একটা সাধারন প্রেমের গল্প

বোকা মানুষ ৪ নভেম্বর ২০১৩, সোমবার, ০১:৩২:৪৭পূর্বাহ্ন গল্প ১৮ মন্তব্য

গভীর রাত। এমনকি, পাড়ার নেড়ি কুকুরগুলোও চিৎকার থামিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। দেয়াল ঘড়িটার টিক টিক শব্দও পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। ক’টা বাজে দেখার জন্য জ্যোতি ডিম লাইটের আলোতে দেয়াল ঘড়ি দেখার চেষ্টা করলো। ঝাপসা লাগছে। ছেঁচড়ে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল পৌনে তিনটা বাজে। পা টলছে, মাথা ঝিম ঝিম করছে, তবু ঘুমের কোনও খবর নেই। মাথাও কাজ করছে পরিষ্কার। রোখ চেপে যায় জ্যোতির। শালার ঘুম, তোকে আসতেই হবে। কটমট করে তাকায় গ্লাস ভর্তি নির্জলা সোনালী তরলের দিকে। তারপর নিজের উপর, ঘুমের উপর প্রবল এক অজানা আক্রোশে ঢক ঢক করে গিলে ফেলে গ্লাসের সবটুকু তরল। তারপর চোখ বুঁজে পড়ে থাকে বালিশে মাথা হেলিয়ে। ঘুমুতে চেষ্টা করে। ঘুমের বদলে তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে গত কিছুদিনের ঘটনাপঞ্জি।

স্তুতি।

তার সাথে সরাসরি কোনও পরিচয় ছিলনা জ্যোতির। জ্যোতি যেখানে আড্ডা দিত, সেই একই জায়গায় আড্ডা দিত স্তুতি তার বন্ধুদের সাথে। কখনও উচ্চস্বরে হেসে উঠতো খিলখিল করে। কিন্তু জ্যোতির মনোযোগ কাড়ে একদিন স্তুতি যখন তার রাজনৈতিক ভাবনার কথা বলছিল বন্ধুদের কাছে। কি স্পষ্ট, ঋজু আর দেশপ্রেম মাখানো বিশ্বাস। জ্যোতি রাজনীতিতে সরাসরি সক্রিয় না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতির প্রবল সমর্থক। স্তুতির রাজনৈতিক চিন্তাও একই। এর পর অনেক দিন থেকেই তাকে নিরবে খেয়াল করতে থাকে জ্যোতি। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় স্তুতি কি বলে, কি করে এসব দিয়ে বুঝতে চায় তার চিন্তা, তার রকম, তার ভাবনা। যতই দেখে, ততই মুগ্ধ হয় জ্যোতি।

এভাবে দিন যেতে থাকে। একদিন জ্যোতি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে স্তুতির বন্ধু হতে হবে। এরপর একদিন স্তুতি খুব আবেগ নিয়ে এদেশের নারীদের অপমানের কথা বলছিল। শুনে জ্যোতিও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে থাকতে না পেরে স্তুতির কথার সাথে সেও যে একমত, তা সবার সামনেই স্তুতিকে বলে ফেলে। স্তুতির বন্ধুরা একটু অবাক হয়ে তাকালেও স্তুতি কিন্তু স্মিত হেসে তা গ্রহন করে। সেই থেকে জ্যোতি সুযোগ খুঁজতে থাকে স্তুতিকে বন্ধু হওয়ার কথা বলার জন্য। খুঁজতে খুঁজতে সে সুযোগ পেয়েও যায় জ্যোতি। স্তুতি একা, অপেক্ষা করছে তার বন্ধুদের জন্য। তখনই জ্যোতি এগিয়ে গিয়ে নম্রভাবে স্তুতিকে বলে, আপনার কথা আমি প্রায়ই শুনি, আপনার রাজনৈতিক চিন্তা আমার সাথে মেলে, আপনার ভাবনাগুলো আমাকে ভাবায়। আমি আপনার বন্ধু হতে চাই। তারপর স্তুতিকে কিছু বলতে না দিয়ে নিজের আদ্যোপান্ত পরিচয় দেয় জ্যোতি। সব শুনে স্তুতি বলে, হ্যা, আমরা বন্ধু হতে পারি।

সেই থেকে শুরু। এর পর স্তুতির বন্ধুদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয় স্তুতি। কখনও সবাই মিলে আড্ডা, কখনও শুধু স্তুতি আর জ্যোতি। এভাবেই কখন যে একজন আর একজনের খুব কাছের বন্ধু হয়ে যায়, তাদের কেউই তা টের পায়না। এরকম কথায় কথায় স্তুতি জ্যোতিকে তার খুব একান্ত কিছু বেদনার কথা বলে। শুনে জ্যোতি আদ্র হয়ে যায়। চেষ্টা করে স্তুতিকে পরামর্শ দেয়ার, মানসিক সমর্থন দেয়ার। স্তুতি দুর্বল হয়ে পড়ে। জ্যোতিও তাকে বলে নিজের কিছু একান্ত কষ্টের কথা। স্তুতির মনও ভিজে যায়। তারপর প্রায় একই সময়ে দুজনেই স্বিকার করে যে তারা একজন আরেকজন কে ভালবাসে। কিন্তু তারা জানে তারা দুজনে দুজনকে চুড়ান্তভাবে পাবেনা নানা বাঁধার কারনে। তবু তারা মেনে নেয় যে, এক হতে না পারলেও তারা একে অপরের আশ্রয় হয়ে থাকবে, পাশে থাকবে আনন্দ, বেদনায়। ঠেকা দেবে একে অপরের কষ্টের সময়।

এসব যখন হচ্ছে, তখন স্তুতিদের আড্ডায়, বা একা বিভিন্ন প্রসঙ্গে স্তুতি তার এক বন্ধু জাভেদের কথা বলতো। জাভেদের কথা বললেই স্তুতির মুখে ফুটে উঠত স্মিত হাসি। জ্যোতির কেমন জানি হালকা একটা খটকা লাগত। তবু জ্যোতি কিছু বলেনি তার খটকাটা ভুলও হতে পারে ভেবে। জ্যোতির সাথে জাভেদের কখনই দেখা হয়নি। এরকম চলতে চলতে একদিন হঠাৎ স্তুতি গায়েব! আড্ডায় নেই, ফোন ধরেনা, কিছুই না। জ্যোতির মধ্যে অস্থিরতা পাঁক খেতে থাকে। অমঙ্গল আশঙ্কায় জ্যোতি অসুস্থ হয়ে পড়ে ভীষন। এই অসুস্থতার জন্য সেও কদিন কোথাও যায়না। তার এই অসুস্থতার কথা শুনে স্তুতি যোগাযোগ করে জ্যোতির সাথে। বলে তার মন খারাপ, তাই সে কদিন আড্ডায় নেই। সে জ্যোতিকে বলে নিজের যত্ন নিতে। কেন মন খারাপ জানতে চেয়েও জ্যোতি জানতে পারেনা। তার অস্থিরতা বাড়তে থাকে।

আবার ফোন করে স্তুতিকে চেপে ধরে জ্যোতি। বলে, আমার কাছে যদি মন না খুলো তুমি, তবে কার কাছে খুলবে! তাও জ্যোতিকে কিছু বলেনা স্তুতি। এবার কেন জানি হঠাৎ তার ওই খটকাটার কথা মনে পড়ে জ্যোতির। মনে পড়তেই সে জিজ্ঞেস করে, “জাভেদ কি চলে গেছে?”। ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ ওপাশে, আর কোনও শব্দ নেই। জ্যোতি ভেবেছিল তার রাগ হবে, মাথা ঘুরে পড়ে যাবে এই সত্যের মুখোমুখি হয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে, সে খুব শান্ত হয়ে যায়। শান্ত গলায় বলে “ইট’স ওকে, নো প্রবলেম। তুমি ভাল থাকলেই তো আমি ভাল থাকব”। এরপর বাঁধ ভেঙ্গে যায় স্তুতির। কাঁদতে কাঁদতে বলে, “জ্যোতি আমি অনেকদিন ধরে তাকে চিনি। আমার অনেক খেয়াল রাখে সে। কতবার আমাকে সবার সামনে বলেছে ভালবাসি, কিন্তু আমি বুঝিনি। ভেবেছি এটা অপত্য ভালবাসা। কিন্তু কদিন আগে আমাদেরই আর এক বন্ধু তোমার কথা বলেছে জাভেদকে। বলেছে আমরা একা একা আড্ডা দেই, বলেছে আমি তোমার প্রতি দুর্বল। এটা জেনে জাভেদ নিরবে সরে গেছে আমার কাছ থেকে। কিন্তু জ্যোতি, আমি জাভেদকেই ভালবাসি। বুঝতে পারিনি এতদিন, কিন্তু সত্যি আমি তাকে ভালবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দাও তোমাকে এভাবে কষ্ট দেয়ার জন্য…” জ্যোতি বজ্রাহতের মত দাঁড়িয়ে থাকে ফোন কানে লাগিয়ে। তারপর খানিকক্ষনের জন্য চুপ থেকে বলে, তুমি ভেবনা, সে যদি সত্যি তোমাকে ভালবাসে, তবে তার রাগ ভাঙ্গবেই। একটু ধৈর্য ধর।

তার পর অনেক কিছুই হল। অপেক্ষা করতে করতে স্তুতি এমন কিছু আঘাত পেল জাভেদের কাছ থেকে যে সে জাভেদকে দূরে ঠেলে দিল। ভালবাসার উপরেই আস্থা হারিয়ে ফেলল কি সে! এদিকে জ্যোতি তার যন্ত্রণা চেপে প্রানপনে চেষ্টা করতে লাগলো স্তুতিকে ফিরিয়ে আনতে তার স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু স্তুতি যে কে সেই।

ভালবেসে আঘাত পেয়ে নিজে নিরানন্দ থাকে সবসময়, কিন্তু জ্যোতিকে বলে তুমি স্থির থাক। কারও জন্য নিজেকে ধ্বংস করে দেয়া ঠিক না। জ্যোতি শোনে, চেষ্টা করে। প্রবল ইচ্ছে চেপে স্তুতিকে ফোন করেনা, কারন স্তুতি মানা করেছে বলে। এভাবে একসময় জ্যোতির সব উলট পালট হয়ে যায়। কিছুই ঠিকমত হয় না। আর এগুলো জেনে স্তুতি বলে কারও জন্য পাগলামি করা বোকামি। কিন্তু নিজের পাগলামি থামায় না।

জ্যোতি ছিন্ন ভিন্ন হতে থাকে, পুড়তে থাকে, মরে যেতে থাকে প্রতি মুহূর্তে। ভাবে কিভাবে বললে যে ওই পাগল মেয়েটা বুঝবে যে একমাত্র সত্যিকার ভালবাসলেই এরকম পাগলামি করা যায়! একদিন আর না পেরে জ্যোতি বাসায় নিয়ে আসে সোনালী তরল। সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর শুরু করে গেলা। চলতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত বেহুঁশ হয়ে যায়। কিন্তু কেউ টের পায় না। পরদিন থেকে জ্যোতি করতে থাকে রোজ। একসময় আবিষ্কার করে তার অস্থিরতার সবটুকুই রাতে বাড়ী ফিরে সবার ঘুমিয়ে যাওয়ার অপেক্ষার দিকে মোড় নিয়েছে। জ্যোতি ভাবে “বাহ! ভালতো! স্তুতির জন্য অস্থির হয়ে তাকে আর বিরক্ত করতে হয়না ফোন করে, তাকে ভাল রাখার চেষ্টায় উতলা হতে হয়না। এখন যাবতীয় অপেক্ষা রাত গভীর হওয়ার জন্য“…… তার জন্য জ্যোতির এই অস্থিরতা কমে যাওয়া দেখে স্তুতি অবাক হয়। কিন্তু বলে, এইতো তুমি পারছ! দেখেছ, আমি বলেছিলাম না তুমি পারবে! শুনে হো হো করে দিলখোলা হাসি হাসে জ্যোতি।

হঠাৎ মশার কামড়ে জ্যোতি ফিরে আসে বর্তমানে। দেখে বোতল অর্ধেক খালি, তবু নেশার নাম গন্ধও নেই। প্রবল আক্রোশে জ্যোতি নির্জলা বিষ ঢালতে থাকে গলায়। তরল বিষ তার গলা বেয়ে, পাকস্থলি হয়ে, শিরা-উপশিরা বেয়ে, হৃৎপিণ্ড খেয়ে মগজে ঢুঁ মারে। জ্যোতি দেখে সামনে নিকষ অন্ধকার আর তলাহীন একটা খাদ। জ্যোতি অনুভব করে সে পড়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই সেই খাদে, অন্তহীন পতন আর থামেনা। বাতাস কেটে পড়তে পড়তে দপ করে নিভে যায় সেই অন্ধকার টুকুও একসময়।

২৭৯জন ২৭৯জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য