ন্যায়-নীতি ও আদর্শ রক্ষা এবং ধর্মকর্ম পালন উন্নততর মানুষের বৈশিষ্ট্য। ন্যায় ও বিজ্ঞানের দর্শনে নীতি ও আদর্শের চর্চা মানুষকে উৎকর্ষের দিকে নিয়ে যায়; যেকোনো ক্ষেত্রে সফল হওয়ার পথকে সুগম করে তোলে। তাছাড়া নৈতিক চরিত্র গঠনেও ধর্মকর্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল নৈতিকতার জন্যই নয়, দেহ-মনে স্বস্তি (Harmony in body & mind), আত্মার প্রশান্তি, মনের পবিত্রতা, সৌন্দর্যচর্চা ও সুস্বাস্থ্য লালনে ধর্মকর্মের রয়েছে বিরাট ভূমিকা। প্রকৃতপক্ষে শরম ও ধরম ছাড়া মানুষের মধ্যে ভালোত্বের আশা করা বৃথা। ধর্ম মানুষের কল্যাণে স্রষ্টার বিধি-বিধান। ধর্ম মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখায়। ধর্ম মানুষের সেই পবিত্র বিশ্বাস, যে বিশ্বাস তাকে সর্বদা সত্য-সুন্দর, ন্যায় ও নৈতিকতার পথ ধরে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের নির্দেশনা দেয়। সত্যিকার অর্থে ধর্মকে যিনি অন্তর দিয়ে ধারণ ও লালন করেন, তিনি বুঝতে পারেন ধর্ম আত্মাকে যে পবিত্রতা ও প্রশান্তি দান করে, তা জাগতিক ধনসম্পদ বা ঐশ্বর্য থেকে কখনো পাওয়া যায় না।  সকল ধর্মের নিয়মকানুন সাধারণত মানুষের শারীরিক ও আত্মিক সুস্থতার ক্ষেত্রে সহায়ক। অর্থাৎ ধর্ম যেমন মানুষের আত্মাকে পবিত্র করে তেমনি শরীরকেও সুস্থ রাখে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে সমতা পালনের কথা বলা হয় ধর্মে। এ সমতা মানুষের দৈহিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য একান্ত প্রয়োজন।

ধর্মীয় নির্দেশাবলীর পালন মানুষের হৃদয়কে নির্মল করে, মনকে সংযত ও শরীরকে সুস্থ রাখে; চিন্তাকে করে পবিত্র। ধর্ম মানুষকে লোভ, হিংসা, পরনিন্দা-পরচর্চা ইত্যাদি থেকে দূরে রাখে। শরীর ও মনের ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে এমনই সুস্থ রাখে যা মানুষের জাগতিক ও পারলৌকিক উভয় জীবনের সুখ, সমৃদ্ধি ও সফলতার জন্য একান্ত প্রয়োজন।
ধর্ম কেবল আক্ষরিক ও দর্শনের অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, মানব জীবনে শৃঙ্খলা-সৌন্দর্য ও সুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ধর্মের কারিশমা রয়েছে সরাসরি। যেমন ইসলাম ধর্মে নামাজ, রোযা, হজ, জেকেরসহ অন্যান্য ধর্মের বিভিন্ন কর্মেও নৈতিক উন্নতির পাশাপাশি দেহ-মনের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক বহুবিধ উপকার ও কল্যাণ নিহিত। নামাজে রুকু-সেজদা-সালামসহ প্রত্যেকটি মুভমেন্টে শারীরিক নানা উপকার রয়েছে এবং অজু করার মধ্যে বাধ্যগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিরাট সুযোগ রয়েছে। তাই যারা দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, তারা বাধ্যগতভাবে পরিচ্ছন্ন থাকেন এবং শরীরের এমনসব নিয়মিত চর্চায় অভ্যস্ত থাকেন, যার ফলে অনেক অসুখ-বিসুখ তাদের হয়ই না এবং তারা ঈমান, শৃঙ্খলা ও সুস্বাস্থ্যে মজবুত থাকেন।
যারা বুদ্ধি-বিবেক কাজে লাগান, জ্ঞানের গভীরতা রাখেন, তারা জানেন যে স্রষ্টার লীলাখেলার এ পৃথিবীতে তাঁর অনুমোদন ব্যতিরেকে কিছুই হয় না। তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে ভূমি ভিজিয়ে শস্য অঙ্কুরিত করেন। আবার ক্ষেতে ফসলের শোভা দেখে মালিক যদি আত্মদম্ভে মেতে ওঠেন অথবা কোনো অহমিকার আশ্রয় নেন, তখন স্রষ্টা এমন দুর্যোগ বইয়ে বা গজব নাজিল করে সেই ফসল নিশ্চিহ্ন করে দেন; যেন গতকালও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এতে ধৈর্যহারাদের এখানেই শেষ। আর অনুশোচনাকারী ও ক্ষমাপ্রার্থীরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে সক্ষম হলে স্রষ্টা আরেক সময়ে কয়েকগুণ বেশি ফসল দান করে তাকে পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেন এবং ক্ষতি পুষিয়ে দেন। এভাবেই নদীর একূল ভাঙা আর ওকূল গড়ার মতোই স্রষ্টা মানুষের পাপ ও পুণ্যের বিচার ও ব্যালেন্স করে থাকেন।
স্রষ্টার সহজ-সরল প্রাকৃতিক শক্তির সাথে চাই সরল-সহজ প্রেম; পুঁতির মালার মতো। ২০০ পুঁতির মালার মধ্য হতে একটি পুঁতি পড়ে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে তা আর মালা থাকে না, পুঁতিগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে বা পড়ে গিয়ে অবস্থা জটিলতর হয়ে যায়। তেমনি পাঞ্জেগানা নামাজের এক ওয়াক্ত না পড়লে বাকি ৪ ওয়াক্তের চেইন নষ্ট হয়ে যায়, স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার সম্পর্ক ব্যাহত হয়; প্রমাণিত হয় প্রেমিকের প্রতি অবহেলা। সেই ব্যর্থতা ও অবহেলার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অবশ্যই রয়েছে, যা স্থূল মন বা সংকীর্ণ চিন্তার মানুষদের বোধেই আসে না। ভালোর চর্চার মাধ্যমে তাদের এন্টেনায় তথা নূর বা জ্যোতি বা Aura level এ শান দেয়া থাকে না বলে সে এন্টেনায় এসব সূক্ষ্ম ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সিগন্যাল ধরা পড়ে না। ফলে চালাক-বোকার দলভুক্ত এসব মানুষ ধর্মকর্ম এবং স্রষ্টা, সৃষ্টি ও প্রকৃতির প্রতিশোধ সম্পর্কে থাকে উদাসীন। এদের মধ্যে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও `অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী` এর বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে নিজকে বঞ্চিত করে রাখে সেই সম্ভাবনা ও সাফল্য থেকে।

এজন্যই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের অন্তর ও বিবেক। বিবেকই বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ আদালত। তাই আমাদেরকে নিজের বিবেক ও বুদ্ধি দিয়ে সত্য ও ন্যায়কে অনুভব ও উপলব্ধি করতে হবে; সত্য ও কল্যাণের পথে আত্মোৎসর্গ করতে হবে, যে কল্যাণ-কর্মের প্রতিদান স্রষ্টা নিজ হাতেই দিয়ে থাকেন। সুরা ইউনুস এ রয়েছে কল্যাণ কাজের ফল বাড়তে থাকে বহুগুণে, আর পাপের পরিণাম নির্ধারিতই থাকে।  শান্তি, সমৃদ্ধি ও সৌহার্দ্যরে পথই হচ্ছে আল্লাহর পথ। শান্তি মানেই সত্য ও ন্যায়ের পথে অর্জিত চিরন্তন শান্তি; ক্ষণিকের আনন্দ উল্লাস নয়। 

আমরা ক্ষণিকের আনন্দ-উল্লাসে মোহাবিষ্ট হব না; কারণ ক্ষণিকের এ আনন্দ স্থায়ী সুখ ও সমৃদ্ধি অর্জনে বর্তমানের সময়কে নস্যাৎ করে দেয়। যারা তাদের ইচ্ছা ও কর্মকে শান্তি ও সমৃদ্ধিতে তথা আল্লাহর নিকট সমর্পিত করেন, তাদেরকেই কেবল সরল-সঠিক পথ দেখান স্রষ্টা। তাই সত্যের অনুসন্ধানের জন্য সরল-সঠিক পথের সন্ধান পাবে তারা, যারা আল্লাহর পথে তথা প্রকৃতির শক্তির পথে সাধনা করে থাকেন।   হিন্দু ধর্মেও স্রষ্টার সান্নিধ্যলাভ বা উপাসনার পূর্বশর্ত হলো ভক্তি ও সরলতা। স্রষ্টার কাছে কপটতা বা জটিলতার কোনো স্থান নেই। সরল হৃদয় ও নির্মল ভক্তির মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্যলাভ সম্ভব।
ধর্মকর্মে চিন্তার দারিদ্র্যের বা অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগ নেই। তাই ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়ার অন্ধবিশ্বাসও অতিরঞ্জন, অনাকাক্সিক্ষত। ধর্মের ক্ষেত্রে উৎসবমুখর হওয়ার চেয়ে যৌক্তিক আবেগী হওয়া দরকার। যেমন শবেবরাতকে খাদ্যোৎসবের দিন হিসেবে না নিয়ে এবাদত-বন্দেগীর দিন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তাছাড়া ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কখনো শান্তি দিতে পারে না। ধর্মকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে নিয়ে এর মূল দর্শনকে অনুভবে নিতে হবে। ধর্মের নামে হত্যা, নিপীড়ন, বোমাবাজি, সন্ত্রাস কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
১৩১জন ৩৭জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন