একাত্তরে রাজধানীর ফকিরাপুলের গরম পানির গলিতে ফিরোজ মেম্বারের বাড়িতে রাজাকার ক্যাম্প ছিল। এপ্রিলে শান্তি কমিটি গঠনের পর সেখানে কার্যালয় বসানো ও রাজাকারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। মুজাহিদ নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করতো এবং সেখান থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটন করা হতো।মুজাহিদ ওই রাজাকার ক্যাম্পে গিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটনের নির্দেশ দিতেন এবং সে অনুসারে সারা দেশে আলবদর বাহিনী, রাজাকাররা অপরাধ ঘটাত।

 

11401083_10153346212013363_3697344358636483971_n

(ছবিঃঅমি রহমান পিয়াল)

৭১ এর কোন দুপুরে মুজাহিদ কয়েকজন রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার এ কে এম হাবিবুল হককে হত্যার জন্য,কিন্তু ভাগ্যগুনে পালিয়ে সেদিন বেচে যায় তিনি, তারপর তাঁর বাড়িতে হামলা চালান মুজাহিদ ও তার দোসরেরা।এভাবেই কোন একটি ঘটনা দিয়ে  শুরু হয়েছিলো মুজাহিদের আলবদর এর নির্যাতন অধ্যায় গুলো।কিন্তু সেই মুজাহিদকে বিচারের মুখোমুখি করতে সময় লেগেছে দীর্ঘ ৪৪ বছর।ততদিনে মুজাহিদ শুধু সমাজে ফিরেই আসেনি হয়েছে এদেশের সমাজকল্যান মন্ত্রী,শহীদের রক্তে ভেজা লাল সবুজের পতাকা উঠেছে একজন রাজাকার আলবদরের গাড়িতে।সমাজে গর্ব করে বুক ফুলিয়ে বলেছে-

 

“বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নাই, এটা তাদের কল্পনাপ্রসূত, নিজেদের বানোয়াট একটা উদ্ভট চিন্তা। বাংলাদেশে কোন স্বাধীনতা বিরোধীও নাই। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ছিলো না, এখনো নাই!!”

১৬ ডিসেম্ভর শহীদের জন্য মিলাদের আয়োজন করে আমাদের সাথে তামাশা করেছে।তারপর, তারপর একদিন বিচারের সামনে আসতে হয়েছে তাকে, বিচারের হাত ধরেই ফিরে দেখা যাক মুজাহিদ একজন আলবদরের অপরাধনামা।ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে করা একটি মামলায় মুজাহিদকে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।

 

 

মুজাহিদ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে কাজ করেন। তাই এই বাহিনীর সব দায় থেকে মুজাহিদ আলাদা নয়।মুজাহিদ একাত্তরের প্রথম দিকে ঢাকা জেলা ইসলামী ছাত্র সংঘের (জামায়াতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন) সভাপতি হয়।একাত্তরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক এবং অক্টোবর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করে। মুজাহিদ ছাত্র সংঘের সভাপতি থাকাকালে আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে কাজ করেছিলো।

11048772_10153346610863363_6920094053680956604_n11088624_10153346610948363_8527507338505525232_n (1)

(ছবিঃঅমি রহমান পিয়াল)

 

৭ নভেম্বর বিকেলে বায়তুল মোকাররম মসজিদ প্রাঙ্গণে ছাত্রসংঘের গণজমায়েতে মুজাহিদ বলেন, আর কোনো হিন্দু লেখকের লেখা বই প্রচার, বিক্রি বা পড়া যাবে না। 

 

মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনিত সাত অভিযোগঃ

 

প্রথম অভিযোগ :
মুক্তিযুদ্ধকালে ইত্তেফাক-এর তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন তাঁর ‘ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড়’ নামে একটি উপ-সম্পাদকীয় লেখেন এবং পাকিস্তানি সেনাদের এদেশীয় সহযোগীদের হাতে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের নিগ্রহের বিবরণ তুলে ধরেন। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এ ‘অতএব ঠগ বাছিও না’ নামে একটি উপ সম্পাদকীয় লিখে জনাব হোসেনকে পরোক্ষভাবে মৃত্যুর হুমকি দেয়। এ সময় তিনি জামায়াত ও আলবদরের লক্ষ্যে পরিণত হন।

 

মুজাহিদ একাত্তরের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার চকবাজারে আলবদর লেখা ব্যানারে একটি গাড়ি নিয়ে জনসমক্ষে বক্তব্যে বলে,‘বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ এরপরই ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর মুজাহিদের নেতৃত্বে আল বদররা তাঁকে তাঁর শান্তিনগর, চামেলীবাগের ভাড়া বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় তারপর তিনি আর কোনদিন ফিরে আসেননি।এমনকি লাশও পাওয়া যায়নি।

11401343_10153346210448363_4492785558845502762_n

(ছবিঃঅমি রহমান পিয়াল)

 

সিরাজুদ্দীনের ছেলে সাংবাদিক শাহীন রেজা নূরও তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন,”আলবদররা তাঁর বাবাকেহত্যা করে। যেহেতু একাত্তরে মুজাহিদ আলবদরের কমান্ডার ছিলেন, সেহেতু বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন এবং সেই সূত্রেই সিরাজুদ্দীন হোসেনকে হত্যা করা হয়।”

 

শাস্তিঃ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

10403218_10153346213703363_3353454969388938418_n

(ছবিঃঅমি রহমান পিয়াল)
(এই চিঠিটা পাঠানো হয়েছিলো শহীদ সিরাজউদ্দিন হোসেনকে যাকে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে ট্রাইবুনাল মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আলী আহসান মুজাহিদকে)

 

দ্বিতীয় অভিযোগ :
একাত্তরের মে মাসের এক ভোরবেলায় মুজাহিদ ৮-১০ জন রাজাকারসহ পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের বৈদ্যডাঙ্গি, মাঝিডাঙ্গি ও বালাডাঙ্গি নামের তিনটি হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেন। তাঁরা সেখানে তিন শ থেকে সাড়ে তিন শ ঘর জ্বালিয়ে দেন এবং ৫০-৬০ জন নারী-পুরুষকে হত্যা করেন। ওই গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ জনের নাম-পরিচয়সহ তালিকা পাওয়া যায়।
শাস্তিঃ খালাস

 

তৃতীয় অভিযোগ :
জুনের প্রথম সপ্তাহে রাজাকাররা ফরিদপুরের রথখোলা গ্রামের রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে খাবাসপুর মসজিদের কাছ থেকে ধরে পুরাতন সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়।বেলা অনুমান ১১টার দিকে ফরিদপুর পুরোনো সার্কিট হাউসে আসামি আলী আহসান মুজাহিদের সামনে পাকিস্তানি সেনা অফিসার মেজর আকরাম কোরাইশীর কাছে হাজির করা হয় বাবু নাথকে।

 

তখন মুজাহিদ ওই মেজরের সঙ্গে কথা বলার পর বাবু নাথের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। তার একটি দাঁত ভেঙ্গে ফেলা হয়। নির্যাতনের পর মুজাহিদের ইশারায় তাকে হত্যা করার উদ্দেশে বিহারি ক্যাম্পের উত্তর পাশে আব্দুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে রাজাকাররা আটকে রাখে। পরে রাতে রণজিৎ নাথ বাবু তার আটক ঘরের জানালার শিক বাঁকা করে ওই ঘর থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচান।

 

শাস্তিঃ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

 

চতুর্থ অভিযোগ :
একাত্তরের ২৬ জুলাই স্থানীয় রাজাকাররা আবু ইউসুফ নামের এক ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে ধরে আলফাডাঙ্গা থেকে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। মুজাহিদ ওই ক্যাম্পে গিয়ে এক পাকিস্তানি মেজরকে কিছু বলার পরে ইউসুফের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। তাঁকে সেখানে এক মাস তিন দিন আটক রেখে নির্যাতনের পর যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নির্যাতনে ইউসুফের বুক ও পিঠের হাড় ভেঙে যায়।

 

শাস্তিঃ খালাস

 

পঞ্চম অভিযোগ :
১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট রাত ৮টায় পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীসহ ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের আর্মি ক্যাম্পে যান। সেখানে তারা আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে দেখে তাদের গালিগালাজ করেন এবং পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন যে, প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আদেশের আগেই তাদের হত্যা করতে হবে। আসামি মুজাহিদ অন্যদের সহায়তায় আটকদের একজনকে ছাড়া অন্যান্য নিরীহ-নিরস্ত্র বন্দিদের অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ গুমের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেনসুরকার আলতাফ মাহমুদের নির্যাতনের কথা খুজে পাবেন।

 

 

শাস্তিঃ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (মানতে পারি নাই)

 

ষষ্ঠ অভিযোগ :
একাত্তরের ২৭ মার্চের পর ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্প তৈরি করে। পরবর্তীতে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারাও ওই স্থানে ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ অপরাধজনক নানা কর্যক্রম চালায়। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি হবার সুবাদে আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ছাত্রসংঘের ও আলবদর বাহিনীর সুপিরিয়র নেতা হিসেবে আর্মি ক্যাম্পে উপস্থিত ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসারের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী নানা অপরাধের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করতেন। এ ধরনের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র মাধ্যমে আসামী আলী আহসান মোহামদ মুজাহিদ ১০ ডিসেম্বর থেকে পরিচালিত বুদ্ধিজীবী নিধন অভিযানেরসহ সারা বাংলাদেশের দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী বাহিনীসহ হত্যা, নির্যাতন, বিতাড়ন ইত্যাদিসহ যাবতীয় মানবতবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা সংঘটিত করেন।

 

শাস্তিঃমৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

 

সপ্তম অভিযোগ :
একাত্তরের ১৩ মে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নির্দেশে রাজাকার বাহিনী ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ করে। শান্তি কমিটির বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বকচর গ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হামালা চালিয়ে বীরেন্দ্র সাহা, উপেন সাহা, জগবন্ধু মিস্ত্রি, সত্য রঞ্জন দাশ, নিরদবন্ধু মিত্র, প্রফুল্ল মিত্র, উপেন সাহাকে আটক করা হয়। উপেন সাহার স্ত্রী রাজাকারদের স্বর্ণ ও টাকা দিয়ে তার স্বামীর মুক্তি চান। রাজাকাররা সুনীল কুমার সাহার কন্যা ঝুমা রানীকে ধর্ষণ করে। পরে আটক হিন্দু নাগরিকদের হত্যা করে। তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অনিল সাহাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়।

 

শাস্তিঃ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

 

৭১ এর ২২ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা টাউন হলের এক সমাবেশে মুজাহিদ বলেছিলো–ছাত্রসংঘের একজন কর্মী জীবিত থাকতেও পাকিস্তানকে ভাঙতে দেওয়া হবে না। দরকার হলে তাঁরা সীমান্তে গিয়ে অস্ত্র ধারণ করবে।১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা যখন আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হয় তখন এই বদর নেতা পাক সৈন্যদের ভৎসনা করে বলেঃ

“হে জালেমরা, দুশমনের সামনে অস্ত্র সমর্পণকারীরা। তোমরা হজরত মুহাম্মাদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিভাবে মুখ দেখাবে”

11407018_1009108115778602_8989788117090534402_n 1926689_1009108122445268_6794102750248592092_n

তার কোন কথাই রয় নাই পাকিস্তান ভেঙ্গেছে আজ তার আপিলের রায়,মুজাহিদ ও আশা করি ভেঙ্গে চুড়ামার হবে শান্তি পাবে শহীদের আত্না শান্তি পাবে শহীদ রুমী,শহীদ বদি, শহীদ জুয়েল, শহীদ আলতাফ মাহমুদ, শহীদ আজাদ।

৬৭৮জন ৬৭৮জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ