এলোমেলো ভাবনারা-১

বোকা মানুষ ২৬ আগস্ট ২০১৪, মঙ্গলবার, ১০:২৮:৪৯পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১৮ মন্তব্য

সৃষ্টিকর্তা মন বলে এই এক জিনিস দিয়েছেন মানুষকে। সে মনে কত ভাবনা যে আসে জলোচ্ছাসের মত! আমারও মনে নানান ভাবনা কিলবিল করে নিয়ত! সেসব ভাবনার কিছু কবিতা, কিছু গদ্য হয়ে মুখবই এর দেয়ালে ছাপ রেখে যায়। আর কিছু হারিয়ে যায় চিরদিনের জন্য।

মনে পড়ে, ছোট বেলায় অদ্ভুত সব ভাবনা ঘুরত মাথায়। আমার সেসব ভাবনায় সে সময়কার টিভিতে চলা ইংরেজি ধারাবাহিক বা সিনেমা, রুশ উপকথা বা ঠাকুরমার ঝুলির গল্পগুলোর বেশ প্রভাব ছিল। আমার স্কুল ছুটি হত দুপর একটায়। বাড়ি ফিরে দুপুরের খাওয়া শেষে মা, বৌমা (আমার চাচী), দাদী যখন দুপুরে একটু গড়িয়ে নিচ্ছেন, তখনই শুরু হত আমার কল্পনার ঘোড়া ছোটানো। আমাদের বাবা-চাচার যৌথ পরিবার। উঁচু সীমানা দেয়াল ঘেরা বিশাল জায়গা নিয়ে বাড়ি। এমনকি সেসময়ও শহরের মধ্যে এরকম সবুজে ঘেরা বাড়ী বিরল ছিল। বাড়ির সামনের দিকে খোয়া বিছানো উঠোন। লাগোয়া দেউড়ি ঘর। মাঝখানে বাগান। বাগানের প্রান্ত জুড়ে আম, কাঁঠাল, নারকেল গাছ। পেছন দিকটায় পেয়ারা, ডালিম, আম, কাঁঠাল, নারকেল গাছ নিয়ে ছোট খাট একটা জঙ্গলই বলা যায়! এই জঙ্গলই ছিল আমার রুপকথার রাজ্য। মা, বৌমা আর দাদুর চোখ ফাঁকি দিয়ে, ঘুমুবার কড়া নির্দেশ উপেক্ষা করে চলে যেতাম পেছনের জংলা জায়গাতে। গাছের ছায়ার আশ্রয়ে হাঁটতাম সেখানে। আর ভাবতাম।

ভাবতাম আমি এক নির্বাসিত রাজকুমার। শয়তান মন্ত্রীর কুপ্ররোচনায় রাজা আমাকে পাঠিয়েছে বনবাসে। সাথে একটা তলোয়ার ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই! সেই তলোয়ার দিয়ে আমি একের পর এক বাঘ ভালুক মেরে নিজেকে রক্ষা করে চলেছি। ফলমূল ছাড়া খাওয়ার কিছু নেই আমার জন্য। কোত্থেকে জানি একটা পাখি এসে জুটেছে আমার সাথে। সে পাখি ছাড়া আমার সঙ্গী নেই আর কোনও! আমি হেঁটে চলেছি তো চলেছিই...। নিজেকে এরকম দুঃখী কিন্তু সাহসী বলে ভাবতে বেশ লাগত আমার।

কোনও কোনও সময় বনের রাজা টারজান হতাম! বিদেশে থাকা ফুফু চিতাবাঘের ছালের ছাপ দেয়া কিছু নেংটির মত প্যান্ট পাঠিয়েছিলেন। তারই একটা পরে হয়ে যেতাম টারজান। গাছের ডাল থেকে ঝোলানো দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে টারজানের সেই বিখ্যাত হুঙ্কার "আ-আ-আ-আ-আ-আ-উ-উ-উ-উ......" নকল করে ভাবতাম আমি চলেছি কোনও এক বন্দী গরিলা কে উদ্ধার করতে!

কখনও কখনও আবার কারও বকা খেয়ে অভিমান করে চলে যেতাম আমার সেই অভয়নগরে। ভাবতাম ইশ! আমি যদি সুপারম্যান হতে পারতাম, তাহলে কাউকে কিচ্ছুটি না বলে উড়ে চলে যেতাম অনেক দূরে কোথাও। আমাকে খুঁজে না পেয়ে সবাই খুব কান্নাকাটি করত, তখন খুব ভাল হত! এর পর ফিরে এলে আমাকে কেউ কিচ্ছু বলত না...।

এর পর আর একটু বড় হলাম। ততদিনে পড়া শুরু করেছি কাকাবাবু, ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু, টেনিদা, জুল ভার্ন এসব।

ভাবনায়ও শুরু হল তাদের আসা যাওয়া। স্কুল থেকে ফিরে ক্লান্ত, ঘুমন্ত দুপুরে চলে যেতাম অভয়নগরে। কোনও একটা গাছের গুঁড়িতে বসে নিজেকে তোপসে ভাবতে বেশ লাগত। তোপসে হয়ে কল্পনায় ফেলুদার সঙ্গে হিল্লি দিল্লী ঘুরে বেড়াতাম দুঃসাহসিক সব অভিযানে! আমার বুদ্ধির জোরে মাঝে মাঝে ফেলুদা বড় বড় বিপদ থেকে বেঁচে গিয়ে আমার পিঠ চাপড়ে দিত। নিজেকে তখন পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী বলে মনে হত!

কোনও দিন হয়তোবা সন্তু হয়ে কাকাবাবুর সাথে বেরিয়ে পড়তাম আফ্রিকার ঘন জঙ্গলের উদ্দেশ্যে! তারপর পিগমি, মাসাই জংলিদের গ্রাম থেকে পালিয়ে খুঁজে পেতাম রত্ন ভরা কোনও পাহাড়। কিংবা মিশরের প্রাচীন কোনও নগরীর অলি গলি পেরিয়ে, হারিয়ে যাওয়া কোনও সভ্যতার পুরোহিতের পাহারা ফাঁকি দিয়ে আবিষ্কার করতাম লুকানো কোনও নগরী। সেই নগরীতে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর কোনও অপরাধী দলকে পাকড়াও করে কাকাবাবুর সাথে বেরিয়ে আসতাম বিজয়ীর বেশে!

চলবে...

0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ