বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আদেল ও সাঈদ।
পড়া-শোনা শেষ করে একটি গ্রামে তারা স্কুলের শিক্ষকতা কর্মে নিয়োজিত।
গ্রামটিতে কবর ও মাজার খুব বেশী, মানুষ ওগুলোর তা’যীম করে, নযর-নেওয়াব পেশ করে; উরস করে।

স্কুলে যেতে হয় বাসে করে।
একদিন বাসের ভিতর আদেল ও সাঈদ পরস্পরিক কথাবার্তায় লিপ্ত।
এমন সময় জনৈক বৃদ্ধ বাসে উঠে ভিক্ষা চাইতে লাগলো, গায়ে তার হাজার তালি লাগানো পোষাক।
তাও ময়লা মাখা।
বয়সের ভাড়ে কাঁপছে, দেখে মনে হচ্ছে অর্ধ পাগল; মুখের লালা বার বার মুছে ফেলছে হাতের আস্তিনে।
গাড়ীতে চড়ে সে যাএীদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করছে, তাদের ভয় দেখাচ্ছে, দাবী করছে তার দোয়া সর্বদা কবুল হয়ে থাকে; সে যদি বদদোয়া করে তবে বাস উল্টে যেতে পারে….।
সাঈদ এমন পরিবারে প্রতিপালিত হয়েছে যারা ওলী-আউলিয়া, তথাকথিত পীর-ফকির, দরবেশ, কুতুব, আবদাল… দ্বারা প্রভাবিত!
সে ভীত ও পেরেশান হয়ে সাথী আদেলকে অনুরোধ জানায় ভাই কিছু দিয়ে দাও, কেননা এ দরবেশ খুব বরকতময় লোক।
সর্বদা তার দোয়া কবুল হয়। হতে পারে বাস্তবিকই তার বদদোয়ায় বাস উল্টে যাবে।
আদেল তার কথায় খুবই আশ্চর্য হলো।
বলল হ্যাঁ আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের লোকেরা কারামতে বিশ্বাস করে;
কিন্তু নেককার ও পরহেজগার লোকদের কারামত।
যারা লোক দেখানোর জন্য আমল করেনা। আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনার্থে গোপনে সৎআমল করে। এসকল ভন্ড ও ভবঘুরে লোকদের কারামত নয়।
যারা দ্বীন বেঁচে অর্থ উপার্জন করে।
সাঈদ চিৎকার করে উঠলো। কি তুমি আজেবাজে কথা বলছ! এই দরবেশের কারামতের কথা ছোট-বড় সব লোকেরই জানা! একটু পরেই দেখবে তিনি বাস থেকে নেমে যাবেন।
আর আমরা গ্রামে পৌঁছার আগেই তিনি হেঁটেই পৌঁছে যাবেন।
এটা তার কারামত।
তুমি কি অলীদের কারামতকে অস্বীকার কর?

আদেল‌ঃ আমি কখনোই কারামতের অস্বীকার করিনা আল্লাহ ‌তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করতে পারেন। কিন্তু এটা হতে পারেনা যে, কারামতের দরজা দিয়ে শির্ক প্রবেশ করবে- আমরা এ সমস্ত মানুষকে, মৃত অলীদেরকে আল্লাহর সাথে অংশীদার মনে করব? সৃষ্টি, নির্দেশ, জগতের পরিবর্তন ইত্যাদি ক্ষমতা আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন এ বিশ্বাস করব? আর তাদেরকে আমরা ভয় করব, তাদের ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করব? এটা সম্ভব নয়।

সাঈদঃ তুমি কি বিশ্বাস কর না যে, শায়খ ‘আহমদ আবু সারুদ’ হজ্জে এসে আরাফাতের দিন (তুরস্কের) ইস্তাম্বুল গিয়ে নিজ পরিবারের সাথে খানা খাদ্য খেয়ে আবার আরাফাতে ফিরে এসেছেন?

আদেলঃ সাঈদ! আল্লাহ তোমার বিবেক বরকত দিন!
তুমি কি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কথাই শিখেছ?

সাঈদঃ মনে হয় আমরা হাসি-ঠাট্টা শুরু করেছি।

আদেলঃ আমি তোমার সাথে হাসি-ঠাট্টা করছি না। কিন্তু সাধারণ মানুষের অবান্তর কথা আর তাদের কুসংস্কারের প্রতিবাদ করা যাবে না এমনতো নয়।

সাঈদঃ কিন্তু এ সমস্ত কারমতের কথা শুধু সাধারণ মানুষের মুখেই শোনা যায় না; বড় বড় আলেম ওলামগণও এ সমস্ত মাজার ও দরবারের অলৌকিক ঘটনাবলী বর্ণনা করে থাকেন।
বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে এ সমস্ত বিষয় ব্যাপকহারে আলোচনা হয়।
আদেলঃ ঠিক আছে সাঈদ, তোমার কি মত, আমি যদি বাস্তবে প্রমাণ করে দিতে পারি
যে, এ সমস্ত মাজার ও দরবারের অধিকাংশই মিথ্যা ও কাল্পনিক? এসব মাজারের অধিকাংশের হাক্বীকত নেই -কবর নেই, লাশ নেই, কোন ওলী নেই। কিছু মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের কারণে মানুষের কাছে তা সত্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
একথা শুনে সাঈদ ক্রোধে ফুঁসে উঠলো এবং বলতে লাগল, আউজুবিল্লাহ! আউজুবিল্লাহ!
উভয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকল।
বাস তাদেরকে নিয়ে গ্রামে প্রবেশের আগে চৌরাস্তার মোড়ে যখন পৌঁছল তখন আদেল সাঈদকে লক্ষ্য করে বলল, সাঈদ! রাস্তার এ মোড়ে কি কোন যুক্তিসংগত কথা হল না কি- একজন ওলীকে চৌরাস্তায় বা রাস্তার মোড়ে দাফন করা হবে?

আদেলঃ তাহলে তোমার কি মত,যদি আমরা প্রচার করে দেই যে, এই চৌরাস্তায় জনৈক নেক ব্যক্তির পুরাতন কবর আছে, যার চিহ্ন আজ মিটে গেছে এরং নষ্ট হয়ে গেছে? এর পরে আমরা তার কারামতের কিছু ঘটনা, তার দুআ কবুল হওয়া কিছু গল্প মানুষের সামনে পেশ করব।
দেখি মানুষ বিশ্বাস করে কি না? আমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখি মানুষ ব্যাপারটিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবে; বরং হতে পারে পরবর্তী বছর তারা এখানে একটি বিরাট মাজার বা দরবার প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে।
এরপর শুরু হবে সেখানে শির্ক। অথচ এখানে শুধু মাটির মাটি- যদি ওরা যমীনের পাতাল পর্যন্ত খনন করে তো কিছুই পাবে না।

সাঈদঃ কি সব আজেবাজে কথা বলছ?
তুমি কি মনে করছো মানুষ এত বোকা ও নির্বোধ?

আদেলঃ ঠিক আছে, তুমি যদি আমাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা কর তাহলে এবং সামর্থন দাও তাতে তো তোমার ক্ষতি নেই? নাকি তুমি ফলাফলের ব্যাপারে আশংকা করছো?

সাঈদঃ না, ভয় করিনা। তবে বিষয়টিতে আমি তেমন সন্তুষ্ট নই।

আদেলঃ বুঝা গেল তোমার মত আছে। তুমি কি মনে কর যদি আমরা প্রস্তাবিত ওলীর নাম রাখি ‘শায়খ বরকত ‘?

সাঈদঃ ঠিক আছে তুমি যা চাও।

এরপর দু’বন্ধু বিষয়টি খুব ধীরে ধীরে প্রচার করার সিদ্ধান্ত নিল।
এক্ষেত্রে তারা প্রথমে চায়ের স্টল, সেলুন, প্রভৃতি দোকান থেকে শুরু করবে। কেননা এসব স্থান থেকেই যেকোন সংবাদ দ্রুত প্রসার হয়।
তারা গ্রামে পৌঁছে সলিমের সেলুনে গেল। তার সামনে ওলী-আউলিয়াদের কথা আলোচনা করার পরে বলল, জনৈক নেক ওলী অনেক বছর থেকে সমাধিস্থ আছেন, অথচ আল্লাহর দরবারে তাঁর মর্যাদা অনেক বেশী; কিন্তু তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করার লোকের সংখ্যা খুব কম।
সেলুনের নাপিত জিজ্ঞেস করল, কোথায় সে কবরটি? তারা বলল, গ্রামে প্রবেশের আগে যে চৌরাস্তা রয়েছে তার মোড়ে!

নাপিতঃ আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর সবাই তা’রিফ, তিনি আমাদের গ্রামে একজন ওলী দিয়ে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আমি বহুকাল থেকে এ রকম একটা আশা করছিলাম।
এটা কি কোন যুক্তিসংগত কারন হতে পারে- পার্শ্ববর্তী ‘নতুন গ্রামে’ ও ‘নারায়ণপুর’ গ্রামে দশ জনের বেশী ওলী-আউলিয়া আছেন- আর আমাদের গ্রামে একজনও থাকবে না?

আদেলঃ সেলিম ভাই! ‘শায়খ বরকত’ খুব বড় মাপের ওলী ছিলেন।
আল্লাহর দরবারে তাঁর খুব মান-মর্যাদা ছিল।

নাপিত চিৎকার করে উঠলো, শায়খ বরকত (ক্বাদ্দাসাল্লাহু) সম্পর্কে আপনি এত কিছু জানেন, তারপরও চুপ রয়েছেন?
এরপর শায়খ বরকতের খবর শুষ্ক ঘাসে আগুণ দেয়ার মত গ্রামের আনাচ-কানাচে ছড়িয়ে পড়ল।
মানুষের মুখে মুখে সে কথা আলোচনা হতে লাগল।
এমনকি মানুষ স্বপ্নেও তা দেখতে লাগল।
( চলবে…..)

১১৩জন ২৮জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য