আমি এবং আমার কলিগ দুজন মিলে সিনিয়র এক কলিগের গাড়ীতে করে বাসায় ফিরবো বলে রওয়ানা হয়েছি। সেদিনটা সম্ভবত ২০১৬ সালের শেষদিক ছিলো। এটাওটা নিয়ে আলাপচারিতা একসময় রাজনৈতিক আলোচনায় গিয়ে প্রাণ পায়। সেসময়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বিভিন্ন সভা-সমাবেসে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাই নিয়েই আলাপ জমে উঠেছে। কলিগ দুজন তাঁর ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু আবার নিজেরাই প্রশ্ন তুলছেন, এক্টিং বিচারপতি কি এভাবে প্রকাশ্যে জনাকীর্ণ পরিবেশে বিচারব্যবস্থার বাইরের কোন বিষয়ে বক্তব্য দিতে পারেন? এ পদবীটির তো সীমাবদ্ধতা আছে। আমার ওই দুজন কলিগের মতো ‘হুজুগে বাঙালী’ বলে খ্যাত আমাদের আমজনতাও ব্যাপারটাকে সেদিন খুব ইতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেছিলেন। কেউই আর সেরকমভাবে নোটিশ করছিলেন না যে তিনি একটি সাংবিধানিক পদের সীমাবদ্ধতা ডিঙিয়ে প্রকাশ্যে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউকেউ বুঝতে পারলেও সাংবিধানিক বিধিবিধানের কারনেই প্রকাশ্যে সমালোচনাও করতে পারছিলেন না। যাহোক, আলোচনার মাঝেই একসময় আমি আমার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলি প্রধানবিচারপতির বর্তমান গতিবিধি রহস্যজনক। এই রহস্য ঘনীভূত হওয়ার যৌক্তিক কারণও আমি ব্যাখ্যা করি। উল্লেখ্য, কলিগ দুজনের কারোরই রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব নেই তবে রাজনৈতিক সচেতনতা আছে। একজন কলিগ মারাত্মকভাবে ক্ষেপে উঠলেন। আমার ওই কলিগটি আবার নন-মুসলিম। তিনি ইগোপ্রবণ হয়ে উঠলেন অনেকটা ইজমপ্রীতির কারনে। আর অন্যজন আমার বক্তব্যটিকে রাজনৈতিকভাবে দেখতে শুরু করলেন। আমি বিচারপতির সেসময়ের রহস্যময় আচরণ হিসাবে দুটো ঘটনা উল্লেখ করে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইলাম।
১। সাকার ফাঁসির রায় পূর্ববর্তী লন্ডনে সাকার পরিবারের সাথে গোপনে দেখা করা।
২। যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনাল যে জায়গাটিতে বিচারকার্য পরিচালনা করছে, তিনি আদালতের সীমানা সম্প্রসারণের বাহানায় যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনালটিকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার অনুরোধ করেন।
এই দুটো ঘটনাই তো সে সময়ে তাঁকে বিশ্লেষণ করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। উল্লেখ্য যে, যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনাল যখন গঠন করা হয়, তখনই পরিকল্পনায় ছিলো দাগী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পরে এ জায়গাটিকে যাদুঘর হিসাবে সংরক্ষণ করা হবে। তিনি খুব সুপরিকল্পিতভাবেই ইতিহাস মাটিচাপা দেয়ার হীন উদ্দেশ্যে নিয়ে সেদিন এই ভূমিকাটি রেখেছিলেন। (যেমন করে পাকসেনাদের আত্মসমর্পণের জায়গাটিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান মেজর জিয়া শিশুপার্ক তৈরি করে ইতিহাস মাটিচাপা দিয়েছিলেন)।
এরপরের ঘটনা পরম্পরা তো ইতিহাস।
তিনি তৃতীয় ন্যাক্কারজনক ভূমিকাটি রাখেন, হেফাজত আর সরকারপ্রধানকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে। অত্যন্ত কুৎসিত এবং ভয়ঙ্কর খেলাটি খেলতে তিনি নীরবে সুপ্রিম কোর্টের সামনে ন্যায়ের প্রতীক ‘জাস্টিসিয়া’ স্থাপন করেন। ক্ষেপে যায় হেফাজতের পাশাপাশি ধর্মাশ্রয়ী দলগুলো। এখানেও শেখ হাসিনার কৌশলী ভূমিকার কারণে সেসময়ে বড় ধরনের একটা ঝামেলা এড়ানো সম্ভব হয়েছিলো, যদিও এর সুদূরপ্রসারী এক নেগেটিভ প্রভাব উদারনৈতিক রাজনীতির উপড় ঠিকই পড়ে। সাম্প্রদায়িক শক্তির ইচ্ছার কাছে যৌক্তিক কারণেই শেখ হাসিনাকে সেদিন হার মানতে হয়, এর ক্ষতিকর প্রভাব তো ঠিকই দেশ জাতির উপর পড়েছে, পড়ছে। অথচ আড়ালের কলকাঠি নাড়নেওয়ালার খবর কে রাখে!
যাহোক, সেদিন আমার সেই সিনিয়র কলিগটি ভীষণরকম ক্ষেপে গিয়েছিলেন যদিও কিন্তু আজ সেই কলিগের মুখেই তৎকালীন বিচারপরি সিনহাকে নিয়ে বিষোদগার করতে শুনলাম। সত্য সত্যরুপেই প্রতিষ্টা পায়। গলাবাজি করে তা সাময়িকভাবে চাপা দেয়া যায় কেবল।

আজ ফেসবুকে দেখছি লোকে তাঁকে ‘মীরজাফর’ বলে গালমন্দ করছে। যদিও সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যেদিন প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ পান সেদিন এই আমিও খুশি হয়ে সরকারপ্রধানকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফেবুতে কিছু লিখেছিলাম এবং মনে পড়ছে এই নিয়োগ নিয়েও ধর্মান্ধতার দিকে ঝুঁকতে থাকা এক আত্মীয়ের সাথে বাসায় বসে বাকযুদ্ধও হয়েছিলো আমার।

“বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়।” মাননীয় সুরেন্দ্র কুমার সিনহাও কর্মেই নিজের পরিচয়টা দিলেন।

৬০৪জন ৬০৪জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ