অনেকক্ষণ থেকে ভাবছিলাম আমার পুরোনো কিছু লেখা দেবো। যে লেখায় আবেগগুলো কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হয়নি। এই যে জীবন সকালে উঠে দৌঁড়ানো, কাজে যাওয়া। এরপর আবার ক্রেডিট বিল, এই হিসাব, সেই হিসাব। ছেলের দিকে খেয়াল দেয়া। ঘর-সংসার-স্বামী-সন্তান এসবের বাইরে এখন আমি নেই। কোনো নারী-ই থাকেনা। প্রতিটি মুহূর্ত এনজয় করি আমি। আমার কাজ হোম হেলথে। তো বাড়ী বাড়ী যেতে হয়। কতো মানুষের সাথে মিশতে হয়। কতো কিছু যে দেখি। জীবনে কতো ধরণের কাজই না করেছি। সকলেই গোপন করে বিদেশে তাদের চাকরীকে। আমি আবার ওসব হিপোক্রেসি পারিনা। দেশে যখন ছিলাম, হাইস্কুলে ছয় মাস চাকরী করেছি। মাষ্টার্সের রেজাল্ট দিতেই কলেজে। আমার কিছু মহাদুষ্টু বন্ধু আছে জিজ্ঞাসা করতো, “তোকে মানে তোর ছাত্র-ছাত্রীরা?” ওরা বিশ্বাসই করতে চাইতো না। একদিন বললো আমি যখন ক্লাশে থাকবো, একদিন গোপনে ক্লাশের পেছনের সিটে গিয়ে বসে আমায় জ্বালাবে। ওদের অসাধ্য কিছু নেই, বিশ্বাস করে নিলাম। কি যে ভয় গেছে। কলেজ মানেই রাজনীতি। এমন রাজনৈতিক আন্দোলনে সব শিক্ষককে যখন ক্লাশ থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে, আমায় এসে অনুরোধ ক্লাশটা কি এখন শেষ করা যায়? প্রথম চাকরী স্কুলে সব শিক্ষকদের দেখতাম হাতে বেত নিয়ে ঢুকতো। এ জীবনের ওটা আমায় দিয়ে হয়নি। এলোমেলো কথা লেখা হয়ে যাচ্ছে।

এবার আসি অন্য চাকরীতে। বর পি.এইচ.ডিতে সুযোগ পেলো জাপানে। এলাম জাপান। একা বাসায় দমবন্ধ হয়ে আসতো। ছেলে নভোনীল চলে যেতো ডে-কেয়ারে। আমি একা। আর জীবনে চাকরী ছাড়া তো বসে থাকিনি শিক্ষাজীবন শেষ করার পর। যাক জাপানী ক্লাশে ভর্তি হলাম। ওখানে পরিচয় হলো ইউক্রেনের মেয়ে লানার সাথে। এতো ভালো মেয়ে, একদিন খুব শরীর খারাপ ক্লাশে যাইনি, বাসায় এসে রান্না করে আমায় খাওয়ালো। জাপানে এক বৌদি পেয়েছিলাম যে আমার জন্য অনেক করেছে। যাকে নিয়ে লিখতে গেলে লেখা শেষ হবেনা। বৌদির নাম তনুশ্রী গোলদার উনি জাপানে এন.এইচ.কে বেতারে সংবাদ পরিবেশন করেন এখনও। যাক এরপর বরকে বলে-কয়ে ঢুকলাম মোবাইল কোম্পানীতে চেকিং অপারেটর হিসেবে। জাপান থেকে যেসব পার্টস যেতো বাইরে, সেসব আমাদের ফ্যাক্টরীতে তৈরী হতো, আমরা সেগুলো চেক করতাম। কি যে কষ্ট। একদিন আট ঘন্টা দাঁড়িয়ে, একদিন আট ঘন্টা বসে। আমাদের সুপারভাইজার মহিলা যার নাম জলহস্তী দিয়েছিলো মুন ভাই। সুপারভাইজারের এসিটেন্ট ছিলেন উনি। জাপানী কিচ্ছু বুঝতাম না। মুন ভাই বুঝিয়ে দিতেন কি কি করতে হবে। তবে ওখানে যেসব বাঙালী ভাবীরা কাজ করতেন, তাদেরকে আমি প্রণাম করি। জীবনে অমন সহকর্মী কেউ যেনো না পায়। সত্যি বলতে কি জটিলতা-কুটিলতা আজও বুঝিনা আমি তেমন, আর তখন তো আমার সামনে প্যাঁচিয়ে বলে গেলেও ‘হা’ করে থাকতাম। ওখানে সেই ভোরে যেতাম আর ফিরতাম সন্ধ্যা সাতটায়। বর বললো এভাবে যদি কাজ করি, ছেলেকে দিতে-আসতে ওর পেছনে সময় দিতে গেলে ওর যে প্রফেসর বেশ বিরক্ত হয়ে যাচ্ছেন। যাক ছাড়লাম চাকরী। এবার কি করি! কাজের খোঁজে গেলাম ক্যারিয়ার সেন্টারে। কিন্তু যে চাকরিই দেখি জাপানিজ ভাষা মানে নিহঙ্গ পুরোপুরি জানতে হবে। আর আমি তো জাপানিজে অশিক্ষিত একজন। ফেরার পথে হঠাৎ দেখি একটা ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্ট। কতোদিন যে ফুচকা খাইনা। বললাম বরকে ওখানে খাবো। বললো সময় নেই। বেশ জোরাজোরি করে গেলাম। এক নেপালী ভদ্রলোক নাম ওম গুরুং সান(জাপানীরা নামের পেছনে ‘সান’ লাগায় সম্মান করে। আর ছোট্ট ছেলে শিশুদের নামের পেছনে ‘কুন’ আর মেয়েদের ‘চান’ বলে।)উনি ওই রেষ্টুরেন্টের ম্যানেজার। আমার কাছে জানতে চাইলো কাজ  করবো না রেষ্টুরেন্টে? তরুণ মানে আমার বর জানতে চাইলো করবো নাকি? বললাম ভাষা জানিনা। উনি বললেন কাজ করতে করতে শিখে যাবো। হয়ে গেলো চাকরী। পার্ট-টাইম। পাঁচ বছর কাজ করেছি ওই ইন্টারনেশনাল ক্যুইজেন রেষ্টুরেন্টে। আমাদের মালিক ছিলেন পাকিস্তানী, কিন্তু অসম্ভব সম্মান করতেন আমায়। ভদ্রলোকের ষোলোটি রেষ্টুরেন্ট ওই টোকিওতে। আর প্রতিটা মারাত্মক ব্যস্ত। ওম গুরুং সান ছিলে পুরো কোম্পানির ম্যানেজার। আমায় কাজ শিখিয়েছিলেন খান ভাই। এতো ভদ্র একজন মানুষ। বকেছেন এরপর বলেছিলেন একদিন এই কোম্পানী আমাকে রাখতে চাইবে। আর সত্যি বলতে কি যখন জাপান ছেড়ে আসি বস আমায় ডেকে বলেছিলেন আমাকে ওয়ার্কিং ভিসা দেবেন। কিন্তু দেশে বরের চাকরী তাই ফিরতেই হলো। ওখানে কাজ করার সময় প্রায় প্রতিটি ব্রাঞ্চে আমায় ডাকতো। না বললেই নয় আমাদের ব্রাঞ্চের ম্যানেজার নাকাহাতা সানের জন্য আমার কোথাও যেতে মন চাইতো না। এতো মজা করতাম তার সাথে। আর আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিতেন। ওখানে আমার নিজেরই অনেক কাষ্টমার হয়ে গিয়েছিলো। লাঞ্চের সময় একসাথে দুইশ জন খাবার খেতে পারতো, এতো বড়ো আর ব্যস্ত ছিলো রেষ্টুরেন্টটা। আর আমি একটা কাজ নিজের থেকেই শিখে গিয়েছিলাম, কোনো কাষ্টমারকে ফিরে যেতে দিতাম না।

যাক ফিরে এলাম দেশে। এবার পুরোপুরি গৃহিণী। ছেলেকে পড়াও, স্কুলে নেয়া। মানে বিদেশের থেকেও ব্যস্ত। দেশ থেকে এক বছর পরই বর গেলো পোষ্ট-ডক্টরেট করতে বেলজিয়াম। সেখানে গিয়ে সারাদিন ফ্রেঞ্চ শেখার স্কুলে। তবে পাশাপাশি বাচ্চাদের গান-নাচও শেখানো শুরু করলাম। ফ্রেঞ্চ ক্লাশে পরিচয় হলো ফিলিপিনো মেয়ে লিজেল, ইন্দোনেশিয়ার মেয়ে কিকি, আর মালয়েশিয়ার মেয়ে ইয়ান্তি। আরোও ছিলো জার্মানের নিনা, ইরানের বকথসাদ, কিউবার ভিরি। বেশ আড্ডা গল্প হতো। এ নিয়ে বিশাল গল্প পরে কোনো একদিন বলবো। ওখান থেকে এলাম কানাডায়। ইংরেজী কম-বেশী তো জানতাম। চাকরী হয়ে গেলো ম্যাকডোনাল্ডসে। বেশ ভালোই যাচ্ছিলো। আমায় অফার করা হলো ফুল-টাইমের জন্য। আমার পক্ষে তা সম্ভব ছিলোনা। ছাড়লাম সেই চাকরী। এবার শুরু হলো অন্য জীবন। মাংসের ফ্যাক্টরীতে কাজ। জীবনে যে কাজটি করতে গিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে সময় যাচ্ছিলো, তা বুঝতে পেরেছিলো আমার বান্ধবী ঊর্মী। বকে-ঝকে ছাড়ালো চাকরীটা। শুরু হলো নার্সিং-এ ডিপ্লোমার জন্য প্রস্তুতি। অনেক কষ্ট এ চাকরীতে, দায়িত্ত্ব অনেক। কিন্তু কলেজের চাকরীর পর এই একটি চাকরী যা আমায় ক্লান্ত করলেও মনের ভেতরে একটা স্বস্তি জোগায়। ভালো আছি চাকরী নিয়ে।

কতো সংক্ষেপে লিখলাম। এর ভেতরের যে দীর্ঘশ্বাস মাংসের ফ্যাক্টরীতে রেখে এসেছি, জীবনে কাউকে যেনো এমন কষ্ট না করতে হয়। একটি কবিতা দিলাম, অন্তত বোঝা যাবে আমার সেইসব দিনগুলি।

শব্দের বৈচিত্র্য………..
পৃথিবীর মানচিত্র ঘুরে ঘুরে
ক্রমাগত শব্দ আর ভাষার বুননে একেকটি পংক্তির জন্ম দেই
খসে পড়ে তারারা আকাশ থেকে মাটিতে
কিন্তু ক্ষমতাশালী উল্কাপিন্ডের মতো কোনো গর্ত কিংবা ক্ষতের সৃষ্টি করেনা
রেশমী জ্যোৎস্নায় পাখীর চঞ্চুতে বিষাদের যে ম্রিয়মাণতা
তবুও ভোর হলে উদ্দাম গতিতে ছুটে চলে হাওয়া কেটে কেটে

ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা একেকটি দীঘল স্বপ্ন বর্তমান হয়ে যায়
বুনোট ছন্দে এপাশ-ওপাশ
দিন-রাত্রির খেলা
পায়ের নীচের মাটি খুঁজতে সভ্যতার পর সভ্যতা পিষে ফেলে
পাওয়া যায় কেবল কংক্রিট

বেদুঈন-যাযাবর হয়ে মাধবকুন্ড থেকে নায়াগ্রা
ফুজিসান থেকে আল্পস
হিমালয় থেকে নিঃসঙ্গ আকাশ
পদ্মা থেকে টেমস , তারপর আটলান্টিক আলো-অন্ধকার
সময়ের হিসেব মেলেনা

একই জল ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে
বন্যা-সুনামী-টাইফুন বিভিন্ন শব্দের কারুকাজ একই
ভাসিয়ে নেয়
শুধু হলুদ ফসলের পাশে অকৃ্ত্রিম সবুজ আর বর্ষা ভেঁজা মাটি
প্রেমিকের দেয়া কদম
শুভ্র প্রেমিকা বেলী ফুলের মাতাল করা ঘ্রাণ
শব্দগুলোর অনুবাদ কোথাও নেই
যেমন নেই তোমার মতো একটি মন কোথাও।

**কানাডা আসার আগের দিন রাতে লেখা।**

ইতারব্যাক,ব্রাশেলস,বেলজিয়াম
৩০ জানুয়ারী, ২০১১ ইং।

কিছু ছবিতে নিজের মুখ দিলাম, লজ্জ্বা পাচ্ছি এমনভাবে নিজের ছবি পোষ্ট হিসেবে দেয়া। তবুও সেই সময়গুলো আমার সোনালী বন্ধুদের কাছে না রাখলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে সব।

 

হ্যামিল্টন, কানাডা
১০ জুলাই, ২০১৫ ইং।

২০০০ সালে কলেজের চাকরীতে তখনও ছিলাম...
২০০০ সালে কলেজের চাকরীতে তখনও ছিলাম…

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

জাপানের টোকিওতে কাজ থেকে বেড়িয়ে সহকর্মী পুনম নামের মেয়েটির ক্যামেরায় তোলা।
জাপানের টোকিওতে কাজ থেকে বেড়িয়ে সহকর্মী পুনম ওর ক্যামেরায় তুলেছিলো।
28218_1431171895692_513545_n
বেলজিয়ামে আমার নাচ-গানের ছাত্রীরা…
10403362_10204012913779553_2481724589021570505_n
কানাডা– আমার নার্সিং-এর চাকরীতে কাজ থেকে ফেরার পথে…

 

 

 

৫৭২জন ৫৭২জন
0 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ