দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত বর্ণবাদবিরোধী নেতা, বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস সাদা-কালোর বিবেধ ঘুঁচিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াকু সৈনিক, বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ৫ ডিসেম্বর ২০১৩ বৃহস্পতিবার জোহানেসবার্গে তাঁর নিজের বাড়িতে ৯৫ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার মাধ্যমে তাঁর বর্ণিল ও সংগ্রামী জীবননের যবনিকাপাত ঘটলো। তাঁর এ মহাপ্রয়ানে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ শোকের সাগরে ভাসছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ও বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক আজীবন সাম্য ও বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামে অাত্মনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বের তাবৎ মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিলেন। গান্ধীবাদী এ মহান নেতার নিরন্তর সংগ্রাম নির্দিষ্ট কোন স্থান বা কালে সীমাবদ্ধ ছিলনা । তাঁর এ সাম্য ও শান্তির সংগ্রাম বিশেষ কোন বর্ণ বা গোত্রের বিরুদ্ধে ছিল না। বরং পৃথিবীর যে প্রান্তেই ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে নিপীড়িত হয়েছে সে নিপীড়িত ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তিনি। ম্যান্ডেলা নিজেই বলেছিলেন, ‘বর্ণবাদকে আমি অত্যন্ত ঘৃণা করি, কেননা আমি একে বর্বরোচিত মনে করি, সেটা কৃষ্ণাঙ্গ বা শ্বেতাঙ্গ যাদের কাছ থেকেই আসুক।’ শুধু নিজ দেশে নয় দেশের বাইরেও যেখানের মানবতা ভূলুন্ঠিত হয়েছে, শাসন-শোষণের অত্যাচারে নিস্পেশিত হয়েছে মানুষ সেখানে মানুষের অধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে গেছেন তিনি। তাই গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সমতা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সম্মান জানাতে ১৯৯৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন বিশ্বের শান্তি ঐক্য মনবতাবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। ৯৫ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই মহান নেতা নিজকে সাম্যের লড়ায়ের নিয়োজিত করে হয়ে উঠেছেন এ কালের ‘মহানায়ক।’

আমাদের নতুন প্রজন্মের যারা এই মহান নেতা সম্পর্কে সাম্যক অবহিত নন তাদের উদ্দেশ্যে এখানে তুলে ধরতে চাই নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনের সংক্ষিপ্ত গল্প। ১৯১৮ সালে দক্ষিণ অফ্রিকার ইস্ট কেপটাউনের ছোট্ট এক গ্রামে জোসা ভাষিক টেম্বু গোত্রে ম্যান্ডেলার জন্ম। নিজের গোত্র থেকে পাওয়া ‘মাদিবা’ নামেও দেশবাসীর কাছে পরিচিত তিনি। রোলিহ্লা ডালিবুঙ্গা নামের কালো শিশুটি নেলসন ম্যান্ডেলা নামটি পান এক স্কুলশিক্ষকের কাছ থেকে, ওই নামেই ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে। ম্যান্ডেলার বাবা ছিলেন ম্যটেম্বু গোত্রের ‘অভিজাত’ পরিবারের পরামর্শক। তিনি যখন মারা যান, ম্যান্ডেলার বয়স তখন নয় বছর। এর পর গোত্রপ্রধানের তত্ত্বাবধানেই বেড়ে উঠতে থাকেন ম্যান্ডেলা। ১৯৪১ সালে ২৩ বছরের তরুণ ম্যান্ডেলার বিয়ের আয়োজন হয়। কিন্তু ঠিক তখনই সংসারে বাধা পড়ার ইচ্ছা তাঁর ছিল না। ফলে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে চলে যান জোহানেসবার্গে।
দুই বছর পর উইটসওয়াটারান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হন ম্যান্ডেলা। সেখানেই বর্ণবাদ ও বৈষম্যের রূপ অনেক স্পষ্টভাবে দেখা হয় তাঁর; পরিচয় ঘটে কট্টরপন্থা, উদারপন্থা ও আফ্রিকান ভাবনাগুলোর সঙ্গে। ভবিষ্যতের বিশ্বনেতা ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক চেতনার বিকাশের শুরু ওই সময় থেকেই। ওই বছরই তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে (এএনসি) যোগ দেন, গড়ে তোলেন তরুণদের শাখা- এএনসি ইয়ুথ লীগ। এরই মধ্যে আইনজীবী সনদ হাতে পান ম্যান্ডেলা, ১৯৫২ সালে জোহানেসবার্গে অলিভার ট্যাম্বোর সঙ্গে যোগ দেন আইন পেশায়।

দক্ষিণ আফ্রিকার শাসন ক্ষমতায় তখন সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গদের দল ন্যাশনাল পার্টি। তাদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সোচ্চার হন ম্যান্ডেলা ও ট্যাম্বো। ১৯৫৬ সালে প্রথম মামলা হয় ম্যান্ডেলার বিরুদ্ধে। আরও ১৫৫ জনের সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। অবশ্য চার বছর পর মামলার রায়ে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান তিনি।
ওই রায়ের পর বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন নতুন গতি পায়। বিশেষ করে নতুন আইনে কালোদের বাসস্থান ও কাজ নির্দিষ্ট করে দেয়ায় শ্বেতাঙ্গ শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এরই মাঝে ১৯৫৮ সালে উইনি মাদিকিজেলাকে বিয়ে করেন ম্যান্ডেলা। ১৯৬০ সালে এএনসি নিষিদ্ধ করার পর আত্মগোপনে চলে যান ম্যান্ডেলা।
একই বছর পুলিশের গুলিতে ৬৯ জন কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হওয়ার পর সরকারবিরোধী ক্ষোভ তীব্রতর হয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে সরে আসে এএনসি। দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার সিদ্ধান্ত নেন।
এর পর গ্রেফতার হন ম্যান্ডেলা, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে হামলা এবং সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
ওই মামলার শুনানিতে রিভোনিয়ার আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমতার দাবি তোলেন ম্যান্ডেলা।

১৯৬৪ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় ম্যান্ডেলার। ১৯৬৮-৬৯ সালের মধ্যে ১২ মাসের ব্যবধানে মা ও বড় ছেলের মৃত্যু হয়। তাদের শেষকৃত্যে উপস্থিত হওয়ারও সুযোগ পাননি তিনি। ১৯৮২ সালে পোলসমুর কারাগারে নেয়ার আগে রোবেন দ্বীপে বন্দীজীবন কাটাতে হয় যৌবনের ১৮টি বছর। ম্যান্ডেলা ও এএনসির জ্যেষ্ঠ যখন অন্তরীণ, তখন সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণরা। স্কুলশিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দমন করতে সে সময় কয়েক শ’ তরুণকে হত্যা করে শাসকগোষ্ঠী। আহত হন কয়েক হাজার তরুণ।
১৯৮০ সালে ট্যাম্বোর নেতৃত্বাধীন এএনসি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার শুরু করে। এক পর্যায়ে ম্যান্ডেলার মুক্তি।
তাদের প্রথম ও প্রধান দাবি হয়ে ওঠে ‘আমি একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের স্বপ্ন লালন করি, যেখানে সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সবাই সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করবে। এটাই আমার আদর্শ। আমি এটাই অর্জন করতে চাই। এর জন্য প্রয়োজন হলে আমি মরতেও প্রস্তুত।’ এর পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ জোরালো হয়ে উঠলে ১৯৯০ সালে এএনসির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন দক্ষিণ আফ্রিকার তখনকার প্রেসিডেন্ট এফডব্লিউ ডি ক্লার্ক। কারাগার থেকে মুক্ত হন ম্যান্ডেলা। শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকার বহুদলীয় গণতন্ত্রের আলোচনা।

বর্ণবাদের অবসানের পর ১৯৯৪ সালের ১০ মে নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন নেলসন ম্যান্ডেলা। এর মাত্র এক দশক আগেও সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গশাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল এক অকল্পনীয় ঘটনা।
এ পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও তিনি ভূমিকা রাখেন।

১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে ডি ক্লার্কের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান ম্যান্ডেলা। এর পাঁচ মাস পর দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।

দীর্ঘদিন থেকে ফুসফুস সংক্রমণে ভুগছিলেন তিনি। গত দুই বছরে বেশ কয়েকবার হাসপাতালে যেতে হয় ম্যান্ডেলাকে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে ভর্তির পর প্রেসিডেন্ট দফতর থেকে জানানো হয়, আগে ফুসফুস সংক্রমণ হয়েছিল তাঁর।আশির দশকে রোবেন দ্বীপে বন্দী থাকার সময় যক্ষায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ম্যান্ডেলা। ২০১২ সালের শুরুর দিকে ম্যান্ডেলা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে জানানো হয়, পাকস্থলীর সমস্যায় ভুগছেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফুসফুস সংক্রমণে বার বার চিকিৎসা নিতে হয় তাঁকে।

বাংলাদেশেরও পরম বন্ধু ছিলেন এই সাম্যবাদী নেতা। আমরা যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে আমাদের স্বাধীনতার লাল সূর্যটাকে ছিনিয়ে এনেছিলাম তেমনি ম্যান্ডেলার তাঁর হাত ধরেই স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল দক্ষিণ-আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠরা। শ্বেতাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় ম্যান্ডেলার। ২৭ বছর বন্দিত্বের পর ১৯৯০ সালে মুক্ত হন তিনি। এরপর ১৯৯৪ সালে জনগণের ভোটে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ১৯৯৭ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশেও এসেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা।

তাঁর এক ছেলে মারা গিয়েছিলেন এইডসে। এ ঘটনার পর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় এইডস প্রতিরোধ এবং এর চিকিৎসা নিয়ে সোচ্চার হন। বাকি জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং এইডস নিরাময়ের লক্ষ্যে প্রচারণায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে বৈরী প্রতিপক্ষের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার মতো উদার একটি মন ছিল তাঁর। চরিত্রের নানাবিদ সুগুণাবলীর কারণেই নেলসন ম্যান্ডেলা হয়ে উঠেছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী নেতা ও বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রবাদপুরুষ নেলসন ম্যান্ডেলা আর ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে সারা বিশ্ব আজ শোকাভিভূত বাংলাদেশে সরকার তার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে। এই মহান নেতার মৃত্যুতে বিশ্ববাসীর সাথে বাংলাদেশের ষোলকোটি মানুষও শোকাভিভূত। শুধু শোকাভিভূত বললে হয়তো কম বলা হবে আর কি বললে সব কিছু ঘুছিয়ে বলা হেবে সে ভাষাও যেন আমরা আজ ভুলে গেছি। যারা ফেইসবুক চর্চা করেন তারা কিছুটা আন্দাজ করতে পারবে এদেশের মানুষ এই কিংবদন্তি মহানায়কের মহাপ্রয়ানে একটি দুটি নয় হাজার হাজার স্টেটাস লিখে ছবি আপলোড করে শোক প্রকাশ করেছে।

জন্মিলে মরতে হবে জানি। শুধু মানুষ কেন প্রতিটি জীবকেই মৃত্যুর হিমশীতল স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর চিরন্তন সত্যকে মেনেই ম্যান্ডেলাকেও চলে যেতে হয়েছে এই মায়াময় জগতসংসার ছেড়ে । সবশেষে এ প্রার্থনাই করি তাঁর আত্মা যেন পরম শান্তিতে থাকে।

১৪১জন ১৪১জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য