সেইদিনই বাবা দিল্লী থেকে কল করে আমাদের অবস্থা জানতে চাইলেন। বললাম, আমি বুঝতে পারছি না এখন আমরা কি আমরা সরকারী বাসভবনে থাকব না কি কোনও আত্মীয়র বাসায় চলে যাবো। এ-প্রশ্ন টি করতে বাধ্য হয়েছিলাম কারন ডঃ ইনামুল হক সাহেবকে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়য়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি এসে উপাচার্যের প্রাপ্য সুবিধা গুলি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বাবা, চুপ করে থেকে বললেন, তোমরা এ-বাসায় থাকবে- আমি ব্যবস্থা করছি। যাই হোক কিচ্ছুক্ষণ পর, উপাচার্যের অফিসের সেক্রেটারি এসে আমাকে বললেন, আপনারা স্যারের অবস্থায় যা যা সুবিধা ভোগ করতেন তাই ভোগ করবেন, কারন স্যার এখনও তার দায়িত্ব নতুন উপাচার্যকে বুঝিয়ে দেন নাই। এরপর বাবা বোধহয় দুই তিনদিন পরে দেশে ফিরলেন। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, এ-কেমন প্রশাসন? তিনি মুচকি হেসে জবাব দিলেন- দেশের অধঃপতন শুরু হল। কিন্তু আমি বাবার চেহারায় কোন বিষাদের ছায়া দেখলাম না। কেন- তা আমি জানি না ।

এরপর বাবা মা’ কে বললেন- প্যাকিং শুরু করে দাও আমরা দুই তিনদিনের মধ্যেই চট্টগ্রাম  চলে যাবো। বাবা মুক্তিযুদ্ধে যাবার আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়য়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর এবং হেড ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়য়ের চাকুরী থেকে বিনা বেতনে ছুটি নিয়েই উপাচার্য পদে যোগ দিয়েছিলেন। আমরা যাবার প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। সন্ধ্যায় অনেকেই  বাবার সাথে দেখা করতে এলেন- তাঁরা বাবাকে বললেন যাবার আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে যেতে। তিনি বললেন- নিশ্চয়ই যাবো- আমিতো আমাকে অন্যের মত হতে দিতে পারি না। তিনি দেখা করে এসে যা বললেন, তা হল- বাবাকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারের তিনি কিছুই জানেন না । বাবা- প্রধানমন্ত্রীর কথায় মুচকি হেসে বলেছিলেন- প্রশাসন তাহলে কার হাতে?  প্রধানমন্ত্রী- বাবাকে বললেন- আপনি চট্টগ্রামে যাবেন না- আমি আপনার জন্য একটা ব্যবস্থা করছি। বাবা বলেছিলেন, সেটা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমি বলছি আপনি কোথাও যাবেন না।   যাইহোক কিছু আদেশ অমান্য করাও যায় না । আমরা কিছুদিন থেকে গেলাম। ( মনে হয় পনেরো বিশ দিন হবে)  আমরা ভাসমান অবস্থায় ছিলাম । সরকারের পক্ষ থেকে এতদিনেও কোনও আদেশ না আসায়,  একদিন সকালে উঠে বাবা- মা’কে বললেন আজ রাতের ট্রেনে আমরা চট্টগ্রামে যাচ্ছি। মা’  বললেন- তাহলে তিনি কেন থাকতে বললেন? বাবা বললেন- হয়তো দেশ কারও ইশারায় চলছে? এবং আমরা রাতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। ট্রেনে বাবা বলেছিলেন তিনি শিক্ষামন্ত্রীকে বলে এসেছেন-যা বলেছিলেন তা হল- একটি স্বাধীন দেশের এতো স্বাধীনতা । তোমরা তো দেশের অধঃপতন জন্য দায়ী থাকবে। তোমরা সদ্য স্বাধীন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার বদলে অন্ধকারে ঠেলে দিও না।

 

৪৫৫জন ৪৫৫জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ