ঈদ মোবারক- বাবা

রোকসানা খন্দকার রুকু ৯ জুলাই ২০২২, শনিবার, ১১:২৭:২৭অপরাহ্ন চিঠি ৮ মন্তব্য

বাবা❤️

কেমন আছো, ওই আটোসাটো অতটুকু জায়গায়, জানতে ইচ্ছে হয়? অবশ্য তোমাকে আটকে রাখে কে? বলা নেই কওয়া নেই হুটহাট চলে যাওয়া তো তোমার অভ্যাস। যেমন গল্প করতে করতে এমন ঈদরাতে তুমি চলে গেলে।

আল মাহমুদের কবিতা প্রায়ই বলতে, তোমার প্রিয় কবিতা ছিল বলে হয়তো তাই হয়েছে –

” কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে

মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;

অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে

ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।

ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন–

নিরুপায় কিছু নাম, কিছু স্মৃতি কিংবা কিছু নয়;

অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন

কার হাত ভাঙে চুড়ি? কে ফোঁপায়? পৃথিবী নিশ্চয়।

স্মৃতির মেঘলাভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক

অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায়?

কেন দোলে হৃদপিণ্ড, আমার কি ভয়ের অসুখ?

নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়!

আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার

যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার।”

 

আচ্ছা বাবা, ওখানে কি তোমার বন্ধুরা বেড়াতে আসে। তুমি যে বন্ধু ছাড়া চলতে পারতে না। মা তো নেই বকা দেবার। নিশ্চয়ই অতি জরুরী কিছু ফেলে দিব্যি পান খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছো বীরেণ কাকুর সাথে নদীর পাড়ে কিংবা সাগরের তটে কিংবা জঙ্গলে নয়তো হারিয়ে ফেলেছ পথ।

সংসার বিবাগীরা বারবার পথ হারায়। এ তোমার ইচ্ছে পথ হারানো আমি বুঝি। যেমন করে ক্লাসে টেবিলে পা তুলে দেয়ার অপরাধে তোমার চাকরী হারালে। রেডিও ঘুস দেবার বদলে তুমি বললে, ও দিয়ে আমিই গান শুনবো মন ভরে। দু টাকার চাকর তো অনেক হলো আর করবো না।

তোমার ইন্টারভিউটা দারুণ ছিল।  ভোলা কি বলুন ?

তুৃমি উত্তর দিলে- হুম, প্রথমত আমার বাড়ির কুকুরের নাম ভোলা ,,,,,, এরপর; তবুও তোমার চাকরীটা হলো। কি অদ্ভূত!

অসম্ভব মেধাবী মানুষ তুমি, যে মানুষ ভাসতে জানে, ভাসাতে জানে, উড়তে জানে, প্রকৃতি যার প্রান, যে মানুষ গাছের তলায় রাতভর ঘুমিয়ে থাকে। তার কাছে জানতে চায় ভোলা কি?

বাবা জানো, ভাইয়া অবশেষে মুক্তিযোদ্ধা কার্ড নিয়েছে। তুমি তো নিলে না। তোমার অহংবোধে লাগল। ভাইয়া কেমন ছ্যাচড়ার মতো ভাতা তুলে খায়।

” কি এতোটুকু করেছি তারজন্য টাকা নিবো দেশের কাছে। তাহলে তো ও জিতে যাবে। ওকে জিততে দেয়া যাবে না। থাকুক সে ঋণী হয়ে!”

বাবা, জানো গতবছর ইদের দিন খালাম্মাও আমাদের ছেড়ে গেলেন। আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তোমার পরে তিনি ছিলেন আমার ভক্ত। মার চেয়ে তাকেই আমার বেশি ভালো লাগতো। একদিন বাইরে থেকে এসে দেখি সিঁড়ির গোড়ায় বসে আছেন আমার অপেক্ষায়।

উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন- ধরে ফেলেছি। দুদিন হল আমি এসেছি তুমি তো দেখা করনি। অপরাধী আমি তাকে বুকে জড়িয়ে রুমে নিলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলেন যেন মায়ের কোলে নিশ্চিত শিশু।

তোমাদর ভীষন মিস করি বাবা। কতোগুলো বছর হয়ে গেল তোমাকে ছুঁয়ে দেই না। যখন তুমি ছিলে তখন ইচ্ছেটা এতো প্রবল ছিল না। জন্মের পর থেকেই দেখছি টেকো মাথার মানুষ তুমি। চুল না থাকলেও তোমার মাথায় তেল দেবার টাকা নিতাম। তুমি বলতে, হিসেবী হওয়া ভালো। টাকা না দিয়ে বলতে বাকির খাতায় লেখা রইলো।

সেই সব বাকি কিন্তু আজও শোধ দাওনি বাবা! আমি যে কতো স্বপ্ন দেখেছিলাম আমার নিজের টাকা হলে বাপ- বেটি মিলে শোধ বোধের খেলায় নামবো। তার তো কোনটাই হলো না।

আমার একমাত্র বন্ধু ছিলে তুমি, তোমার সাথে আমার ঝগড়া হয়নি। মা সারাক্ষণ বকে, বলে বাপের মতো হয়েছিস আমি অহংবোধ করি। অন্ততঃ আমি তোমার মতো হয়েছি। দুটাকা চুরি করেছিলাম বলে যে মানুষ পিটিয়ে তক্তা বানায়। তার মতো অনেস্ট হতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার।

 

বাবার ভিটে- মাটি, জীবনের সমস্ত হিসেব, আহ্লাদ মাটি করে মার পাশে রইলে অথচ সেই মা তোমাকে কখনোই বোঝেনি। তেমনি আমাকেও কেউ বোঝে না। ওই যে তুমি বলতে মন হবে কাঁসার থালার মতো মসৃণ আর পরিস্কার। সেরকমই হয়েছি বাবা। তাই ভালোবাসায় হিসেবটা আরও বেশি গোলমেলে। ভালোবাসায় আমি মোটেও হিসেবী হতে পারিনি।

যতোদিন ছিলে সবাই ভীষন বিরক্ত হতো। অগোছালো, যাচ্ছেতাই তুমি একটা। আমি বুঝি, সকালে ওঠা অনেক কষ্টের, নিয়মমাফিক জীবন চালানো সেও কষ্টের। আমাকেও সবাই রিরক্ত হয়। পাশে থাকে না। ভালোবাসে না, সহানুভূতি নেই। আমি আজও কারও প্রিয়জন হতে পারিনি।

আমারও তোমার মতোই বলতে ইচ্ছে হয়, ” প্রয়োজন হতে পারে কজন”! প্রিয়জন না হয়ে কিছুতো হতে পেরেছি। ভালোবাসা ব্যপারটাই বোঝা। অযথা যা বহনের তাগদ নেই তা চাইবো কেন?

একটা জিনিস খুউব মিস করি। সারাদিন হাডুডু কিংবা মার্বেল খেলে বাড়িতে ফিরলে মা লাঠি হাতে তারা করত। তুমি আগলে ধরতে মেয়েকে ‘ ডাকু’  বানাবে বলে। মা বলতো, বাপের মতোই হতে হবে তোকে, তুই তো মেয়ে। কিছুটা মেয়েলিপনাও দরকার।

তোমার অবজেকশান ছিল- হ্যালো লেডি ড্রাকুলা মেয়ে পুরোপুরী আমার মতো হয়নি, চুল আপনার মতো হয়েছে।

মা রাগে ফুঁসতে থাকে, এই ফাঁকে তুমি আমাকে নিয়ে উধাও! বেটি, ভাগ্যিস তোর জন্মের সময় আমার মাথায় চুল ছিল না। তাই আজ দুজনে বেঁচে গেলাম। না হলে বিরাট ধোলাই হতো।

তুমিও পারোও বাবা, এই সিরিয়াস সিচুয়েশনে এমন মসকরা? হাসতে হাসতে আমার পেট ব্যথা হয়। হাসাতে পারতেও তুমি? এতো কঠিন সময়ে হাসাতে, হাসতে পারাই আসলে জীবন।

অতোটুকু বয়সে সিনেমা হলে গিয়ে টাইটানিক দেখে ফেললাম, সভাসধের বিচারক ভাইয়া। কঠিন পিটুনির আগে আগে তুমি জানালে অবজেকশান ইয়োর অনার, তাহার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সত্যি কিনা তা প্রমান করার জন্য আমাকে সিনেমাটা দেখতে হবে। তারপর বুঝবো সে সত্যিই অশ্লীল কিছু দেখেছে কি না? আমি জানতাম, ও তোমার আমাকে বাঁচানোর পন্থা।

বুড়ো বয়সে এমন লবডঙ্কা মেয়ের বাবা হবার অপরাধে তোমাকে সদা প্রস্তুত থাকতে হতো। কতো কথাই শুনেছ! আর আজ আমি মাথা নিচু করে থাকি আমার অপরাধে। পাশে দাড়াঁবার যে কেউ নেই। একটা শক্ত হাত, শক্ত কাঁধ, নির্মল ছায়া সরে গেছে পাশ থেকে। বাকি জীবন সবার কাছেই আমি অপরাধী, অপদার্থ, অযোগ্য হয়েই থাকতে চাই।

আর খুব তারাতারী তোমার কাছে যেতে চাই বাবা। অনেক বাকি দুজনের! আমার তুলে রাখা নীল শাড়ি, তোমার ফতুয়া ম্যাচিং করে খুউব বেড়াব আমরা। সবাই বলবে দুই পাগলের জমেছে বেশ!!!

ছবি – নেটের

১৮৬জন ২৩জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ