এভাবেই নীল খেকো পাখিটি হারিয়ে গেলো

মাসুদ চয়ন ১৮ আগস্ট ২০১৯, রবিবার, ০৮:৪৩:২১পূর্বাহ্ন গল্প ২১ মন্তব্য

#ছোটগল্পঃ-এভাবেই নীলখেকো পাখিটি হারিয়ে গেলো//
তখন শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজে অধ্যয়নরত।কলেজের প্রধান অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম পিপিএম পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি।
পুরো মিরপুর ওনার দখলে।ক বললেই কবিতা হয়ে যায়।খ বললেই খুন হয়ে যায়।গ বললেই গায়েব হয়ে যায়,ঘ বললেন ঘুষের গাড়ি উপস্থিত।অথচ তিনিই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা।
বয়স কম থাকায় বেশি কিছু অনুধাবণ করতে পারতাম না।জানতামনা একজন আইজিপি কি জিনিস এবং কি কি প্রয়োগ করার অধিকার রাখেন।তিনি একদিন ইন্টার ফাস্ট ইয়ারের ক্লাসে এসে বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন।ওনার আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছেন বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকেরা।একেকজন ভয়ে শিহরণেে চুপসে আছেন।আমি খুব খুব বিস্মিত হয়েছিলাম স্যারদের এমন চেহারা দেখে।তিনি যখন বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন।চারপাশে শুনশান নিস্তব্ধতা।তিনি একাই শব্দ করে হাসছেন কথা বলছেন।তার বক্তৃতার ভাষা ছিলো এমন।এখানকার ৯০ ভাগ ছেলে/মেয়ে পুলিশের সন্তান।তাই তোমাদেরকে অর্ধ ফিতে সবকিছু ভোগ করার অধিকার প্রদান করা হয়েছে।আর বাকি ১০ ভাগ ছাত্রছাত্রীকে এই সুযোগ দেয়া সম্ভব হয়নি।তবে তারা যদি মাত্রাতিরিক্ত ভালো ফলাফল করে দেখাতে পারে সেক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে।আমাদের কলেজের জন্য পুলিশ ইউনিয়ন থেকে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার ডোনেশন প্রাপ্তিত হয়।আশা করি তোমরা আমাদেরকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলির তালিকায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।এতে করে ডোনেশনের পরিমান আরও বাড়বে। বি এ এফ শাহিন কলেজে বিশাল মাঠ আছে,আমাদেরটা ছোটো।হারম্যান মেইনারের মতো বিশাল ক্যাম্পাসো নেই আমাদের।রেজাল্টের দিক দিয়েও অনেক পিছিয়ে রয়েছি।তাই তোমাদেরকে জয়ী হতে হবে।যুদ্ধ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হও।
.
ওদের সাথে টক্কর দিতে হবে।পারবে তো!না পারলে এখানে টিকে থাকতেও পারবেনা।সোজা টিসিতে তেপাত্নরে পাঠানো হবে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বুক টানটান করে ওনাকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম,আপনার অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি এতো ক্ষোভ কেনো?আপনিতো আমাদের কচিকাঁচা মগজে যুদ্ধের দামাম ঢুকিয়ে দিতে চাচ্ছেন।শিক্ষা ক্ষেত্রে রেশারেশির চক্রান্তচিপি এঁকে দিচ্ছে।ওসব প্রতিষ্ঠানেের ছাত্র ছাত্রীরা কি আপনার ছাত্র ছাত্রী তুল্য নয়।যদি নাই হয় তাহলে এটাকে শিক্ষাঙ্গন না বলে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার সংসদ ভবন বলাই শ্রেয়।টিসি দেয়ার আগে সেই শিক্ষার্থীদের বিগত সময়ের যাবতীয় বেতনাদি ফিরিয়ে দেয়াও কি উচিৎ নয়! এরপর থমথমে পরিবেশ।শুধু তিনিই নন বাকি শিক্ষকেরাও একে অপরের দিকে চেয়ে থরথর করে কাঁপছেন।পিপিএম আর কিছুই বললেননা।বক্তব্য এখানেই পরিসমাপ্তি টানলেন।চোখ মুখ লাল করে ক্লাস থেকে বেড়িয়ে গেলেন।অন্য শ্রেণীগুলোও পরিদর্শন করার কথা ছিলো।কোত্থাও গেলেননা।সোজা নিজের ভি আই পি রুমে চলে গেলেন।
.
তিনি চলে যাওয়ার পর কয়েকজন সহপাঠী আমাকে বাহ বাহ দিয়ে উজ্জীবিত করতে লাগলো।ওনার পেছনে ছুটছেন একঝাঁক সুবিধালোভী শিক্ষক।যারা শিক্ষাকে বিজনেস খাতে প্রবাহিত করেছে যুগে যুগে কালে কালে।
কিছুক্ষণ পর আমাদের ডিসিপ্লিন মেইনটেইনার শিক্ষক তৌহিদ আরাফি ক্লাসে প্রবেশ করে আমাকে সহ আরও তিন জনকে পানিসমেন্ট রুমে নিয়ে গেলেন।ওখানে মিটিং চলছে।মিটিংয়ে অবস্থান নিয়েছেন ১৩ জন প্রভাবশালী শিক্ষক।এদের চোখের দিকে তাকানোর সাহস হয়না শিক্ষার্থীদের।আলোচনা সমালোচনা তো দূরের গন্তব্যে।ওনাদের অধিকাংশই পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।ক্লাস নেননা-পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।অধিকাংশ প্রাইভেট কলেজের একই হাল।তবে প্রথম দিকে নিয়মিত ক্লাস নিতেন ওনারাও।এখন কেবল পরিদর্শক হিসেবে প্রতি সপ্তাহে একদিন ক্লাসে অবস্থান করেন।
আমি মনে মনে খুব খুশি।বহুদিনের লুকিয়ে রাখা আক্ষেপগুলি প্রকাশ করার এটাই উপযুক্ত সময়।আজ কিছুটা হলেও প্রকাশ করবোই,টিসি হলে হউক।আমার সাথে আসা বাকি তিনজনের অবস্থা গুরুতর।তিন্নি আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছেঃরুদ্র,তুই নিশ্চিৎ টিসি খাবি।তবে সাবধান!আমাদের আবার বিপদে ফেলিস না।মুখের লাগাম টেনে রাখিস প্লিজ।আমরা হেসেছি এটাই আমাদের অপরাধ,কিন্তু!তুই কি করলি এটা!তুই জানিসনা সামনে ফাস্ট ইয়ার ফাইনাল।এখন টিসি দিলে কোথায় যাবি।
আমি তিন্নির গালে আলতো এক থাপ্পড় বসিয়ে দেই,ভয় কিসের!এবার নাটক জমবে।দর্শক হিসেবে দর্শন করবি তোরা।নুহাস ও অনিতার চোখ গড়িয়ে টপ টপ জল ঝরছে।
.
মিটিং সাইলেন্ট হয়ে গেলে-তৌহিদ আরাফি আমাকে সামনে ডেকে নিলেন।ওনার শক্তপোক্ত হাত দিয়ে পিঠে দুম দুম করে হিট করতে থাকলেন।ওই জানোয়ার তুই ডাইরেক্ট টিসি পাইছস!আর কোনো কথা নেই।তুই এক্ষনি বেড় হয়ে যা কলেজ থেকে।কালকে বাপ মা নিয়া আসবি।সব কিছু রেডি করে রাখা হবে।আর বাকি তিনজন থেকে যাও।তোমাদের জরিমানা করা হবে ডিসিপ্লিন ভঙ্গ করার জন্য।
আমি তৌহিদ স্যারের দিকে রক্ত লাল চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম।আপনাকে সাথে নিয়েই বের হতে চাই।কি ভাবেন নিজেকে!তখন আমি আবেগ ধরে না রেখে কেঁদেই ফেলি।বিড়বিড় করে সব সত্যি বলতে থাকি।আপনি তিন্নিকে তিন তিন বার এই রুমে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেছেন।ও সুই সাইড করতে চেয়েছিলো।এতোদিন বুকের মধ্যে কষ্টটা চেপে রেখেছিলাম।তিন্নির সন্মান হানি হবে এটাও একটা কারণ ছিলো।কিন্তু,ও আমাকে সব খুলে বলেছে।ও আমার প্রাণেের বান্ধবী-সেই স্কুল জীবন থেকে একসাথে বেড়ে উঠেছি।এই দেখুন ও চোখ মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।এই ঘটনা এই শিক্ষক প্যানেলের সবাই জানে।কিন্তু সবাই নিশ্চুপ!সবাই আপনাকে ভয় পায়।আমি পাইনা!আমি থানায় যেতে পারবোনা,আদালতে যেতে পারবোনা।কেউ আপনার বিচার করার সাহস রাখেনা তাইতো।তাহলে আমি পৃথিবীর দেয়ালে দেয়ালে লিখে দিবো আপনার মতো শিক্ষকের হাতে শত শত নারী শিক্ষার্থীর ধর্ষিত হওয়ার চিত্রনাট্য।এই রাষ্ট্র কিছুই করতে পারেনি,কিচ্ছুনা!এরপর আমাকে পুলিশের গাড়িতে করে থানায় নেয়া হয়।সেই কিশোর বয়সেই ২ বছরের স্বশ্রম কারাবাসে থাকতে হয়েছিলো।আর অপরাধ কি জানেন!তিন্নিকে নাকি আমিই ধর্ষণ করেছিলাম।তিন্নি নিজ মুখেই স্বীকারোক্তি দিয়ে এসেছে।
এরপর ৯ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো।অনার্স শেষ করে চাকরি খুঁজে যাচ্ছি।তিন্নি ওই ধর্ষক কতৃক আবারো ধর্ষিত হয়েছে।আমার সাথে বহুবার যোগাযোগ করেছে।ও একাই কথা বলেছে।আমি মাথা নিচু করে শুনে গিয়েছি।
.
চুল ধরে টেনেছে।গালে মুখে এলোপাতাড়ি থাপ্পড় দিয়েছে।শার্টের কলার টেনে টেনে অবিরাম কেঁদেছে,আমি কিছুই বলিনি।বারবার এভাবেই ফিরে গিয়েছে।বহু মাস হলো খোঁজ নেই।খোঁঁজ তো আর কখনোই হবেনা।এই যে হাতের পত্রিকা।মূল শিরোনামে কি লিখেছে জানেন-ও নাকি আত্নহত্যা করেছে।ও নাকি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলো।সেই ভেঙে পরার চুরান্ত ইতিহাস পত্রিকায় লেখা নেই।আমরা দুজন দুজনকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলাম।অথচ কেউ কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারিনি।তিন্নি বলেছিলো,ওকে মিথ্যা জবানবন্দী দিতে বাধ্য করা হয়েছিলো।সব হিসেবের ক্রান্তি টেনে ও চলে গেলো।তবে কি ও জাহান্নামী হবে!আপনারাও কি সেটাই বলবেন।আমি বলি ও ঠিক করেছে।পৃথিবী নামক জাহান্নামের গল্প শেষ হয়ে গেছে তার জন্য।যে গল্প কেবল আমাকেই বলতো,আর কাউকে না!আজ ও নেই,তাই গল্প বলার ইতি টেনে দিলাম।
(মাসুদ চয়ন)

১৫২জন ১৫২জন
18 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য