একান্তের নৈকট্যে

জিসান শা ইকরাম ৮ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার, ০৭:০৩:১৪অপরাহ্ন গল্প ৩৪ মন্তব্য

ঠিক রাত এগারোটায় ঢাকা বিমান বন্দর রেলওয়ে ষ্টেশনে উবারের টয়োটা করোলা থেকে নামলো প্রবাল, সাথে একটি মেয়ে। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে দুজনেই দৃপ্ত পদক্ষেপে রেলওয়ে ষ্টেশনে প্রবেশ করে বাম দিকে হাঁটা দিলো, যেন সবকিছু অত্যন্ত চেনা জানা। বুঝবার উপায় নেই, এই ষ্টেশনে তারা প্রথম এসেছে। ভিড় এড়িয়ে প্লাটফরমের একেবারে শেষ দিকের একটি বেঞ্চে বসলো দুজনে। আশে পাশের বেঞ্চে দু’একজন যাত্রী ঝিমাচ্ছে ট্রেনের অপেক্ষায়।

প্রবাল সাথে থাকায় মেয়েটি একদম নির্ভার, যেন প্রবাল আছে বলেই কোন চিন্তা নেই, সব চিন্তা তো প্রবাল করবে। দুজনে এতই সপ্রতিভ যে বোঝার উপায় নেই দুজনেই আসলে ঘর ছেড়ে পালাচ্ছে। দুজনের মুখই হাসিতে উজ্জ্বল চকচক করছে। রাতে ডিনার করেনি দুজনের একজনও। প্রবাল কিছুক্ষণ পরে উঠে কাছের দোকান থেকে কেক, বিস্কুট, কলা আর আইসক্রিম কিনে নিয়ে এলো। শান্তা এর খুব সামান্যই খেলো, তবে আইসক্রিম খেলে শান্তা-ই।
প্রবালঃ শান্তা একটা কলা খাও
শান্তাঃ না, আমি রাতে কলা খেতে পারিনা।
প্রবালঃ আইসক্রিম তো খাচ্ছ, কলার সাথে আইসক্রিম মিশিয়ে খাও।
শান্তাঃ আমি তোমার মত নাকি? তুমি তো চা এর মধ্যে কলা ভিজিয়ে খাও।
প্রবালঃ মনে করিয়ে দিলে! কফি নিয়ে আসি তাহলে 🙂
এমন হালকা খুনসুটি চলে দুজনার মধ্যে মাঝে মধ্যেই। দুজনে এত ক্লোজ হয়ে বসা যে একটি মাছিও ঢুকতে পারবে না, দুজনের মধ্যে।

রেল ষ্টেশনে আসলে প্রবাল কেমন ভাবুক হয়ে যায়। দেশ বা বিদেশের রেলস্টেশন প্রায় একই। দেশের টা অপরিষ্কার, হইচই বেশী। বিদেশেরটা পরিষ্কার, কোন হইচই নেই। কত মানুষ আসছে যাচ্ছে। বিদায় জানাতে আসছে কেউ প্রিয়জনকে, কেউ বা প্রিয়জনকে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এখানে দেখতে পাওয়া যায়। গরীব,  ধনী, ভিক্ষুক, ফেরিওয়ালা, চোর ছ্যাঁচোড় বদমাইশ সব। রেল লাইনের দিকে তাকালে মনটা বহু দূরে চলে যায়। অসীম দূরত্বে চলে গিয়েছে রেলপথ। রেল লাইন দুটো পাশাপাশিই থাকে, অনেক দূরে তাকালে মনে হয় মিশে গিয়েছে দুই লাইন। একসাথে মিলুক বা না মিলুক, পাশাপাশি তো থাকছে লাইন দুটো। শুধু একটি লাইনে রেল চলবে না, রেল চলতে হলে দুটা লাইনই সমান্তরাল থাকতে হবে।

কমলাপুর থেকে রেল এসে গিয়েছে, যাত্রীদের মধ্যে চঞ্চলতা। প্রবাল, শান্তা ও ব্যাগ হাতে কাঁধে নিয়ে উঠে পরলো ট্রেন এ। টিকিট মিলিয়ে প্রথম শ্রেনীর এসি কক্ষে গিয়ে বসলো দুজনেই। তারা চিটাগাং যাচ্ছে। পাশাপাশি বসে শান্তা ই প্রথম কথা বলল।
শান্তাঃ তোমাকে কিছু কথা বলি প্রবাল। যার অধীনে আমি থাকতে চাই, যার অনুভব নিয়ে আমি আজীবন চলতে চাই, সে হচ্ছো তুমি। আমার আকাশ, আমার মাটি, আমার নিঃশ্বাস, বিশ্বাস সব তোমাকেই সঁপেছি আমি। আমাকে ঠকিও না কখনো।
প্রবালঃ আমি তোমার এই উপলব্ধি অনুভব করি শান্তা। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন তোমাকে ভালোবাসার মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই। আমার ভালোবাসা কি তুমি অনুভব করো না?
ট্রেন চলছে রাতের আঁধার ভেদ করে, মাঝে মাঝে দু একটা স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে, আবার ছুটছে হুইসেল বাজিয়ে। দুজনে কথা বলতে বলতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছে কেউই জানেনা। ঘুম ভাঙলো দরজায় নক করায় ‘ চিটাগাং এসে গিয়েছে ‘

দুজনে নামলো চিটাগাং ষ্টেশনে। চিটাগাং থেকে যাবে কক্সবাজার। ষ্টেশনের বাইরে আসার সাথে সাথে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরলো প্রবালের। আজ হরতাল, গাড়ি চলবেনা। তাহলে যাবে কিভাবে কক্সবাজার? ভোরের আলো তখনো স্পষ্ট নয়। বাইরের অপেক্ষমান সিএনজি চালকদের সাথে আলাপ করে একটা স্থানে গেলো সিএনজিতে শহর থেকে দূরে কোন এক ব্রীজের কাছে। আরো অনেক যাত্রী ওখানে অপেক্ষমান।সবাই যাবে কক্সবাজার। কিছু মাইক্রোবাস আছে যারা যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছে।

প্রবাল শান্তা উঠে পরলো একটা মাইক্রোবাসে। প্রবালের মনে ভয় কাজ করছে, হরতালের মধ্যে এভাবে যেতে। কখন পিকেটাররা এসে মাইক্রো থামিয়ে ভাংচুর আরম্ভ করে এই চিন্তা তাকে শান্তি দিচ্ছে না। মনের মধ্যে এমন ভয় প্রবালের তা শান্তাকে বুঝতে দিচ্ছে না। কয়েকটা পিকেটিং পয়েন্ট নির্বিঘ্নে অতিক্রম করলেও এক বাজারের পিকেটারদের মধ্যে অবরুদ্ধ হলো মাইক্রোবাস। প্রবাল প্রবল আতঙ্কে শান্তাকে আড়াল করে রাখলো যাতে মাইক্রোর জানালার গ্লাস ভাঙলেও  গ্লাসের টুকরা শান্তার গায়ে না যায়। যা যখম তা যেন প্রবালের উপর দিয়েই যায়, জানালার কাছে একারণেই বসেছিল প্রবাল। পিকেটাররা হ্যাঁচকা টানে ড্রাইভারকে নামিয়ে দিয়ে নিজেরা একজনে ড্রাইভ করে নিয়ে চলে গেলো তাঁদের নেতার কাছে। যাত্রীরা সব আতংকে নীল। একমাত্র শান্তা অবিচল স্থির, তার মুখে সামান্য তম ভয় নেই, যেন প্রবাল আছে তো ভয় এর কি আছে? নির্ভরতার প্রতীক যেন প্রবালই।
মাইক্রো থেকে সব যাত্রী নামলো। প্রবাল সেই নেতার কাছে গিয়ে কি কথা বললো কেউ শুনলো না। নেতা বললো ‘ নাস্তা করে আসেন, ঠিক ত্রিশ মিনিট পরে কেবল মাত্র আপনার মাইক্রোবাসটাই যেতে দেবো এখান থেকে। সামনে যদি আবার পিকেটিং এ পরেন, আমার কথা বলবেন। আটকাবে না আর।

ত্রিশ মিনিট পরে মাইক্রোবাস কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা শুরু করলো। দুপুর তিনটার দিকে কক্সবাজার পৌঁছালো। আগে থেকেই বুক করা হোটেল কল্লোল এ উঠলো। সমুদ্র দেখে সকাল থেকে বয়ে যাওয়া ধকল, ক্লান্তি উধাও দুজনের মাঝ হতেই। শাওয়ার নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে বসে দুজনেই প্রচুর ভাত খেলো। গত রাত থেকে বলতে গেলে কিছুই খায়নি দুজনে। শান্তার ক্ষুধা মনে হয় একটু বেশীই পেয়েছিল। খেয়ে দুজনে আবার হোটেলের কক্ষে। কক্ষের ওয়াল তিনদিকে ইটের হলেও সমুদ্রের দিকটা কাচ দিয়ে বানানো। শুয়ে শুয়েই সমুদ্র, সমুদ্রের ঢেউ দেখলো, দেখতেই থাকলো। সে ঢেউ আছরে পরতে থাকলো কক্ষের মধ্যেও। ঘুমিয়ে পরলো একসময় দুজনেই।

সন্ধায় দেখা গেলো তাদের সমুদ্র সৈকতে। বালির উপর হেঁটে, বসে সমুদ্র দেখা। হাত হাত রেখে কত কথা দুজনে। যেন জন্ম জন্মান্তর যাবত দুজনে হাত ধরাধরি করে এভাবেই ছিল, এবং এভাবেই থাকবে। আলো আঁধারে দুজন দুজনকে দেখছে। শান্তা দেখছে প্রবালকে ‘ এত সুন্দর হয় কিভাবে একজন পুরুষ?” প্রবাল ও দেখছে শান্তাকে “ আমার জীবন ধন্য আমি এমন একজন নারী পেয়েছি।‘’ সমুদ্রে পা ভেজালো দুজন একই সাথে। রাত গভীর হওয়ায় একটু দূরের ধানসিঁড়ি হোটেল থেকে পরাটা ডিম মামলেট খেয়ে হোটেলের কক্ষে এসে দরজা আটকালো। সমস্ত রাত তারা জেগেছিল না ঘুমিয়ে ছিল তা দরজা আটকানো থাকায় বাইরে থেকে আর দেখা গেলো না।

কক্সবাজারের দ্বিতীয় দিন সকাল দশটার দিকে ব্রেকফাস্ট করেই ছুটলো তারা সমুদ্রের দিকে। দুজনেই দৌড় দিয়ে ঢেউয়ের মাঝে। এক একটা ঢেউ আসে আর দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে। শান্তা অবাক হয়ে ভাবছে, এই ঢেউয়ে সে নিজে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে, কিন্তু প্রবাল দাঁড়াতে পারছে না কেন? তাকে সামলাতে প্রবালকে প্রতিবার জাপটে ধরতে হচ্ছে।
প্রবাল ভাবছে শরীরটা খুবই দুর্বল তার, গত কয়েকদিন ধরেই কেমন আন ব্যালেন্স অবস্থা শরীরের। হাটাঁর সময় পা কেঁপে যায়। এই অসুস্থ অবস্থা কোন ভাবেই শান্তাকে বুঝতে দেয়া যাবে না। তাহলে কক্সবাজারের আনন্দ মাটি হয়ে যাবে শান্তার। সমুদ্র থেকে ক্লান্ত হয়েই দুজনে হোটেলের কক্ষে এসে শাওয়ার নিয়ে ড্রেস পরলো। দুজনের একসাথে আজ প্রথম দিন। এত ঘরোয়া পরিবেশ যেন তারা কয়েক যুগ ধরে এভাবেই একসাথে। লাঞ্চ করে বিকেলটা হোটেলের কক্ষেই বিশ্রাম নিল।
সন্ধ্যার পরে আবার দুজনে সমুদ্র সৈকতে। একটা বিশ্রাম চৌকি ভাড়া নিয়ে সমুদ্রের গর্জন শুনছে, আকাশ দেখছে জরা জরি করে কথা বলছে দুজনে। পাশের চৌকির কাপল তাকিয়ে দেখছে ওদের, প্রবাল শান্তার ভ্রুক্ষেপ নেই এতে। প্রেম করছি তোরাও কর, তাকিয়ে তাকিয়ে হিংসা করিস কেন?  প্রবাল মোবাইল বের করে ইউটিউব থেকে গান বাছাই করে ছাড়লো বেশ জোরেই। বার বার একই গান শুনছে দুজনে। কথা বন্ধ করে দুজনেই গানের মধ্যে ডুবে গেলো। অনেক রাতে ফিরলো তারা হোটেল কক্ষে। পরদিন ফিরবে তারা ঢাকায়। সকালে হিমছড়ি যাবে, যাবে ইনানী।

পরেরদিন একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলো দুজন। দুপুরে লাঞ্চ করে ছুটলো হিমছড়ি, ইনানীর উদ্দেশ্যে। ব্যাটারী চালিত তিন চাকার বাইক নিলো। সাগরের পার ঘেঁষে মেরিন ড্রাইভ সড়ক। অত্যন্ত মনোরম সড়কের দুপাশ। ডানপাশে সমুদ্র, বাম পাশে বাড়ি ঘর, মাঝে মাঝে পাহাড়। ঝক্‌ঝকে রোদে ছুটে চলছে তিন চাকার অটো গাড়ি। থামলো এসে হিমছড়ি পাহাড়ে। উঁচু পাহাড়ের সিড়ি দেখে প্রবালের মনে ভয় এসে ভীড় করলো। পারবে তো সে এত উচুতে সিড়ি বেয়ে। শরীরটা কেমন আন ব্যালেন্স। বুঝতে দিচ্ছে না শান্তাকে, মুখে হাসি এনে শান্তার পিছনে পিছনে সিড়ির একেক ধাপ উঠছে। কিছুক্ষণ পরপর দাঁড়াচ্ছে আর শান্তাকে দাঁড়াতে বলে তার ছবি তুলছে। ছবি তোলা আসলে বাহানা ছিল, উঠতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল, তাই ছবি তোলার নাম করে জিরিয়ে নিচ্ছে। শান্তা যদি কোনো ভাবে বুঝতে পারে প্রবালের কষ্ট হচ্ছে তাহলে শান্তা আর উপরে না উঠে নেমে যাবে। এটি কোন মতেই প্রবাল চাচ্ছে না শান্তার আনন্দ মাটি হোক। এক সময় উঠে গেলো গন্তব্যে। ২১৭ টি সিঁড়ির ধাপ কিভাবে বেয়ে উঠলো প্রবাল তা নিজে এখন ভেবে অবাক হয়। ভালোবাসার মানুষ সাথে থাকলে যে কোন অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়। কৃষ্ণচূড়া একটি গাছে লাল ফুল ফুটে আছে। কৃষ্ণচূড়ার উপর থেকে আকাশ আর সমুদ্র দুটোই দেখা যাচ্ছিল।

একটু ঢালুতে গোল একটি বসার স্থান। পলিথিন বিছিয়ে বসে দুজনে সাথে আনা খাবার খেলো। যেন এটিই তাদের বাসা বাড়ি। উপরে ছাউনিটা ভাঙ্গা। আকাশ দেখা যায় তার ফাক গলিয়ে। দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে পূর্ব জনমের কথা মনে পড়লো প্রবালের। এটিই কি সেই পাহাড় যেখান থেকে কেউ একজন ধাক্কা দিয়ে ফেলে তাকে হত্যা করে শান্তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল?
প্রচুর ফটো তুলে পাহাড় থেকে নেমে এসে ছোট একটি ঝর্না দেখল। কৃত্রিম মনে হলো ঝর্ণাটি। এরপর বের হয়ে ইনানীর দিকে যাত্রা। পথে মাঝে মাঝে অটো দাঁড় করিয়ে ফটো তোলা। পথটাই পছন্দ হলো সবচেয়ে বেশী প্রবালের। এই দীর্ঘ পথ ঘেঁষে সমুদ্র। পথে যেতে যেতে সমুদ্র দেখা।

এমন পথ বিদেশে থাকলে পথটিকেই সম্পদ বানিয়ে ফেলত তারা। লাখ লাখ পর্যটক আসতো বিদেশ থেকে। কয়েকটি রিসোর্ট দেখা গেলো পথের পাশে।
ইনানি গিয়ে কিছু ফটো তুললো দুজনে, একাকি, দুজনের একসাথে সেলফি। প্রবাল পাথর গুলো স্বাক্ষী হয়ে রইল প্রবাল আর শান্তার আগমনের। একই পথে ফেরা আবার কক্সবাজার। রাতের গাড়িতে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা।

আবার কবে এমন একান্তে সময় পাবে দুজনে? আদৌ কি পাবে আর? সমস্ত পৃথিবীকে উপেক্ষা করে সবার মাঝে থেকেও নিজস্ব সময়ের মাঝে ছিল দুজন তিনটি দিন, তিনটি রাত। যে পথে গিয়েছে দুজন সে পথেই হয়ত ফেরা যায়, তবে সময়ের পথে আর ফেরা হয় না। সময় সামনে এগুতেই থাকে,

————–
প্রবাল-২

২৯৫জন ৩৫জন
76 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য