এক জীবনের গল্প

লেখিকা সুরাইয়া নার্গিস।

রণি বিছানা ছেড়ে ওঠে বসল। তখনও পুরোপুরি সকাল হয়নি। পূর্ব আকাশে সূর্যটা উঁকি মারার চেষ্টা করছে। দু’ একটা পাখি কিচির মিচির শব্দও শোনা যাচ্ছে। বালিশের নিচ থেকে বাটন মোবাইলটা বের করে রণি চোখ বুলিয়ে দেখল মাত্র সাড়ে ছয়টা বাজে।

এতো সকাল সকাল রণি খুব কমেই ঘুম থেকে ওঠে। না। আজ সে নিজেই উঠেনি তার একমাত্র ছোটবোন রাণী তাকে ডেকে তুলছে। অন্যদিন কেউ তার ঘুম ভাঙ্গালে রণি মেজাজ দেখায় কিন্তু আজ কিছুই বলল না।

ভাইয়া! আজ কলেজ যাবে না? সিয়াম ভাইয়া এসে তোমার জন্য বসে আছে বলল রাণী

ওহ্ তাইতো আজ কলেজের রেজাল্ট দিবে,

অনেকদিন কলেজে যাওয়া হয় না, রাস্তাটা ভুলে গেছি মনে হচ্ছে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে সেই কবে, তারপর থেকে আর কলেজে যাওয়া হয়নি। ক্লাস করার জন্য সপ্তাহে ৪/৫ দিন কলেজে যেতে হতো। তাও সকাল ৯টা ২০ মিনিট থেকে বিকাল তিনটা। গতকাল সন্ধ্যায় টিভিতে নিউজ দেখালো আজ ওদের রেজাল্ট দিবে। এই রেজাল্ট প্রমান করবে দু’ বছরে কে কতটুকু পড়াশোনা করছে। ভবিষ্যৎ জীবনের গতি-প্রকৃতিও নির্ভর করবে এর উপর।

বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে সিয়ামেই তার বেশী ক্লোজ।মানুষের হয়ত অনেক বন্ধু-বান্ধব থাকে।

তাদের মধ্যেও একজন থাকে খুব ক্লোজ।যার কাছে ভালোবাসা বা অধিকার থাকে বেশি এবং মনের সব কথা শেয়ার করা যায়। বিশ্বাস করা যায় নির্ভয়ে।ভালোবাসার মাপকাঠি দিয়ে সবাইকে সমান ভাবে বিচার করা যায় না হয়ত।মনের কথাগুলোও নির্দ্বিধায় বলার মতো একজন মানুষ জীবনে খুব প্রয়োজন।এটাই মানব হৃদয়ের বৈশিষ্ট।হ্যাঁ তেমনি এক বন্ধু সিয়াম। সিয়ামের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই আমার খুব ভাব। সারাদিন গলাগলি করে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ানো, পাখির বাসা খোঁজা, ঘাসফড়িং এর পিছনে ছুটতে ছুটতে কেটেছে অর্ধেকটা বাল্যকাল। কাগজের নৌকা ভাসিয়েছি নদীর জলে। বৃষ্টির দিনে সারা পাড়ার পুকুরে গোসল করা, জীবনে হয়ত কিছুই বাদ যায়নি,হার না মারা ছুটে চলা জীবনের প্রতি মহূর্তে সিয়ামকে পাশে পেয়েছি সব সময়।

সিয়ামের বাবা-মা খুব স্নেহ করেন রণিকে নিজের ছেলের মতোই।সিয়াম খুব ধনী পরিবারের ছেলে কিন্তু এতো বড়লোকের ছেলে হলে কি হবে?কোন অহংকার নেই। সিয়ামের বাবা-মা যেন মাটির মানুষ।সিয়ামের মা ভালো কোন রান্না করলে তা রণিকে রেখে কোনদিন খায় না।রণি দরিদ্র বাবার ছেলে।ভালো মন্দ যা রান্না হয় মা দু’ ছেলে মেয়ের প্লেটে তুলে দেয়। বাবা পোস্ট অফিসের পিয়ন, রণি আর রাণী দুই ভাই বোন।রণি খুব ভালো ছেলে,পড়াশোনায় ভালো। সিয়ামের সাথে একসাথে পড়াশোনা করে।আর চার পাঁচটা ছেলের মতো সারাদিন বইয়ে ডুবে থাকেনা ঠিকই কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায় সিয়াম আর রণি ওরাই সবার উপরে ভালো রেজাল্ট করে। শিক্ষকগণও খুব স্নেহ করেন ওদেরকে।

‘কিরে তাড়াতাড়ি কর। ‘বলতে বলতে সিয়াম ঢুকল রণির ঘরে। ঘর বলতে ছোট্ট একটা কুটির। উপরে শন পাতার ছাউনি।মাকড়সা বাসা বেঁধেছে।ঘরে একটা কাঠের টেবিল।বয়সের ভারে আসল রংটা ওঠে গেছে অনেক আগে। চেয়ারটা ১০/১২ বছরের পুরনো একটা হাতল অনেক আগেই ভেঙ্গে গেছে।এখানে বসেই রণি পড়াশোনা করে।ঘরে বিদ্যুৎ নেই তাই হারিকেন দিয়েই রাতে পড়াশোনা করে রণি।বাবার উপর পুরো সংসার চালাতে কষ্ট হয় তবু সন্তানদের পড়াশোনা করাবেন।

রাতে ভালো ঘুম হয়নি রণির।সারারাত উত্তেজনায় কেটেছে, শুধু ভেবেছে তার পরীক্ষার রেজাল্টের কথা। পরীক্ষা ভালেই দিয়েছে সে। তবুও ভয় হয় অনেকেই বলে পরীক্ষা ভালো দিয়েও ভালো রেজাল্ট হয় না। মা বাবা কত কষ্ট করে সংসার চালায়, রনিও পড়াশোনার খরচ সে নিজেই চালায়।কোন দুঃসংবাদ হলে বাবা-মা খুব কষ্ট পাবে। আমি পাশ করে ভালো কলেজে পড়বো। চাকরি করে সংসারের হাল ধরব, আমাদের সব অভাব দূর হবে।

সেবারে এস.এস.সি A+ পেয়ে পাশ করেছিলো রণি বাবার খুশি মুখটা এখনো চোখে ভাসে। বাবা যাকে সামনে পেত তাকেই বলতো আমার রেজাল্টের কথা।

মা অল্প শিক্ষিত মানুষ। পড়াশোনার মর্ম কম বুঝে, তবুও তিনি চান রণি ভালো রেজাল্ট করুক, নামকরা কলেজে পড়ুক।

রণি বর্তমানে কলেজের ফাইনাল দিলো এবারও ভালো ফলাফল আসবে আশা করছে। ফলাফল খারাপ হবে না জানি, তবে আরেকটা A+ পেলে মন্দ হয় না, গ্রামে বাবার মুখটা আলো উজ্জ্বল হবে।

আরে বেডা চিন্তা করিস না তো, তুই ভালো রেজাল্ট করবি তবে আমারটা আল্লাহ জানে। পরীক্ষা খুব বেশি ভালো হয়নি বলেই পাশে বসল সিয়াম।

রণির বাবা সহজ, সরল মানুষ সেই সুযোগে চাচারা জমি ভোগ দখল করে বসে আছে। তাই রনির ভালো ফলাফল চাচারা ভালো চোখে দেখে না।

এর মধ্যে রণি এইচ.এস.সি A+ পেয়ে পাশ করে, আর সিয়াম কিছু নাম্বারের জন্য প্লাস পায়নি তবে দু’জনের পরিবারই খুশি।

রণির বন্ধুরা মিষ্টি খাওয়ানোর বায়না ধরে সিয়াম প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বলে আরে রণি, বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম।

তোর বাবা আমাকে ৫০০ টাকা দিয়েছিলো তোকে দিতে এই নে, সবাইকে মিষ্টি খাওয়াবি।

রণি জানে সকালে বাড়ি থেকে না খেয়ে এসেছে। ঘরে খাবার ছিলো না, সেখানে বাবা ৫০০ টাকা কই পাবে? নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, সেখানে ৫০০ টাকা বিলাসিতার মতো তাই রণি ছলছল চোখে সিয়ামকে দেখে।

সবাই চল। উপস্থিত ৪/৫ জন ছেলেকে নিয়ে সিয়াম মিষ্টি খাবে বলে রণিকে টেনে নিয়ে যায় রাস্তার পাশের বড় মিষ্টির দোকানে। রণির মা সবাইকে বলে ছেলে পাশ করছে, গ্রামের মানুষ বলে বাবার কষ্ট সফল হলো। ছেলে রণি ভালো রেজাল্ট করেছে।

সুখবর শুনে আনন্দে রণির ম-বাবা যেন কেঁদে ফেললন। সুখেও অনেক সময় মানুষ কাঁদে।

সিয়াম স্বপ্ন ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করবে কিন্তু ওখানে তো অনেক খরচ, সবমিলিয়ে পারবে তো?

আরে চিন্তা করো না, তোমার রণির রেজাল্ট ভালো, সমস্যা হবে না চান্স পাবে বলে সিয়ামের বাবা সান্তনা দেয়।

বড় সাহেব আপনার কথা শুনে মনে শান্তি পাই কিন্তু পড়াশোনার এতো খরচ কিভাবে দিবো? তুমি জানো না পাশের গ্রামের মালেকের ছেলে শহরে থেকে পাড়াশোনা করে কিছু পাইভেট পড়িয়ে পড়াশোনার খরচ যোগায়। শুনছি গ্রামে মা বাপকেও টাকা পাঠায় ওরাও ভালো ভাবেই চলে। তোমার রণিও ভালো ছাত্র সেও নিজের খরচ নিজে বহন করতে পারবে। এত চিন্তা করো না। আমার সিয়াম তো আছে বিপদে আপদে দু’জন একসাথে থাকবে।

এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল আজ সকালে। ভিজিয়ে দিয়ে গেছে আধা শুকনো আঙিনাটা। হালকা  বাতাসে গাছের পাতা থেকে টুপটুপ ঝরে পড়ছে ফোঁটাফোঁটা বৃষ্টি।রণি বারান্দায় বসে রাণীকে পড়াচ্ছে। রাণীরর স্কুলের বান্ধবীরা সবাই স্কুলের স্যার এর কাছে প্রাইভেট করে, অনেকেই কোচিং করে। কিন্তু রাণীদের সংসারে যা অবস্থা এতে করে ঠিকমতো স্কুলের মাসিক বেতন দিতেই হিমসিম খেতে হয় প্রাইভেট পড়বে কি ভাবে!

রহিম মিয়া বাড়ি আছো বলেই আলম স্যার বাড়িতে ঢুকলেন। না স্যার আব্বা একটু মাঠে গেছে,আপনি বসেন বলে চেয়ারটা টেনে দিলো রণি। আলম স্যারের একমাত্র মেয়ে শীলা দেখতে ফর্সা,লম্বা তবে লিকলিকে চিকনা মন্দ না।রণিকে পছন্দ করে কিন্তু রণি ওদিকে নজর দেয়না সে গরিব, শীলা মাস্টারের মেয়ে ভালো পরিবার।

আলম স্যার রণির ভালো ফলাফলে খুব খুশি তাই শুভেচ্ছা জানাতে আসছে, রাণী পড়াশোনায় ভালো ছাত্রী এটা আলম স্যার বলে গেল।

শাঁ শাঁ করে ছুটে চলছে ট্রেন। জানালার পাশে বসেছিলো রণি। বাইরের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে রণি। চারদিক সবুজ মাঠ আর গাছ গুলো যেন মেতে উঠেছে প্রতিযোগিতার দৌড়ে। হালকা বাতাসে এলোমেলো করে দিচ্ছে চুলগুলো। সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিম আকাশে।একটু পরেই হারিয়ে যাবে।

রণি মনে মনে মায়ের কান্না,ছোট বোনের ভাইয়া ডাকটা সবাইকে মিস করছিলো খুব।

মনে পড়ে শীলা নামের সেই পাগলী মেয়েটার কথা। সত্যিই পাগলী ও। চলে আসার সময় কতগুলো ফুল নিয়ে এসে বিদায় বেলায় বলে ছিলো “আমার কথা মনে থাকবে তো?

বলতে বলতে চোখ দুটো ছলছল করছিলো মেয়েটির।তারপর আর কথা বলেনি চলে গেল।

রণি তো শীলা কে বন্ধু ভাবে, সম্পা,কান্তা,সেজুতি, মিতুর মতো এর বাইরে কিছু না।

দেখতে দেখতে নীল আকাশটা হালকা মেঘে ঢেকে গেল হয়ত আবার বৃষ্টি নামবে।

কিছুই ভালো লাগছে না রণির। ইচ্ছে হচ্ছে ফিরে যাই গ্রামে।  বাবা- মায়ের কাছে’।

সিয়াম বললো ‘আমারও ভালো লাগছে না। তবুও তো যেতে হবে। জীবনের প্রয়োজনে অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হবে আমাদের। আবারও বাইরে তাকাল রণি। দু’এক ফোঁটা বৃষ্টি এসে পড়ল ওর মুখে।

ঢাকায় কোন আত্মীয়স্বজন নেই। তবে পাশের গ্রামের কয়েকটা ছেলে ঢাকা থাকে গার্মেসে চাকরি করে। এক সময় রণির সাথেই পড়াশোনা করতো বেশি দূর আগাতে পারে নাই সব ক্লাসেই ফেল করতো।

বাম পকেট থেকে একটা মানি ব্যাগ বের করল রণি।রাজধানীতে চলাচল করতে হলে একটা মানিব্যাগ না থাকলে কি চলে? ঠিকানাটা ঠিকমতো আছে কিনা দেখে নিল একবার। ৭৮/২,ভি,পি,কে, সি ঘোষ রোড,(দশম তলা)….

রণি,সিয়াম দুজনেই ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ায় ঢাকার ছেলেমেয়েরা কত আরামে ঘুমায়, আধুনিক জীবনযাপন করে,কত সুখ শান্তিতে পড়াশোনা করে।রণির শরীরে জ্বর মাকে খুব মিস করছে। এই সময় মা কপালে জলপট্রি দিয়ে রাখতেন। ঔষধ না খেলেও জ্বর অনেকটা কমে যেত তারপর গ্রাম্য ফার্মেসির ঔষধ খেত।

এখানে কেউ নেই একা একাই থাকতে হয়,সিয়াম অন্য কলেজে পড়ে সপ্তাহে একদিন দেখা হয়,কথা হয়। চলছে দিন ভালোই।

দেখতে দেখতে তিন মাস কেটে গেল। কয়দিন আগেই ক্লাস শুরু হয়েছে রনির। নিয়মিত ক্লাস। সপ্তাহে চার দিন।

কলাভবনের চার তলায় ক্লাস হয় রণির। প্রথম কয়েক দিন ক্লাস খোঁজে পেতে সমস্যা হতো রণির। এখন আস্তে আস্তে সব চেনা হয়ে গেছে।

ডিপার্টমেন্টের নোটিশ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুটিনাটি পুরনো নোটিশগুলোর উপর চোখ বুলাচ্ছে রণি।

কোন কাজ না থাকলে মানুষ যা করে রণিও তাই করছে। হঠাৎ আড়াল থেকে কার যেন খট্ খট্ পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল রণি। একটা মেয়ে হনহনিয়ে চলে গেল তাকে পাশ কেটে। না তাকানোর মত তাকাল তার দিকে। পাশের একটা রুমে ঢুকে আবার বেরিয়ে গেল হয়ত পরিচিত কাউকে খোঁজতে আসছিলো।

মেয়েটা ওর সঙ্গে পড়ে প্রথম দিন ক্লাসে দেখেছিলো। মাঝে মাঝে গাড়ী করে আসে,কারো সাথেই তেমন কথা বলে না ক্লাসে স্যার,ম্যাডামের প্রশ্নের জবাব দেয় জটপট।

সবাই ভাবে অহংকারী তবে আমার তা মনে হয় না, শান্ত ভাবে ক্লাসে বসে থাকে হয়ত এটা তার স্বভাব চুপচাপ থাকা।

রণি আর নীলা।  বসে আছে সেই টেবিলে যেখানে চার বছর আগে প্রথম কথা হয়েছিলো ওদের। সেই নীলা আর আজকের নীলা যে দু ‘মেরুর দু’জন। কি ভুল ধারনাই না পুষেছিলো সে নীলার উপর।

রণিকে নীলাই বন্ধু হতে বলে তারপর আস্তে আস্তে নীলাই সম্পর্কটা প্রেমে পরিণত করে। ক্লাসের পরেই দুজনে বের হয় গল্প করে,হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে টিএসসিটিত এখানেই বসে থাকে আড্ডা দেয়।

রণি ভালো কবিতা আবৃতি করতে পারে নীলা মনযোগ দিয়ে শুনে।

রণির কণ্ঠটা খুব ভালো লাগে নীলার।

রণি ভাবে যে নীলা চোখে কাজল,সানগ্লাস, গাড়ী ছাড়া কলেজ আসতো না এখন কোথায় সেই সাজসজ্জা ওর?একদম সাধারণ পোশাক পড়ে নীলা।

হয়ত রণির জীবন যাত্রার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেছে।

রণি আর নীলার প্রেম এখন কলেজের সবাই জানে,সিয়াম তো রণিকে খেপায় এত সুন্দরী মেয়ে পেল কিভাবে বলে হাসে।

রণিও ভাবে যে নীলা একদিন স্বপ্নে ছিলো সে এখন ভালোবাসার মানুষ কিন্তু এত সুখ কপালে সইবে তো! নাকি কোন ঝড়ে দুজনকে আলাদা করে দিবে?

নীলা মাঝে মাঝেই বলে চল রণি আমরা বিয়ে করে ফেলি’।

বিয়ে! অবাক হয় রণি। যেন শব্দটা জীবনে প্রথম শুনছে সে।

তারপর হেসে বলে নীলা আমাদের বিয়ে তো হয়ে গেছে। নীলা অবাক হয়, কখন কিভাবে?রণি হেসে বলে শোন নীলা ‘বিয়ে হচ্ছে দুটি মনের মিলন,দুটি সত্তা,দুটি অস্তিত্ব,দুটি আত্মা এক হয়ে যাওয়াই কি প্রকৃত বিয়ে নয়? শুধু দৈহিকমিলনের অধিকার পাওয়াটাকেই কি বিয়ে বলি?

কোন কথা বলেনি নীলা। মুখের দিকে চেয়ে থাকে দু’জন দু’জনের।

রণি নীলার কাছে তার বাবা, মা,বোনের গল্প করে কতটা ভালোবাসে তাকে,নীলা বলে ছোটবেলা আমি মাকে হারিয়েছি তোমার মায়ের কাছে একদিন আমাকে নিয়ে যাবে?

রণি বলে যাবো মা তোমাকে পেয়ে খুব খুশি হবে। সবটা জানলে আনন্দে তোমাকে বুকে টেনে নিবে।আদর করবে,নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসবে, আচ্ছা পরীক্ষার পর নিয়ে যাবো চিন্তা করো না।

নীলা অপেক্ষায় থাকে এদিকে বাংলা একাডেমিতে বইমেলা শুরু হয়েছে রণি নীলাকে একটা বই কিনে উপহার দেয়,আর বলে পড়া শেষে জানিও গল্পটা কেমন লাগলো।

এর মধ্যে রণির কাছে ফোন আসে তার বাবা মারা গেছে খবরটা শুনে রণি গ্রামে চলে যায় এদিনে নীলা রণির খোঁজে অস্তির হয়ে উঠে।

রণিকে ফোনেও পায় না নীলার বুক কেঁপে ওঠে নানা টেনশনে,তবে কি রণি তাকে ঠকিয়েছে আর ঢাকা ফিরবে না কেঁদে ওঠে নীলা।

সামনে ফাইনাল এই সময় রণি নেই। কয়েকদিন পর রণিকে কলেজে দেখা যায় বাবা মারা গেছে আজ দেড় মাস চলছে সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি। রণির মাঝ রাতে জ্বর আসে কয়েক মাস ধরেই চলছে। হালকা কাশিও আছে।

সারা গা ঝিম ঝিম করে। মাঝে মাঝে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে মন চায়। কোনকিছুই সুস্থির ভাবে চিন্তা করতে পারেনা এখন।আজ রণির মেডিকেল রিপোর্ট দেবার কথা।

ধীর পায়ে হেঁটে যায় পি.জি. হাসপাতালের দিকে যায়। সিরিয়ালে থেকে অপেক্ষার পর অনেকগুলো রিপোর্টের মাঝে নিজেরটা খোঁজে পায় রণি। ‘একি! ভাবতে পারে না রণি।একি দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত সে? যেন জ্ঞান হারিয়ে ফেলে হঠাৎ। এ ব্যাধি থেকে কিভাবে মুক্তি পাবে সে? কোন উপায় নেই। একমাত্র মৃত্যুই তাকে দিতে পারে মুক্তি।আমি মরে গেলে মা,ছোট বোন রাণীর কি হবে?

আর আমার ভালোবাসা নীলা ওরে কার কাছে রেখে যাবো?

পরক্ষণেই ভাবে নীলাকে সবটা জানাবে। নীলার বাবার অনেক টাকা বিদেশ থেকে টাকা খরচ করে সুস্থ করে আনবে কিন্তু রণি কি পারবে এত টাকার ঋণ শোধ করতে?

ভাবতে ভাবতে রণি রিক্সায় ওঠে নীলা ওর জন্য অপেক্ষা করতেছে। না, নীলাকে আমার অসুস্থতার কথা জানাবো না ওর সুন্দর ভবিষ্যৎ সামনে অপেক্ষা করছে সে বিয়ে করবে,তার সুখের সংসার হবে।

আমার জীবনের সাথে নীলাকে আর জড়াবো না এর মধ্যে রিক্সা এসে টিএসসির সামনে থামে। নীলা বার বার প্রশ্ন করে রিপোর্ট কি আসছে? রনি আড়ালে চোখ মুছে বলে কোন সমস্যা নেই ডাক্তার ঔষধ দিয়েছে ঠিকমত খেলেই সেরে যাবে।

নীলা সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচা গেল তোমার কিছু হলে তো আমি মরেই যেতাম।

রণি হেসে বলে পাগলি ভয় নেই আমি ভালো আছি বলে বুকে জড়িয়ে ধরে আর মনে মনে বলে নীলা এটাই হয়ত আমাদের শেষ দেখা।

 

আজ চার মাস হয়ে গেল রণির কোন খোঁজ নেই। পাশ করছে রেজাল্ট নিতেও আসেনি, ওই যে পরীক্ষা শেষে গেল।

কাঁদতে কাঁদতে নীলার চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছে তবু তার জেদ রণির গ্রামে যাবে দেখতে হয়ত শীলার নামের সেই মেয়েটাকে নিয়ে সুখের সংসার করতেছে।

আমি শুধু ওর সুখটা দেখেই চলে আসবো বেইমান, প্রতারক,স্বার্থপর আমাকে কত স্বপ্ন দেখিয়ে হারিয়ে গেল ও কোনদিন সুখি হবে না।

মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে যেখানে রণির মতো ছেলেও আমাকে ঠকিয়েছে। না,আর না এই কষ্টের চেয়ে রণির সুখের সংসারটা একবার দেখবে নীলা।

বাবাকে সবটা জানায় একবার গ্রামে যেতে চায় মা মরা মেয়ের আবদার পূরন করতে বাবা নীলাকে রণির গ্রামের বাড়িতে আসার অনুমতি দেয়।

ট্রেন এসে থামলো কদমতলী স্টেশনে। প্রচন্ড ভিড় চারদিকে। নীলা সামনের দিকে হেঁটে যায় একজন বৃদ্ধ লোককে প্রশ্ন করে ডাঙ্গিরচর গ্রামটা কতদূর?লোকটা সামনে রিক্সাটা দেখিয়ে বলে সামনেই। নীলা ভাবে রিক্সা নিয়ে রণির বাড়িতে গেলে রণি হয়ত বউ নিয়ে রং তামাশা ব্যস্ত দেখতে পারবে।

নীলা বাড়িতে ঢুকতেই একজন বিধবা নারী বের হয়ে আসে।তুমি কে মা? আমি রণির কাছে এসেছি।

এবার বৃদ্ধার চোখে জল। কেঁদে ফেললেন তিনি।

আমি রণির মা।

রণি তো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে অনেক আগেই মা, এতদিন পর কেন এলে?

নীলা একি শুনল! রণি বেঁচে নেই! এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে! এই হলো রণির মা যাকে দেখার জন্য নীলা পাগল ছিলো। এবার নীলা কেঁদে ফেলল আর চোখের পানি আটকিয়ে রাখতে পারল না।

রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছল নীলা।ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল নীলা। তারপর কবরের পাশে বসে পড়ল। তুমি সত্যিই একটা প্রতারক,প্রতারক,প্রতারক। মনে মনে বললো নীলা।,এভাবে আমাকে ছেড়ে চলে গেলে? সারাটা কবর ঢেকে আছে পলাশ ফুলে।

মা নীলাকে রণির ঘরে নিয়ে গেল হাতে একটা সোনার আংটি দিল। এটা তো আমি রনিকে দিয়েছিলাম।

হ্যাঁ, মারা যাবার আগে রণি আংটিটা দেখে পাগলের মতো হয়ে যেত,কি জানি ভাবত।

রাণী সামনে আসল।আপনার নাম নীলা? ভাইয়া এই চিঠিটা দিয়ে বলছিলো যদি আপনি কখনো তার খোঁজে এ বাড়িতে আসেন তাহলে যেন এই চিঠিটা দেই।

 

শাঁ শাঁ করে ছুটে চলছে ট্রেন। এক্ষুনি ডুবে যাবে সূর্যটা।জানলার পাশে বসে নীলা ব্যাগ খুলে চিঠিটা বের করে অঝোরে কাঁদে ফেলে নীলা।

 

প্রিয় নীলা,

আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা কখনো টেনে আনে আমাদের বাড়ীতে,তবে তুমি এ চিঠি পাবে।তখন আমি তোমার থেকে অনেক অনেক দূরে থাকবো।

বেইমান, প্রতারক ভাবছো তো? সত্যি বলতে আমার জীবনের সাথে তোমাকে জড়াতে চাইনি তাই পালিয়ে আসছি। জানি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, কাঁদিয়েছি তারজন্য আমাকে

ক্ষমা করে দিও।

অভিশাপ দিও না, দোয়া করো। এ জনমে তোমাকে পাইনি তাতে কি?পর জনমে যেখানেই থাকো না কেন তোমাকে ঠিকই খোঁজে নিব আমি।

ইতি,তোমার ভালোবাসা রণি

আরো কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল নীলার চোখ থেকে। বাইরের দিকে তাকাল নীলা। আকাশের সূর্যটা পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে।

৮৫জন ৭৫জন
0 Shares

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ