“এক কাপ চা”

রেজওয়ানা কবির ১৩ মে ২০২১, বৃহস্পতিবার, ০৩:০৮:৪৯পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১৭ মন্তব্য

 

“হরেক রঙের বাহারে

সকাল হল  আহারে।

চুলার পারে উড়ছে ধোঁয়া

এক কাপ চা।

শিশির ভেজা দেহটাকে ঢাকছে কুয়াশা,

ভোর হয় কারো পাখির গানে,

ভোর হয় কারো মাঝির টানে…

ঐ গানে টানে মেলেনা ভাই,

নিষ্ঠুর এই সংসারে,

তখনো চাই এক কাপ চা । ”

মোবাইলে গানটি বাঁজছে আর কিছু নস্টালজিক স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে, আমার বেড়ে ওঠা, আমার চায়ের অভ্যাসসহ অনেক স্মৃতি যা আজও আমায় অনেকভাবে বিনিসুতার মত টানে।

আমার আমি অনেকের মতই চা খোর কিন্তু একটু ব্যতিক্রম, কি লিখব ভাবতে ভাবতে চুলায় এক কাপ চা বানিয়ে চায়ে প্রথম প্রেমের মত চুমুক দেয়ার সাথে সাথেই চা নিয়ে অনেক ঘটনা মনে পরে গেল,আজ কিছু শেয়ার করি।।।।

আমার চা খাওয়া প্রথম শেখা আমার দাদীর কাছে, ঘুম থেকে আধোঁ আধোঁ চোখ কচলাতে কচলাতে প্রথম যাকে দেখতাম তা ছিল আমার দাদীর হাতের অসাধারণ এক কাপ চা। তখন আমার বয়স খুব কম, আনুমানিক ৪/৫, শুধু এইটুকু মনে আছে প্রচন্ড বৃষ্টি, আমাদের বাড়ি থেকে দাদীবাড়ি একটু দূরে, আমি আম্মুর চোখ ফাঁকি দিয়ে শুধু চায়ের লোভে দাদীবাড়ি যাই। বেঁচারী মা আমার খুঁজে খুঁজে হয়রান। এই হল, চা প্রেমী আমি, এভাবেই, প্রতিনিয়ত একবার করে চায়ে চুমুক দিতাম আর মনে হত,আমি প্রতিবার প্রেমে পরতাম !   এ যেন অদ্ভুত নেশা যে নেশার প্রেমে আমি আজও টুইটুম্বুর।

এভাবেই আমার চায়ের অভ্যাস গড়ে ওঠা। আজও বাড়িতে গেলে গভীর রাতে আমার মুখ দেখে দাদী বুঝে যায় আমার চায়ের প্রয়োজন, নিজেই তখন শুরু করে চা বানানো। তার চা বানানোর শব্দে অনেকে জেগে উঠলেও তার ইচ্ছা হয়েছে চা খাওয়ার, এই দোষ ঘারে নেয়।  দাদী আমার মার্কেটে গেলে, ঘুরতে গেলে,শুধুমাত্র আমার ভিতর চায়ের অতৃপ্ততা বুঝে নিজেই বলে মাথা ব্যাথা চল চা খাই।  বেঁচারী দাদী বুঝে না যে তার ভিতরের কাহিনী আমি ধরে ফেলি, তবুও আমার ভিতরের আনন্দ তাকে আমিও বুঝতে দেই না, অবুঝ বালিকার মত চায়ে চুমুক দিয়ে তৃষ্ণা মেটাই আহা!!!!

দাদী থেকে এবার চায়ের আরেকসঙ্গী ট্রান্সফরম্যাশনে পরিনত হল আমার বাবা।

এরপর শুরু হল নতুন আইডিয়া, বাবার হাত ধরে গোটা রংপুর শহর চষে বেড়ানো শুধু এক কাপ চা টেস্টের আশায়।  বাবা বলে চা আমাদের লেখার স্পিড বাড়ায়, ভিতর চাঙ্গা করে। আব্বু প্রচুর সিগারেট খায় চা হাতে নিয়ে। ছোটবেলায় আব্বুকে বলতাম আব্বু আমিও সিগারেট খাবো 🤪আব্বু শুনে হেসে বলত এটা শুধু বড়রা  ছাড়া খাওয়া যায় না। তখন তাই বিশ্বাস করেছিলাম। এখন বুঝি!!! হোস্টেলে ফ্রেন্ডরা মিলে প্রথম সিগারেটে একবার শখের বসে টান দিয়ে কানে ধরেছি এর চাইতে আমার চা ই ভালো।  এমন অখাদ্যকর জিনিস ক্যামনে খায় মানুষ?? দিনের পর দিন এভাবেই আব্বু আমার চায়ের আসক্তিতে আরেক সঙ্গীরুপে থাকত।

ঘুম পেলে বাবার হাতে থাকত এক কাপ চা, আমার কোন অকারন জিদ থামাতে বাবা বানাতো তার হাতের এক কাপ চা, ভালোই হত অবশ্য তাই মাঝেমধ্যেই ইচ্ছেকরে অকারন আবদার করে বসতাম চায়ের লোভে। তবে আমি সিউর  আব্বু এবার এই লেখা পড়লে আর কোন অকারন বাহানা চা বানিয়ে পুরন করবে না😂😂😂।

আমার মনে আছে, প্রায় রাত ১ টা, হঠাৎ আব্বু বলল, আজ সুন্দর জোস্না, চল হেটে হেটে চা খেয়ে আসি। যেই ভাবা সেই কাজ, দুজনে কেরানীপারা থেকে হেটে ফাল্গুনীতে গিয়ে চায়ে চুমুক দেয়া মাত্র আব্বুর কবিতা লেখার শব্দ তরতর করে বেয়ে পড়ছিল এটাও কিন্তু ছিল এই এক কাপ চায়ের কারসাজি বুঝলেন🤪🤪🤪।

এরপর থেকে আমি দীপ্তি হয়ে গেলাম এক চায়ের ভক্ত পাগলা। আর কিছু না পাই কেউ চা দিলে মনে হয় নিজের কিডনিটাই দিয়ে দেই😋😋😋 কেননা মনে হয় জীবনটা আবার নতুনরুপ খুঁজে পেল এক  কাপ চায়ের বদৌলতে ।

আমার ফ্রেন্ডরা আমার পরিবারের সদস্যের মত। ভার্সিটিতে থাকাকালীন বি ডি আর ২ নং গেইট থেকে  টি এস  সিতে মোক্তার ভাইয়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে, কলাবাগান, ফার্মগেইট, মৌরী হোটেল পর্যন্ত যেতাম শুধুমাত্র হরেকরকম চায়ের নেশায়। শায়লা, বৃষ্টি, সুমা দি,সুপ্তি  জাকিয়া, সোহাগসহ সবাই ছিল আমার ভার্সিটির চায়ের সঙ্গী। মন খারাপ, ঝগড়া,বৃষ্টি, আকাশ নীল,অহেতুক, অকারন সব ক্ষেত্রে ছলনার আশ্রয়ে থাকত সেই এক কাপ চা। আরে বাবা! ব্যাগে ২০ টাকা বিডিয়ার গেইট থেকে হেটে চলে যেতাম টি এস সি শুধু চায়ের প্রত্যাশায়। হোস্টেলে রাত ১০ টার পর চুরি করে গেইট থেকে সবাই বেড়িয়ে যেতাম শুধুমাত্র চা খেতে। অবশ্য ধরা পড়িনি কখনো। এরকম চা নিয়ে বন্ধুদের সাথে অজস্র স্মৃতি আমার।

এরপর জবের কারনে যেখানেই অফিস থাকত সেখানেই খুঁজে নিতাম নিজের একান্ত সময় কাটানোর স্থান যেখানে পেতাম এক কাপ চা আর বানিয়ে নিতাম আমার মত চা খোর কিছু কলিগকে চায়ের সঙ্গী হিসাবে ।

এরপর  ঢাকা থেকে দীর্ঘ ১২ বছরে পর চাকরীসূত্রে চলে এলাম  নিজ এলাকা কুড়িগ্রামে। বাসা থেকে আমার কলেজ প্রায় ৪০ কিঃমি। বাসা থেকে বেড় হয়ে প্রথম সঙ্গী আমার  এক কাপ চা।  তারপর কলেজে ঢোকার আগে কিছুদিন কয়েক দোকান ঘুরে আবিস্কার করলাম চম্পাকলির লেয়ার চা, যা সেখানকার স্থানীয়রাও আবিস্কার করতে পারেনি। আমি যখন একা কাচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে সেই দোকানে চায়ে চুমুক দেই তখন মনে হয় আমার সমস্ত ক্লান্তি সেই চা শুষে নেয় আমার শরীর থেকে আহ! কি শান্তি!!!!

মফস্বল শহর, তাই আশেপাশের মানুষ আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে আর অবাক হয়ে ভাবে এই মেয়ে একা বসে প্রতিদিন চা খায়??? কিন্তু ঐ যে মানুষ অভ্যাসের দাস, তাই আমি যেমন চায়ে অভ্যস্ত ঠিক তেমনি সেই লোকজনরাও আমার চা খাওয়া দেখে এখন অভ্যস্ত। বরং এখন তারা আমি গাড়ি থেকে নামার পরই সালাম দিয়ে বলে এই ম্যাডামরে চিনি কম ভালো কইরা এক কাপ লেয়ার চা দাও 🤪🤪। দেখছেন চায়ের কেরামতি!!””

রুকু আপু আমার কুড়িগ্রামে চায়ের সঙ্গী। আমরা ২ বোন বগুড়া দধি ঘর থেকে শুরু করে সীমান্ত ক্যান্টিন, জান্নাত হোটেলসহ চম্পাকলিতে চায়ে চুমুক দেয়ামাত্র খুঁজে পাই আমাদের নতুন লেখার শব্দ,আর বাক্য, তবে তার সাথে থাকে আমাদের অট্টহাসি যে হাসির শব্দে আশেপাশের মানুষ বিরক্ত হয়ে তাকায় আমাদের দিকে। কিন্তু উই ডোন্ট কেয়ার🤪মাঝে মাঝে মানুষের বিরক্তি দেখতে ভালোই লাগে কি বলেন???

সবশেষে আসি, আজাদের চা নিয়ে গবেষনা আর আমাকে চা দিয়ে ভুলিয়ে রাখার কৌশল।  আমার মাথা গরম হওয়ার আগেই নিয়ে আসে তার বানানো এক কাপ মরিচ চা যে চা খেয়ে প্রচন্ড ঝালে চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরে। রাগে, জিদে মাথা হয়ে যায় আরও গরম। সে দেরিতে বাসায় আসলে অজুহাতের আগেই বলে, আসো তোমায় চা বানিয়ে দেই ! আমিও কম না 🤪 মরিচ চা খাওয়ানোর প্রতিশোধের আগুনে উত্যপ্ত আমি গভীর রাতে সে ঘুমালে তাকে ডেকে আব্বুর চা বানানোর গল্প শোনাই আর মায়াকান্নায় ঢলে পরে বলি আমার বাবা  আর দাদী ছাড়া কেউ  এইসময় চা বানায় দিবে না 😭  ঘুম চোখে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে মুখে আর্টিফিসিয়ালি হাসি নিয়ে চা বানাতে গিয়ে মাঝে মাঝে চায়ে চিনির জায়গায় লবন দিয়ে ফেলে😭। যদিও সেই চা খাওয়া যায় না কিন্তু ওকে বিরক্ত করতে ভালোই লাগে,প্রতিশোধ তো নেয়া যায় হা হা হা😁😁😁।

আমার ঘুম আসেনা আর সে নাক ডেকে ঘুমাবে!!! শখ কতো!!! এইক্ষেত্রে আমি ভীষন স্বার্থপর।

মাঝে মাঝে চা ভালোই বানায়। তবে আজাদ ও সপ্তাহে ২ দিন হলেও  আমাকে নিয়ে যায় কুড়িগ্রামের একটা প্রিয় জায়গায় চা খেতে যেখানে আমি শুধু ওর সাথেই যাই।।।

এবার আসি আমার প্রানপ্রিয় চায়ের কথা! তাকে আমি কখন মিস করি ???/কখন আমি তাকে খুব খুব বেশি করে কাছে চাই???

যখন খুব একা থাকি,অন্ধকার ঘরে জোড়ে গান ছেড়ে জানালা দিয়ে আমার জোস্না দেখা, বৃষ্টির শব্দ শোনায়, কবিতা লেখা, হেড ফোনে গান শোনা,চিৎকার করে গলা ছেড়ে গান গাওয়া থেকে শুরু করে মন খারাপের সময়,আনন্দের মুহূর্তে পাগল প্রেমিকের মত এই এক কাপ চায় ই আমাকে ধরে রাখে অক্টোপাশের মত।

যখন চায়ে চুমুক দেই তখন মনে হয়, এ যেন প্রথম প্রেমের প্রথম চুমুর অনুভূতি যাতে সমস্ত শরীর ঝরঝরে হয়ে যায়, মন মেজাজ ফুরফুরে হয়। মনে হয় আমার আমিকে হারিয়ে যেতে দেয় না এই আমার প্রানপ্রিয় নিত্যসঙ্গী এক কাপ চা যে আমার প্রথম এবং শেষ প্রেমিক। এই প্রেমিক কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে না, এই প্রেমিক স্বার্থপর ও নয়, এই প্রেমিককে যত জড়িয়ে ধরতে চাই তত সে আমার ঠোটের কোনে আলতোভাবে লেগে থাকে। এই প্রেমিক আমার ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমায় অসাধারন তৃপ্তি দেয়,সুখ দেয়।

তাই যতযাই হোক,,,,

“প্রথমত আমি তোমাকে চাই,

দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই,

শেষ পর্যন্তও আমি তোমাকে চাই।।।

এক কাপ চায়েও আমি সবসময় ফিরে পেতে চাই আমার সব নস্টালজিক স্মৃতি❤️❤️❤️।”

আজ এ পর্যন্ত,যারা আমার মত চা খোর তারা  এ লেখা পড়ে আশা করি আমার মতই অনেক নস্টালজিক স্মৃতিতে ভাসবেন এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।।।

ছবিঃ নেট থেকে সংগ্রহ।

৩০০জন ৪৯জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য