একটি প্রতারণার গল্প

নীরা সাদীয়া ১৪ জুন ২০২০, রবিবার, ০৮:৫৩:৩০পূর্বাহ্ন গল্প ১০ মন্তব্য

ইরা : জালাল, কেমন আছো?

জালাল : (থতমত হয়ে) জ্বী ম্যাডাম, ভালো।

 

জালাল আর ইরার চোখের দিকে তাকাতে পারলো না। মাথা নীচু করে রইলো।

 

ইরা অরণ্যের স্ত্রী। অরণ্য এই অফিসের বস। জালাল হলো দারোয়ান। দারোয়ানের চাকরি ব্যতীত জালালের একটি ব্যবসাও আছে। ইরা আজ দ্বিতীয়বার অরণ্যের অফিস ঘুরে দেখতে এসেছে। এসেই জালালের সাথে দেখা। ইরা ফিরে গেল ১ বছর আগের স্মৃতিতে…

 

আজকাল অনলাইনে অনেকেই পণ্য কেনে। এটা দেখে ইরাও উৎসাহিত হয়ে একটি পেইজ থেকে খুব সুন্দর একটি সাদা কালো শাড়ি অর্ডার করেছিলো। বিক্রেতা হিসেবে ওপাশে ছিলো জালাল। জালালের কাজটা মূলত এরকম…সে পণ্যের মূল্য আগেই বিকাশে নিয়ে নেয়। তারপর কুরিয়ারে জিনিসটা পাঠাতে তালবাহানা করে। অথবা ক্রেতাকে বলে পাঠিয়ে দিয়েছে, কিন্তু কুরিয়ার সার্ভিস জিনিসটা মেরে দিয়েছে। এসব বলে যদি কাজ না হয়, অনলাইন পেইজ থেকে ক্রেতাকে ব্লক করে দেয়। ইরার সাথেও ঠিক এটাই ঘটেছে! ঘটনাটা ইরা কিছুতেই মানতে পারছিলো না। তাই অন্যান্য পেজগুলোতে সে এ ঘটনার স্ক্রিনশটসহ বিস্তারিত লিখে পোস্ট করে, যেন অন্যান্য ক্রেতাগন এই লোক হতে সাবধানে থাকে।

 

ইরার এই পোস্টের কারণে জালালের ব্যবসায় ভাটা পড়ে। জালাল তাই প্ল্যান করে কিভাবে এর প্রতিশোধ নেওয়া যায়। সে ইরার ইনবক্স ভালো করে চেক করে তারপর পরিকল্পনা করে। সে কিছু পুরানো কথপোকথন দেখতে পায়…

 

:আপু,আপনি আমাদের পেইজের সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা বুক করেছেন।

:আচ্ছা।

:আপু, শাড়িটা কি বিশেষ কেউ কিনে দিচ্ছে?

:না।

:বাবা দিচ্ছেন?

:না, আমি নিজেই কিনছি।

 

এসব কথপোকথন থেকে এবং প্রোফাইল দেখে বুঝে নেয়, ইরা একদম একা। একা মানুষকে ঠকানো খুব সোজা। তাই সে ইরার জন্য ফাঁদ পাতে। ম্যাসেঞ্জারে আরেকটা ভূয়া আইডি থেকে ইরাকে একটা ভালো চাকরির অফার দেয়। ইরা বর্তমানে যে চাকরিটা করছিলো, তারচেয়ে ভালো। এরকম বিজ্ঞাপন ইরা প্রায়ই দেখে,কিন্তু এগিয়ে যায় না। এবার কোয়ারান্টিনে বসে কেন যেন তার মন চাইলো এটা একটু খতিয়ে দেখতে। তাই করলো। তাদের পেইজে ম্যাসেজ দিলো। সহজেই উত্তর পেল। তারপর লোকটা ফোন করে বললো,

 

:আপনি সিভি নিয়ে আমার সাথে নদীর ধারে দেখা করুন।

:আচ্ছা।

:আমার বাইক আছে। তাতে করে আপনাকে নিয়ে আমি আমার অফিসে যাব। আমার অফিস মধুপুর। ওটার মালিক আমিই।

:আপনি অফিসের ঠিকানা দিন, আমি নিজেই চলে যাব। আমি আপনার বাইকে যাবো না।

:আশ্চর্য! আপনি আমার অফিসে চাকরি করবেন, আর এতটুকু বিশ্বাস নেই আমার ওপর?

:চাকরি করব মানে আপনার বাইকে করে ঘুরতে যাব এমন তো বলিনি!

:এজন্যই মেয়ে মানুষকে নিতে চাই না!

 

ইরা ফোন কেটে দিলো। ” মেয়ে মানুষ ” শব্দটা তার কাছে খুব অপমানজনক লাগলো। এরপর লোকটার দেয়া তথ্যগুলো ঘাটতে থাকলো। লোকটা বিশ্বাস অর্জনের জন্য একটা নাম ও ঠিকানা দিয়েছিলো। সেটা চোখে পড়লো:

 

“ইশতিয়াক অরণ্য

ডিরেক্টর অব মুন গ্রুপ

মধুপুর, টাঙ্গাইল।

ফোন:০১৩২****”

 

ফোন নাম্বার তো ঠিকি আছে। কিন্তু কথাবার্তা, আচরণে কেমন খটকা লাগে। একটা কোম্পানির বস এমন হতে পারে? ইরা ভাবতে থাকলো কিভাবে এর রহস্য বের করা যায়। টাঙ্গাইলে আছে তার এক বন্ধু। তাকে দিয়ে প্রথমে খোঁজ নেয়ালো। সে খবর নিয়ে জানালো মুন গ্রুপ এবং তার মালিক অরণ্য দুটোই সত্য। অরণ্য মানুষ হিসেবেও খুব ভালো। তারপরও ইরার মন থেকে সন্দেহ গেলো না। এভাবে দেখতে দেখতে ছ/সাত মাস পার হয়ে গেলো। ইরা আবার তার বন্ধুকে বললো,

 

:আমি মুন গ্রুপে যেতে চাই।

:ঠিকাছে, চলে এসো। আমি তেমাকে নিয়ে যাব।

 

যা ভাবা, তাই করা। বন্ধুর সাথে করে মুন গ্রুপে চলে গেলো ইরা। গিয়ে অবশ্য অরণ্যকে পেলো না। তার ব্যক্তিগত সহকারী জানালো আগামী দিন গেলে তাকে পাওয়া যাবে। অগত্যা বন্ধুর বাড়িতে একটা দিন কাটিয়ে পরদিন আবার গেলো সেখানে। এবার অরণ্যের দেখা পেলো।

 

ইরা ও অরণ্য সামনাসামনি বসে আছে। ইরার মুখে সব ঘটনা শুনে অরণ্য একদম অবাক। সে এসবের কিছুই জানে না। তার কোন বাইক নেই, সে কাওকে চাকরি দেবে বলে ডেকেও পাঠায়নি। তাহলে তার নাম ভাঙিয়ে কে করলো এটা? ইরার দেয়া ফোন নম্বরে কল করে দেখলো এটা তারই অফিসের জালালের নম্বর। এবার সব পরিষ্কার হলো তার কাছে!

 

জালাল মূলত অনলাইন ব্যবসায় ভাটা পরার ঝালটা মেটাতে চেয়েছিল ইরার ওপর। বাইকে করে কোথাও একটা নিয়ে গিয়ে হয়ত মেরে ফেলত, নয়ত অপহরণ করত। তাই সে ঐ ছক কষেছিল। কিন্তু ভাগ্য ইরার পক্ষে ছিলো। তাই সে বেঁচে যায়। অরণ্য জালালকে চাকরি থেকে ছাটাই করে। মামলাও দিতে চায়। কিন্তু তার ছোট ছোট বাচ্চা আর বৌয়ের দিকে চেয়ে তা আর দেয়নি। জালাল আজ আবার এসেছে সবার কাছে ক্ষমা চাইতে।

 

এই কয়েক মাসে অনেক কিছু ঘটে গেছে। ইরাকে দেখে অরণ্যের খুব পছন্দ হয়। দুই পরিবারের মাঝে কথা হয়। সব ঠিকঠাক মিললে তাদের বিয়ে হয়। আর এসব প্রতারক জালালরা অনুশোচনায় ভোগে…

 

(ছোটগল্প)

২৪৭জন ১৬৮জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য