এবং দু’টি মৃত্যু

রেহানা বীথি ১ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ১১:৪৫:৩১অপরাহ্ন গল্প ২৬ মন্তব্য

এবং দু’টি মৃত্যু
*****************
(১) শোকে স্তব্ধ আজ বিশাল বাড়িটি। মিসেস চৌধুরী আজ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন! রেখে গেলেন এই বিশাল বাড়িতে তাঁর সাজানো সংসার, উচ্চপদস্থ ছয়টি ছেলেমেয়ে, আর যত্নে গড়া সুসজ্জিত ফুলের বাগান। বয়স হয়েছিলো যথেষ্ট। শেষ বয়সে এসে আক্রান্ত হলেন ক্যান্সারে। ফল হবে না জেনেও উন্নত চিকিৎসা। বাঁচানোর, বেঁচে থাকার সকল প্রচেষ্টা। মায়া। এই পৃথিবীর, স্বামী এবং সন্তানদের। বাড়ির সামনের প্রশস্ত খোলা জায়গায় একে একে এসে থামছে গাড়ি। গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছেন সাদা কিংবা কালো অথবা সাদাকালোয় মেশানো পাটভাঙ্গা পোশাক পরিহিত বিশিষ্টজন। আসছেন আত্মীয়- স্বজন। শোকে স্তব্ধ সবাই। নিঃশব্দে একে একে কফিনে শায়িত চৌধুরীপত্নীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, তাঁর পরিবারের সদস্যদের শান্তনা দিচ্ছেন সবাই। পরিবারের সদস্যরা সাদা পোশাক পরিহিত। থমথমে মুখে যে যার কর্তব্য করছে। আগত অতিথিদের সাথে কুশল বিনিময়, কেউ চলে গেলে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেয়া, এসব। থমকে গেছে যেন শোকস্তব্ধ পুরো বাড়ি, চোখের জলও। ফুলে ফুলে ঢাকা কফিন ঘিরে মিহিসুরে কোরআন পড়া আর সালাম বিনিময়ের মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। নিশ্চুপ সব।

প্রাসাদোপম এ বাড়ির সমস্ত ইট কাঠ, এমনকি যত্নে গড়া বাগানের গাছগুলোও যেন শোকস্তব্ধ। একেবারে বাউন্ডারী দেয়াল ঘেঁসে যে বড়সড় বকুলের গাছটা, সেটাও থমকে গেছে। ফুলগুলো যেন ঝরে পড়তে ভুলে গিয়ে আটকে গেছে পাতার ভাঁজে। দু’টো কাক কোথা থেকে উড়ে এসে বসলো বকুলের একটা অশক্ত ডালে। একটু তোলপাড় উঠলো, ফিরে তাকালো কেউ কেউ। আকস্মিক এই ছন্দপতনে যেন কাকদু’টো ভীষণ লজ্জিত। চুপ মেরে পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো ওরাও।

খাঁ খাঁ দুপুর পেরিয়ে বিকেল এলো শোকের বাড়িটিতে। বাদ আসর জানাজার পর সম্পন্ন হলো দাফন। আগত জনসমাগম পাতলা হলো। সফলভাবে সমাধা হলো একটি শোকযাত্রা।

(২) শেফালি হালদার, মানিক হালদারের খেটে খাওয়া রুগ্ন বউটি মারা গেছে সেই ভোরবেলায়। সূর্য কেবল পূব আকাশে উঁকি দিয়েছে কি দেয়নি, সেসময়। গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানিক হালদারের ঘুমটা তখন যেন একটু বেশিই চেপে এসেছিলো। কল্কেতে সুখটান দিয়ে ধোঁয়ার সাগরে ডুবতে ডুবতে যেন বহুদূরের কোনো অজানা দুনিয়া থেকে কারো কাতরানির শব্দ কানে এলো। টকটকে লাল ঘোরলাগা দু’চোখ মেলতেই সব ঝাপসা। চাটাইয়ের ঘরের এক কোণে পাটির বিছানায় বউটি তার কেন যে দুমড়ে মুচড়ে শুয়ে কোঁকাচ্ছে, ঠিক ঠাওর করতে পারলো না সে। কচিকাঁচা ছেলেমেয়েগুলো অঘোরে ঘুমোচ্ছে উল্টোপাল্টা হয়ে। আবার চোখ লেগে আসবে ভাব। এমন সময় হেঁচকি তোলা শুরু করলো বউটি। কী আর করবে মানিক হালদার! কোনোরকমে উঠে ধাক্কা দিয়ে বউকে শুধালো, “অমন করিস ক্যান, মরন উঠছে?”

কচিকাঁচাদের মধ্যে যেটি সবচেয়ে বড়, সে জেগে উঠেছে ততক্ষণে।
“ওমা, কী হলো মা তুমার? এমন করো ক্যান?”

হেঁচকি থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে একটু চেয়ে থেকেই গড়িয়ে পড়লো শেফালি। তারপর সব চুপচাপ। এতক্ষণের দোমড়ানো শরীরটা সটান হয়ে গেলো খেজুরপাতার পাটিটার ওপর। দু’চোখ কিন্তু তেমনই খোলা ফ্যালফ্যাল চাহনিতে। মানিক হালদার থ হয়ে বসে আছে। জেগে ওঠা মেয়েটির কেমন শঙ্কা হলো।
“বাবাগো মা’য় নড়ে না ক্যান, কুনু শব্দও তো নাই!”

তাই তো! নাকের কাছে হাত নিয়ে, বুকের ওপর কান পেতে বউয়ের বেঁচে থাকার প্রমাণ পেতে চাইলো মানিক। নাহ্ নেই, কোনোই সাড় নেই। ঠোঁটের কোণে এক টুকরো বিষাদমাখা বেদনার হাসি নিয়ে থেমে গেছে সে। কয়েক পলক, বুঝে গেলো ওরা। খসখসে শুকনো আর্তনাদ বেরিয়ে এলো মানিকের গলা দিয়ে। এই আর্তনাদেই যেন পুরোপুরি জেগে উঠলো সূর্যটা। ধড়মড় করে উঠে বসে চোখ ডলতে ডলতে বাকী কচিকাঁচারা দেখলো তাদের মা টা সটান শুয়ে। খোলাচোখের অচঞ্চল স্থির দৃষ্টি ওদের শিশুমনে কেমন যেন ভয় ধরিয়ে দিলো। কাঁদতে লাগলো ওরা, একসঙ্গে চিৎকার করে।

নিউমার্কেটের পেছনের ওই বস্তিতে মাত্র কয়েকঘর হিন্দু। গায়ে গায়ে লেগে থাকা ঘরগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে নিঃশ্বাসের শব্দও যাওয়া আসা করে অনায়াসে। মানিকের বুকফাটা আর্তনাদ, ছেলেমেয়েদের সমস্বরে কান্নার রোল জানিয়ে দিলো সবাইকে,কিছু হয়েছে। বিশাল নিমগাছে বসে থাকা কাকগুলোও কা কা শব্দে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে দিশাহীন। সেই আর্তনাদের পর কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইল মানিক হালদার। ছেলেমেয়েগুলোর কান্না যেন সে শুনতেই পাচ্ছে না। হঠাৎ কানে এলো, আহারে, শ্যাষ পয্যন্ত তুই মরলি রে শেফালি!
এতক্ষণ বুকের ভেতরে ধরে রাখা চাপা নিঃশ্বাসটা ফস করে বেরোতে বেরোতে আচমকা ঝাপিয়ে পড়লো যেন। প্রবল বেগে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো,
“শেফালি রে…., এমন কইরে ক্যান তুই চইলে গেলি! একবারের তরে ছাওয়াল পোওলের সাতে কুনু কতা কলি না। আমার সাতেও না! কেমনে পারলি তুই?”
হাত পা ছড়িয়ে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে কাঁদতে লাগলো মানিক হালদার।
“চুপ যা মানিক, অত কান্দিস না শেফালির আত্মা কষ্ট পাইবে যে!”
প্রতিবেশীরাও অশ্রুসজল, তবুও তো সামলাতে হয়। যেন একটু হুশ হোলো মানিকের। প্রায় খুলে যাওয়া পরনের লুঙ্গিখানা ঠিকঠাক করে নিলো একটু। সবচেয়ে ছোট ছেলেটা সাহস পেয়ে বাপের কোলে বসে কারো দেয়া এক প্যাকেট বিস্কুট খেতে লাগলো কুড়মুড় করে। সূর্য তখন মাথার উপর সিধে হয়ে তাপ ছড়াচ্ছে। লাশ আর বেশিক্ষণ রাখা ঠিক হবি না রে মানিক! শ্মশানে নিয়ার ব্যবস্তা কত্তি হয় তো। গাঁজার ঘোর কেটে যাওয়া অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মানিক হালদার।

জোগাড়যন্ত্র চলছে, সধবা শেফালির শ্মশানযাত্রার। শাঁখা, সিঁদুর আলতায় সেজেছে আজ শেফালি। কোথা থেকে যেন একটা নতুন লাল টুকটুকে শাড়ি জোগাড় হয়েছে। রোগে ক্লিষ্ট শেফালির মুখখানা কি জানি কেন, আজ বড় সতেজ লাগছে! কেবল ঠোঁটের ওই বিষাদ বেদনার হাসিটি বড় করুণ। ওখানেই লুকিয়ে আছে তার সকল না পাওয়া, সন্তানদের ফেলে অসময়ে চলে যাওয়ার কষ্ট। ওই হাসিটিই বলে দিচ্ছে…. যেতে চায়নি, তবু যেতে হলো তাকে।

১৩৭জন ১৩জন
5 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য