এলে বেলে একটা বেলা//

বন্যা লিপি ১ জানুয়ারী ২০২০, বুধবার, ১০:১৬:১৩অপরাহ্ন বিবিধ ২৬ মন্তব্য

ফোনটা বেজে চলছে….
হ্যাঁ বল-
-শোন আজ আমি যাচ্ছি, মানে এখন রওনা দিয়েছি লঞ্চে। জানিস কি হয়েছে? লঞ্চে এসেই দেখা পেয়েছি সায়মা’র! আমি তো প্রথমে চিনতেই পারিনি। বার বার সামনে থেকে গিয়েছি। এক পর্যায়ে সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, তুমি কি সায়মা? সায়মাও আমাকে দেখেই, এক গাল হেসে দিলো,বল্লো তুই রুকু না?
ভাব একবার? আমি আর কি বলবো? তারপর কেবিনে এসে তোকে ফোন দিলাম। এখন তুই বল, কবে আসবি? সায়মা থাকতে থাকতে চলে আয়,আমরা একদিন আমাদের ইচ্ছেমতো ঘুরবো।টংয়ের দোকানে চা খাবো, রাস্তার ধারে ভাতের হোটেল খুঁজে ভাত খাবো, লাল টকটকা রঙের মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাবো। কতই তো খাই ঢাকার ফাস্টফুডের খাবার অথবা পাঁচতারা হোটেলের খাবার। এবার আমরা একেবারে অখ্যাত রাস্তার ধারের হোটেলে খাবো! তুই কবে আসবি বল? তারাতারি চলে আয়না!
এপারে আমি কল্পিত চোখে একগাল হাসি নিয়ে শুনে যাচ্ছি রুকু’র বকবকানী আর গলা ভরা উচ্ছাস!বলার সুযোগ পেয়ে —
– আমি তো আগেভাগে আসতেই পারবোনারে! আমার আসতে আসতে এ মাস শেষ হবেরে রুকু!
কেন তুই একটু আগে এলে কি হয়? সায়মা হয়তো পারবেনা থাকতে!
-কিছু করার নেই রুকু!

পর পর ফোন দিয়েই যাচ্ছে রুকু! কবে আসবি? কবে রওনা দিবি? অদৃশ্য খাঁচায় বন্দী থাকি যেন আমরা। শৈশব কৈশোর দস্যিপণায় কাটিয়ে এখন আমাদের যেন মাঝেমাঝেই ইচ্ছে করে খোলা জমির ভেতরে ইটের চুলায় ভাত,তরকারি রেঁধে কলাপাতায় খেতে, ইচ্ছে করে শীতের সন্ধ্যায় খোলা আকাশের নীচে জমির কেটে নেয়া ধানের অবশিষ্টাংশের মাঝে হাতে ভাজা মুড়ি আর বিস্কুটের সাথে লাল চা’য়ের কাপে উষ্ণতা পেতে চুমুক দিতে।
ইচ্ছে করে শহর ছেড়ে অচেনা গ্রামের পথ ধরে ছুটতে। ইচ্ছে করে ভুলে যেতে, আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে। বড় হয়েছে আমাদের পরিসর। বেড়েছে আমাদের বয়স।
ইচ্ছে করলেই আমরা এখন আর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারিনা অথৈ নদীর ঢেউয়ে। বড়জোড় পা ভিজিয়ে চুপ করে অনুভবে নিয়ে নিতে পারি আছড়ে পরা ঢেউয়ের দোলা!

সেদিন ছিলো মাসের শেষের দিকের তারিখ। রুকুর ফোন।–লিনা তুই এখনো কি করো তোর শশুড়বাড়ি? হয়নি তোর যজ্ঞ
শেষ? জানিস ঝর্ণা এসেছে? -তাই? দারুন তো!কথা হয়েছে তোর সাথে ওর?
-হ্যাঁরে! হয়েছে,ওকে বলেছি আমাদের পরিকল্পনার কথা। ঝর্ণা রাজি। তুই কবে আসবি বল?
-আমি আজই রওনা হচ্ছি এখান থেকে বিকেলে।
-আমরা তো আর থার্টিফার্স্ট নাইট পালন করতে পারবোনা! আমরা না হয় একটা দিন কাটাবো আমাদের মতো, কি বলিস?
আমি অট্টহাসি হাসলাম। থার্টিফার্স্ট ডে?ব্যাপারটা মন্দ নয়তো! বেশ তো তবে তাই হোক!
-ঝর্ণারে ফোন দিস, কখন কি কোথায় হাজির হবো। আমি আমার এখান থেকেই নিয়ে আসবো গাড়ি ভাড়া করে।সারাদিন থাকবে আমাদের সাথে।
– আচ্ছা, বেশ।

৩১ তারিখ।
বেলা সাড়ে দশটার মধ্যে দুজনেই তাঁদের বাচ্চা সহ হাজির আমার বাবার বাসায়। আমরা বের হলাম আমাদের এলে বেলে একটা বেলা কাটাবার উদ্দেশ্যে। আমরা জানিনা, চিনিনা সে পথের নকশা। ড্রাইভারও চেনেনা এ পথের ঠিকানা।
ড্রাইভার বললেনঃ- চিন্তা কইরেন না তো আপনারা! ওয়া জিগাইতে জিগাইতে (জিজ্ঞেস) পারমুআনে যাইতে।
অল্পকিছুদুর গাড়ি চলার পরেই শুরু হলো গ্রামের রাস্তা। বোঝাই যায়না, এ পথ গ্রামের পথ! পিচঢালা পরিচ্ছন্ন পথ একেবারে। আমার গল্পে মন নেই।আমার চোখ সেঁটে আছে সাড়িবদ্ধ গাছপালা আর মাঝে মাঝে জমির ভেতরের দিকে সুনসান বাড়ির দিকে। ইচ্ছে করছে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ি। ওই বাড়ির রান্না ঘরে ঢুঁ মারতে ইচ্ছে করছে।কেমন করে রান্না করে দেখতে ইচ্ছে করছে।কথা বলতে ইচ্ছে করছে ও বাড়ির গৃহিনীর সাথে। রুকু আর ঝর্ণা বক বক করেই যাচ্ছে। কতশত পুরোনো কথা উঠে আসছে ওদের কথায়! মাঝে আমি। দুই পাশে দুইজন কিছু পরপর হেসে উঠছে দুজনেই। অবারিত জমির দিকে চোখ রেখে রেখে আমিও মাঝে মাঝে ওদের হাসিতে যোগ দেই। যেন বুঝতে না পারে, লিনা অন্যমনস্ক!

আর কতদূর পথ বাকি? যেখানে আমরা নামবো? কাঁচা রাস্তাও এসে গেলো এরই মাঝে। তেমনি জিজ্ঞেস করতে করতেই এসে গেলাম বিস্তৃর্ণ এক বিশাল পেয়ারা বাগানের সামনে। নেমে পড়লাম সেখানেই!
এখানে এখন দেখার কিছুই নেই!

তবুও দেখে গেলাম এখানে আগামী ভরা মৌসুমে হাট বসবে ভাসমান হাট।পেয়ারার হাট বসবে।দেশী-বিদেশী পর্যটকে ভরে যাবে তখন এখনকার এই পেয়ারা বাগানের দৃশ্য।
আমরা কিছুক্ষন ছবি তুললাম নিজেদের মতো। —এহন এহানে গইয়া পাইবেন না এট্টাও! আমাদের সবকটা মাথা ঘুরে গেলো একসাথে। কে বলে উঠলো এমন কথা?
অ-দূরেই এক বৃদ্ধ, লুঙ্গী পড়া, গায়ে কোনো জামা নেই,গলায় তুলসির মালা।সাথে দুটো বাচ্চা, হবে হয়তো নাতী পুতি কিছু! আবারো বলে উঠলো- গইয়া নেবেন আমনেরা? হাতে ধরা এক পলিথিনে কিছু পেয়ারা আছে মনে হচ্ছে। আমি তাঁর ভাষাতে কথা বলা শুরু করলাম– এ কাগু, মোরা গইয়া খোঁজদে আইনাই! মোরা হুদা গইয়া বাগান দেকতে আইছি।
-এহন আইছেন ক্যা আমহেরা? আইতে অয় বইশ্যা কালে(বর্ষা কালে)
– কাগু মোরা হেসোমায় আইতপারিনা(আসতে পারিনা)
মোরা এহন সোমায়(সময়) পাইছি, হেইর লইগ্যা এহন আইছি দেকতে!
কাকামশাই হন হন করে হাঁটা শুরু করলেন, বাড়ির পথে।হঠাৎ খেয়াল হতেই আমিই আবার চিৎকার করে ডাক দিলাম।-
– ও কাগু গইয়া দেবেন না মোগো? দিয়া যায়ন ওই গইয়া কয়ডা! কাকু ফোঁকলা দাঁত বের করে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আরো দ্রুত পা চালিয়ে প্রস্থান করছেন।
রুকু বলে উঠলো- মোরা নাইলে কিন্নাই(কিনে) নেতাম কাগু!
ঝর্ণাঃ কাগু মোগো দাম দেলে নারে!
মূল রাস্তায় উঠে এলাম।হাঁটছি আমরা —
পথের ধারেই সর্ষেফুল ফুটে আছে অল্প একটু জায়গায়, সাড়ি বাঁধা কপির ক্ষেত,পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাঁদা ফুলের কমলা রঙের বাহার রোদ্দুরে হাসছে। হাঁটতে হাঁটতে পথ থেকে একটু দূরে একটা বাড়ি দেখা গেলো। আমি চনমন করে উঠলাম। আমি যাবো ওই বাড়ির ভেতর। দেখবো তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন কেমন হয়?
মুখে বললাম – চল ওই বাড়ির পেছন দিকটাতে যাই।ঝর্ণা টিপ্পনী কাটলো,- কেনরে লিনা? তোর কি অন্য কোনো প্রয়োজনের ডাক পড়লো? ওয়াশ রুম ব্যাবহার করার দরকার পরলো কিনা বোঝাতে চাইলো। আমি কিছুই না বলে ওদের আগে আগেই পা চালালাম। রুকুর চোখ পড়লো একজন মাঝবয়সী মহিলার দিকে। হাতে তাঁর কচুর লতি! রুকু- ওই দেখ, লতি টোকাইয়া আনছে এখন।এই লতি এখন কুটবে,বাছবে তারপর রান্না করবে! ভাবা যায়? এখন বেলা বাজে ক’টা বলতো? প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে! আমি এগিয়ে গেলাম!- কাকিমা’আপনার বাড়ি এইটা? — আমার বাড়ি নাই।
-বলেন কি? বাড়ি নাই মানে?
-এডা মাইয়ার বাড়ি।
– ওহ্,আপনি বেড়াইতে আসছেন?
কপালে সিঁদুর নেই,গলায় তুলসির মালা, হাতে শাদা শাঁখা আছে।পিছু পিছু ঢুঁকলাম পেছনের দিক দিয়ে রান্নাঘরের দাওয়ার দিকে। আমার বন্ধু সবার আগে তাঁদের ওয়াশ রুম(প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়ির তুলনায় বেশ ভালো মানের টিন দিয়ে ঘেরা শৌচাগার) ব্যাবহার করতে ঢুঁকে পড়লো। রান্নাঘর বেশ উঁচু মাটির ঢিবির উপরে। একপাশে চৌকি পাতা।সেখানে সদ্য প্রসূত একজন মা তাঁর ছাব্বিশ দিন বয়সি পুত্র সন্তানকে রোদ পোহাচ্ছেন। আমি পানি চেয়ে উঠে বসলাম দাওয়ায়।ছোট ছোট দুটো বাচ্চা অবাক চোখে দেখছে আমাদের। এখনো উনুনে আগুন জ্বলেনাই। পাশেই কাটা তরকারি দেখতে পাচ্ছি। প্রস্ততি চলছে হয়তো উনুন ধরাবার! এবার খেয়াল করলাম আমার সামনেই বসা বৃদ্ধের দিকে।খলবলিয়ে বলে উঠলাম– ও কাগু আমনে ওই কাগু না? গইয়া দেননাই মোগো? বৃদ্ধ হেসে মাথা নাড়ল।
-আমহে না দেলে কি অইবে? মুই এহন এহান দিয়াই খামু এই গইয়া।
সদ্যজাত শিশুর মা বলে উঠলো, ওয়া মোর পোলাপাইনে বানাইয়া (পেয়ারা মাখা) খাইবে।
এক টুকরো মুখে দিয়ে চিবুতে গিয়েই আমার মুখ চোখ বিকৃত হয়ে গেলো।রুকুর মেয়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলো। – লিনা আন্টি কি হলো? বল্লাম ততধিক বিকৃত মুখে – কষষষ্! মুখটাই নস্ট হলো!


বেড়িয়ে পড়লাম ওখান থেকে।আবার ছুটছি আরেক গ্রামে। পেয়েও গেলাম অল্প বিরতিতেই। ধ্বংসাবশেষের কাছে এসে আমি নির্বাক! পলেস্তারায় কত শতাব্দির কথা লেখা আছে? এখানে সেখানে এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো মন্দিরের ভগ্নাবশেষ, দাঁড়িয়ে আছে এক খন্ড দেয়াল।  কি ছিলো এখানে? ইতিহাস জানার সুযোগ হলো না। বিশাল পুরোনো এক বট গাছ থাকার কথা ছিলো! খুঁজলাম নিজের মতো, এগোতে পারিনি সেখানে। মনে পড়লো, এখানে এক আত্মীয়র বাড়ি থাকার কথা! বের হলাম খুঁজতে।পেয়েও গেলাম। নাহ্ এখানে আর নয় চলতো শীগগির! রুকু বলে উঠলো। -ভাত খাবো তো! হোটেল খুঁজবো চল।খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলাম। কি কি আছে জানতে চাইতেই শশ্রূ মন্ডিত বৃদ্ধ চাচা হেসে যেন আতিথেয় ভঙ্গিতে আহবান করলেন। -আসেন আসেন খাইয়া কইবেন কেমন রান্দোন(রান্না)? রুই মাছের তরকারি,ডিমের তরকারি আর ডাইল(পানি ডাল) মাছের ঝোলের রঙ দেখে ভয় পেয়ে গেলাম আমি। এত টকটকা লাল? বাটা লাল মরিচের রান্না নির্ঘাত! এমনিতেই আমি কম ঝাল খাই।এ তরকারি দিয়ে খেতে পারবো তো? ভয়ে ভয়ে নিলাম। ভয়ে ভয়ে মুখে মাছ ভেঙে দিতেই ধারনা বেমালুম ভেঙে গেলো। মোটা চালের ভাত,সিম দিয়ে টকটকা লাল করে রান্না করা রুই মাছের ঝোল দিয়ে আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললাম। রুকুঃ নাহ্, লিনা! যা যা স্বপ্ন দেখেছিলাম, আজ তা পূরণ হলো অবশেষে। আমি স্রেফ মাথা নাড়লাম হাসি ঝুলিয়ে রেখে ঠোঁটের কোনে। আমাদের দিন তখনো শেষ হতে আরো কিছুটা বাকি।
গাড়ি ছোটালাম শহরের উপকন্ঠে।নদীর তীর ঘেসে গড়ে ওঠা ছোট্টখাট্টো এক বিনোদন কেন্দ্রে। নদীর পাড়ে এসেই জুতো খুলে নেমে পড়লাম আমি আর রুকু ঢেউয়ের দোলায় পা ভেজাতে। স্টিমার ছুটে সামনে এগিয়ে যাবার পরে, পেছনে রেখে যাওয়া তোলপাড় করা ঢেউয়ের আঘাত এসে আছড়ে পড়ছে আমাদের ডোবানো পায়ে। আমরা ২০১৯ সালের একটা এলে বেলে দিনের শেষ সুর্যাস্ত বিদায় জানালাম এভাবেই।

৩০৩জন ১৫০জন
6 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য