এইসব পরিচিত কষ্ট

ভায়লা সালিনা লিজা ১৬ জানুয়ারী ২০১৬, শনিবার, ০৭:৪৯:৫৯অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১১ মন্তব্য

ছোটবেলায় মেয়ে যখন স্কুলে অঙ্ক পরীক্ষায় ১০০ না পেতো আমি চিৎকার চেঁচামেচি করে বলতাম ১০০ পাওনি কেন। আমার উইন্টার সেমিস্টারের ম্যাথের ফাইনাল আজ। গতকাল মেয়েকে বললাম একটু হেল্প করো। মেয়ে আমাকে হেল্প করতে এসে বলে ১০০ না পেলে দেখো কি করি। কিছুক্ষন পর পর ধমকাচ্ছিল আর বলছিল ঠিকমত করো ম্যাথ। আমি তাকাতেই হেসে দিয়ে বলে মনে আছে আমি না পারলে কি করতে তুমি? আমি ভাবছিলাম একসময় আমি মা ছিলাম আর সে ছিল কন্যা আজ আমি তার কন্যা সে আমার ‘মা’। এজন্যই বলে ‘গোউজ এরাউন্ড কামজ এরাউন্ড’।

সকাল ভোরে কিছুক্ষন চোখ বুলিয়ে রেডি হয়ে তাড়াহুড়ো করে ছেলেসহ বেরিয়ে পড়লাম কলেজের উদ্দেশ্যে। ছেলে স্কুলে চলে যায় আর আমি সেভেন ট্রেনে উঠে বসে পড়ি। কিছুক্ষন পর এক নেপালি মা তার ৭/৮ মাসের লিটিল এঞ্জেলকে নিয়ে বসে পড়ে আমার সামনের সিটে। বাচ্চাটা চারিদিকে দেখছে আর হাসছে। আমি তাকিয়ে দেখছি বাচ্চাটাকে। কিছুতেই চোখ সরাতে পারছি না। সামনেই এক লম্বা স্প্যানিশ লোক মেয়েটির দিকে চেয়ে আছে আর হাসছে। লোকটি কোনভাবেই চোখ সরাচ্ছে না বাচ্চাটির থেকে। এমন সময় ট্রেন ৬১ স্ট্রিটে থামলো। অনেক লোকজন নেমে যাওয়ার সুবাদে আমার পাশে সিটটি খালি হতেই ভদ্রলোকটি আমার পাশে এসে বসল।

দেহ মধ্য বয়স, মুখে বার্ধক্য। চুলে কিছুটা পাক ধরেছে। কপালে দুশ্চিন্তার বলি যেন প্রভাত সরোবরে বাতাসের হিল্লোল। আমি মোবাইলে লালনগীতি শুনছিলাম। হঠাৎ পাশে বসা লোকটি আমাকে কিছু বলছে দেখে গান বন্ধ করে বললাম, কি হয়েছে? কিছু বলবে? সে আমাকে তার মোবাইল থেকে ছবি বের করে জিজ্ঞেস করছিল তুমি কি আমার লিটল প্রিন্সেসকে দেখবে? আমি সাথে সাথে বললাম অবশ্যই। ছবি দেখাতে দেখাতে একসময় লোকটি কেঁদে উঠে বলে আমার ওয়াইফ দু’বছর আগে আমার মেয়েটিকে নিয়ে চলে গেছে তার নতুন বয়ফ্রেন্ডের সাথে। একদিন রাতে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে কল করে তাকে জানায় মেয়ের ভরণ-পোষণ দেবার জন্য। আমি তাকে অনেক অনুরোধ করি আমার মেয়েটাকে নিয়ে ফেরত আসবার জন্য। সে শুনেনি। মাসে মাসে মেয়ের জন্য খরচ পাঠাই। মাঝে মাঝে কল করে মেয়ের সাথে কথা বলতে চাইলে আমার এক্স আমাকে কথা বলতে দেয়না। পাশের এক বয়স্ক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি করেছিলে যে সে তোমাকে রেখে চলে যায়?

জীবজগতে আসলেই লোকটির মতো অপদার্থ নেই। না হয় গার্ল্ফ্রেন্ডকে সারারাত ঘরে একা ফেলে কেউ ট্যাক্সি চালায়? সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা কেউ এতো ভাবে? এ যুগে এতো কর্তব্যপরায়ণ হয় কোন বয়ফ্রেন্ড? আমি তার মেয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে আছি। ভাবছিলাম বাবার মুখটা যেন কেউ কেটে মেয়েটির মুখে সেঁটে দিয়েছে। সামনে বসা নেপালি বাচ্চার মা করুন মুখে লোকটির বাচ্চার কথা শুনছিল আর বার বার তার সন্তানকে বুকে চেপে ধরছিল। ছোট মেয়েটি অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে লোকটির দিকে। আমি এ ছবি থেকে সে ছবি দেখতে দেখতে কখন গ্রান্ড সেন্ট্রাল চলে আসি খেয়াল করিনি। নামার আগে লোকটার দিকে একবার তাকিয়ে কিছু না বলে বেরিয়ে এলাম। নারী প্রগতির এই সাংঘাতিক স্তরে, আমার মতো বহু নারীর মনে ফসিলের মতো প্রাচীন কিছু পদার্থ জমে আছে; তার মধ্যে একটি হলো রাগ। লোকটার উপর রাগ হচ্ছিল। ভাবছিলাম কি হতো যদি কিছুটা সময় গার্লফ্রেন্ডকে দিয়ে নিজের সন্তানটিকে কাছে রেখে দিত? আমার গন্তব্যে যাবার সময় হলো। এক ট্রেন থেকে অন্য ট্রেনে উঠবার সময় আমার মায়ের একটি কথা বার বার মনে হচ্ছিল ‘সংসার জানালার কাচের শার্সি। ঢিল ছুঁড়ো না ভুলে।’

সারা জীবন কি পেলাম কি হারালাম এ হিসেব কষেই কাটিয়ে দিলাম। মায়া-ভরা পৃথিবীতে নিয়েছি যত, তারও বেশি হয় তো, হয়তো হয়েছে দিতে। সংসারে বেশি কিছুতো চাইনা আমরা নারীরা- একটু মনযোগ চাই, একটু স্বীকৃতি আর সঙ্গ। পৃথিবীর সব বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে হাসিসুখে কাটাক। সকল বাবা-মায়ের বুক সন্তানদের ভালোবাসায় ভরে থাকুক; শুভ কামনা ও শুভ রাত্রি।

ভায়লা সালিনা লিজা
০১/১৫/২০১৬

২৯৭জন ২৯৭জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ