একজন অনন্য মুক্তিযোদ্ধা, মহান মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্য নায়ক খালেদ মোশাররফ, পর্ব ০১

‘ ১৯ মার্চ, ১৯৭১ সালে আমাকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক করে কুমিল্লা সেনানিবাসে বদলি করা হয়। আমি ২২ মার্চ আমার পরিবারকে ঢাকায় ধানমন্ডিতে রেখে কুমিল্লা চলে যায় এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করি। ইউনিটে পৌঁছার সাথে সাথেই বুঝতে পারলাম আমার সৈনিকরা বেশ উদ্বিগ্ন। আরো জানতে পারলাম পাঞ্জাবিদের গোলান্দাজ(আর্টিলারি) এবং কমান্ডো বাহিনী চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চারদিকে পরিখা খনন করে মেশিনগান লাগিয়ে অবস্থান নিয়েছে। নির্দেশ পেলেই সবাইকে হত্যা করবে। পাঞ্জাবীরা সেনানিবাস রক্ষার অজুহাতে এসব পরিকল্পনা নিয়েছে।আমার সৈনিকেরা আমার কাছে জানতে চাইল তাঁদের এখন কি করণীয়? আমি তাঁদেরকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিলাম এবং আত্মরক্ষায় প্রহরী দ্বিগুণ করার নির্দেশ দিয়ে শান্ত করি।

পরের দিন ২৩ মার্চ ছুটির দিন ছিল। ২৪ মার্চ সকাল সকাল ৭টায় আমি প্রথম রিপোর্ট করি লে.কর্নেল খিজির হায়াত খানের (পাকিস্তানি) কাছে । ঐদিন সকালে আমি যখন আমার অফিসে সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছিলাম তখন সকাল সাড়ে দশটায় খিজির হায়াত আমাকে উনার রুমে ডেকে পাঠান। উনি  বললেন যে একটি বিশেষ কাজে আমাকে আজই সিলেট যেতে হবে। সেখানে নকশালপন্থীরা বেশ উৎপাত করছে। আমি বললাম ‘ কোন ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ককে সাধারণত এভাবে পাঠানো হয় না। ‘ আমার বক্তব্য শুনে তিনি বললেন,”ব্যাপারটা বেশ গুরত্বপূর্ণ সেজন্যই আপনাকেই যেতে হবে।” তিনি বললেন চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের একটি কোম্পানি নিয়ে আমাকে গিয়ে এইসব উৎপাত বন্ধ করতে হবে। আমি বললাম ‘ একটি কোম্পানি যখন যাচ্ছে তখন কোন জুনিয়র অফিসারকে পাঠানো যেতে পারে। ‘ আমার বক্তব্য শুনে খিজির হায়াত খান অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। বললেন ‘ ঠিক আছে আপনি যান,আমি পরে আপনাকে জানাচ্ছি। ‘ পরে তিনি ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফিকে দিয়ে আমাকে চাপ দিলেন। যেহেতু তিনি ব্রিগেড কমান্ডার তাই আমি উনার কমান্ড অগ্রাহ্য করতে পারলাম না।

তারা আমাকে হালকা অস্ত্র নিয়ে রেডি হতে বললেন। আমি বুঝতে পারলাম যেতে আমাকে হবেই। যেহেতু উপায় নেই তাই এদের কাছে যতটুকু আদায় করে নেওয়া যায় ততই মঙ্গল। আমি বললাম আমি যে কাজে যাচ্ছি সেখানে এক কোম্পানির চেয়ে বেশি সৈন্য প্রয়োজন হতে পারে। আমার সামরিক জ্ঞান অনুসারে আরও হালকা এবং ভারী অস্ত্র প্রয়োজন হবে। তারা সায় দিলেন। আমি ইউনিটে ফিরে এসে এডজ্যুটেন্ট ক্যাপ্টেন গফফারকে নির্দেশ দিলাম বেছে বেছে ২৫০ সৈনিক নাও। অস্ত্র এবং গোলাবারুদ এমনভাবে নাও যেন অন্তত ১মাস যুদ্ধ করা যায়। একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করলাম আমি যতক্ষন যাওয়ার জন্য অস্ত্র এবং গোলাবারুদ নিয়ে রেডি হচ্ছিলাম ততক্ষন পর্যন্ত সকল পাকিস্তানি অফিসারেরা এক দৃষ্টিতে আমাদের লক্ষ্য করতে থাকেন। ২৪ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় আমি যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলাম। যাওয়ার আগে যেসব বাঙালি অফিসার কুমিল্লা রয়ে গেলেন তাঁরা একে একে আমার সাথে দেখা করে গেলেন। তাঁদের মধ্যে সিনিয়র অফিসার মতিনকে ডেকে বললাম আমি যাচ্ছি সেজন্য ঘাবড়ানোর কিছুই নেই। এখন তুমি সিনিয়র এবং তুমি দায়িত্ব নেবে। কিছু হলে বাকি ব্যাটালিয়ানের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে এবং প্রয়োজনে যুদ্ধ করে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসবে এবং আমার সাথে যোগাযোগ করবে।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আমি আমার কনভয় নিয়ে সিলেটের শমসের নগরের পথে রওনা হলাম। পথে পথে জনতা আমাদের বাঁধা দিচ্ছিল। তাঁরা বললেন পাকিস্তানিরা ষড়যন্ত্র করে আপনাদের সরিয়ে দিচ্ছে। আমি তাঁদের বললাম বেঙ্গল রেজিমেন্ট আপনাদের রেজিমেন্ট আপনাদের প্রয়োজনে আমরা পিছিয়ে থাকব না। ২৫ মার্চ আমি সকাল ১০টায় শ্রীমঙ্গল গিয়ে পৌঁছায় এবং সেখানে থেকে মূল রাস্তা ধরে না গিয়ে জঙ্গলের পথ ধরে শমসের নগর পৌঁছাই। পরে জানতে পারি আসলেই পাকিস্তানিরা আমাদের হত্যার জন্য ষড়যন্ত্র করে মূল রাস্তায় পজিশন নিয়ে বসেছিল। শমসেরনগরে গিয়ে দেখতে পেলাম যা বলা হয়েছে সব ডাহা মিথ্যা কথা। সেখানকার স্থানীদের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এখানে কোন নকশালের উৎপাত ঘটেনি। পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। আমি কুমিল্লায় হেড কোয়ার্টারের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। ২৫ মার্চ পর্যন্ত কি হচ্চে তার কিছুই আমি জানতে পারলাম না। বুঝতে পারলাম আমাকে কৌশলে এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

২৬ মার্চ সন্ধ্য বেলায় আমি মেজর শাফায়েত জামিলের সাথে যোগাযোগ করতে পারলাম। শাফায়েত আমাকে জানালেন ঢাকায় পাকিস্তানিরা ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে এবং এখনও চালাচ্ছে। লোকজন সব গ্রামের দিকে পালাচ্ছে। শাফায়েত আমাকে আরও জানালেন চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের বাকি অংশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে এবং তার দায়িত্ব ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনগণ সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে মিছিল বের করেছে। এমতাবস্থায় তাঁদের করণীয় কি আমার কাছে জানতে চাইলেন। আমার পক্ষে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন ছিল। কারণ আমি প্রায় একশ মাইল দূরে অবস্থান করছি।

সমস্ত বাংলাদেশে আর কোথায় কি হচ্ছে তা আমার জানা নেই। পাকবাহিনীরা ঢাকায় এবং সারাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে এটা বুঝতে পারছিলাম। রাজনৈতিক নেতাদের সাথেও কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই যে তাদের পরামর্শ পাব। চিন্তায় মাথা ঘুরপাক খেতে লাগল। একদিকে সামরিক শৃংখলা এবং কর্তব্য বোধ এবং অন্যদিকে বিবেকের দংশন আমাকে পীড়িত করছিল। এই উভয়সংকটে পড়ে আমি চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলি। শাফায়েতকে বললাম আমাকে কিছুটা সময় দাও,একটু পর জানাচ্ছি। এবং সাথে সাথে বললাম লোকজনকে বুঝিয়ে শান্ত কর, কোনভাবেই যেন গুলি চালানো না হয়। চিন্তায় আমি আমার কামড়ার ভিতরে পায়চারি করছিলাম, ল্যাফটেনেন্ট মাহবুব আমার রুমে ছিল। আমার সৈনিকেরাও উদ্বিগ্ন হয়ে আমার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে আমার বিবেক আমাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। যদিও কোন রাজনৈতিক নির্দেশ ছিল না তবুও ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণের কথা মনে পড়ে গেল।
তিনি বলেছিলেন,” ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

আমি লেফটেনেন্ট মাহবুবকে ডেকে বললাম এই মুহূর্তে আমি স্বাধীন বাংলার  আনুগত্য স্বীকার করলাম। আজ থেকে আমরা কেউ আর পাকিস্তানের অধীন নই। স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দাও। আজ থেকে আমরা যুদ্ধ শুরু করব। সৈনিকদের তৈরী হতে বল। আমরা এখান থেকে ঢাকার দিকে রওনা দেব। লেফটেনেন্ট মাহবুব  এই নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল। সে দৌড়ে গিয়ে সৈনিকদের আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালো। সাথে সাথেই বঙ্গ শার্দূলরা শ্লোগান দিয়ে উঠল “জয় বাংলা”।

আমি প্রথমে তাদের শান্ত করলাম এবং বুঝিয়ে দিলাম এখন থেকে আমাদের যে সংগ্রাম শুরু হল তা বিপদসংকুল এবং কঠিন । সবাইকেই নিজের স্বার্থ ভুলে গিয়ে দেশ ও জাতি এবং বাংলাদেশ সরকারের জন্য আত্মীয়স্বজন, আর্থিক কষ্ট এবং সব সুবিধা ত্যাগ করে আত্মবিসর্জনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি দেখতে পেলাম আমার বীর সৈনিকেরা আগে থেকেই দৃঢ় সংকল্পে আত্মত্যাগের মনোভাব নিয়ে  প্রস্তুত হয়ে আছে।

.

সুত্রঃ “খালেদের কথা”।
লেখকঃ মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া

২২৫জন ২২৫জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য