একান্ত অনুভূতির ডায়েরি-৫

তৌহিদ ২৭ অক্টোবর ২০১৯, রবিবার, ১১:০৭:০২অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩৬ মন্তব্য

এই ধর ধর ধর!! নিয়া গেইল! নিয়া গেইল!

চিৎকার চেঁচামেচি শুনে এগিয়ে গেলাম। বজলু কি হয়েছে রে?
ভাইজান- নিয়া গেলো সউগগুলায়। মুই শ্যাষ!!
আরে কি নিয়ে গেলো কে সেটাতো বল?
ভাইজান- আইজ বাড়ি যাইম ক্যামন করি? বৌ মোক আর আইজ আস্ত থুইবার নেয়। ভাত বুজি আইজও কপালত জুটিলনা।

গাঁধাটার এমন কথায় খুবই বিরক্ত লাগছে। মসজিদ থেকে আসরের নামাজ পড়ে বের হয়েছি। হেঁটে হেঁটে বাসায় আসার পথেই এই ঘটনা। বজলু এলাকার খেঁটে খাওয়া মানুষ। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে বিকেলে যা মজুরী পায় তাই দিয়ে বাজারসদাই করে বাড়িতে ফেরে। আমাদের এলাকার প্রত্যেকের বাড়িতে তার কোননা কোন কাজ থাকেই। বিশ্বাসী মানুষ সে। এলাকার মুরুব্বীরা ছোট বেলা থেকেই তাকে দেখে আসছেন। শুধু তাকে কেন বজলুর মাকেও দেখে আসছেন ছোটবেলা থেকেই। তবে তার বাবার হদিস নেই অনেকদিন থেকে। মরে গিয়েছে নাকি বেঁচে আছে কেউ জানেন না। কানাঘুষায় খবর পাওয়া গিয়েছিলো একবার বজলুর বাবাকে নাকি সাভারে দেখেছেন এলাকার কেউ একজন। সে অন্য কোন নারীর সাথে এক রিক্সায় যাচ্ছিলো। বজলুর মায়ের ধারণা গার্মেন্টস এ চাকুরী করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি বজলুর বাবা। সেখানেই আরেকটা বিয়ে করেছে সে। এ নিয়ে বজলুর মা’র এখন আর তেমন আফসোস নেই। হারামীটা চলে গিয়ে বড় বাঁচা বেঁচেছে সে। সংসারের নিত্যদিনের অশান্তি থেকে এখন সে মুক্ত।

বজলুরে তুই ক্যামন চ্যাংড়া! হাতোত একনা জিনিস ধরি থুইবার পাইস না? খালেক এসে একথা বজলুকে বলার পর থেকেই বজলু তাকে জিজ্ঞেস করে- অই খালেক, পালু?
না পাও নাই মুই- খালেকের মেন্দা উত্তরে আরো ভেঙে পড়লো বজলু। সব্বোনাশ হয়া গেইলরে খালেক! বৌতো পরের কতা, মা ও মোক আর আইজ আস্ত থুবার নেয়।

এই বজলু কি হয়েছে বলছিস না কেন?- জিজ্ঞেস করলাম। আমার কথা শুনে সে বসে পড়লো মাটিতে। খালেক কে জিজ্ঞেস করলাম- বজলুর কি হারিয়েছে রে?

খালেক বললো- ভাইজান আর কননা, বজলু আইজ এক কেজি গোস্ত কিনি আনছিল পলিথিনত করি। হাঁটি আইসপার সময় একটা কুকুর দৌড়ি আসি পিছন থাকি ব্যাগটাত কামড় দিয়ে দেচে দৌড়। বজলুর চিক্কর শুনি মুইয়ো পিচন পিচন কুকুরক ধইরবার নাগি দিছুং দৌড়। কিন্তু আর খুঁজি পাওয়া গেইলনা কুকুরটাক। কোনটে যে যায়া নুকাইল?

এতক্ষনে বুঝলাম আসল ঘটনা। মাংসের ব্যাগ কুকুরে নিয়ে গিয়েছে বলেই এত আক্ষেপ বজলুর। স্বাভাবিকভাবেই সে ভেঙে পড়েছে। এর কারন হচ্ছে বজলু প্রতিদিন কাজ করে পারিশ্রমিক পায় তিনশো পঞ্চাশ থেকে চারশো টাকা। তার তিনজনের পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে হাতে থাকে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ থেকে একশত টাকা। তারমধ্যে যদি সামান্য সাধ্যের বাইরে টুকটাক কিছু কিনতে হয় তাহলেতো হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা।

বজলু তার বৌকে অন্য বাড়িতে কাজ করতে দেয়না। এতে তার আত্মসম্মানে লাগে বোধহয়। তার মা এখন বৃদ্ধা। আম্মা তাকে প্রতি মাসে কিছু হাতখরচ দেয় ঔষধপত্র কেনার জন্য। অন্যান্যরাও কিছু করে দেয়, সেখান থেকেই বজলুর মা টাকা জমিয়ে ঈদপার্বনে কিংবা অন্যকোন আচার-অনুষ্ঠানে নিজেদের জামাকাপড় কেনে। সমাজে এরকম অনেকেই আছেন আমাদের চারপাশে। দিন আনে দিন খায় তাদের সবারই এই একই অবস্থা।

বজলু তার পারিশ্রমিক থেকে প্রতিদিন কিছু কিছু করে জমিয়ে আজ মাংস কিনেছিলো। গরুর মাংস এখানে পাঁচশো টাকা প্রতি কেজি। তাদেরও শরীর আছে, মন আছে। তাদেরও ইচ্ছে হয় সপ্তাহে অন্তত একদিন মাছ মাংস খাবার। ইচ্ছেটা নিতান্তই অমূলক নয়। এদেশে গরীব সারাজীবন গরিবই থেকে যায় আর টাকাওয়ালারা ফুলেফেঁপে ওঠে। যাদের আবার টাকা রাখার জায়গা নেই তারা জুয়ায় ওড়ায় টাকা, মেয়ে মানুষ, মদে ওড়ায় টাকা। এরাই আবার যাকাত দেয় পাতলা ফিনফিনে কাপড়ের শাড়ি লুঙী। নির্লজ্জ্ব বেহায়ার দল সব।

সব শুনে বললাম- বজলু হয়েছে আর কান্নাকাটি করতে হবেনা। আমি জানি আজ আর বজলুর হাতে টাকা নেই। বাড়িতে সবাই হয়তো আশায় বসে আছে আজ মাংস খাবে বলে। তাকে বললাম- বজলু, চল আমার সাথে সামনের মোড় পর্যন্ত। ক্যানে ভাইজান, মোক নিয়া যেয়া আর কি করমেন? আহা! সাথে চলতো বজলু এত কথা বোলনা।

বজলুকে মোড়ে নিয়ে এলাম মাংস কিনে দেবো বলে। কিন্তু কসাইয়ের কাছে মাংস শেষ। অগত্যা তার হাতে টাকা দিয়ে বললাম কাল যেন অবশ্যই সে মাংস কেনে। কৃতজ্ঞতায় বজলুর চোখ বেয়ে পানি ঝড়তে লাগলো। বললো ভাইজান, তোমরা ফেরেশতার নাকান। আল্লাহ্‌ তোমার ভাল করুক ভাইজান।

হয়েছে হয়েছে, এত কিছু বলতে হবেনা। আর শোন, মাংস কুকুর নিয়ে গিয়েছে বলে দুঃখ পেওনা। মনে রেখ, এই পৃথিবীতে প্রতিটি জীবের আহারের ব্যবস্থা উপরওয়ালা করে দেন। আজ তুমি যে মাংসের জন্য কষ্ট পাচ্ছো, সেই একই কারনে এদেশের অনেক মানুষ না খেতে পেয়ে রাত্রীযাপন করছে। তাদের চেয়ে তুমি অনেক সুখী, ঠিক কিনা বলো? হয় ভাইজান, এক্কেরে ঠিক কইছেন। মুই এলা যাও ভাওজান? বাড়িত তোমার বৌমা বোধহয় নাকার পারত একেলকায় বসি আছে আন্দন আন্দিবার নাগি।

হ্যা যাও, বাসায় যাও। একথা বলার পর সে চলে গেলো কৃতজ্ঞচিত্তে। কিন্তু সে যেটা জানলোনা তা হলো- মা’র কাছে শুনেছিলাম এরশাদ সরকারের সময় আমার ব্যাংকার বাবা ব্যাংকার্সদের দাবীদাওয়া নিয়ে সিবিএ আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধে অন্যায়ভাবে অন্যান্য শত শত চাকুরের ন্যায় তিনিও চাকুরীচ্যুত হয়েছিলেন। তখন আমার জন্যে খাবারের দুধ কেনার টাকাও তার কাছে ছিলোনা। আমি মায়ের বুকের দুধ পেতামনা বলে আমার নানী তুলোয় মধু মাখানো পানি ভিজিয়ে আমার ছোট্ট মুখে তুলে দিতেন ফোঁটায় ফোঁটায়। আব্বার এমন অবস্থায় আমার নানা আমাদের নানীবাড়িতে নিয়ে যান। সেখানেই আমি মানুষ হয়েছি। আর এই জেদেই আব্বা পরবর্তীতে এলাকার এবং তার চারপাশের সাধারণ কর্মজীবি মানুষের জন্য এতকিছু করেছেন যা বলার বাহিরে। তিনি তার আয়রোজগারের সবকিছুই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমার মনে আছে আমার এক ফুফুর বিয়ের জন্য নিজের ঘরের আলমারি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আরেকজনের মেয়ের বিয়েতে আমাদের টিভি বিক্রি করে দিয়েছেন। আমার ছোটভাইবোনদের তখনো জন্ম হয়নি। এসব বিষয় তাদের স্পর্শ করেনি।

আব্বা শুধুমাত্র হালাল রোজগার করবেন বলে সরকারি অনেক চাকুরী প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি বলতেন- দেশের জন্য নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সেই দেশে যখন সবাইকে লুটপাট করতে দেখি তখন আমি লজ্জা পাই। কষ্টে বুক ফেঁটে যায়। দেশ আমার মা, আমার মায়ের সম্পদ আমি কি করে লুট করি? তিনি রাজনীতি করতেন জনগনের জন্য। নিজের জমিজমা যা কিছু ছিলো সব বিক্রি করে দিয়েও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মানুষের সেবা করে গিয়েছেন। অথচ তার সমসাময়িক রাজনীতিবিদগন আজ শতকোটি টাকার উপর শুয়ে আছে। এ কেমন পরিহাস!

রাজনীতির পাশাপাশি তিনি যে প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকুরী করতেন সেখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দেশ বিদেশ ঘুরেছেন অনেক। তবু নিজের নীতি থেকে একচুল সরে আসেননি। তিনি কখনওই মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার প্রদত্ত সম্মানীভাতা গ্রহণ করেননি। সম্মান, টাকাপয়সা এতকিছু অর্জন করার পরেও তাঁকে দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি তার আবেগ, ভালো কিছু করার তাগিদ থেকে বিন্দুমাত্র লক্ষ্যচ্যুত হতে দেখিনি।

সে কৃতজ্ঞতা থেকে আব্বা মারা যাবার এতদিন পরেও মানুষ তাকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন এখনো। তার সন্তান হয়ে তাঁকে ছোটবেলা থেকে খেঁটেখাওয়া মানুষের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গিও যে তার মতই হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। আমি কৃতজ্ঞ সৃষ্টিকর্তার প্রতি, আমাকে যতটুকু উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সেটি ন্যায়সঙ্গতভাবেই আমি উপার্জন করতে পারি। এতেই আমি সন্তুষ্ট।

আমার বাবার সন্তান হয়ে আমিইবা কি করে সেই আদর্শ থেকে সরে আসি?

(বজলুর কথোপকথন রংপুরের ভাষায় লেখা। পাঠক কোন শব্দ বুঝতে না পারলে মন্তব্য করুন। উত্তর দেবার চেষ্টা করবো।)

২৩৭জন ১৫জন
35 Shares

৩৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য