সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

এইতো জীবন

রেজওয়ানা কবির ১৮ আগস্ট ২০২১, বুধবার, ১০:০৩:০৮অপরাহ্ন গল্প ১৫ মন্তব্য

একটা কিছু লিখতে চাই ভাবতে ভাবতেই এই দিনগুলি হচ্ছে গত,,,, কিন্তু কালতো আর ফিরে পাবো না এমনটা ভাবতে ভাবতেই ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ থাকা স্বত্বেও  চোখ দুটি  ঘুমে বিভোর হয়ে যাচ্ছিল নিয়নের । দুই/তিন মিনিট ও যে গভীরভাবে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা যায় তা নিয়নকে না দেখলে বোঝার কোন উপায় নেই।

শুধুমাত্র এই লেখালেখির মাঝে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্যই সারাদেশের অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন  নিয়ন। সংসার সামলানোর কোন কাজেই নিয়ন  নেই।  বিয়ের পর এই প্রথম বউ নিয়ে যাচ্ছেন বেড়াতে। কিন্তু কোথায় যাবেন তা এখনো ঠিক করে উঠেনি। যতদুর ট্রেন যাবে, ততদুর তারাও যাবে হয়তো!

ইক্সিউজ মি! এটা কি ২০৩ নং কামরা?? আনন্দ বললো,

আলোঃ  জ্বি

আনন্দঃ আর কিছু না বলেই, তিতির এসো এটাই আমাদের কামরা।

এ কেমন মানুষ নুন্যতম ভদ্রতাও নাই আলোকে ধন্যবাদ না দিয়েই,,,,,

আনন্দ বউকে অনেকটা টেনে নিয়ে এলো কামরার ভিতর। আলো মেয়েটির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে, শ্যমলা মেয়ারাও  এত সুন্দর  হয় নাকি পৃথিবীতে??? তার মায়াময় চোখের  দিকে না তাকালে আলোর বিশ্বাসই হতো না!

আনন্দঃ তিতির, ঠান্ডা লাগবে, জানালাটা ওভাবে খুলো না বলেই তার মিষ্টি বউয়ের গায়ে চাদর জড়িয়ে দিয়ে কাছে টেনে নিল। তারপর তাদের ফিসফিস কথা ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না।

 

অপরদিকে ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেল নিয়নের। এবরোথেবরো চুলগুলো কোনরকমে ঠিক করে নিয়েই  নিয়ন আলো-কে বলল আবার ঘুমিয়ে গেছিলাম,তুমি ডাকলেই পারতে। নিয়নের কন্ঠ শুনেই  তিতিরের বুকে আচমকা একটা ধাক্কা লাগল।  তিতির পাশ ফিরতেই দেখলো নিয়ন,,,, , এ কি সেই নিয়ন??? যার সাথে,,,,,,,,,??? তিতির হারিয়ে গেলো সেই দিনগুলিতে ,,,,,,,,,,,,

নিয়নের সিল্কি চুল আর এলোমেলো নিয়ন ভালোলাগার  কবিতা, লেখালেখি আর আধপাগল নিয়নকে ভালোবেসেছিল এই তিতির। কি সুন্দরই না ছিল দিনগুলি!  নিয়ন সারাদিন শুধু কবিতা লিখেই যেতো, আর তিতির মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো অগোছালো নিয়নের দিকে।

এভাবে ভালোবাসার ভালো সময় পার করছিল তারা দুজনেই।

যত দিন যাচ্ছিল তিতিরের পরিবারে বিয়ের চাপও ততোই বাড়ছিল তখন।  তিতির এই আধপাগল বেকার যুবকটার কথা বাসায় বলতেও পারছিল না সেসময়।  এভাবে কিছুদিন যেতেই তিতির নিয়নকে একা একা বিয়ে করে ফেলে, তারপর শুরু হয় তাদের নতুন জীবন।

এমন নতুন জীবন, যেখানে কবিতা দিয়ে পেট ভরে না,এমন নতুন জীবন যেখানে আর উস্কোখুস্কো চুল, আর এলোমেলো নিয়ন সামলাতে পারে না তাদের শখের সংসার। লিখতে পারেনা আর কিছুই।

তবু ও বাঁচতে হবে ভেবেই তিতির একটা প্রাইভেট জব শুরু করে। তারপর আবার শুরু হয় তাদের একটুখানি ভালো থাকা, তিতির জব করে আর নিয়ন সারাদিন স্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে সবার দ্বারে দ্বারে ঘোরে। সবাই লেখা পছন্দ করে, ভালো এমাউন্টও দিতে চায় কিন্তু লেখাগুলো নিয়নের তা কোথাও বলা যাবে না এমন শর্তে পিছন ফিরে চলে আসে নিয়ন। তিতিরের ব্যস্ততা আর নিয়নের বার বার হেরে যাওয়ায় আবার তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে।  তারপর,,,,,,,

এই তিতির শুনছো ট্রেন থেমেছে ,তুমি একটু বসো,আমি বাইরে থেকে তোমার পছন্দের খাবারগুলো নিয়ে আসি।।।

(তিতির নামটি শুনে নিয়ন তার হাতের সামনের বইটি ফেলে ওপাশে  স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে,,সেই তিতির,,,,,

আবার এতোদিনপর,,,,,,,,,,,,)

তিতির ঃ মিষ্টি হেসে আনন্দের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিকআছে তাড়াতাড়ী এসো।

এদিকে আলো নিয়নকে বললো,পানি শেষ হয়ে গেছে নিয়ে এসোতো।

নিয়নঃ হুম, আচ্ছা বলেই বেড়িয়ে গেল।

এবার আলো মনে হলো,সুযোগ পেলো মিষ্টি মেয়েটির সাথে  কথা বলার।

আলোঃ হ্যালো আপু!  আমি আলো!

তিতিরঃ আমি তিতির!

আলো ঃ বাহ! সুন্দর নামতো,আপনি যেমন দেখতে সুন্দর তেমন নামটাও আপনার সুন্দর, বলেই বকবক করতেই থাকলো। আপু,আপনার বর খুবই রোমান্টিক তাই না???আপনার কত যত্ন করে!আপনি এত মিষ্টি আপনাকে ভালো না বেসে পারাই যাবে না, আরও কত কি!!!! এক নাগারেই কথা বলতেই লাগলো।

তিতির মনে মনে বিরক্ত হয়েও মুখে আর্টিফিসিয়ালি হাসি রেখে হু,হ্যা করতেই থাকল, আর ভাবতে লাগল,নিয়ন এরকম  বাঁচাল মেয়ের সাথে কিভাবে থাকে??? নিয়নের জন্য কি আমি ভালো ছিলাম না???

আলো ঃ আপু তবে আমার কাছে সংসার মানে স্বামীকে প্রাধান্য দেয়া,তার ভালো থাকায় আমার ভালো থাকা। জানেন আপু! আমার উনি সবসময় নিজের মতো থাকেন,আমাকে সময় দেয়ার তার সময়ই নাই কিন্তু এতে আমার খারাপ লাগে না।আমার মনে হয় উনি লিখতে চায়, লিখুক না তার মত করে, থাকুক না তার মত করে আমি তার পাশে আছি এটাইতো অনেক। সবারতো তার পাশে থাকার ভাগ্য হয় না তাই না??? সংসার মানেই মেনে নেয়া কেউ কম মেনে নেয়,  আবার কেউবা একটু  বেশি মেনে নেয়।  তবে মেনেতো নিতেই হয়  কি বলেন আপু???

তিতির কি শুনছে কিছুই জানে না, শুধু বার বার মনে হচ্ছিল, আমি কি তবে মেনে নিতে পারেনি???এসব ভাবতেই তিতির,,,,,

আবার হারিয়ে গেল সেইসব দিনগুলিতে,,,,,

যেদিন তিতির শেষবারের মত চলে এসেছিল, সেদিনতো তিতির এই মেয়েটির মতো ভাবেনি। তিতির একা লড়াই করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিল,তিতিরতো নিয়নকে সুযোগ দেয়নি লেখার, সবসময় নিয়নকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছিল,নিয়নের মত করেই নিয়নকে থাকতে দেয়নি কখনো???।

সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি ছিল, তিতির নিয়নকে ছেড়ে চলে এসেছিল কারন একটাই যে নিয়নকে একটা কিছু করতেই হবে, এই লেখা লেখা করে জীবন শেষ করলে হবে না। অথচ এই তিতিরই ভালোবেসেছিল একসময় নিয়নের কবিতা, নিয়নের লেখা অথচ এখন এই লেখাই যেন তিতিরের কাল হয়ে উঠেছিল।

যেদিন তিতির চলে এসেছিল সেদিন নিয়ন একবারও আঁটকায়নি তিতিরকে, নিরবে তিতিরের চলে যাওয়া মেনে নিয়েছিল । সেদিন কি তিতির কে আঁটকালে তিতির থাকতো ???

আলোঃ আপু, শুনছেন??কোথায় হারিয়ে গেলেন?আমিতো একাই কথা বলে যাচ্ছি, আপনিও কিছু বলেন?

তিতিরঃ আবার সেই হাসি!!! হুম,,,

আলোঃ  জানেন আপু, আমার উনি আমাকে খুব ভালোবাসে আমি বুঝি। আমি যখন ঘুমাই তখন উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, আমার পছন্দের শার্ট পরে, আমার পছন্দের হাতঘড়ি পরে, আমি যাকিছুই রান্না করি না কেন  সব এমনভাবে বাচ্চার মতো চেটেপুটে খায় দেখে  মনে হয়, যে তার খাওয়া দেখে আমিই শেষ তৃপ্তিটাই পাই,শুধু তাকিয়েই থাকি।

তিতির ঃ তুমিতো অনেক বোঝ! সবাই  তোমার মতো বুঝলে হয়ত অনেক ভালো হতো!

তুমি এতো ছোট একটা মেয়ে এরকম মধ্যবয়সী লোকটাকে  বিয়ে করলে কেন???

আলো ঃ কি যে বলেন আপু,বিয়েটাতো ভাগ্যের ব্যাপার! আর বয়স  কোন বিষয় নয়। বড় কথা হলো আমি এই মানুষটাকে পেয়ে সুখী।

তিতির,এই নাও চিপস বলেই আনন্দ এগিয়ে আসলো।

তার পিছনে নিয়নও আসল পানি নিয়ে।

তিতিরকে জঁড়িয়ে আনন্দ অনেক খুনশুটি করতে লাগল।

অপরদিকে নিয়নও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলোর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, সামনের স্টেশনেই আমরা নেমে পরবো,ঝটপট রেডী হও।

নিয়নের এই শক্ত করে হাত ধরে রাখা মানে কি তিতির কে ভুলতে পারা???কে জানে???

আলো ওয়াশরুমে আর আনন্দ সিগারেট খাওয়ার জন্য বাইরে গেলে প্রথম তিতিরই নিয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,

কেমন আছো???

নিয়নঃ হুম ভালো, তুমিওতো ভালো আছো। বিলাসবহুল জীবন আর কেয়ারিং হাসবেন্ড ভালোই লাগছে তোমাদের দেখতে।

তিতিরঃ নিয়ন আমি সরি!!!! আমি বুঝিনি যে আমি কি চাই? কিন্তু আমি প্রতিনিয়ত তোমাকে খুঁজি আনন্দের মাঝে বিশ্বাস করো। আনন্দ আমার অতীত জানে। আনন্দ আমাকে ভালো রাখার জন্য সবসময় চেষ্টা করে, তাই আর ভুল করতে চাই না জন্যই ওকে আঁকরেই বেঁচে আছি।।।।

নিয়নঃ আলো আমার অতীত জানতে চায়নি কখনো,আমি অনেকবার বলতে চেয়েছি আলো থামিয়ে দিয়েছে।  এই ছোট্ট মেয়েটাই হয়ত আমার জন্য পারফেক্ট। ভালোবাসা কি জানি না, তোমাকে ভুলতে পারিনি কখনো,তোমায় ঘিরেই আমার এখনো লেখা তোমাকে হারানোর আফসোস ও নেই কারন তোমায় না হারালে আলোর মতো এতো বোকা,সহজ সরল মেয়ের দেখা পেতাম না। তোমার জায়গা কখনো আলো নিতে পারেনি তুমি আছো আজও, কিন্তু আমার ভিতর আলোর আরেকটা জায়গা তৈরী হয়েছে। ভালো থেক,,, ভালোবাসি ঠিক আগের মতো।।

তিতির কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেইসময় আলো কামরায় এসে বললো আমি রেডী,চলো নেমে পরি,বলেই লাগেজ হাতে নিয়ে আলো আর নিয়ন ট্রেন থেকে নেমে পড়ল।  ট্রেন থেকে নামার আগে পিছন ফিরে নিয়ন একবারও তাকালো না।

তিতিরের চোখের কোনে একরাশ জল গড়াতে লাগল,,,,, 😭😭😭

আনন্দ এসে তিতিরকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে হিন্দি গান শুরু করে দিল,,,

“হাম তুম, এক কামরে মে বন্ধ হো,

ওর চাবিকো খো যায়ে”””

তিতির আনন্দকে জঁড়িয়ে আঁড়ালে চোখের পানি মুছে আনন্দকে বলতে লাগল, পাগল একটা!!!!

আনন্দ, তিতির আর নিয়নের সব কথা শুনেছিল, তবুও বুঝতে দিল না তিতিরকে।

ট্রেন চলছে তার গতিতে আনন্দ, তিতিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর তিতির ভেসে যাচ্ছে তার অতীতে,নাকি বর্তমানে?????

আনন্দের মোবাইলে গান বাঁজছে,,,

“এই তো জীবন,

যাক না যেদিকে যেতে চায় প্রাণ”।

ছবিঃ নেট থেকে

১৫৭জন ৪৮জন
15 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য