এই জীবনে বইমেলার মুখোমুখি

নীলাঞ্জনা নীলা ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৪, মঙ্গলবার, ০৫:২১:১৫অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১২ মন্তব্য


বইমেলা । প্রাণের মেলা । কবি-সাহিত্যিক-লেখকদের মেলা । বন্ধু-বান্ধবদের উচ্ছ্বাস-আনন্দর মেলা । কয়টা বই কেনা হয় , সে হিসেব-নিকেশের পরিসংখ্যান আমার জানা নেই । যদিও আজকাল সব খবর পাওয়া খুব সহজ হয়ে গেছে । একসময় হাতেগোণা কিছু লেখক-সাহিত্যিকদের লেখা প্রকাশিত হতো । এখন অপরিচিতর ভীড় বেশী , তবে মেধাবীদের আর সেই দৌরাত্ম্য নেই । এটা আমার মত । এই অনলাইনে বিশেষ করে ফেসবুকে আসার পর দেখেছি এমন অনেক মেধাবী কবি-গল্পকার আছেন , যাদের আজ পর্যন্ত কোনো লেখা কোনো কাগজের পাতায় বন্দী হয়নি । আবার অনেক আছেন যারা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন । আবার অনেকেই আছেন লিখতে লিখতে মাথা ধরিয়েও দেন । একসময় আমিও এমন করতাম । খুব সহজ স্বীকারোক্তি । যখন বুঝলাম যে আসলে এভাবে লেখার কোনো মানেই হয়না । আর লেখা মানেই বিষয় খোঁজা । হাতেগোণা কিছু বিষয়ই আছে , যা থেকে আমরা সরে আসতে পারলেও সরে আসিনা । এর মধ্যে সবথেকে বড়ো প্রমাণ , প্রেম আর নারী নিয়ে লেখা । একঘেঁয়ে হয়ে গেছে , তাও ভুরি ভুরি লেখা । আর প্রেম মানেই একটি অবয়ব , একজন মানুষ , আর একটি সত্ত্বা । যতোই বলিনা কেন প্রেম নিয়ে লিখি , কিন্তু আসলে এটা আমার নিজের জীবন নয় । কাকে ফাঁকি দেই জানিনা , তবে এই কথায় আমরা সবথেকে ফাঁকি দেই নিজেকে । ভালোবাসা অন্যায় নয় , কোনো পাপ নয় । ক্ষতি না করে ভালোবাসা যায় । আমি ভালোবাসি একজনকে নয়…কয়েকজন এ জীবনে আছে , থাকবে । এদেরকে না ভেবে , আমার পক্ষে শ্বাস নেয়া সম্ভব নয় ।

কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম ! বইমেলা থেকে ভালোবাসায় । তার মানে কি ? ভালোবাসা আছে বলেই আমরা এখনও অনেক কিছু ভাবতে পারি , লিখতে পারি , সম্পর্ক গড়ে তুলতেও পারি । যাক বইমেলা নিয়ে নিজের জীবনের কিছু কথা বলতেই আজকে ফেলে আসা সময়ের মুখোমুখি হলাম ।

পৃথিবীতে প্রথম বইমেলা শুরু হয় ৫০০ বছর আগে জার্মানীর ফ্রাঙ্কফুর্টে । আর এখন পর্যন্ত সবথেকে বড়ো বইমেলাটি এখানেই হয়ে আসছে । এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে জেনেছি , আমাদের বাংলাদেশে প্রথম বইমেলা শুরু হয় ১৯৭২ সালের ৮-ই ফেব্রুয়ারী তারিখে । কলকাতা থেকে ৩২টি বই নিয়ে আসেন চিত্তরঞ্জন সাহা , এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গনে বটতলায় চট বিছিয়ে বইমেলার উদ্বোধন করেন । একটানা ৪টি (১৯৭২-‘৭৬) বছর একাই চালিয়ে নিয়ে যান । তাই তাঁকেই বাংলা একাডেমীর বইমেলার উদ্যোক্তা হিসেবে অভিহিত করা হয় । ১৯৮৪ সালের আগ পর্যন্ত বইমেলা অনাড়ম্বরভাবেই (যদিও প্রতিবছর নয়) অনুষ্ঠিত হতো । ১৯৮৪ সাল থেকে সাড়ম্বরভাবে অমর একুশে বইমেলার সূচনা হয় । ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতেই প্রতিবছর ফেব্রুয়ারী মাসে এই বইমেলা হয়ে থাকে ।

এতোকিছু বলার কারণ আমার বইয়ের প্রতি বেজায় লোভ আর যেমন কেনার , তেমনি কোনো বই উপহার পেলে সবথেকে খুশী হতাম , এখনও হই । ১৯৯০ সালে এস.এস.সি দেবার পর কলেজে যখন ভর্তি হই । তখন এমন হলো বড়োদের বই পড়ার আর কোনো গোপনীয়তা রইলো না । যদিও চুরী করে অনেক আগেই মামনির লাইব্রেরীর প্রায় অনেকগুলো বই পড়া হয়ে গিয়েছিলো । এর মধ্যে ছিলো বিমল মিত্র , আশুতোষ মুখোপাধ্যায় , ফাল্গূণী মুখোপাধ্যায় , শংকর , বেগম রোকেয়া , বনফুল , নিহারঞ্জন রায় , সমরেশ বসু , জহির রায়হান , অগাথা ক্রিষ্টি , লিও তলস্তয় , শেক্সপিয়র , প্রমুখ । আরোও অনেকের নাম ভুলে গেছি । আমার গল্পের বই পড়া শুরুর বয়সের কথা মনে নেই । তবে জীবনের প্রথম বইয়ের কথা মনে আছে , তখনও জীবনের স্কুল শুরু হয়নি । বাপি ঢাকা থেকে এলো আমার জন্যে জামার কাপড়/জামা ভুলে গেছি । আর দুটো বই । একটা হলো কালীপ্রসন্ন সিংহের “হুতোম প্যাঁচার নকশা” আরেকটি জানি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বই । বইটি বয়সের তুলনায় যথেষ্ট উঁচুমাত্রা বিশিষ্ট ছিলো । বড়ো হয়ে জেনেছি ওই বইটা ছিলো “Satire type” মানে ব্যঙ্গধর্মী গ্রন্থ । মাথা খারাপ করিয়ে দিয়েছিলাম মামনিকে করা হাজারও প্রশ্নে । বাপিকে বই পড়তে দেখিনি , এই অভ্যেসটা আমার মায়ের থেকে পাওয়া । রূপকথার গল্প আমার মোটেও ভালো লাগতো না । ওসব শুনতেই মজা , আমার বরিশালের মা(দিদিমা) আর ঠাকুমার থেকেই শুনতাম ওসব গল্প । সেই যে বই পড়া শুরু হলো , এরপর আর থামেনি । জীবনে সেই সময় একটাই ব্যাপার লুকিয়েছিলাম মামনি আর বাপির কাছে , সেটা হলো বই পড়া গোপনে বইয়ের ফাঁকে রেখে । রাশিয়ার একটা রূপকথার বই “মালাইকাঠের ঝাঁপি” খুব ভালো লাগতো । আমাদের বাংলা রূপকথার মতো না , তাই ভালো লেগেছিলো ।

আমার বইয়ের প্রতি এতো টান দেখে আমার বড়ো মাসীর মেঝো ছেলে শোভনদা বলেছিলো বইমেলার কথা । শোভনদার সাথেই প্রথম বইমেলায় যাওয়া ১৯৮৯ সালে । চোখের সামনে এতো এতো বই ? কোনটা কিনবো ? কোনটা না । ব্যাগে ৫০০৳ ছিলো । বিশাল বড়োলোক । যাক বেশ কিছু বই কিনেছিলাম , মনে নেই নামগুলো । এরপর শোভনদা না থামালে বোধ হয় কিনেই চলতাম টাকা শেষ না হওয়া পর্যন্ত । বইমেলা থেকে ফেরার পথে শমি কায়সারকে দেখে কি ইচ্ছে কথা বলার । একটা ছুটও লাগালাম । এখন ভাবি সেই ছুট কি আর ফিরে আসবে ? ইচ্ছেই তো আর নেই । আসলেই আমরা যখন যা চাই , সে সময় পাইনা । যখন পাই , তখন দেখা যায় আরোও অনেক কিছু পেয়ে গেছি । ওখান থেকে গেলাম এলিফ্যান্ট রোডের ওখানে গীতালি ক্যাসেট রেকর্ডিং সেন্টারে (নামটা ঠিক নাও হতে পারে), ওখানে বেশ কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত-আধুনিক গান রেকর্ড করতে দিয়ে এলাম । আর একটা খালি ক্যাসেট কিনলাম , সবার কন্ঠ এটার ভেতরে রাখবো বলে । ওহ বলতে ভুলে গেছি , সেই বছরেই বাপি আমাকে রিমোট কন্ট্রোলড ডাবল ডেকসেট কিনে দেয় একটা । আর তাই আরোও অনেক উচ্ছ্বাস । যাক বাসায় ফিরে এলাম অনেক বই আর ক্যাসেট নিয়ে । কি করে সবার কন্ঠ এটায় রাখবো , ভেবে পাচ্ছিলাম না । কারণ কয়েকজন ছাড়া আর কেউ আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করবেনা । যাক চেষ্টায় কি না হয় ! ওই ক্যাসেটে আমার পৃথিবীর ছোট্ট ওই নীড়ের মধ্যে অবস্থিত সকলের কন্ঠই আবদ্ধ করে রেখেছিলাম । কেউ গান গেয়েছিলো , কেউ কবিতা , কেউ কৌতুক ইত্যাদি বিভিন্ন কিছু । আর মাসী-মেশোদের দূর থেকে ভেসে আসা কথা । আমার বড়ো মাসীর বড়ো ছেলে বাবুনদাকে ডেকেছিলাম , বেশ ঝাড়ি । কিন্তু একটা কথা আটকে গিয়েছিলো ওখানে । “আমার টাওয়েলটা কোথায় ?”

যাক ফিরে আসি বইমেলায় । এরপর আবারও গেলাম ১৯৯১ সালে । তখন ভারতীয় লেখকদের বইও আসতো । যাক বাংলা বই বলে কথা , সবারই বই পড়তাম , কিনতাম । আমার জীবনে বড়োদের বই (সেই সময় বইয়ের ভাগ সকলেই মেনে চলতো) উপহার হিসেবে পাই , তার নাম ছিলো “আবাস ।” ভুলে গেছি কার লেখা ।

যাক বই জমানো শুরু হলো । আমাদের বাসায় দুটো লাইব্রেরী ছিলো । একটি মামনির আরেকটি আমার । মেঝো মাসীর মেঝো ছেলে রানা আমার বইয়ের লাইব্রেরীর নামকরণ করলো , “গ্রন্থিকা ।” বেশ কিছু বই পড়তে নিয়ে আর ফিরে আসেনি । তাই রানা বুদ্ধি দিলো একটা খাতা কিনে বই যে নেয় , তার নাম আর সেই তারিখ লিখে রাখতে । এছাড়া বইয়ে লাইব্রেরীর নাম এবং পুস্তক নাম্বার উল্লেখ করতে । ১৯৯৩ সাল , আমার জীবনের আরেকটি বছর বইমেলায় । ওহ ১৯৯১ সালে আমার কলেজের বাংলার শিক্ষক শ্রদ্ধেয় আবু রায়হান সেলিম স্যার আমাকে বললেন জাতীয় কবিতা উৎসবে যেনো অংশ নেই । উনি আমার নাম দিয়ে রাখবেন । কিন্তু যেতে পারিনি । সেই বছরই জানলাম জাতীয় কবিতা উৎসবের কথা । একটি কথা বলে রাখতে চাই , আজ অব্দি আমি কবিতা উৎসবে যেতে পারিনি । ফিরে আসি আবারও ১৯৯৩ সালে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেলাম । এতো আনন্দ করেছিলাম , তখন এমন কোনো অতিরিক্ত ফালতু ভাবনার জন্ম হয়নি । বেশ ছিলাম । বইমেলা , ফুচকা খাওয়া । বড়ো মাসীর ছোট ছেলে মুন্না আমার একদিনের ছোট , ওর সাথে ঘুরতে যাওয়া । তবে ওর কিছু বন্ধু-বান্ধবও ছিলো । নাম ভুলে গেছি অনেকেরই । স্নিগ্ধা , বিলু , আশু আর মুন্নার ছাত্র সিধু । এমনও হয়েছে একদিন ঠেলাগাড়ীতে চড়েছি । এত্তো মজা পেয়েছিলাম । হুম জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি , যা একটি মেয়ে কমই পায় । দেশের মতো জায়গায় আমার মতো মফস্বলের একটা মেয়ে ট্রাকের পেছনেও উঠেছে , আবার ট্র্যাক্টরেও ।

সেইবার বইমেলায় যে পরিমাণ বই কিনেছিলাম , দেশের লেখক থেকে শুরু করে দেশের বাইরের লেখকও ।

জীবনের চড়া-উৎড়াই পার করে ১৯৯৮ সালে আবার ঢাকায় আসি , ইডেন কলেজে মাষ্টার্সে ভর্তি হই । এরপর যে দু’ বছর ছিলাম বইমেলা ছাড় পায়নি । এমনকি পৌষমেলাও । আমি , সুস্মিতা , মধুছন্দা , লাকি এতো মজা করেছি যে না-পাওয়া অনেক কিছুই ভুলিয়ে দেয় ওসব আনন্দর কথা ভাবলে । আমরা না-পাওয়া ভাবি বেশী , তাই অনেক পেয়েও স্বস্তি পাইনা । এটা আমাদের মজ্জাগত । কিন্তু অনেক কিছুই তো বদল করে নিয়ে চলি জীবনে , এটাও করা যায় । আসলে আমার মধ্যে গভীরতা কম(নাকি বুঝতেই দেই না আছে) যার জন্যে সব পরিস্থিতিকে খুব হাল্কা করে নিতে পারি । যারা এমন হাল্কা করে নিতে পারে জীবনকে , তাদেরকে আমরা তাচ্ছিল্য করি , অবহেলা দেই । মানুষ কি আসলে এমনই ? পেয়ে ধরে রাখেনা আর না পেলে আপসোস করে । অতীত ভুল সংশোধনের জন্যে , আপসোসের জন্যে নয় । যা আমাদের জীবনে আনন্দ এনে দেয় , আমরা তার খবর না করে যে আনন্দ খুঁজছি , সেটাই খুঁজে বেড়াই । যাক অনেক বক্তব্য হলো । বাঙ্গালী স্বভাব সে কি আর বদলায় ? এক বিষয় ছাড়িয়ে অন্য বিষয়ে । এটুকুই থাক , এরপর দেখা যাবে বইমেলা বৈশাখী মেলায় পৌঁছে গেছে ।

হ্যামিল্টন , কানাডা
১০ ফেব্রুয়ারী , ২০১৪ ইং ।

১৮৫জন ১৮৭জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

️️ 🍂️️ 💝 ️️ 🌟 🌺 💐 💥 🌻 🍄 🌹 💐 ⭐️ 🎉 🎊