সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

এক মুঠো ভালোবাসা (৩২তম পর্ব)

ইঞ্জা ৯ এপ্রিল ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৬:৪৭:৫৮অপরাহ্ন গল্প ২৭ মন্তব্য

অনিকের মা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, কি কি বলছেন?

মিসেস রাশেদ, সত্যি দুঃখের সাথে বলছি, মি. অনিক আজ বিকেলে পার্ক স্ট্রীটের পার্কিং লট থেকে কিডন্যাপ হয়েছেন, সোহেল চৌধুরি বললো।
ওগো শুনছো উনি কি বলছেন, অনিকের বাবাকে ধাক্কা দিয়ে কান্না করতে করতে অনিকের মা বললেন, ওদিকে অনিকের বাবা সকড হয়ে শক্ত হয়ে গেলেন, রওশনের বাবা অনিকের বাবার হাত ধরে অভয় দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করলেন।
ছায়া দাঁড়িয়ে ছিলো, ও মাটিতে বসে পড়লো কলহন বুঝতেই পারেনি, চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, নিজের মাথায় নিজেই হাত মারলো, কেন সে অনিককে ওখানে ডাকলো সে, নিজেকে নিজে দোষী মনে হচ্ছে ওর।
আপনারা একটু শক্ত হোন প্লিজ, এইভাবে করলে আপনাদের ক্ষতি হয়ে যাবে, সোহেল চৌধুরি স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলো।
আপনি সিউর হয়ে বলছেন, ভুল হচ্ছে নাতো, রওশনের বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
জ্বি, আমরা সিউর হয়েই বলছি।
রওশনের বাবার চোখ ছলছল করে উঠলো।
মি. রাশেদ, মি. রাশেদ, আর ইউ ওকে?
পুলিশ অফিসারের ডাকে অনিকের বাবা ফিরে তাকালেন।

অফিসার আবার বললেন ইংরেজিতে, আপনারা নিরাশ হবেন না, অলরেডি সিআইএর টিম মাঠে নেমেছে, উনাকে আমরা দ্রুতই খুঁজে বের করবো।
এখন আমাদের কি করা উচিত, অনিকের বাবা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন?
অফিসার সোহেল চৌধুরির দিকে তাকালেন, সোহেল চৌধুরি বলে উঠলো, মি. রাশেদ আসলে এখন আপনারা ঘর থেকে বেরুবেন না প্লিজ, সময়টা ক্রিটিকাল, আমাদের টিমও কাজে লেগে গেছে, আশা করছি দ্রুতই উনাকে আমরা উদ্ধার করে ফেলবো।
অনিকের মা কান্নাকাটি করছে দেখে আবার বললো, মিসেস রাশেদ, আপনি চিন্তা করবেন না, অনিক দ্রুতই আপনাদের মাঝে ফিরে আসবে, এখন আমরা উঠছি, বাইরে আমাদের লোকজন আপনাদের দিকে খেয়াল রাখবে, এই ফ্লোরেই দুজন লোক দিচ্ছি আমরা, যদি কিছুর দরকার হয়, ওরাই এনে দেবে, নিজের বিজন্রস কার্ড এগিয়ে দিয়ে বললো, এইটি আমার কন্টাক ইনফরমেশন, দরকার হলে যোগাযোগ করবেন।
ওরা বের হয়ে গেলে রওশনের বাবা দরজা বন্ধ করে এসে অনিকের বাবার পাশে বসলেন।
অনিকের বাবা বাচ্চাদের মতো করে কান্না করতে লাগলেন দেখে উনি পিটে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ভাই আপনি শান্ত হোন, আপনি ভেঙ্গে পড়লে ভাবীকে কে সামলাবে?

রাতে আর কারও খাওয়া হলোনা, কেউ খেতে রাজিনা হওয়াতে ছায়া বুকে পাথর বাঁধলো।
আজ ওর জন্যই এতো বড় বিপদ হলো অনিকের, নিজের চুল নিজে ছিড়তে লাগলো ছায়া, চোখ ফেটে পানি বের হচ্ছে ওর।
অনিকের মা উঠে এসে ছায়াকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন, সাথে ছায়াও নিজেকে আটকাতে পারলোনা, সেও কান্না করতে লাগলো, ওই শুধু জানে অনিকের এই বিপদের জন্য ওই একমাত্র দায়ী।
ওমা মারে, কই যাবো বল, কই গেলে আমার বুকের ধনকে ফিরে পাবো, অনিকের মার আহাজারি।
অনিকের বাবা নিজেও উঠে এসে দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
ওদিকে রওশনের বাবা শোকে পাথর হয়ে রইলেন।
সারা রাত আর কারো ঘুম হলোনা, মাঝ রাত তিনটার দিকে ছায়া জোর করে সবাইকে ঘুমাতে পাঠালেও সত্যিকার অর্থে কারোরিই ঘুমানোর মতো অবস্থা ছিলোনা।

ভোরের দিকে সবার ঘুম লেগে এসেছিলো কিন্তু ছায়া উঠে গেলো নামাজ পড়ার জন্য, ওয়াসরুমে গিয়ে অজু করে নিয়ে ড্রয়িংরুমের এক কোণায় নামাজ পড়তে শুরু করলো।
নামাজের শেষে সালাম ফিরাতে গিয়ে দেখলো অনিকের মাও উঠে এসে নামাজ পড়তে দাঁড়ালেন, ছায়া মুনাজাত শেষে কোরআন শরিফ নিয়ে সুরা ইয়াসিন পড়তে লাগলো এক মনে, এগারোবার পড়া শেষে মুনাজাত করতে শুরু করলো, চোখ ভরা পানি আর বাধ মানলো না ওর, অঝোরে কাঁদছে আর আল্লাহর কাছে অনিককে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছে, অনেকখন মুনাজাত শেষে উঠতে যাবে, দেখলো অনিকের বাবা এবং ওর শ্বশুরও নামাজ পড়ছে।
ছায়া উঠে গিয়ে সবার জন্য সকালের নাস্তা রেডি করলো, সবার নামাজ শেষ হলে সবাইকে জোর করে ডাইনিংয়ে এনে বসিয়ে খেতে দিলো।
মা আমি খেতে পারবোনা, অনিকের মা না করলেন, জানিনা আমার ছেলেটা খেয়েছে কিনা?
ছায়া বড়ভেকটা নিশ্বাস ফেলে বললো, আন্টি আপনি না খেলে কেমনে চলবে, অনিক ফিরে এলে এইসব শুনলে ও কষ্ট পাবেনা, নিন আমি খাইয়ে দিচ্ছি, বলেই রুটি ছিড়ে ভেজিটেবল নিয়ে উনার মুখের সামনে তুলে ধরলো, অনিকের মা কিছুক্ষণ ছায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে খাবারটা মুখে নিলেন।
ছায়া সবাইকে খাইয়ে সব ধুয়ে মুছে তুলে রাখছে, এইসময় সেলফোনে রিং হচ্ছে দেখে এগিয়ে গিয়ে রিসিভ করলো।

ছায়া অনিক এসেছে, আফরিনের কণ্ঠ শুনা গেলো।
ছায়া ফুঁফিয়ে কান্না করতে লাগলো।
ছায়া, ছায়া কি হয়েছে, অনিক ঠিক আছে তো?
ছায়া কাঁদতে কাঁদতে সব খুলে বললো, সব শুনে আফরিনও ফুঁফিয়ে কাঁদতে লাগলো।
আমি আসছি ছায়া, আল্লাহকে ডাকো যেন অনিককে ফিরিয়ে দেয়।
ঠিক আছে, লেভিনকে জানিয়ে দিও, বলে ছায়া ফোন ডিসকানেট করে চোখ মুছলো।
টিকেটের কথা মনে পড়ায় ছায়া ল্যাপটপ বের করে অনলাইনে টিকেট ক্যান্সেল করিয়ে দিয়ে নিজে রেডি হলো ঘরের জন্য বাজার করতে যাবে।
আন্টি ঘরে কিছুই নেই, আমি গ্রোসারি শপ থেকে কিছু নিয়ে আসি।
ছায়া টাকা নিয়ে যাও, অনিকের বাবা বললেন।
না আনকেল, অনিকের টাকা আছে আমার কাছে।
ঠিক আছে যাও।
ছায়া দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতেই দুইজন বাঙ্গালী পথরোধ করে দাঁড়িয়ে বললো, ম্যাডাম আপনাদের কারো বেরুনো নিষেধ।
আমাদের তো বাজার সদাই লাগবে, ছায়া বললো।
তাহলে কি লাগবে তার লিস্ট দিন আমরাই এনে দেবো।
ছায়া অনিচ্ছা শর্তেও ভিতরে চলে গেলো এবং কিছুক্ষণ পর লিস্ট এনে তাদের একজনের হাতে দিয়ে কিছু টাকা (ডলার) দিলো।
আধা ঘন্টার মধ্যে একজন কলিংবেলে চাপ দিলে ছায়া দরজা খুললে ওর হাতে বাজার সদাই বুঝিয়ে দিয়ে গেলো।
আপনারা কিছু খেয়েছেন, ছায়া জিজ্ঞাসা করলো।
আমাদের কথা চিন্তা করবেন না প্লিজ, আমাদের সব ব্যবস্থা আছে।

………. চলবে।

ছবিঃ গুগল।

জনস্বার্থেঃ

৫৮১জন ২৩২জন
56 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ