একা

মাসুদ চয়ন ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, ০৯:২৫:১৩পূর্বাহ্ন উপন্যাস ১২ মন্তব্য

উপন্যাসঃ-একা/
(প্রথম পর্ব)
আজ শুক্রবার।ভোরের প্রথম প্রহর শুরু হয়েছে।মধ্য রাতের বৃষ্টির রেশ এখনো রয়ে গেছে।তবে বৃষ্টির তুলনায় বাতাসের বেগ কিছুটা বেশি।
জানালার কার্নিশ গলে চুয়ে চুয়ে জল ঝরছে।জানালা খুলে দিতেই শব্দটা প্রায় তিনগুন হয়ে গেলো।পুকুর পাড়ে শ্যালো ইঞ্জিন চলছে।ওই শব্দটা বৃষ্টির সাথে মিশে অন্য রকম এক আন্দোলন তুলে ধরলো।ভট ভট ফট ফট ঝুপ ঝাপ সা—য়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া_ কোন পাগলের কাজ তা বুঝতে বাকি রইলোনা।এলাকায় তিনি রমজান পাগলা নামে পরিচিত।মানুষটা প্রচুর ধন সম্পত্তির মালিক কিন্তু তার চেয়েও বেশি নিঃসঙ্গতার আঁধার ।একমাত্র ছেলে ডালিম শেখ কানাডায় সেটেল্ড।৬ বছর হলো গ্রামে ফেরেনা ।স্ত্রী মৃত।১৭ বছরের কিশোরী কন্যা নীলাকে নিয়েই এই বিশাল বাড়িতে বসবাস ওনার।নীলা অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে,সাবজেক্ট ইতিহাস। রান্না বান্না ও জমিজমা দেখাশুনা করার জন্য তিনজন কাজের লোকো রয়েছে। একসময় এই যৌথ পরিবারে অনেক মানুষের সমাগম ছিলো।ওনার তিন ভাইয়ের মধ্যে দু’জন বাইক এ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছেন।ছোট বোন রুবিনার বিয়ের কেনাকাটা করতে সদরে গিয়েছিলেন।ফেরার পথে ট্রাকে চাপা পরেন।অন দ্যা স্পটেই মৃত্যু।এরপর থেকে শুরু হয় রমজান শেখের আধ পাগলামি।
গভীর বেদনা সহ্য করতে না পেরে এই পরিনতি হয়েছে ওনার।সেই শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি।মাঝে মাঝে নির্জন কোনো স্থানে গিয়ে চিৎকার করে কান্না করে বুকভরা শান্তি নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন।তবে মানসিক বোধ ঠিকই পরিপূর্ণ রয়েছে ওনার।সবার সাথে কথা বলেন স্বাভাবিকতায়।দেখে মনে হয়না এই মানুষটা মাঝে মাঝে উদ্ভট সব কান্ড করে বসেন।এই যেমন বৃষ্টির দিনে শ্যালো দিয়ে ধান ক্ষেতে জল প্রবেশ করাচ্ছেন।এটা কি স্বাভাবিক মানুষের কাজ হতে পারে!এমনি এমনি তো আর পাগল নাম দেয়া হয়নি।
শুক্রবার মানেই ইমুর জন্য বিশেষ উপলক্ষের দিন।অফিসের ঝামেলা নেই।পরের দিনো অফিস বন্ধ।সপ্তাহের দু’দিনের ছুটি বেশ উপভোগ করেই কাটিয়ে দেয়া যায়।যদিও চাকরিটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।কি আর করার!ওদিকে ইশার বিয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে।বেকার ছেলের হাতে কেউ কি মেয়ে তুলে দেয়।চাকরিটা আছে বলেই ভরশা আছে।ওর বিয়ের আলোচনা উঠলেই নিজেকে সামিল করা যাবে।ইশাও এমনটাই বলে ফোনে।ও ইমুর বেকারত্বকে ভয় পায়।আর ইমু চায় মুক্তি।চাকরির দাসত্বের প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা সন্মান নেই তার। ইমু ঝটপট বিছানা থেকে উঠে ব্রাশ করতে করতে পুকুর পাড়ে চলে আসে।রমজান শেখের অন্য ভাই(বড়)মোতালেব শেখ তার ভাগের জমিজমা বিক্রি করে গাজিপুর শহরের বাসিন্দা বনে গেছেন।তিনি ইসলামি মাইন্ডের ব্যক্তিত্ব।সবসময় ধর্ম প্রচারের কাজে ব্যস্ত থাকেন।গ্রামে ফেরেননা প্রায় ৮/৯ মাস।ফিরেও বা কি করবেন?ওনার পরিবার তো ওখানে বেশ সুখেই আছে।ছেলে ইমরান পুলিশের ওসি।মেয়ে তানহা মাস্টার্স এ অধ্যয়নরত।তাদের বোন রুবিনা শশুর বাড়িতে।মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে।কখনো কখনো নীলাকে সাথে করে নিয়ে যায়।
ইমু লুঙ্গীটা কাছা দিয়ে নেয় ভালোভাবে।মাথায় ছাতা ঠেকিয়ে আইল বেয়ে কিচ্ছুক্ষণ হেঁটে পুকুর পাড়ের অপর সাইডে চলে আসে।রমজান শেখের পাশে বসে কুঁজো হয়ে।কি খবর চাচা,জমিতে সেচ দিতেছেন?
রমজান শেখ মুখে মুচকি হাসি জিইয়ে রেখে স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেনঃহ বাবা,দেখতাছোনা জলের অভাবে ফসলের কি কাহিল অবস্থা।
ইমু এবার ছাতার অর্ধেকটা ওনার মাথার উপর ছড়িয়ে দেয়।বৃষ্টিতো হচ্ছে চাচা,জল না দিলেও চলতো।
রমজান শেখ হুট করে রেগে ওঠেন।
তাতে তোমার কি মিয়া!এটা কি তোমার বাপের জমি!ভাগো কইতাছি!নাইলে এই কাস্তি দিয়া কোপানি দিমু।হালার ঘরের হালা আমারে শিখাইতে আইছে!কি করতে হইবো না হইবো!
ইমু চট করে কেটে পড়ে ওনার সান্নিধ্য হতে।

বৃষ্টি দুপুর পর্যন্ত চললো
_ইমুর সকালী ভ্রমনে বের হওয়া হলোনা।কি আর করার,বিকেল সন্ধ্যাই ভরসা।গাজিপুর শহরের সন্নিকটেই ছোট্ট একটি গ্রাম।গ্রামের নাম ছাতনাইপুর।ইমু এই গ্রামে নতুন এসেছে।এঞ্জিও কোম্পানীতে জব করার সুবাদে এখানে পোষ্টিং হয়েছে।মাস খানেকের মধ্যেই অনেকের সাথে সুসম্পর্ক জমিয়ে ফেলেছে।ইমু যেই বাড়িতে ভাড়া থাকে সেই বাড়ির মালিক গাজিপুর গভট কলেজের প্রভাষক।বেশ প্রভাব ওনার গাজিপুর শহরে।প্রভাষক ইমতিয়াজ বললেই সবাই চিনে যায়।ওনার বাড়িটা দু’তলা।নিচ তলায় ওনারা থাকেন।উপর তলার ছয়টি রুম ভাড়া দিয়েছেন।খুব ছোটো সাইজের রুম।প্রতি রুম ভাড়া দু’হাজার টাকা।ওনার এক ছেলে এক মেয়ে।মেয়ে মেঘা বাবার কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।ছেলে হৃদয় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র।মেঘা মেয়েটা ভীষণ রকম ভাবুক টাইপের।অপরিচিত কাউকে সন্মান দিয়ে কথা বলতে চায়না।কেমন জানি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। সব সময় দুষ্টমিতে মেতে থাকে এর ওর সাথে।দু’তলার ছাদে পাটি বিছিয়েছে।
একান্তে সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস পড়ছে।
মেয়েটি লেখালেখিও করে।তবে প্রফেশনাল নয় শখের বসে।ইমুও ছাদে চলে আসলো।মেঘার দিকে চোখ পরতেই ছাদ থেকে নেমে আসতে উদ্যত হলো।মেঘা পেছন থেকে ডাক দেয় মৃদু স্বরে।এই যে ইমু ভাই এদিকে আসুন।
ইমু কিছুটা ইতস্তত বোধ করে মেঘার সামনে আসতে।খুব চটপট করে কথা বলতে গিয়ে কখন যে কি বলে ফেলে মেয়েটা।
আচ্ছা ইমু ভাই,আপনি কি পুরুষ নাকি কাপুরুষ।
ইমু কিছুই বলেনা।বিস্মিত হয়ে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে।মেঘা উপন্যাস পাঠে নিমগ্ন।ইমু উত্তর না দিয়েই পেছনে ফেরার পথ ধরতে চায়।মেঘাও আর ডাকেনা।ইমু দাঁড়িয়েই থাকে।
মেঘা,তুমি আমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলে।আমি কেনো নির্জন প্রেক্ষাপট খুঁজে ফিরি।ছুটির দিনে কোথায় যাই।আর কেনই বা এতো রাত করে ফিরি।সারাদিন কোথায় থাকি না থাকি।তোমার আব্বু জানলে বাসা থেকে গেট আউট করে দিবেন।এসব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।তুমি বরং আংকেলকে এসব জানিয়ে দিয়ো_আর বইলো আমাকে যেনো বাসা থেকে আউট করে দেয়।ঘুমোনোর জন্য গাছতলা আছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেের বারান্দা আছে।রাস্তা ঘাট পথ প্রান্তর আছে।আর কিই বা লাগে।তোমরা মানুষ বড়ই স্বার্থপর,মানুষের ভিতরপট পাঠ করার প্রয়োজন বোধ করোনা কখনোই।আমারতো বাবা মা বেঁচে নেই।খুব একা মানুষ।তাই নির্জন প্রকৃতিকে ভালোবাসি।স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে একটু আধটু সময় দেই।শান্তি পাই।খুব খুব শান্তি পাই।

মেঘা চট করে উঠে দাঁড়িয়ে ইমুর দিকে রক্ত লাল চোখে তাকিয়ে রইলো।মনে হচ্ছে কেউ যেনো বুকের মধ্যে ধনুক তাক করে ধরে রেখেছে।ইমু পিছু পায়ে হেঁটে ছাদের গেটের কাছে চলে আসে।মেঘা ওখানে ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।রক্তবর্ন সুন্দর মুখখানা ফুলে ভোম হয়ে আসছে।মেঘার এটা চিরাচারিত স্বভাব।রেগে গেলে বেশ কিছু সময় নিস্তব্ধ হয়ে যায়।তারপর একান্তে দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে কাঁদতে থাকে,কাঁদবেই।না কাঁদলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।ইমু নিচে নেমে আসার পর মেঘাও ওর নিজস্ব রুমে চলে যায়।বই পাটি ছাদের মধ্যেই থেকে যায়।
বিকেল চারটা বাজতে পনেরো মিনিটের অপেক্ষা।ইমু বাই সাইকেলটা মুছতে মুছতে ম্যানেজারের সাথে ফোনে কথা বলছে।এটি একটি সেকেন্ড হ্যান্ড ফনিক্স সাইকেল।সারে তিন হাজার টাকার বিনিময়ে একজনের কাছ থেকে ক্রয় করে নিয়েছে। হ্যালো,ম্যানেজার সাহেব——–জি ভাই,এটাই আমার কথা বলার ধরন।স্যার বলে সম্বোধন করতে পারিনা।কেবলমাত্র শিক্ষা গুরুকেই স্যার সম্বোধন করা চলে।আপনি আমার শিক্ষা গুরুও নন,বাব চাচা তূল্যও কেউ নন।ম্যানেজার একরামুল হক ওপার থেকে রাগী গলায় কথা বলছেন।ধুর মিয়া!ফোন রাখো।আমার গ্রুপে তোমার কাজ করার লাগবেনা।অন্য গ্রুপে জয়েন করবা।ফোন কেটে যায়।ইমু সাইকেলের ছিটে বসে মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।আহা!কি অপুর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য।মনে হচ্ছে আকাশের বুকে একঝাঁক পাহাড় ভেসে বেড়াচ্ছে ডিঙি নৌকোর মতো।
“মানুষগুলো এমন কেনো!কেমন যেনো ভাবুক ভাবুক,ভাবই মানুষের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট,ভাবহীনেরা সাদা মনের সরল মানুষ,সমাজে তারা হ্যাবলা কান্ত বলে পরিচিত।এই সমাজে চাটুকার বাটপাররাই সন্মান পাওয়ার যোগ্য।কত্তো কত্তো ইনভাইটেশন তাদের”
আবারও বৃষ্টির আগমনের সম্ভাবনা রয়েছে।ইমু তাই বেশি দূরে গমনের পরিকল্পনা বাতিল করে দিলো।আপাতত সান্তালীর মোড়ে যাওয়া যাক।চায়ের দোকানে জাম্পেস আড্ডা চলছে।এই আড্ডা মধ্য রাত অব্ধি চলে।পাশেই তুরাগ নদী অবিরাম বয়ে চলছে। নদীর পাড়ে কেউ জুয়া খেলছে,গাজা টানছে,কেউবা জটলা করে গান বাজনা গল্প গুজবে মেতে আছে।

১৪৩জন ২৩জন
7 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য