহ্ন ইতিহাস ১২ মন্তব্য

 

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষেরই ইচ্ছে হয় চট্টগ্রামের মেজবান একবার খেয়ে দেখবেন আর যারা একবার খেয়েছেন তারা বারবার খেতে চান, অনেকে তো চট্টগ্রামের বন্ধু বান্ধদের চেপে ধরেন মেজবান হলে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু অনেকে মেজবানের নাম শুনলেও ইহা কি, কতো উপাদেয় খাদ্য তাহা বুঝতে পারেননা, হটাৎ আজ নিচের লেখাটি পেয়ে ভাবলাম সকল বন্ধুদের জন্য শেয়ার করি, আসুন জেনে নিই মেজবান কি?

ইঞ্জা।

 

চাটগাঁইয়া মেজ্জানের ইতিহাস,,

গোডা দুনিয়া ছড়াই গেইয়ে, চাটগাঁইয়া “মেজ্জান” l

মেজবান “ফার্সি” শব্দ। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘মেজ্জান’। চাটগাঁইয়া মেজ্জানের রয়েছে আলাদা কদর, রূপ-বৈচিত্র্য ও বহুল জনপ্রিয়তা। তবে শতবর্ষের পরিক্রমায় এ মেজবান বা মেজ্জান শব্দটার অর্থে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে মেজবান মানে হচ্ছে, বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আপ্যায়নের ব্যবস্থা। সামর্থ্য যা-ই থাকুক না কেন, ধনী-গরীব যে-ই মেজবানের আয়োজন করবে তার অতিথির সংখ্যা নিরূপণ করা চলবে না। অর্থাত্ অতিথির সংখ্যা গুনে মেজবানের আয়োজন সম্ভব নয়। যত অতিথি আসবে এবং যে পরিমাণ খেতে চাইবে ততটুকু পরিবেশন করাই হলো পরিপূর্ণ মেজবানের মিথ।

খুব সম্ভবত বাংলাদেশে ইরানি শাহ্ বংশীয় শাসনামলে এর প্রচলন আরম্ভ হয়। এর আরেকটি কারণ হতে পারে চট্রগ্রাম বন্দরে বহুকাল ধরে আরব ও পারসিক বণিকদের যাতায়াত। ঠিক কখন থেকে চট্টগ্রাম বাসী মেজবান সংস্কৃতির সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছে তার সুস্পষ্ট কোনও ইতিহাস জানা যায়নি। তবে এর প্রচলন ১৬০০ থেকে ১৮০০ সালের যে কোনো সময়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ১৫০০ ও ১৬০০ শতাব্দীর প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যে ‘মেজোয়ানি’ ও ‘মেজমান’ দুটি শব্দ পাওয়া যায়। মেজোয়ানি অর্থ আপ্যায়নকারী ও মেজমান অর্থ আপ্যায়ন।

মূলত গরুর মাংসের উদার ও আয়েশি পরিবেশন হয় মেজবানে। এটাই মূলত চট্টগ্রামের মেজবানের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। খাওয়ার প্রতি কমবেশি সব বাঙালিরই রয়েছে সহজাত আকর্ষণ। কিন্তু অতি আকর্ষণ চট্টগ্রামবাসীকে করেছে অন্যদের চেয়ে আলাদা ও ব্যতিক্রম। এই জন্যই চট্টগ্রামবাসীর খ্যাতি আজ ভোজনরসিক হিসাবে। ভোজনরসিক চট্টগ্রামবাসীর ভোজনবিলাসিতার নানা আয়োজনের একটিই হলো মেজবান। শত শত ঐতিহ্যে লালিত মেজবান চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলের উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেও দেখা যায় মেজবান আয়োজনের রেওয়াজ। মেজবানের মাধ্যমে অতিথি আপ্যায়নের এই প্রথা দেশের অন্য কোনও জেলায় তেমন একটা দেখা যায় না।

মূলত মেজবানের সঙ্গে স্থানীয় মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধ নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই কেবল মুসলিম পরিবারগুলোই এখানে মেজবানের আয়োজন করে। ধর্মীয় অনুভূতির ফলে মুসলমানরা যেসব উপলক্ষে মেজবান আয়োজন করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আকিকা ও খৎনা উৎসব। এছাড়া কেউ মারা গেলে তার মৃত্যুর চতুর্থ দিনে আয়োজন করা হয় মেজবান। পাশাপাশি চল্লিশা নাম দিয়ে মৃত ব্যক্তির ৪০তম দিনে মৃতের নিকটাত্মীয়রা আয়োজন করে মেজবানের। সেই সঙ্গে প্রতিবছর মৃত্যুবার্ষিকীর দিনেও কোনও কোনও বিত্তবানপরিবার মেজবানের আয়োজন করে।

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই মেজবানের যাত্রা হলেও ইদানীং মেজবান আর ধর্মীয় গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। ধর্মীয় উপলক্ষের বাইরে কোনও কোনও পরিবার বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে আয়োজন করে মেজবান। মেজবান নিয়ে এখানকার বিত্তশালীদের মধ্যে কখনও কখনও প্রতিযোগিতাও চলে। কেউ তার মেজবানে ১০টি গরু জবাই করলে প্রতিদ্বন্দ্বী করবে আরও বেশি। এই প্রতিযোগিতা মেজবানে আমন্ত্রিত অতিথিদের রসনাবিলাস আরও বাড়িয়ে দেয়। আবার নিম্নমধ্যবিত্ত পবিবারগুলোকেও দেখা যায় আর্থিক সঙ্গতি না থাকা সত্ত্বেও ধার-কর্জ করে স্বজনদের মৃত্যুতে মেজবান আয়োজন করতে। বংশপরম্পরায় পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্যও এই মেজবানের আয়োজন হয়।

মেজবানির দাওয়াত সবার জন্য উন্মুক্ত। গ্রামাঞ্চলে কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি মেজবানির আয়োজন করলে লোকের মাধ্যমে সেই ভোজের দাওয়াত বিভিন্ন গ্রাম ও পাড়া মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে আগে ঢোল পিটিয়ে মেজবানের দাওয়াত দেয়ার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। তবে গরুর মাংসই মেজবানের মূল আকর্ষণীয় উপাদান।
গরুর মাংসের জন্য আদিকাল থেকেই চট্টগ্রাম প্রসিদ্ধ। এখানকার লাল গরু (রেড ক্যাটল অব চিটাগাং) সবচেয়ে উন্নত দেশী গরুর জাত। মূলত চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, চন্দনাইশসহ সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে এ গরু উত্পাদন হয় বেশি। দেখতে সুন্দর এ গরু আকারে ছোট হলেও মাংস সুস্বাদু, পুষ্টিকর। মেজবানে মূলত লাল গরুর ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি।

চট্টগ্রামের মানুষ গরুর মাংস কতটা পছন্দ করেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় কথিত একটি ঘটনা থেকে। জনৈক এক ব্যক্তি তার নিকটাত্মীয়কে নিয়ে ভারতে গেছেন হূদরোগের চিকিত্সা করাতে। ওখানে বাঙালি ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, আপনার বাড়ি কোথায়? যথারীতি উত্তর ‘বাংলাদেশ’। ডাক্তার বললেন, কোন জেলার বাসিন্দা আপনারা? উত্তর শুনে ডাক্তার স্মিত হেসে বললেন, আমি জানতাম, তাই আপনাকে প্রশ্ন করার আগেই বাংলাদেশ ছাড়াও চট্টগ্রাম নামটি লিখে রেখেছি। পরে কথাচ্ছলে ডাক্তার জানালেন, ভারতে বাংলাদেশী যত মানুষের হূদরোগের চিকিত্সা বা অপারেশন হয়, এর সিংহভাগই আসে চট্টগ্রাম থেকে।

বিশ্বকাপ খেলে এসে ঘরের মাঠে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে টানা পাঁচটি সিরিজ জিতেছে টাইগাররা। মাশরাফি-মুশফিক-সাকিব-তামিমদের এমন সাফল্যে শেরে বাংলায় ‘মেজবান’ আয়োজন করেছিলেন বিসিবি।

অধিক পরিমাণে গরুর মাংস খাওয়ার কারণেই এ অঞ্চলের মানুষের হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কথিত আছে, সারা দেশে একদিনে যে পরিমাণ গরু জবাই হয়, ঠিক সমপরিমাণ হয় চট্টগ্রামে। বয়স্কদের হূদরোগের বিষয়ে সচেতন করা হলে মেজবান সম্পর্কে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ‘হায়াত মউত, আল্লার হাতত, মেজ্জান খাইয়ুম, মরি যাইয়ুম; তো কি হইয়ে।’ (জন্ম-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। মেজবান খাব, মরলে মরব; তাতে কী?)

গত কয়েক দশকে চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে, মেজবান এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি এখন চট্টগ্রামের ব্র্যান্ডসংবলিত সামাজিক অনুষ্ঠান। মূল কেন্দ্রবিন্দুতে আছে বিশেষভাবে রান্না করা গরুর মাংস।

সাধারণত সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এক নাগাড়ে মেজবানি খাওয়ানো হয়। আগের দিন রাতে আয়োজকদের বিশেষ আমন্ত্রণে আসা লোকজন, মেজবানির কর্মী এবং পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও নিকটাত্মীয়দের মধ্যে শলাপরামর্শ হয়। ওই বৈঠকের পর সবাই একসঙ্গে খাবার খান। এটাকে চট্টগ্রামের মুসলমানরা ‘আগ দাওয়াত’ বা ‘আগ দাওতি’ বলে। মূলত পরদিনের মেজবানি উপলক্ষ করেই এ ‘আগ দাওতি’ অনুষ্ঠান। ফেনী-নোয়াখালী অঞ্চলে এ অনুষ্ঠানকে ‘পান সলাত্’ বলা হয়। সামাজিক কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে মেজবানের দাওয়াত দেয়া হতো বলে বৈরী সম্পর্কের মানুষেরও মেজবানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার নজির আছে।

মেজবানি উপলক্ষে বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীসহ তাদের আত্মীয়স্বজন ও অন্য জেলার লোকদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। সাধারণত কেউ মেজবানি খানা থেকে নিজেকে বিরত রাখে না।

সাদা ভাতের সঙ্গে গরু-মহিষের মাংস, ছোলার ডালে হাড্ডিসহ মাংস, সেসঙ্গে গরম নলার ঝোল। মেজবানের অন্য নাম হতে পারে ‘ইচ্ছামতো খাওয়া’। এতে থাকে মাংসের আধিক্য। গরুর মাংসের গোড়া ও নেহারি (চট্টগ্রামের ভাষায় ‘নলা’) দিয়ে তিন-চার রকমের আইটেমে অনন্য উপাদেয় খাদ্যের আয়োজন হয়ে থাকে মেজবানে। মূলত গরুর মাংসের উদার ও আয়েশি পরিবেশন হওয়ায় মেজবানের জন্য কোনো প্রকৃত বাজেট নিয়ে আয়োজন করা যায় না। এর পরও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মানুষকে উপলক্ষ করে আয়োজন শুরু করলেও অতিথি সমাগমে পর্যালোচনা করে তাত্ক্ষণিকভাবে গরু জবাই দেয়া হয় অনুষ্ঠানস্থলেই।

মেজবান নিয়ে কবি-সাহিত্যিকদের উত্সাহ চোখে পড়ার মতো। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের গীতিকার, সুরকার সৈয়দ মহিউদ্দিন ‘মেজ্যান দিএ’ শিরোনামে একটি গান লিখেছেন। আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবের কণ্ঠে গানটি পেয়েছে অন্য মাত্রা। আশির দশকের শুরুতে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। যদিও এ গানে ধনী-গরিবের মধ্যে মেজবানের আতিথেয়তা রক্ষার রীতি ভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া যায়।

“মেজ্জান দিএ মেজ্জান দিএ / ঐ তারত, ঐ তারত;
গরিবুল্ল্যাই মেইট্যা বছি / ডঁর মাইনষেরলাই বাসনত/ কি সৌন্দর্য বিছানত ……………”
“(মেজবান দিয়েছে ওদের ওখানে / গরিবের জন্য মাটির পাত্র/ ধনীদের জন্য সুন্দর পাত্র, সুন্দর বিছানা)”

“কেঅরে খাবার ঢালিঢুলি / পান্নি পুচার লইলো;
কেঅরে খাবার মাপিঝুপি / আর দিতান-ন কইলো।”
“(কাউকে খাওয়াচ্ছে বেশি বেশি, খাবার চাহিদামাত্র পাচ্ছে কিনা জিজ্ঞেসও করছে/ কাউকে খাওয়াচ্ছে মেপে মেপে, চাইলে দেবে নাও বলছে।)”

এছাড়া লোকজ ছড়ার মধ্যেও মেজবানের রসনাবিলাসের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়…
“আর নাতিন ইক্কিনি/ গোশত লাগের দশখানি,
নাতিরে খাবাইয়োম/ সাধের মেজবানি।”
“(আমার নাতিন/নাতি এতটুকু ছোট হলেও মাংস লাগবে দশখানা। নাতি/নাতনিকে খাওয়াব সাধের মেজবানি।)”

আবার চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অন্য একটি গানে দেখা গেছে, ভারতবর্ষ কিংবা বিশ্বের অন্যতম স্বাদে অতুলনীয় মাছ ইলিশের চেয়েও মেজবানি অনেক বেশি মজাদার মানুষের কাছে।

“কালামইন্যা ধলামইন্যা / আনের আদা জিরা ধইন্যা/ আর ন লাগে ইলিশ-ঘইন্যা;
গরু-খাসি বুটর ডাইলর / বস্তা দ্যাখা যায় / মেজবানি খাতি আয়।”
“(নানা স্বাদের মাছ, এমনকি ইলিশ মাছও লাগবে না/ গরু, খাসি আর বুটের ডালের বস্তা দেখা যাচ্ছে। মেজবানিই সেরা।)”

মেজবানকে নিয়ে ছড়া-কবিতা যেমন হয়েছে, তেমনি ধাঁধা-প্রবাদেরও শেষ নেই। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রবাদে আছে, “যার কোয়ালত নাই / ইতাল্লাই মেজ্জাইন্যা বাড়িতও নাই”। “(যার কপালে নেই/ সে মেজবানেও খেতে পারে না)।”

গাঁও-গ্রামের মেজবান কালক্রমে চট্টগ্রামের সংস্কৃতির আঁকর হয়ে উঠেছে। ঢাকায় চট্টগ্রাম সমিতির মেজবান একটি অনন্য উদ্যোগ।

দেশের প্রধানমন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, সাবেক-বর্তমান মন্ত্রী, আমলা, দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সরব উপস্থিতি থাকে। দেশবরেণ্য ব্যক্তিরা মেজবানের স্বাদ গ্রহণ করেন। জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম ঢাকায় মেজবানির প্রচলন শুরু করেন। চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি (১৯৬৮-৮৩) থাকাকালীন তাঁর অনুপ্রেরণায় তেজগাঁও বাবলী ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক প্রয়াত মোজাম্মেল হক ঢাকায় মেজবানির আয়োজন করেন। বর্তমানে ঢাকা সমিতির মেজবানে অর্ধ লক্ষাধিক লোকের খাবারের আয়োজন থাকে। দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিরা চট্টগ্রাম সমিতির মেজবানে আপ্যায়িত হয়ে থাকেন। এটি দেশের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা বলে এখনো খ্যাতি রয়েছে।

রাজনীতিতে মেজবানি এখন ভিন্ন মাত্রায় যোগ হয়েছে।
নির্বাচনোত্তর দলীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি, কর্মী-সমর্থকদের চাঙা, ভোটারদের আনুগত্য পাওয়া আশায় বড় আকারের মেজবানির আয়োজন করা হয়। অবস্থাভেদে ৪০-৫০ হাজার লোকের খাবারের আয়োজন করা হয়। এসব মেজবানি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পারস্পরিক হৃদ্যতা ও সুসম্পর্ক গড়ে উঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মেজবানকে চট্টগ্রামের বাইরে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে জাতীয় শোক দিবসে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে গোপালগঞ্জের টুঙিপাড়ায় কয়েক হাজার লোকের মেজবানির আয়োজন করা হয়।

নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী এর প্রচলন শুরু করেন। রাউজান আসনের সাংসদ এ বি এম ফজলে করিমও টুঙিপাড়ায় মেজবানের আয়োজন করে আসছেন। এ মেজবানে বাবুর্চি, সহকারী বাবুর্চি থেকে শুরু করে চাল, মসল্লা ও রান্নাবান্নার সরঞ্জামও চট্টগ্রাম থেকে নেয়া হয়। এর ফলে বৃহত্তর ফরিদপুরবাসীও চট্টগ্রামের মেজবানির স্বাদ পাচ্ছেন। এসব অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী, আমলা, দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদেরও খাওয়ানোর আয়োজন থাকে।

মেজবানি রান্নায় চট্টগ্রামের বাবুর্চিদের আলাদা কদর রয়েছে। আসল খুশবু-স্বাদ চট্টগ্রামের বাবুর্চি ছাড়া অন্য জেলার বাবুর্চিদের হাতে পাওয়া যায় না। তাই, এটাকে আমরা খোদা-ই দান বলে মনে করি। তিনি বলেন, ঢাকার নামকরা বাবুর্চিরা মেজবানি রান্নার অনেকটা চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সুঘ্রাণ ও স্বাদ আনতে পারেন না। এজন্য ঢাকার বড় বড় মেজবানি অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের বাবুর্চিদের ডাক পড়ে। এছাড়াও চট্টগ্রাম সমিতি-ঢাকার মেজবানি অনুষ্ঠানের তো জুড়ি নেই। এসব অনুষ্ঠানে ১৫-২০ হাজার লোকের খাবারের আয়োজন করা হয়।

চট্টগ্রামের মেজবানি এখন আর চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ নেই। দেশে ছেড়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।

মিয়া, চৌধুরী অথবা সম্মানিত ব্যক্তির পাতে গরুর পা (নলা) পরিবেশন কুলীন ব্যাপার। এ প্রথা এখনও চলমান।

এখন আপ্যায়নের চেয়ে মেজবানেই মজেছে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামে গড়ে উঠা পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু’র সবচেয়ে বড় খাবারের হলটির নামকরণ করা হয়েছে ‘মেজবান হল’ নামে।

আবহমান কাল থেকে মেজবান গণভোজ বা অতিথি আপ্যায়নের মধ্যে বাঁধা ছিল। এখন চট্টগ্রামের সংস্কৃতির অনুষঙ্গ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। মেজবানির কদর-সুখ্যাতি এখন দেশ ছড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।

 

কালেক্টেড

১৯০জন ১৮৯জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন