২০১৭ সালের মাঝা-মাঝি সময়ে মিয়ানমার রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গারা যখন সেদেশের নিরাপত্তার উপর হামলা করেছিল, তখন এর পাল্টা জবাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীও রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন শুরু করে দিলো। ফলে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করলো। এভাবে পালাক্রমে দলেদলে আসতে থাকা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়াল ১০ লাখেরও বেশি। যা আমাদের ছোট্ট একটা দেশের জন্য বিরাট একটা বোঝা। আমাদের মাথায় ঋণের বোঝা থাকলেও আমরা কিন্তু অতিথিপরায়ণ। আমাদের মানবতা একটু বেশি। কারোর দুঃখ দেখলে আমাদের দরদ উথলে পড়ে। কারণ মানবতার দিক দিয়ে আমরা পৃথিবীতে সেরা, তাই। আমাদের আরকিছু না থাকুক, কিন্তু মানবতা আছে।

এই মানবতার কথা ভেবে একসময় আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কুতুপালং গেলেন। নিজের চোখে রোহিঙ্গাদের সমস্যা দেখলেন। রোহিঙ্গাদের সমস্যা দেখে কাঁদলেন। সমাবেশে আমাদের দয়াময়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের বুকে টেনে নিয়ে বলেছিলেন, “আমরা ষোল কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে আরও লাখ দশেক রোহিঙ্গাকে আমরা খাওয়াতে পারব।” দয়াময়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর সারাবিশ্ব থেকে পেলো বাহাবাহা। রোহিঙ্গারা পেলো বেঁচে থাকার আশ্বাস। শুরু হলো মানবতার মহামানবদের প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ। অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য ছিল অসহায় রোহিঙ্গাদের সাহায্য করা।

সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন আমাদের দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন। এগিয়ে গেলেন বিভিন্ন মানবতার সংঘটন। সবাই নিজ নিজ সাধ্যমতো বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে কুতুপালঙের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। দেশের অনেক মসজিদে মসজিদে শরনার্থী রোহিঙ্গাদের জন্য চাঁদা উঠাতে শুরু করলেন। কেউ টাকা, কেউ পয়সা, কেউ জামাকাপড়, কেউ খাবার, কেউ বাসনপত্র সাহায্য হিসেবে দিতে শুরু করলেন। সেসব ত্রাণসামগ্রী ট্রাকে ভরে ভরে কুতুপালং নিয়ে রোহিঙ্গাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছিল।

সেসময় এমনও দেখেছি, নিজের প্রতিষ্ঠানের গরিব দুঃখীদের দুই টাকা সাহায্য সহযোগিতা করে না, সেসব মালিকরা দশ থেকে পনেরো দিন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণসামগ্রীর প্যাকেট বানিয়েছে। সেসব প্যাকেটে ছিল চিড়ামুড়ি, দুধ, চিনি, মিঠাই, পাউরুটি, চালডাল, তেল, লবণ, লুঙ্গি, গেঞ্জি-সহ আরও অনেককিছু। অথচ নিজের প্রতিষ্ঠানেই খেয়ে-না-খেয়ে যাঁরা চাকরি করে, তাঁদের জন্য একটি প্যাকেটও জুটেনি।

সেই প্যাকেট ট্রাকে ভরে সামনে “রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে ত্রাণসামগ্রী” লেখা ব্যানার টাঙিয়ে নিয়ে গেলেন রোহিঙ্গাদের জন্য। দিলেন তাঁদের। রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে গেলেন বিভিন্ন এনজিও সংস্থা-সহ মানবাধিকার সংস্থাও। আসলেন বিদেশিরাও। আসলেন নোবেলজয়ী কয়েকজন সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ। সরকার জায়গা দিলেন। দিলেন বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতি। বানিয়ে দিলেন থাকার ঘরদোর। রোহিঙ্গাদের দেখভাল ও নিরাপত্তার জন্য দিলেন সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনছার-সহ শতশত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দিলেন এইজন্য যে, তাঁরা রোহিঙ্গারা নিরুপায় অসহায় বলে। সরকারের উদারতায় বাংলার প্রতিটি মানুষও সেসময় খুশি ছিলেন। বাংলার মানুষ ভেবেছিল ওঁরা আর থাকবেই বা ক’দিন? থাকুক! কিন্তু এই থাকা যে চিরস্থায়ী থাকা হবে, তা বাংলার খুব কম মানুষেই জানতো। বেশিরভাগ মানুষেই জানতো তাঁরা অসহায়। কিন্তু এখন আর রোহিঙ্গাদের মাঝে অসহায় বলতে কেউ নেই। রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষের চেয়েও ভালো অবস্থায় আছে। বিশেষ করে কক্সবাজার উখিয়া কুতুপালং সহ এর আশপাশের স্থানীয় মানুষের চেয়ে খুবই ভালো আছে।

তাই এখন আর বাংলার মানুষ কেউ রোহিঙ্গাদের জন্য ভাবে না। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যায় না। মসজিদে মসজিদে রোহিঙ্গাদের জন্য চাঁদা ওঠায় না। অনেকে রোহিঙ্গাদের নামও শুনতে চায় না। রোহিঙ্গা নামটি এখন এদেশের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। গণমানুষের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের নাম। ভবিষ্যৎ বিপদের নাম এখন রোহিঙ্গা। তাই বলে রোহিঙ্গাদের কিছুই আসে যায় না। ওঁরা রোহিঙ্গারা এখন এদেশের কাউকে তোয়াক্কা আর জমা-খরচের হিসাব-নিকাশও দেয় না। ওঁরা রোহিঙ্গারা চলছে ওঁদের নিজের মত করে স্বাধীনভাবে।

তাঁদের এখন মানুষের দেওয়া ত্রাণসামগ্রীর প্রয়োজন হয় না। লাগেও না। তাঁদের ঘরদোর আছে। টাকাপয়সা আছে। কক্সবাজার উখিয়া কুতুপালঙের স্থানীয় বাসিন্দাদের যা না আছে, রোহিঙ্গাদের তা আছে। থাকে শুধু সরকারি শরনার্থী শিবিরে। তাতে দোষের কিছুই নেই। এই শরনার্থী শিবিরে থেকে ওঁরা রোহিঙ্গারা বিদেশ যাবার পাসপোর্টও সংগ্রহ করছে। বিদেশেও যেতে পারছে। চুরি ডাকাতি ছিনতাই খুনখারাপি সবই করতে পারছে। খুন তো সময় সময় করেও থাকে। ওঁদের এখন অনেক শক্তি। ওঁদের অত্যাচারে স্থানীয় বাসিন্দা সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরাও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

রোহিঙ্গারা গতবছরও বেঁচে থাকার আকুতি-মিনতি করেছিল। আজ ওঁরা স্থানীয় নেতাদের গুলি করে মেরে ফেলে। ওঁদের সাহায্য সহযোগিতায় নিয়োজিত থাকা এনজিও সংস্থার প্রতিনিধিরাও প্রতিনিয়ত ওঁদের হাতে মার খাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের হাতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও মার খাচ্ছে। ওঁরা রোহিঙ্গারা এখন হয়তো নতুন করে ঘোষণা দিতে পারে স্থায়ীভাবে থাকার। কারণ ওঁরা এখন মিয়ানমার থেকে ভালো আছে। সুখে আছে। এই সুখ ওঁরা কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইবে না। হাতছাড়া করবেও না। ওঁরা এই দেশ থেকে কখনোই স্বেচ্ছায় যেতে চাইবে না।

ওঁরা রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে থাকা অবস্থাও এমন করেছিলো। কিন্তু সেখানে ওঁরা সফল হতে পারেনি। মিয়ানমার সরকারও ওঁদের নাগরিকত্ব দেয়নি। ওঁদের নাগরিকত্ব ছিলও না। সেই ক্ষোভে রোহিঙ্গারা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের ৩০টি নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলার ঘটনা ঘটিয়ে বিশ্বকে জানান দিয়েছিল, আমরা রোহিঙ্গা মুসলমান। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এবং মিয়ানমারের সব নাগরিক জানতো, ওঁরা রোহিঙ্গারা বিষাক্ত প্রজনন। এখনো মিয়ানমারের অনেক নাগরিক রোহিঙ্গাদের জংলি জানোয়ার বলেই মনে করে থাকে। ওঁদের ব্যবহারিক ভাষাকে মিয়ানমারের নাগরিকরা জংলি ভাষা হিসেবে মনে করে। আরও অনেককিছুর কারণেই, মিয়ানমার সরকার থেকে ওঁরা নাগরিকত্ব আদায় করতে পারেনি। পারেনি শান্তি বজায় রেখে সেদেশে থাকতে। এ-সবকিছু আমাদের জানা থাকতেও আমরা ওঁদের সাদরে গ্রহণ করে বুকে টেনে নিয়েছি। আদর-সমাদর করেছি। খাবার দিয়েছি। থাকার জায়গা দিয়েছি। জামাকাপড় দিয়েছি। বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। ওঁদের দুঃখ দুর্দশা সেরে ওঠার সুযোগ দিয়েছি। বিনিময়ে ওঁরা এখন আমাদের দিচ্ছে বাঁশ।

ওঁরা এখন অন্যরকম সুর তুলেছে। ওঁরা বলছে, মিয়ানমার সরকার ওঁদের নাগরিকত্ব সহ আরও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা না দিলে ওঁরা আর মিয়ানমার ফিরে যাবে না। রাখাইনে ওঁদের যেমন নেতা ছিল, এখানে ওঁদের নেতাও আছে। রোহিঙ্গাদের নেতারা এখন সমাবেশের ডাক দিয়ে মনের আনন্দের দুইবছর ফুর্তি উদযাপন করে। লক্ষলক্ষ রোহিঙ্গা জড়ো হয়ে মিছিল মিটিং করে। এতে কী বোঝা যায়? এতে বোঝা যায় আর কিছুদিন পরই ওঁরা এদেশের নাগরিকত্ব চাইবে। ন্যাশনাল আইডি কার্ডে হাতে পাবার জন্য আন্দোলনে নামবে। আরও দশজন নাগরিকের মতো ওঁরাও নাগরিকত্ব সুযোগসুবিধা ভোগ করতে চাইবে। বিশ্বের কাছে বেঁচে থাকার অধিকার চাইবে।

যদি তা-ই হয়, তাহলে কি আমাদের মানবতার সরকার ওঁদের সেই চাওয়া পূরণ করতে পারবে? না করতে পারলেই হবে মহাবিপদ। রোহিঙ্গা দ্বারা আগামীতে ঘটবে এমন বিপদগুলো বর্তমানে কিছু কিছু রূপধারণ করতে শুরু করেছে। বর্তমানে রোহিঙ্গারা নানারকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত দুই বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে ৪৭১টি মামলাও হয়েছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৪৩টি৷ রয়েছে ধর্ষণ, অপহরণ, মাদক চোরাচালানের অভিযোগও৷ হয়তো আর কিছুদিন পর রোহিঙ্গারা আরও ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। তখন আর কিছুতেই ওঁদের দমানো যাবে না। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফেরত পাঠানোর বিষয়টি আমাদের মানবতার সরকারকে এখনই ভেবে দেখা উচিৎ বলে করি। নাহয় অবস্থা হবে আরও ভয়াবহ। আরও বেগতিক। একসময় রোহিঙ্গারা কক্সবাজার উখিয়া কুতুপালং সহ এর আশ-পাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের জায়গাজমি জবরদখল করে নিবে। এরপর স্থানীয় বাসিন্দাদের গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে, এঁরাই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে। সেদিন বেশি দূরে নয়, অতি নিকটেই।

১৪৭জন ১৩জন
15 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য