এক চিলতে স্বপ্ন

রেজওয়ান ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, রবিবার, ১০:১৮:৫৫পূর্বাহ্ন গল্প ৩ মন্তব্য


মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট ছেলে, লাজুক, বিনয়ী নাম মুগ্ধ। সদ্য ডাক্তারি পাস করে সবে
চাকুরীতে জয়েন্ট করেছে। নাম মাত্র বেতন কিন্তু সরকারি চাকুরী বলে লেগে থাকা, পোষ্টিং মুন্সিগঞ্জ। থাকে হসপিটাল কোয়ার্টারে, সাথে এক কলিগ সেলিম ও কেয়ারটেকার রমজান মিয়া।
ঠিক তখন থেকেই পরিবারে কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে ছেলের বিয়ে নিয়ে। গোপনে গোপনে পাত্রী ও দেখা হচ্ছে, এদিকে মুগ্ধ কিছুই আঁচ করতে পারছে না কি কথা হচ্ছে ওকে নিয়ে। হঠাৎ একদিন ছুটির দিনে সেলিম তার এক দুর সম্পর্কের আত্মীয়র বাসায় ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে নিয়ে যেতে চায় মুগ্ধকে, উদ্দেশ্য পাত্রী দেখানো, মুগ্ধ বুজতে পারে না। পরদিন শুক্রবার বলে রাজি হয়ে যায় কোনো কিছু না ভেবেই। আত্মীয়র বাড়ি বিক্রমপুর, পরদিন হাতের কাজ সেরে যেতে যেতে লাঞ্চ আওয়ার হয়ে যাওয়ায় সৌজন্য সাক্ষাৎ এর পর ফ্রেশ হয়ে সোজা খাবারের টেবিলে। ওখানেই পরিচয় হয় বাড়ির সব ছেলেদের সাথে। খাওয়া শেষে একটু বিশ্রাম নিতেই বাড়ির মুরুব্বী হাজির। কথা হচ্ছে,আড্ডা হচ্ছে তিন জনে মিলে কখন যে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা খেয়াল ই করেনি কেউ, খেয়াল হলো তখনই যখন দরজায় কড়া নরলো, সবাই এক সাথে তাকিয়ে দেখলো গরম চা-নাস্তা নিয়ে এক রমণী দাঁড়িয়ে, কোনো কিছু না ভেবে মুগ্ধ দাঁড়িয়ে যায় সাহায্যের জন্য। এগিয়ে গিয়ে বলে আমি মুগ্ধ কোনো কিছু না ভেবেই রমণী বলে ফেলে আমিও। পরক্ষণেই বলে উঠে উমম আমি রূপা। পিন পতন নিরবতা থাকে কিছুক্ষণ, মুরুব্বীর কথায় নিরবতা ভাঙ্গে বলে উঠে আমার বড় মেয়ে এইতো কিছুদিন হলো উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে।
চা নাস্তা করে রাতে কোয়ার্টারে ফেরে মুগ্ধ ও সেলিম। হাল্কা কথা বলে যে যার রুমে চলে যায়। খুধা ভাব নেই বলে মুগ্ধর রাতে খাওয়া হয় না কিছু। আনমনে রুটিন করতে থাকে কালকে সারাদিন কি কি করতে হবে। নামাজ আর রোগী দেখার রুটিন সাথে ঘুমানোর চেষ্টা কিন্ত একি কোনো ভাবেই ঘুম আসছেনা মুগ্ধর !! কিন্তু কেন ?? লজিক্যালি ভাবতে থাকে, আর অস্থিরতা বাড়তে থাকে কারণ আনমনে সে যে রূপার কথা চিন্তা করছে। মিটিমিটি হাসে আর ভাবে সেকি প্রেমে পরেছে ? নাহ এ কি করে হয় প্রথম দেখাতেই প্রেম ? এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরে খেয়াল নেই ফজরের আজানে ঘুম ভাঙ্গে। ঘুম থেকে উঠে অযু করে নামাজে যায়। নামাজের পর জগিং বা বাগানে কাজ করা মুগ্ধর দৈনন্দিন কাজ। কাজের ফাকে রূপাকে নিয়ে ভাবতে থাকে আর আনমনে বিড়বিড় করে ফরজ কাজে দেরি করতে নেই। এর মধ্যে কখন যে সেলিম পাসে এসে দারিয়েছে খেয়াল নেই। সেলিমের ডাকে মুগ্ধ বাস্তবে ফিয়ে আসে। তখনই সেলিম জিজ্ঞাসা করে কোন ফরজ কাজের কথা বলছিলেন মুগ্ধ সাহেব ?? বলেই দু’জনে উচ্চস্বরে হেসে উঠে। এমন সময় রমজান মিয়া ডাকে আপনেরা খাইতে আহেন নাস্তা রেডি। মুগ্ধ রুটিন করে দিয়েছে সকাল ৭:৩০ এর মধ্যে নাস্তা আর সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত অফিস। সবাই মেনে চলে মুগ্ধর রুটিন। ঠিক মতই চলতে সবকিছু। সেই সাথে অনেক কথা,স্বপ্ন ও ভালবাসা জমতে থাকে রূপার জন্য। ভাবতে থাকে কবে দেখা হবে!!
এক দিন কোনো এক কাজে বিক্রমপুর যাওয়া পথে দেখা হয় রূপার সাথে। সেদিন কথা চলে অনেক্ষণ। মাঝে মাঝে ই দেখা করার জন্য উছিলা খুজতো মুগ্ধ, চুপি চুপি দেখাও করতো দুজন। অনেক চিঠির আদান প্রদান হতো। সেলিমই সাহায্য করতো, পরে নিজ উদ্যোগেই রূপা-মুগ্ধর পরিবারের সাথে কথা বলে সেলিম। সবাই খুসি মনে রাজি হয়ে যায়। রূপার একটাই দাবি পড়াশুনা চালিয়ে যেতে চায় সে,মুগ্ধও আপত্তি করেনি অগত্যা বিয়ে। শুরু হয় মুগ্ধ-রূপার নতুন জীবন, ছোট্ট সংসার রূপাও যে প্রাপ্ত বয়স্ক তা কিন্তু নয়। ১৬ বছর বয়সেই ধরতে হয় নতুন পরিবারের হাল। দেখতে দেখতে ভালবাসা, খুনশোটি আর আবেগী বিবাদেই কেটে যায় ২টি বছর। এবার পরিবার বড় করার পালা। রূপা অন্তঃস্বত্ত্বা হবার পর পরিবারের অনেকের কাছ থেকে অনেক ধরনের কুসনষ্কার শুনতে পায়, যেমন এমন অবস্থায় হাস-মুরগী জবাই করা যাবে না, বাহিরে যাওয়া যাবে না। এমনকি খাবার মেনুতে ও আছে অনেক বাছ-বিচার। কিন্তু মুগ্ধ-রূপা এইগুলা মানে না, যে কুসংষ্কারে বারণ সেগুলোই বেশি করা হতো। বিয়ের ৩ বছরের মাথায় পরিবারের কোল জুড়ে তাদের প্রথম সন্তান ছেলে আসে, নাম আগেই ঠিক করেছিলো রূধ্র। আনন্দের বন্যা একই সাথে টেনশনও এখান থেকেই শুরু। ছেলেকে মানুষের মত মানুষ করতে হবে, অনেক বড় করতে হবে। মুগ্ধ-রূপাকে এখন সমান তালে কাজ করতে হবে। এই ভেবেই রূপা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকার জন্য আবেদন করে, উচ্চমাধ্যমিকে রেজাল্ট ভাল হওয়ায় চাকুরী টা ও মিলে যায় এক বছরের মাথায়। লক্ষ্য একটাই ছেলেকে মানুষের মত মানুষ করতে হবে। নিযেদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে লেগে পরে সন্তানকে মানুষ করার নিমিত্যে। রূপার চাকুরী হবার পর ৩ মাসের জন্য রূপাকে যেতে হয় ট্রেনিং এ। এক বছরের রুধ্রকে রেখে যায় তার নানা বাড়িতে। আর এদিকে রূপার পোষ্টিং হয় মানিকগঞ্জ। নতুন সরকারি চাকুরী, ট্রান্সফারের আবেদন করতে পারে না সে, থেকে যেতে হয় রূপাকে। জীবনের বাকে তিন জন তিন যায়গায়। রুধ্র নানাবাড়িতেই বড় হতে থাকে নানু,মামা-খালামণির কাছে। মুগ্ধ মুন্সিগঞ্জ আর রূপা মানিকগঞ্জ। জীবনের টনাপরেনে এভাবেই কেটে যায় মুগ্ধ-রূপার ৪ টি বছর…

এবার মুগ্ধ-রূপা ভাবে একসাথে থাকার সময় হয়েছে কারণ রুধ্রকে স্কুলে দিতে হবে। ট্রান্সফার নিয়ে চলে আসে ঢাকার এক মফস্বল শহরে। রূধ্রকে ভর্তি করে দেয়া হয় এক কিন্টার গার্ডেন স্কুলে। ছোট্ট ছেলে বাবা-মা কে ভালমত চিনেই না তারউপর নতুন পরিবেশের সাথে পরিচয়। কোনোকিছু বুঝে উঠতে পারে না রুধ্র, সময় নিতে চায় কিন্তু স্কুলের চাপ, নতুন পরিবেশ বাবা-মা’য়ের কড়া শাসনে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না, অসুস্থ হয়ে পরে রুধ্র, স্কুলের ফলাফল খুব খারাপ হয় সেবার। তাছাড়া আত্মীয়র কথা তো আছেই। মুগ্ধ-রূপার মনে যে কি বয়ে যায় শুধু তারাই যানে। কিন্তু ভেঙ্গে পরলে চলবে না। পরিবার,আত্মীয় বা প্রতিবেশিদের দেখিয়ে দিতে হবে “ আমরা আমার ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি”। স্কুল পরিবর্তন করে দেয় রুধ্রর। রূপা নিয়ে আসে নিজের প্রাইমেরি স্কুলে, আবার নতুন পরিবেশ রুধ্রর জন্য। নার্সারি থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত এই ছোট্ট ছেলের স্কুল পরিবর্তন হয়েছে ছয় বার। সন্তান কে একটু ভাল রাখার জন্য সব সময় দুরে দুরে রেখেছে । অনেক মন খারাপ হয় রুধ্রর, এভাবেই কেটে যায় অনেক বছর । দেখতে দেখতে চলে আসে এস এস সি পরীক্ষা, পাশ করে যায় ভাল মতই কিন্তু মনে একটা দাগ থেকেই যায় রুধ্রর কারণ পনের বছরে সে এস এস সি শেষ করে এগারো টা স্কুল পরিবর্তন করে, অনেক রাগ হয় বাবা-মা’য়ের উপর।
কলেজের উছিলায় এবার প্রথম বারের মত নিজ ইচ্ছায় চলে যায় অনেক দুরে, অন্য এক অজানা শহরে। জীবনের প্রতি মায়া কমে যায় রুধ্রর। মিসতে থাকে এলাকার উঠতি বখাটেদের সাথে। নেশার আড্ডায় জরিয়ে পরে এক সময়। হয়ে উঠে এলাকার দাদা, জড়িয়ে যায় ছাত্র রাজনীতিতে। এভাবেই চলতে থাকে কলেজ লাইফ। দু’বছর কেটে যায় খুব তাড়াতাড়ি, এইচ এস সি চলে আসে, নেহাত ভাল ছাত্র ছিলো বলে কলেজের গন্ডি পেরিয়ে যায় রুধ্র। হঠাৎ একদিন বুঝতে পারে বন্ধু, রাজনিতী, ড্রাগসের নেশায় কিছু নেই। ইচ্ছা শক্তি ই সব, কষ্ট হবে কিন্তু ছাড়তে হবে এগুলো। পরীক্ষার পর চলে আসে বাবা-মা’য়ের কাছে। মন মরা, চুপচাপ থাকে সব সময়। কিচ্ছু ভাল লাগে না তার। এদিকে রূপা তখনও পড়াশুনা শুরু করতে পারেনি, যার স্বপ্ন ছিলো গ্র্যাজুয়েট হওয়া। কিন্তু সন্তানের জন্য শুরু করে নি যদি কম পরে, মুগ্ধর সখের গাড়ি (এক্স করলা-টা) নেয়া হয়নি ছেলের জীবন গড়ার জন্য যদি টাকা কম পরে যায়। ভাল কাপড় কেনা হয়না, কারণ ছেলে বন্ধুরা কি বলবে যদি একই কাপড় পরে যায় সব সময় ? সকল খরচ শুধু রুধ্রর জন্য। বাবার ফোন টা ও যে অনেক পুরোনো কিন্তু নিজের ফোনটা বন্ধু মহলে সব চেয়ে দামি। এই বাবা-মায়ের স্বপ্নই হচ্ছে রুধ্রর বড় হওয়া। রুধ্র তখন ই বুঝতে পারে বাবা-মা আসলে তার জন্য কি সেক্রিফাইজ করেছে। আরও বেশি মন খারাপ হয় তার, ভাবে কিছু একটা করা দরকার বাবা-মায়ের জন্য। নতুন করে পড়াশুনা শুরু করার জন্য মা কে মটিভেট করে, মা’ও রাজি হয়ে যায়। কিছুদিন পরে রূপা ভর্তি হয় এক সরকারি কলেজে, এদিকে রুধ্রও সকল খারাপ কাজ ছেড়ে দেয়, সব সময় মা বাবার সাথে থাকে। নতুন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয় বাবা-মায়ের ইচ্ছায় তাদের স্বপ্ন পুরনের জন্য। মা ছেলে প্রায় এক সাথে গ্রাজুয়েট হয় ভিন্ন ভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে। রুধ্র বড় ডিগ্রীর জন্য পাড়ি জমায় অন্য দেশে। পড়াশুনা শেষ করে জব করে বিভিন্ন কোম্পানিতে। এভাবেই চলে যায় ছয়টি বছর।
রুধ্র এখন অনেক বড়, বড় এক কোম্পানিতে জব করছে। কিন্তু ছোটবেলার মত সখ পুরণ করা হয় না তার চিন্তা হয় পরিবারের জন্য যদি কিছু কম পরে যায়। এই সকল কিছু ভাবে আর বিড়বিড় করে বলে “সকল সখ পুরণ হয়েছিলো সেই বাবার টাকাতেই” নিজের টাকায় তো চলে শুধু নিত্য নৈমেত্তিক চাহিদা পুরণ। নিজের অজান্তেই বলে উঠে মিস ইউ বাবা।
সময় গড়িয়ে যায়, দেড় বছর হলো বিয়ে করেছে রুধ্র, স্ত্রী এখন অন্তঃসত্ত্বা। থাকছে নিজ দেশ থেকে অনেক দুরে। ডাক্তার বন্ধু বলেছে সব কিছুই নর্মাল এবং আজই ডেলিভারি হবে সব ঠিক থাকলে। অফিসে ঝামেলা ও ফরেন বায়ারদের সাথে মিটিং থাকায় হসপিটালে সকাল থেকে থাকতে পারছে না স্ত্রীর সাথে, তবে রিংকী-কে সে কথা দিয়েছে, বলেছে দুপুরের মধ্যেই চলে আসবে যত কাজই থাকুক না কেন। রুধ্র পরিশ্রম করছে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটু ভাল থাকার উছিলায়। মিটিং শেষে ডাক্তারের ফোন কলের অপেক্ষায় নিজ অফিস রুমে সে…
কফি হাতে আনমনে ভাবছে জীবন টা হয়তো এমন ই। একটু সুন্দর করে করে চিন্তা করলে ভাবাই যায় একটু কষ্ট কিন্তু অনেক সুন্দর এই পৃথিবী। হঠাৎ টেলিফোনের শব্দে আঁতকে উঠে রুধ্র, কল রিসিভ করলে ওপাশ থেকে এক নারী কন্ঠ বলে উঠে “Congratulation you become a father & you have now twins baby. One son & a daughter”
আনন্দে চোখ ছল ছল করে উঠে, অফিসের সকল কাজ বাদ দিয়ে গাড়ি নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়, হসপিটালে স্ত্রীর কাছে গিয়েই হাতটি শক্ত করে ধরে বলে সরি, অনেক দেরি হয়ে গেছে আসতে, বলেই আর হু হু করে কেঁদে উঠে মা’য়ের কথা চিন্তা করে। কত কষ্টই না সহ্য করতে হয়েছে মা’কে। কত সেক্রিফাইজ করতে হয়েছে। এই কষ্ট শুধু হয়তো মা ই জানে।বুঝে। এমন সময় নার্স দুই বাবুকে নিয়ে রুধ্রর কোলে দেয়। চোখে আনন্দের জল নিয়ে বলে ওঠে Miss you baba-maa. আমি তোমাদের অনেক ভালবাসি।
“ভাল থাকুক জগতের সকল বাবা-মা” * সমাপ্ত *

৬১০জন ৬১০জন
0 Shares

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

মাসের সেরা ব্লগার

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ