সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

ইরার ডাইরী পর্ব-৫

নীরা সাদীয়া ৯ এপ্রিল ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৪:৩৪:১৬অপরাহ্ন গল্প ১৯ মন্তব্য

আগামী কাল কোর্টে শফিকের কেসটা শুরু হতে যাচ্ছে। সময়মত শফিক হাজিরা দেবে ঠিকই। কিন্তু বাদী পক্ষের উকিল ইরা আদিবা সময়মত পৌঁছাতে পারবে তো? ইরাতো বন্দী শফিকের কারাগারে! এসব প্রশ্ন সারাক্ষণ ইরার মাথায় ঘুরঘুর করছে আর মাথাটা ওলট-পালট করে দিচ্ছে। ইরা একমনে মাথা ঠান্ডা রেখে চাবি খোঁজার চেষ্টা করছে। খুঁজতে খুঁজতে বসার ঘরের দিকে গেল। সেখানে তন্ন তন্ন করে খুঁজলো। চো গেল সোফার দিকে। তার মনে পড়লো, এই সোফাসেট, দেয়ালের টাঙানো ওয়ালমেট, নানা ডিজাইনের পর্দা, ওয়ালটন টিভি, টেবিলে সাজানো শো পিস এসবই একসময় দুজন মিলে টুকটুক করে কিনেছিল সংসার সাজাবে বলে। আর আজ…সবকিছু যেন বিভীষিকা হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কোথাও পেল না সে চাবি। এভাবে চাবি খুঁজে খুঁজে যখন ক্লান্ত হয়ে পরলো, তখন শফিক বাড়িতে এলো। ইরাকে খেতে ডাকলো। ইরা ততক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে। শফিক একাই খেয়ে টেবিলে ইরার খাবার রেখে ঘুমোতে গেল। ইরার ঘুম ভাঙলো একটা স্বপ্ন দেখে, ভোর হবার অারও আগেই। তখন প্রায় শেষ রাত, তিনটার মত বাজে। সে স্বপ্ন দেখলো সেদিনের সেই চিত্রটা, যেদিন সে বাধ্য হয়েছিল এ বাড়ি ত্যাগ করতে। সেদিন সদর দরজা খোলাই ছিলো, তাই সে কোন রকম চাবি ছাড়াই সেখান থেকে বের হয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু যাবার আগে কোথায় রেখেছিলো সে চাবি? সেদিনের সেই দৃশ্যটা আপ্রাণ মনে করার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু পারছিল না। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বের হবার আগে শফিক এক নজর দেখে গেল ইরা কোথায় আছে? সে দেখলো ইরা আয়নার সামনে চুল আঁচড়াচ্ছে। তাকে দেখে একটু মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল শফিক।

কোর্টের কাজ শুরু হয়ে গেছে। স্নিগ্ধা আগে থেকেই বিষয়টা জানতো বলে সে অন্যান্য শিক্ষানবিশদের নিয়ে কেসটা কোনরকম সাজিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু ইরা না এলে কাজটা শুরু করাটাই মুশকিল হয়ে যাবে। সবকিছু শুরু হয়ে পাঁচ মিনিট অতিক্রান্ত হলো। কিন্তু ইরার কোন খবর নেই। বিপক্ষের উকিল তার বক্তব্য শেষ করে এও বলে গেলেন যে, বাদী পক্ষের করা মামলাটি মিথ্যা ও বানোয়াট তা বুঝতে পেরে উকিল সাহেবা আজ হাজির হননি। ওসমান পড়ে গেল দোটানায়। তবে কি সে ভুল মানুষকে বিশ্বাস করলো?

এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ইরা কোর্টে ঢুকল। তার এই অনিচ্ছাকৃত বিলম্ব হবার জন্য ক্ষমা চেয়ে তার বক্তব্য শুরু করলো। তাকে সাহায্য করলো স্নিগ্ধা এবং অন্যান্যরা। অনেকক্ষণ যুক্তি তর্ক চললো। কিছুক্ষণ পরই পরিস্থিতি ইরা নিজের দিকে নিয়ে আসতে সক্ষম হলো। এখন শুধু প্রমান দেয়া বাকি। অবশেষে জাজ ঘোষণা দিলেন:
আজকের মত কোর্টের কাজ এখানেই মূলতবি করা হচ্ছে, আগামী ৯ মার্চ পরবর্তী দিন ধার্য করা হলো। কোর্ট থেকে বের হলো ইরা, সাথে ছিলো স্নিগ্ধা এবং অন্যান্যরা। শফিক এগিয়ে এলো। সাথে যারা ছিলো, তাদেরকে ইরা ইশারা করলো চলে যেতে। এবার শফিক তাকে জিজ্ঞেস করলো

:কি করে বাইরে এলে ইরা?
:তুমি কি ভেবেছিলে, আমি আসতে পারব না?
তোমার মনে আছে, যেদিন আমি চলে গেছিলাম ঐ বাড়ি থেকে সে দিনটার কথা? সেদিনও কিন্তু আমার হাতে আরেকটা চাবি ছিলো। কিন্তু মন মানসিকতা আর পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় আমি সে চাবি ছাড়াই খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসি। কিন্তু তার আগে চাবিটা আমি কোথায় রেখেছিলাম তা শুধু আমিই জানতাম। আমি চাবিটা ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে একটা ছোট্ট বাক্সে রাখতাম। আজ এত বছর পর মনে পড়ল, ঠিক মনে পড়লো নয়, মনে করার চেষ্টা করলাম। তারপর ওখান থেকে চাবিটা নিয়েই দ্রুত বের হয়ে এলাম।
:তোমাকে যতটা বোকা মনে হয়, তুমি ততটা বোকা নও।
:বোকা মানুষের এটাই চমক! বিপদে মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়!

একথা বলেই বাড়ির দিকে পা বাড়ালো ইরা। বাড়ি ফিরেও কিছুতেই ভুলতে পারছে না ওসব স্মৃতি। কয়েকটা দিন ঐ বাড়িতে থেকে যেন বাড়িটার প্রতি তার মায়া পড়ে গেছে। এরই মাঝে হাতে আরও দু তিনটে কেস এলো। বেছে বেছে মাত্র একটা রাখলো। আর শফিকের কেসের প্রমাণ জোগাড় করতে লাগলো। ওসমান তাকে এ কাজে সাহায্য করলো। ঐদিনের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে কিছু লোককে চিহ্নিত করা গেলো। তাদের মাঝে একজন লাল শার্ট পরিহিত, যাকে ওসমান চেনে। সে হঠাৎ বলে উঠলো,
: ঐ তো, আজিজ মিঞা, লাল শার্ট!
: তুমি তাকে চেনো?
: হুম, ম্যাডাম। ও আমাদেরই বস্তির আজিজ মিঞা।
: ঠিকাছে ওকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব পুলিশের। অফিসার মাহিকে আজই জানাও । থানায় গিয়ে আমার কথা বলো এবং ফুটেজটা দেখাও।

ওসমান ইরার কথামতো পুলিশকে সব জানালো এবং আজিজ মিঞাকে ঐদিনই গ্রেফতার করা হলো। ইরা কথা বলে অনেক চেষ্টার পর ‘সজীব’ নামটা মুখ থেকে বের করতে পারল। সজীব নামটা ইরা চিনতে পারলো। জানতে পারল সে এসব করেছে সজীবের নির্দেশে। কে এই সজীব, তা আর বুঝতে বাকি রইলো না ইরার।

চলবে…

৩১১জন ১৮৪জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য