একাত্তরের ওরা তিনজন

রোকসানা খন্দকার রুকু ৭ ডিসেম্বর ২০২০, সোমবার, ০১:৪৭:৫৯অপরাহ্ন গল্প ১৯ মন্তব্য

করিম মিয়ার একটাই লুঙ্গি। ডিসেম্বর মাসের এমন দিনে চারিদিকে যুদ্ধের দামামা বাজছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে একটা বোঝাপড়ায় নেমেছে বাঙ্গালী। করিম মিয়া সাধারণ গৃহস্হ। এক ছেলে দুই মেয়ে, অভাবের সংসারে গোসল সেরে পরার মত তেমন কিছু নেই। বউ এর পুরোনো শাড়ি ভাঁজ করে পরেছে। প্রতিদিনই তাই করে। এছাড়া আর উপায় নেই। আশায় আছে, যুদ্ধ শেষ হবে। দেশের অবস্থা একটু শান্ত হলে, নিশ্চয়ই অভাব থাকবেনা। তখন সুন্দর দেখে একটা লুঙ্গি কিনে নেবে। বড় ছেলে কলেজে উঠেছে। তার জন্যও ভালো প্যান্ট শার্ট কিনতে হবে। সে অবশ্য যুদ্ধে গেছে। তারও ইচ্ছা ছিল যাবার কিন্তু শরীর ভালো না, বড্ড হাঁপানির টান। শীতের সময় এটা আরও বেড়ে যায়।

করিম মিয়া সেদিনও শাড়ি ভাঁজ করে পরেছে, লুঙ্গিটা টান করে রোদে দিয়ে শুকিয়ে রেখেছে।বিকেলে পান গাদি করছিল মেয়ে-বউসহ। বাজারে যাবে বেঁচতে। নুন, তেল, মরিচ আনতে হবে। বেচাবিক্রি খুব কম, লোকজন ভাতই পায়না পান খাবে কোথা থেকে!

এসময় বাইরে দুমদাম শব্দে কে বা কারা এল। করিম মিয়া দেখার জন্য বেড়িয়ে এল বাইরে। খাকি পোশাক দুজন সাথে জব্বার সর্দার। কিছু বলার- শোনার আগেই অতর্কিতে তাকে বেঁধে ফেলল। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল।

করিম মিয়ার দুই মেয়ে, বড় মেয়েটি ক্লাস নাইনে পড়ে। ছোটটি সেভেনে। যুদ্ধকালীন সময়ে পড়াশুনা তেমন নেই। দুজনেরই অনেক বুদ্ধি। শব্দ শুনেই তারা ঝটপট দৌড়ে পালালো। বাঁশঝাড়ের ভেতরে খুঁড়ে রাখা গর্তে গিয়ে লুকিয়ে পরল। খাকিরা এলে সবসময় তাই করে। তারা বেশ বুঝতে পারল বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। তারপরও বাবা বলেছে পালিয়ে থাকতে। কিছুতেই যেন বের না হয়।

ছোট বোন বলছে,- ” খাকি পোশাক লোকজন ছিল তাদের সাথে তাদের গ্রামের জব্বার মামাও আছে। বাবাকে কি মেরে ফেলবে। নাহ্ মারবে না জব্বার মামা তো আছে”।

মায়ের আহাজারি শোনা যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে বের হতে কিন্তু হওয়া যাবেনা। এরপর অনেকক্ষন কোন সাড়া শব্দ নেই। তারা দুবোন চুপিচুপি বেরিয়ে এল। আঙ্গিনায় কেউ নেই। মা-বাবা কেউ না, গেল কোথায়? পাশের নদীর পাড়ে বড় আমগাছটার তলায় শোরগোল শোনা যাচ্ছে। দুজনে পা পা করে এগিয়ে পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে দেখতে থাকল ঘটনা।

বাবাসহ বেশকিছু মধ্যবয়সী মানুষ সবাই তাদের গ্রামেরই । সবার হাত পেছনে  বেঁধে রেখেছে। খাকি পোশাক কিছু বলছে উর্দূতে। জব্বার মামা সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছে বাংলায়। সবার দিকে বন্দুকের নল তাক করা। বাবা কিযেন মিনতি করছে। খুব কাঁদছে। তাদের ভীষন ইচ্ছে করছে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে ঠাস ঠাস করে গুলি করে দিতে। কিন্তু তা করা যাবে না। থরথর করে কাঁপছিলো দুজনেই।

কিছুক্ষন পরে জব্বার মামা লাল দাঁত বের করে খি খি করে হেসে লুটিয়ে পড়ল। বাবার কাছে এসে তার শাড়ি দিয়ে বানানো লুঙ্গির কোচা ধরে দিল টান। একে একে সবার লুঙ্গি খুলে নামিয়ে দিল নদীতে। ডিসেম্বর মাসের অসম্ভব ঠান্ডায় সবাই ডুবছে আর ভাসছে। একজন পালিয়ে সাঁতরে পার হবার চেষ্টা করলে তাকে দুম করে গুলি করে দিল। পানি গুলো লাল হয়ে গেল। এরকম বেশ কিছুক্ষণ চলার পর খাকি পোশাক কি সব বলে পাশে থাকা খরের গাদায় আগুন ধরিয়ে চলে গেল। আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকল।

করিম মিয়া পুকুর থেকে উঠে এল। লজ্জায় তার মাথা নত। আশেপাশের মেয়েছেলেরা সবাই লজ্জায় লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে কিন্তু সামন যেতে পারছে না। করিম মিয়া শাড়িটা আবার পেঁচিয়ে নিয়ে ধীরপায়ে চলে এল। তার অপরাধ তার বড়ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গেছে। এত মানুষের সামনে তাকে উলঙ্গ করে ফেলল;এ লজ্জা কোথায় রাখবে!

রাতে তেমন কিছুই খেল না। ঠান্ডায় ভীষন হাঁপানির টান উঠেছে। সবাই কে ঘুমাতে বলে সে বসে রইল।পরদিন সকাল বেলা করিম মিয়াকে কোথাও পাওয়া গেল না। সবাই  অনেক খোঁজাখুঁজি করল তাকে আর পাওয়াই গেল না। মেয়ে বউ হাউমাউ করে কাঁদল, অনেক কাঁদল।

যুদ্ধ শেষ হয়েছে, দেশ স্বাধীন। সবাই লাল-সবুজের পতাকা হাতে উল্লাস মিছিল বের করেছে। করিম মিয়ার ছেলেও বাবা বাবা করে ডাকতে ডাকতে বাড়ি ফিরেছে বীরের বেশে। কিন্তু তার বাবা কোথায় গেছে কেউ জানেনা।

জব্বার সর্দারের বয়স এখন আশির উপরে। বয়সের ভারে নুয়ে পরা মানুষটাকে দেখলে কখনো মনে হয় না; সে একাত্তরেএমন ছিল। হাতে একখানা কার্ড নিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তুলতে। করিম মিয়ার ছেলেমেয়েও দেখে। কথাও বলে, পারলে রিকসাও ডেকে দেয়।

জব্বার সর্দার যেভাবে মুক্তিযোদ্ধা হল। তার ভাই মিলিটারিতে ছিল। যুদ্ধের অনেক পরে যখন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা কার্ড দিচ্ছিল সরকার। সে তার ভাইএর সহযোগীতায় সব কাগজ নকল করেই আজ একজন মুক্তিযোদ্ধা। গ্রামের সবাই জানে এ ঘটনা কে আর কি বলবে। বুড়ো মানুষ বরং তাকে দেখলে মায়া হয়। এখন তো সেই দেহ আর সেই দাপট নেই। সবার সাথে বেশ বিনয়ের সাথে কথাও বলে।

করিম মিয়াকে কেউ কেউ নাকি যুদ্ধ করতে দেখেছে। কেউ বলে সেদিনের ঘটনায় লজ্জায় আত্মহত্যা করেছে। তার ছেলে কিছুদিন খোঁজা খুঁজি করে কোন হদিস পায়নি। আর এসবে তো অনেক খরচও। এত টাকা সে কই পাবে। বাবা বেঁচে থাকলে তো ফিরতোই।

করিম মিয়ার যুদ্ধ ফেরত ছেলেটি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক।এখন রিটায়ার করেছে। এখনও তার মুক্তিযোদ্ধা কার্ড হয়নি। একসময় তো প্রয়োজন অনুভব করেনি কিন্তু রিটায়ার করার পর অভাব যখন চেপে বসেছে তখন মনে হয়েছে। সম্মানের সাথে তো অর্থের প্রাপ্তিও আছে। তাই শেষ সময় এসে কাগজপত্র জমা দিয়েছে। এখন তো দেশের অবস্থা ভালো না। আর সব কাগজও পাওয়া যায়নি। কিছু হারিয়ে গেছে। তাই হয়ত ঘোষণা হবে;নয়ত হবেই না!

আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে। সুফল সবাই ভোগ করছে। সেদিন যাঁরা যুদ্ধ করেছিল তারাও, যাঁরা করেনি তারাও। অনেকে মুক্তিযোদ্ধা মারা যাচ্ছে। সরকারী লোকজন সকল আয়োজনে জাতীয় পতাকা দিয়ে আবৃত করে,সৎকার বা সমাধিস্থ করার  আগে জাতীয় পতাকা খুলে ফেলে, সরকারের অনুমোদিত প্রতিনিধি  কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে, তাদের স্যালুট জানিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করছে।

আবারও কোন একদিন পাশাপাশি দুজন মানুষ মারা যাবে। যে যুদ্ধ করেছে তাকে সাধারণ কাতারে গ্রামের মানুষ সমাহিত করবে। আর তার বদলে স্যালুট দিয়ে, জাতীয় পতাকা নামিয়ে, জাতীয় পতাকায় ঢেকে ফুলে ফুলে সমাহিত হবে জব্বার সর্দারের। শুধু সেদিনের তফাত আকাশ বাতাস নিস্তব্ধ হবে, হাহাকার করবে মিথ্যার বেসাতিতে!!!

২৫৩জন ১১৪জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য