আয়শার সংসার – শেষ পর্ব

মুক্তা মৃণালিনী ১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার, ০১:৫৩:১৪অপরাহ্ন গল্প ২০ মন্তব্য

নওশাদ সাহেব আমতা আমতা করে বললেন , ‘আয়শা আমি খুব অসুস্থ। বিশ্বাস কর তুমি যা ভাবছো এরকম কিছুই না।’ আয়শা তখনও কেঁদেই যাচ্ছেন। নওশাদ সাহেব বললেন , ‘তবে তোমাকে আজ আমি কিছু সিরিয়াস কথা বলতে চাই।’ আয়শা বললেন , কি কথা? নওশাদ সাহেব বললেন , ‘তোমার সাথে আমার লাস্ট ফিজিক্যালি রিলেশন ঠিক কবে হয়েছিল , সেটা কি তোমার মনে আছে ?’
‘মনে থাকবে না কেন? মনে আছে। দু’ বছর আগে আমাদের ১৬তম বিবাহবার্ষিকীর রাতে। সে রাতে খুব ঝড় হয়েছিল। প্রচন্ড বর্ষনে এলাকার নিচতলা বাড়িগুলোতে পানি উঠে গিয়েছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেছিলাম আমাদের বারান্দার টবে লাগানো আমার সখের গোলাপ গাছটা ভেঙ্গে মাটিতে পড়ে আছে। কিন্তু তুমি হঠাৎ করে এসব প্রশ্ন কেন করছো?
‘আয়শা। আমরা হয়তো সংসার আর নিজেদের সাহিত্য চর্চায় অতিরিক্ত সময় দিয়ে ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমাদের নিজেদেরও একটা ব্যক্তিগত চাহিদা আছে।’
‘কে ভুলে গিয়েছে? কই আমি তো কিছুই ভুলিনি। তুমি তোমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকো , তাই আমি তোমায় নিজে থেকে আর ডাকি না। বিরক্ত করি না।’
‘তুমি কি ভাবছো আয়শা? আমি শুধু ব্যস্ততার জন্যই তোমার সংস্পর্শ থেকে এতদিন যাবত দূরে সরে আছি? নাকি অন্য কোন কারণও আছে এর সাথে। শোন আয়শা , আমি ভাল নেই। আমি বুঝতে পারছি আমি দিন দিন একজন অক্ষম পুরুষে পরিণত হয়ে যাচ্ছি। স্ত্রীর সেক্সুয়াল নিডস পূরণ করতে যে ফিজিক্যাল ক্ষমতা একজন পুরুষের থাকে তা আমি একেবারেই হারিয়ে ফেলেছি। তুমি কি বুঝতে পারছো আয়শা , আমি কি বলছি?’
‘পারছি। এটাই কি তোমার সেই সিরিয়াস কথাটা?
‘হ্যা আয়শা। আমি চাচ্ছি। মানে আমি চাচ্ছি তোমায় মুক্তি দিতে। তুমি আমায় ডিভোর্স দাও আয়শা। তুমি তো এখনও একজন পরিপূর্ণ যুবতী নারী। তোমারওতো একটা ফিজিক্যাল নিডস আছে। আর ফিজিক্যাল নিডস একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। আমি কেন স্বার্থপরের মত তোমাকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখব? আমার সাথে থেকে থেকে তুমি কেন শুধু শুধু তোমার সুন্দর জীবনটা নষ্ট করবে। তুমি আবার বিয়ে কর আয়শা। সংসার কর। প্লিজ।’
আয়শা নওশাদ সাহেবের কথা শুনে রেগে আগুন। নওশাদ সাহেব ভয়ে আয়শার মুখের দিকে তাকাতে পারছেন না। আয়শা এখন অগ্নিরুপ ধারণ করেছেন। আয়শা জোরে জোরে চিৎকার করে বলে উঠলেন , ‘তুমি এটাকে এতো বড় করে কেন দেখছো? বল কেন দেখছো? এটা একটা শারিরীক সমস্যা।
আর শারিরীক সমস্যা যে কারোরই হতে পারে। স্বামী বা স্ত্রী যে কারোর। তুমি এটাকে বড় করে দেখছো বলেই তোমার কাছে এ সমস্যাটাকে এত বড় আর জটিল মনে হচ্ছে। আর তাই তুমি আমার থেকে ডিভোর্স নিতে চাইছো। ছিঃ নওশাদ ছিঃ। স্বামী- স্ত্রীর মাঝে শারিরীক সম্পর্কটাই কি সব? সেক্সুয়াল নিডস কি সবকিছুর উর্ধ্বে? পরষ্পরের প্রতি পরষ্পরের প্রেম- ভালোবাসা আর বিশ্বাসের কোন মূল্য নেই? সম্পর্কের কোন দাম নেই? কয়েক মুহুর্তের সুখের জন্য আমি আমাদের তিল তিল করে গড়ে তোলা একুশটা বছরের সমস্ত সম্পর্কটা একটা সিগনেচারের আঁচড়ে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেব? একটা কলমের কালির ছোয়ার এত ক্ষমতা? তুমি কি তাই চাও?’
‘আয়শা আমি তোমার সুখের কথা ভেবেই এসব বলেছি।’
‘শোন। আমার সুখের কথা তোমাকে আর ভাবতে হবে না। অনেক ভেবেছো। এবার আমাকে মাফ কর। আমার কাউকে দরকার নেই। আমার শুধু তোমাকে দরকার। শুধু তোমাকে দরকার।’ এসব বলে আয়শা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়লেন। নওশাদ সাহেব পিছন পিছন ডাকতে লাগলেন , ‘আয়শা আয়শা’। আয়শা মুখ ঘুরিয়ে বললেন , ‘আমায় ডাকবে না। আর কখনো ডাকবে না।’ সে রাতে আয়শা আর তাদের বেড রুমে ঘুমাতে এলেন না। সে ঘুমাল ড্রয়িংরুমের সোফাতে। বিয়ের পর এই প্রথম নওশাদ সাহেব আর আয়শা আলাদা আলাদা ঘুমাতে গেলেন। কিন্তু নওশাদ সাহেব সারারাত এক ফোটাও ঘুমাতে পারলেন না। আজ অনেকদিন পর নওশাদ সাহেব ফজরের আজান শুনলেন। ‘হাইয়া আলাস সালাহ , হাইয়া আলাস সালাহ। হাইয়া আলাল ফালাহ , হাইয়া আলাল ফালাহ। আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’ নওশাদ সাহেব ওজু করে নামাজ পড়লেন। হাত উঠিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন, ‘ হে আল্লাহ। আমার সংসারে শান্তি ফিরিয়ে দাও। আমার সংসারে তোমার রহমত বর্ষন কর।’ তারপর কিছুক্ষণ অন্ধকারে ছাদে হাঁটাহাটি করলেন। দিনের প্রথম আলো ফোটার সাথে সাথেই নওশাদ সাহেব ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়লেন। বের হওয়ার সময় দেখলেন আয়শা সোফার উপরে বিভোর ঘুমে। আয়শার চোখের জল শুকিয়ে সে জলের ছাপ আয়শার গালে লেগে আছে। নওশাদ সাহেব চুপটি করে অতি যত্নে আয়শার কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে বিড়বিড় করে বললেন , ‘আমিও তোমায় ছাড়া ভাল থাকব না আয়শা।’

১৭৯জন ৪জন
33 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য