উড়ান

সাবিনা ইয়াসমিন ১০ মার্চ ২০২২, বৃহস্পতিবার, ০৩:৩৩:১৩পূর্বাহ্ন গল্প ১১ মন্তব্য

নদী,কোথাও তার যাওয়া হয়নি নিজের মতো করে, নিজেকে নিয়ে। একেক সময়ে ভীষন ইচ্ছে হয় জনমের পথ পেরিয়ে ফাগুনের কাছে চলে যেতে, যাকে কখনো নিজচোখে দেখেনি। নদীর ভেতরটা কেবলই হাসফাঁস লাগে অভ্যস্ত জীবনের কঠোরতায়। এভাবেই চলছিল সব, হয়তো এভাবেই চলে যেত আগত সবদিন। কিন্তু হঠাৎ এক স্বপ্ন এলো নদীতে জোয়ার নিয়ে।

স্বপ্ন! স্বপ্ন কী অভ্যাসের শৃঙ্খলা মেনে দু’চোখে পাড়ি দিতে জানে! স্বপ্নটা নদীকে স্বপ্ন দেখায়, ফিসফিসিয়ে  ডেকে বলে এসো পাহাড় সমুদ্র মুক্ত আকাশ সবাই তোমার অপেক্ষায়, চলো পালাই…

নদীর ভাবনা গুলো বয়ে চলে। এভাবে আর নয়, একবার হলেও সে তার স্বপ্নের কাছে যাবে,সব বাধা পেরিয়ে কাছ ঘেঁষে স্পর্শ করবে তার স্বপ্নকে।
যেই ভাবা সেই কাজ, সিদ্ধান্ত নেয়ার পর আর দেরী সইবে কেন! নিজেকে শুভ হ্যাপি জার্নি উইশ করে স্বপ্ন-যাত্রার উদ্যোগ নিলো।

মনে মনে ঠিক করেছে স্বপ্নের পথেই যখন যাচ্ছি তাহলে  উড়াল দিতে দোষ কি! অনলাইনে টিকেট পেতে বেশি বেগ পোহাতে হলো না। টিকিট কনফার্ম হলো কয়েক মূহুর্তে। আরও কিছু সময় লাগলো একান্ত দরকারী বস্তু গোছাতে।
স্বপ্ন-যাত্রায় কোন বাধাবিঘ্ন তার সহ্য হবে না, তাই যথা সময়ের ঘন্টা তিনেক আগেই বাসা থেকে বের হলো। ঢাকা শহরের সুদৃশ্য ফ্লাইওভার গুলো যতই আসস্ত  করুক নদী এই শহরের রাস্তা গুলোকে মোটেই বিশ্বাস করতে পারেনা। কারণ সে জানে, বেরসিক জ্যামে পড়ে গেলে ফ্লাইওভারের মিষ্টি হাসি তার মনের অবস্থা বিশ্রী করে দিতে একদম কার্পণ্য করবে না।

যাইহোক সিএনজি পাওয়া গেলো বাসার সামনেই।
– এয়ারপোর্টে যাবেন?
-…… টাকা
– কী? এত টাকা? আগে কখনো এয়ারপোর্টে গেছেন?  মিটারে যা আসে তাই দিবো,গেলে চলেন।
– ম্যাডাম আপনার ভাড়ায় গেলে দুই ঘন্টা লাগবে, আরও বেশি লাগতে পারে। আর আমার চাওয়া ভাড়ায় গেলে অর্ধেক সময় বেঁচে যাবে। এখন আপনিই ঠিক করেন ভাড়া কমাবেন নাকি সময় অর্ধেক বাঁচাবেন। ভরসা রাখেন, আমি চার বছরের বেশি সময় ধরে সিএনজি চালাই।

সময় বাঁচানোর যুক্তিটা নদীর মনপুত হলো। তারপরও শর্ত দিলো গাড়ি ঠিক মতো চালাতে হবে। সময়ের দাম অবশ্যই আছে কিন্তু সময়ের চেয়ে জীবনের দাম বেশি।

এয়ারপোর্টে পৌঁছানো অব্দি সিএনজি ওয়ালা তার ড্রাইভিং দক্ষতা দেখিয়ে নদীকে রীতিমতো মুগ্ধ করেছে। লোকটা তার কথা রেখেছে। পুরো রাস্তায় কোন ট্রাফিক সিগনাল না ভেঙে শর্টকাট রাস্তা দিয়ে তাকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে এসেছে। ভাড়া দেয়ার সময় নদী তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আপনি ভালো ড্রাইভার, তাহলে সিএনজি চালান কেন?
– আগে আমার অবস্থা ভালো ছিল, নিজের গাড়িও ছিলো। কিন্তু অবস্থা হঠাৎ খারাপ হওয়া শুরু হলে  বিভিন্ন সমিতি থেকে লোন নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। ব্যবসাটা টিকেনি, মাঝখানে সমিতির কিস্তি দিতে দিতে আজ আমি সিএনজি ওয়ালা।

নদী এই প্রথমবার এয়ারপোর্টে প্রবেশ করছে। কী করতে হবে, কোথা দিয়ে শুরু করবে কিছুই জানা নেই। কিছু না জানার কারণে সে কি ফিরে যাবে?  উহু, নদী তেমন নারী নয়। প্রবেশ পথে এয়ারপোর্টের একজন স্টাফের কাছ থেকে সবটা জেনে নিয়ে স্বপ্নপূরণের পরবর্তী ধাঁপ অতিক্রম করলো।

নদী অনেক মানুষের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, তার পিছনেও অনেক মানুষ। সামনে চেকিং চলছে। একটা ঝুড়িতে হ্যান্ডব্যাগ, মোবাইল, ঘড়ি, সানগ্লাস, আংটি, ব্রেসলেট আরেকটা ঝুড়িতে জুতো জোড়া রেখে মেশিনে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে একটা যান্ত্রিক দরজা পেরোলো। সেখানে এক গম্ভীর চেহারার সিকিউরিটি গার্ড (নারী) নদীকে নিয়ে গেল পর্দা ঘেরা এক স্থানে, আপদমস্তক চেকিং হবে সেখানে। ইলেকট্রনিক মেশিনটা প্রথমে চুপচাপ ছিল, যেই মেশিনটা নদীর বুকের কাছে এলো ওমনি এলার্ম বাজা শুরু!  ব্যাপার কি! ব্যাপার আর কিছু না, চেকিং এর সময় সবকিছু ঝুড়িতে রাখলেও নদীর গলায় মেটালের চেইনটা খুলে রাখেনি। তাই এই বিপত্তি। নদী ভেবেছিল এই বুঝি সিকিউরিটি গার্ড বিরক্ত হয়ে তাকে কড়া কিছু শুনিয়ে দিবে। কিন্তু নদীকে অবাক করে দিয়ে তিনি হাসলেন, আহা, এককথায় চমৎকার একটা হাসি গিফট দিলেন।

জানা গেল প্লেনে উঠতে হলে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা লাগবে। ওর কাঙ্ক্ষিত প্লেন নাকি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বিশ মিনিট লেট। ওর সাথে অপেক্ষায় থাকা অপেক্ষামান মানুষরা বলাবলি করছে এদের (বিমান কোম্পানির) সার্ভিস এমনই। এরচেয়ে ওমুক/তমুক লাইন্সের সার্ভিস অনেক ভালো। মোটামুটি সবাই কফি সহ কিছু না কিছু খাচ্ছে। ও হ্যা,এয়ারপোর্টে এসে এখানের কফির দাম/মাণ সম্পর্কেও জ্ঞান বাড়লো। প্রতি কাপ মাত্র দু’শো, স্বাদে অসাধারণ তিক্ত। এসব দেখে নদীর মনে হলো আমাদের দেশের মধ্যবিত্তদের টাকাপয়সা ভালোই আছে, অন্তত মানুষদের যতটা ধনী মনে হয়, তার থেকে অনেক বেশি বড়লোক্স!

নদী বসেছে জানালার পাশে। একটা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়ে সে প্লেন অব্দি পৌঁছে ছিল। দেখতে অত্যন্ত সুন্দরী, সুশিক্ষিত এক বিমানবালা তাকে তার সীট নাম্বার মিলিয়ে বসতে সাহায্য করেছেন।  যদিও এটা নদীর সীট না। নদী বিশেষ অনুরোধ করে এই সীটে বসেছে। জানালার পাশে যার সীট সে এখনো ভেতরে আসেনি। বিমানবালা নদীকে সতর্ক করেছে যার সীট সে আসা মাত্রই (যদি আপত্তি করে) যেন নিজের সীটে চলে যায়।

উড়ার মাত্র কিছু সময় বাকি,সে এলো। নদী আড়চোখে দেখতে পেলো লোকটা উপরের ক্যাবিনেট খুলে ল্যাপটপ না জানি কিসের একটা ব্যাগ রাখলো, প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে খুব সতর্কতার সাথে পাশের সীটে বসে পড়লো। কে যেন বললো কোন সমস্যা নেই। কন্ঠটা এতই মৃদু ঠিক বোঝা গেল না কে কথা বলেছে।

প্লেন ছুটে চলেছে রানওয়ে ধরে, ধিরে ধিরে গতি বাড়ছে। যেকোনো সময় যান্ত্রিক পাখিটা মাটি ছেড়ে আকাশে উড়াল দিবে..রুদ্ধশ্বাসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে নদী। উড়ানের পথেতো শুধু প্লেন নয়, সে-ও যে উড়বে!

হঠাৎ বাম বাহুতে চাপ অনুভব করলো, তাকিয়ে দেখে পাশের ভদ্রলোক চোখ বুজে আছে, তার হাতদুটো আড়াআড়ি করে বুকের কাছে রাখা। লোকটা কিছুটা নদীর দিকে চেপে বসেছে।

এ কেমন অসভ্যতা! বাসে মেয়েদের সাথে প্রায়ই এমন হয় তাই বলে প্লেনেও হবে! প্লেনের সীট তো আর বাসের মতো না,যে চাপাচাপি করে বসতে হবে! একটা কঠিন ঝাড়ি দিতে হবে, ভাবতেই লোকটা দু’চোখ মেলে তাকালো। কিছুক্ষণ আগে শোনা মৃদু কন্ঠটা বের হয়ে এলো তার মাস্ক পরা মুখ থেকে..

– থ্যাংক ইউ এন্ড সর‍্যি
– কেন!
– জানালার পাশে আপনি বসে আমার উপকার করে দিয়েছেন,  তাই। আর এভাবে আপনার গায়ে চাপ লাগার জন্য সর‍্যি। প্লেন ফ্লাই করার সময় আমি খুব নার্ভাস ফিল করি।

– তাই?  ইট’স ওকে। কিন্তু নার্ভাস ফিল করার কি আছে একটু বলবেন? আপনি কী জীবনে এই প্রথম প্লেনে উঠলেন?

– না, আমি কতবার প্লেনে চড়েছি এখন আর হিসাব করে বলতে পারবো না। আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় একই যাত্রায় তিন দেশের এয়ারপোর্টে তিনবার ব্রেকফাস্ট করার অভিজ্ঞতাও আছে।

– তাহলে ভয় পাচ্ছেন কেন?  আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রচুর, এখন শুধু প্লেন চালানোটাই বাকি আছে।

– এই ভয়টা আমি প্রতিবার পাই। প্লেন যখনই টেকঅফ করতে থাকে আমার কানের ভেতর এক ধরনের শব্দ হতে থাকে, ব্রেইনে একটা চাপ সৃষ্টি হয়। মনে হয় এই বুঝি প্লেনটা ব্লাস্ট হয়ে যাবে, আর আমি সীট সুদ্ধ কোথাও পড়ে যাবো। হয়তো মাটিতে আছড়ে পড়বো অথবা কোন সাগরে নিমজ্জিত হবো।..আপনি আসলে বুঝতে পারবেন না। সমস্যাটা স্নায়ুর, এবং কিছুটা মানসিক।  এরকম সমস্যা সবার হয় না। যার হয় প্রথম বা দ্বিতীয় না সব বারেই হয়।
– ওহ। ঠিক আছে।

নদী ওর মোবাইল বের করে নিজের/যতটা সম্ভব বাইরের ছবি বেশ কিছু ছবি তুললো। কিন্তু ভালো ছবি পাচ্ছিল না একটাও, কারণ নদীর অল্পদামে কেনা মোবাইলের ক্যামেরা। ওটা প্রতিবারেই ঝকঝকে ছবি নিতে ব্যার্থ হচ্ছিলো।

পাশের ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিল, হয়তো ঘুমিয়ে ছিল, নদী ব্যস্ত ছবি তোলায়। এতক্ষণে তার মনে হলো পাশের ভদ্রলোকের কাছে আপডেট মডেলের আইফোন আছে। তার ফোনটা দিয়ে ছবি তুললে ছবিগুলো দারুণ আসবে। লজ্জাটুকু গোপন করে নদী কিছু সময়ের জন্য ঐ ফোনটা ইউজ  করার অনুমতি চাইতেই ভদ্রলোক বল্লো, -আপনি আমার ফোন দিয়ে ছবি তুলতে পারতেন, কিন্তু প্লেনে ফোন সুইচ অফ করে রাখতে হয়। ছবি তুলতে গেলেতো ফোন অন করতে হবে।

– বেশতো, আপনি আমার মতো ফোন অন করে ফ্লাইট মুডে রেখে দিন। এতে ফোন বন্ধ থাকলো, ক্যামেরাও অন থাকলো।

ভদ্রলোকের দু’চোখে বিস্ময়! আরে তাই-তো!! এভাবে করা যায় এটা আজ পর্যন্ত কেন যে মাথায় আসেনি! আগে জানতে আমার বিগতদিনের বিমান ভ্রমণের কত ছবি থাকতো!!

নদীর হাসি পায়। বলে না, সব সমস্যার সমাধান তাৎক্ষণিক পাওয়া যায় না। সময়ে মানুষের বুদ্ধি বাড়ে।

প্নেন ল্যান্ড করেছে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। নদী বেরিয়ে এসেছে বিমান বন্দরের ফটকে। কত মানুষ অপেক্ষা করে আছে তাদের পরিচিতজনদের রিসিভ করতে! তার জন্যে কি কেউ নেই?!

ডানে-বামে, পেছনে তাকিয়েছে..হঠাৎ “সে” সামনে  এসে দাড়ালো!

— কেমন আছ নদী? এত দেরীতে এলে কেন?  তুমি কি জানো কতযুগ ধরে আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।

– নদী!!  আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?  আর তুমি করে বলছেন কেন?  কে আপনি!?

–আমি স্বপ্ন, যে তোমায় স্বপ্ন দেখায়,
– আর আমি-ই সেই ফাগুন, যে তোমার স্বপ্নে পূর্ণতা আনে। আমায় এখনো কী চিনতে পারোনি সোনা..//

.

.

.

.

* সমাপ্ত না।

** ছবিসব- আমার 🙂

৩০১জন ১০৮জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য