“ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন নেমে এসেছে। তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে ছিড়ে খুড়ে খাচ্ছে মরা মানুষের দেহ। তাদের চোখ চক চক করছে। কিন্তু মৃত মানুষের সংখ্যা এত বেশী যে শকুনের খেয়ে শেষ করতে পারছে না। শকুনদেরও খাওয়ায় অরুচি এসে গেছে। মরা মানুষের গা থেকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলেছে জামা কাপড়। তাদের অনেকের তখনো গা গরম। সবেমাত্র মরেছে। পথে ঘাটে নালা নর্দমায়—সর্বত্রই কলেরায় মরা মানুষ পড়ে আছে। জন সার দেখতে পেয়েছেন একটি শিশুর মৃতদেহ। শিশুটির গায়ে একটি শাড়ির অংশ পেঁচানো। তাঁর হতভাগী মা পেঁচিয়ে পুটুলি বানিয়েছে। ট্রাকের চলার সময় অসুস্থ শিশুটি মারা গেছে। চলন্ত ট্রাক থামেনি। মৃত ছেলের জন্য ট্রাক থামানো কোনো মানেই হয় না। আরও অনেক মৃতপ্রায় মানুষ এই ট্রাকেই ধুঁকছে। আগে পৌঁছাতে পারলে হয়তো কোনো হাসপাতাল পাওয়া যেতে পারে। তাদের সুযোগ মিলতে পারে চিকিৎসার। বেঁচেও যেতে পারে। এই আশায় সময় নষ্ট করতে কেউ চায় না। শিশুটির পুটুলী করা মৃতদেহটিকে ট্রাক থেকে রাস্তার পাশে ধান ক্ষেতে ছুড়ে ফেলা দেওয়া হয়েছে”

…ঘটনাটি একাত্তরেরই। সেসময়ে পাকি হায়নাদের নির্মমতা,নিকৃষ্টতার কথা তো সবারই জানা।বিশ্বের অন্যতম ৫ টি গণহত্যার মধ্যে একাত্তরের গণহত্যা অন্যতম।উপরে যে ঘটনাটি দিলাম সেটা খুবই সামান্য একটি ঘটনা।কিন্তু আসলেই কি সামান্য? একটু ভাবুন আপনার বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে…
রোগ,শোক,জরা,ব্যাধি সবকিছুই যেনে একেবারে জেঁকে ধরেছিল! একদিকে কলেরার মহামারি অন্যদিকে হায়নার থাবা সেইসাথে বেঁচে থাকার নিরন্তন লড়াই।কি দুর্বিসহ অবস্থা তাই না? কোলের সন্তান কোলেই মারা যাচ্ছে তাঁকে আবার মা নিজ হাতেই পুটুলীতে করে ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছে! বুঝতে পারছেন কি সেই মায়ের মানসিক অবস্থা? না বুঝলে বোঝার চেষ্টা করুন,ভাবুন…

মূল প্রসঙ্গে আসি এবার। একাত্তরে জীবন রক্ষার তাগিদে দেশ ছেড়ে শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রায় এককোটি  মানুষ। আচ্ছা, যারা নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে, দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পারি জমিয়েছিলেন তাঁদের সাথে মৃত মানুষের পার্থক্য কি ছিল জনেন কি? তাঁরা কি খুব ভালো ছিলেন নিজের দেশ ছেড়ে ? কি মনেহয়? কিছুই যদি মনে না হয়, তবে জহির রায়হানের Stop Genocide থেকে টুকে দেয়া নিচে লেখাটুকু পড়ুন তবেই বুঝবেন। তার আগে বলে নিই, লেখাটার শুরুটা কিন্তু অন্য দেশে পাড়ি জমানো সেই অভাগা শরনার্থীদের জীবন পথে ছুটে চলার করুণ বাস্তবতা দিয়েই”

“দেখলাম দিগন্ত বিস্তৃত আধমরা মানুষের চলমান মিছিল। দেহশক্তি নিঃশেষ তবুও ওদের চলতে হয়। মাথায় বয়ে নিয়ে চলছে ওদের শেষ পার্থিব সম্বল। অধিকাংশেরই দৃষ্টি উদভ্রান্ত। নৃশংস গণহত্যার ভীতি ছড়িয়ে আছে ওদের চোখে মুখে সারা দেহে। আবার কারো কারো মুখ পাথরের স্তূপের মত স্থবির, ভাবলেশ হীন; যেন এই নিরন্তন পথ চলার শেষে বেঁচে থাকা আর মরে যাবার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। দিনের পর দিন শরনার্থীর মিছিল এগিয়ে চলে। আহার নেই,ঘুম নেই, দুঃসহ ক্লান্তি। তবুও যেন বিশ্রাম নেবার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত সত্যি বিশ্রামের সুযোগ আসে; কেউ বিশ্রাম নেয় গাছতলায়, কেউ গুদামঘরে।ভারতে এ ধরনের বহু শরনার্থী শিবির খোলা হয়েছে কিন্তু প্রতি ঘণ্টায় যখন হাজার হাজার লোক আসতে থাকে তখন এতগুলো শিবিরেও স্থান সংকুলান হয় না।

6666

অন্য একটি শিবিরে একজন কিশোরীকে দেখলাম। বয়স বড়জোর ১৬। ওর বাবা ছিলেন খুলনার এক ব্যবসায়ী। হানাদার সৈন্যরা ওদের ঘরে প্রবেশ করে মেঝেতে ফেলে ছয়-ছয় জন মিলে পালা করে ধর্ষণ করে ওকে। চলে যাবার সময় ওর বাবা, ২ ভাই আর চাচাকে গুলি করে হত্যা করে। ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশে যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তা নাদির শাহ’র নৃশংসতাকেও হার মানিয়েছে। বাংলাদেশে লুটপাট, বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করা পোড়ামাটি নীতিতে ইয়াহিয়া খান দিল্লীর সুলতান মাহমুদকেও হার মানিয়েছে। বাংলাদেশ নিধনে ইয়াহিয়া মুসলিনীকেও হার মানিয়েছে। ইয়াহিয়া খান হার মানিয়েছে হিটলারকেও”।

বিজয়ের আগ পর্যন্ত শরনার্থীর সংখ্যাটা ছিলো এক কোটির মতো। এদের অনেকেরই আর ফেরা হয়নি।কি অসহনীয় কষ্টে সেই মানুষগুলো দিনাতিপাত করেছে, তা পরবর্তীকালে তাঁদের নিয়ে নির্মিত প্রতিটি প্রতিবেদনেই ফুটে উঠেছে।

 

১৯৭১ সালে জুন মাসে লাইফ ম্যাগাজিনের সাংবাদিক জন সার কলকাতায় এসেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ফটোগ্রাফার মার্ক গডফেরি। তারা দুজনে একটি গাড়িতে করে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন শরণার্থীদের চিত্র। কখনো তারা গিয়েছেন সীমান্ত এলাকায়। কখনো কলকাতায়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায়। লাইফ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত জন সারের সেই প্রতিবেদন ফুটে উঠে একটি হাসপাতালের চিত্র-

“কৃষ্ণনগর হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই। যারা হাসপাতালের মধ্যে এসে পড়েছেÑ তখনও বেঁচে আছে, তাদের রাখা হয়েছে বাইরে খোলা মাঠে। যাদের চিকিৎসা শুরু হয়েছে তাদের রাখা হয়েছে অস্থায়ী ছাউনিতে। বাঁশের কাঠামোতে কাপড় বসিয়ে ছোট ছোট শিবির করে ছাউনি তৈরি হয়েছে। সেখানে কিছু কিছু মানুষ বেঁচে থাকার জন্য মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। তাঁদের চোখ গর্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। অর্ধচেতন বা অচেতন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পড়ে আছে। তাদের মুখে মাছি পড়ছে। মশা ঘুরছে। অনন্তবিদারী দুর্গন্ধ। স্বজনদের কেউ কেউ হাত দিয়ে, তাল পাখা দিয়ে বা কাপড়ের আঁচল দিয়ে মাছি তাড়ানোর চেষ্টা করছে। সাদা এপ্রোন পরা নার্সরা তাদের শিরায় ঢোকানোর চেষ্টা করছে স্যালাইন। তাদের চেষ্টার কমতি নেই। কিন্তু নার্সের বা ডাক্তারের সংখ্যা হাতে গোণা। অপ্রতুল।
এই হতভাগ্যদের অর্ধেকই শিশু। সাংবাদিক জন সার একটি সাত বছরের ফুটফুটে মেয়েশিশুকে তুলে এনেছে রাস্তা থেকে। তার চোখ বড় করে খোলা। তার হাত ঝুলে পড়েছে। নার্স এক পলক দেখেই বলছে, সব শেষ। কিছু করার নেই। মেয়েটি মরে গেছে। একজন ক্লান্ত ডাক্তার বলছেন, এর চেয়ে কুকুর-বেড়ালেরাও ভালো করে মরে। কিছুটা হলেও তারা চেষ্টা তদ্বির পায়। আর এই শরণার্থী মানুষের কলে পড়া ইঁদুরের মতো মরা ছাড়া কপালে আর কিছু লেখা নেই”

111

দেশে থেকে যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করছেন, তাঁদের চেয়ে শরনার্থী শিবিরের মানুষগুলো কোনভাবেই কম আত্মত্যাগ করেন নি। এদের কারোর আত্মত্যাগেরই কোন তুলনা হয় না। আপনারা যদি  শাহরিয়ার কবিরের লেখা একাত্তরের যীশু (উপন্যাস) অবলম্বনে   নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর পরিচালনায়  “একাত্তরের যীশু” ছবিটি দেখে থাকেন, তাহলে দেখবেন মৃত শিশুকে পাশে রেখে না খেতে পেয়ে শক্তিহীন মায়ের আর্তনাদ। দেখবেন প্রিয় মানুষটির লাশ চোখের সামনে পচতে দেখার দৃশ্য।লাশে একমুঠো মাটি না দিতে পারার অসহ্য যন্ত্রণা !

222

কতশত দুধের বাচ্চার কপালে জুটে নি মায়ের বুকের একফোঁটা দুধ। এ দৃশ্য কি চোখে দেখার ! তবুও দেখতে হয়েছিলো একটাসময়ে, আমার লিখতে হচ্ছে এ সময়ে। সেরকমই একটা ঘটনার খানিকটা তুলে দিচ্ছি-

“এতো বেশি সংখ্যায় হাড্ডিসার শীর্ণশিশু মায়ের স্তন চুষছে এবং তাঁদের লোমচর্ম বৃদ্ধের মতো দেখাচ্ছে। এ ধরনের জিরজিরে শিশু কোলে নিয়ে স্তন্যপানের ব্যাপারটায় মায়েরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে- এ দৃশ্যটায় তাঁরা অকারণে আঁতকেও উঠছে না। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে যদি শিশুটি না খেতে চায়, যে কোনো তরল প্রত্যাখান করে, তাহলে তাঁকে আর তোষামোদ না করেই ফেলে রাখা হচ্ছে।”

…. শরনার্থী শিবিরের এই ঘটনাটি বিবৃত করেছেন ডা. মেয়ার কারিতাস। (বাংলাদেশের গণহত্যা ১৯৭১- পৃষ্ঠা ১৯২)

277993_10151050940633363_990709708_o3-400x266

এবার একটা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করি। আচ্ছা, একটা মাঝারি সাইজের রুমে কজন শুতে পারবেন?আমি তো বেশ বড় একটা ঘরে একাই থাকি। এমনকি কারো সাথে আমার রুম শেয়ার করতেও ঘোর আপত্তি। কিন্তু আজকে আমাদের এই অফুরন্ত আরাম আয়েশি জীবন যাপনের সুযোগ করে দেয়া মানুষগুলোর কথাটা ভেবেছেন একবার? একটা অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে, ঘরে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে ৫০০০ মানুষ। উফ ! দুঃসহ… ! কিন্তু এটাই বাস্তবতা ছিল একাত্তরের শরনার্থী শিবিরগুলোতে। এ প্রসংগে শিডনি শনবার্গ এর ডেটলাইন বাংলাদেশ-নাইন্টিন সেভেন্টিন ওয়ান এর পৃষ্ঠা- ৫৭ তে রয়েছে-

“টিমটিমে বাতির আলোয় রেলস্টেশনের শান বাঁধানো স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে গাদাগাদি করে শুয়ে থাকা ৫০০০ শরণার্থীকে মনে হচ্ছে যেন মৃত্যুর চাদরে আবৃত নিথর সত্তা। এক সময় সেই জড়পিণ্ড যেন সামান্য নড়েচড়ে ওঠে। কেউ হয়তো একটি হাত অথবা পা নাড়ালো, কেউ বমি করে উঠলো, কারো গোঙানির শব্দ, একটি বাচ্চা তারস্বরে কাঁদছে। মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে এক বৃদ্ধ, ঘোর-লাগা দৃষ্টি, মৃত্য পথযাত্রী। হাড় জিরজিরে মাছি তাড়িত শিশু হামাগুড়ি দিতে গিয়ে একটু সরে গিয়েছে পরিবারের কাছ থেকে। বাবা-মা’র অনুপস্থিতি টের পেয়ে হঠাৎ জাগা কান্নার সাথে দমকে উঠতে থাকে কাশি। সচকিত হয়ে জেগে উঠলেও বাবা মা এতোই ক্ষীণশক্তি ও ঘোরাছন্ন যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারছে না। পূর্ব পাকিস্তানের বাড়িঘর ছেড়ে এই দীর্ঘ পদযাত্রার শরণার্থীরা একেবারেই শক্তিহীন”…

1

এই ঘটনাগুলো পড়ে মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছে হয় যে, সেই হাড় জিরজিরে শিশুটি কি এখনো বেঁচে আছে? ঐটুকু বয়সে নিজের অজান্তেই একটা মানচিত্র জন্ম দেবার সংগ্রামে তাঁর অংশীদারিত্ব নিয়ে কি সে এখন গর্ব করে ? হয়তো করে না, হয়তো তাঁর সেই অংশীদারিত্বই তাঁর জীবনটাকে এতোটাই এলোমেলো করে দিয়েছে যেটা গুছিয়ে নিতে এখনো নিত্য তাকে হিমশিম খেতে হয়। হবেই তো ! স্বাধীনতার পরে আমরা কতোটুকু ভেবেছি তাঁদের কথা? যারা এ দেশে ছিল তাঁদেরকেই আমরা প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পারি নি, সেখানে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উদ্বাস্তু মানুষগুলো তো বহু দূরের কথা। সেদিনের সেই ছোট্ট শিশুটি হয়তো আজ পঞ্চাশ কোঠায় পা দিয়েছে। তাঁর জিরজিরে হাড়গুলো এখনো ঢাকা পড়েনি চামড়ার আবরণে। সে হয়তো মনে মনে ভাবে “শুনেছিলাম বাংলাদেশ নামের দেশটার স্বাধীনতার জন্য আমাদের ঘর বাড়ি ছেড়ে আসতে হয়েছিলো। আহা ! আমার কপালটা বুঝি সেদিন থেকেই পুড়েছে…”

[চলবে…]

বি.দ্রঃ

০১. প্রতিটি উক্তির তথ্যসূত্র উক্তির সাথেই দেয়া।

০২. ছবি সৌজন্যে- জন্মযুদ্ধ ৭১। কিন্তু বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পের এই ছবিগুলো তুলেছেন মেরিলিন সিলভারস্টোন, রেমন্দ দিপার্দোনে, পেনি টুইড এবং আরো অনেকে যাঁদের নাম পরবর্তীতে জানা যায় নি।

৭০০জন ৭০০জন
0 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ