প্রতি বছর ডিসেম্বর মাস আসলেই আমার নিজের দেখা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কিছু স্মৃতিকথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আমি তখন ৮ বছরের এক নাবালক শিশু। বাবা আর আমার বড়দা চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জ, বাবা চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জ বর্তমান সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন গোদনাইল চিত্তরঞ্জন কটন মিলে। আর বড়দা চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানাধীন লক্ষণখোলা আদর্শ কটন মিলে। আমার মা আর তিন বোন সহ থাকতাম আমাদের বাড়িতে। আমাদের বাড়ি ছিল নোয়াখালী বজরা রেলস্টেশনের পশ্চিমে মাহাতাবপুর গ্রামে। তখনকার সময় ঘরে-ঘরে এত রেডিও টেলিভিশন ছিলো না, পুরো একটা গ্রামে বিত্তশালী কোন ব্যক্তির বাড়িতে হয়তো একটা রেডিও থাকতো। টেলিভিশন তো কারোর বাড়িতে ছিলই না। যদিও থাকতো, তা ছিল স্বপ্নের সোনার হরিণ!

আমাদের মাহাতাবপুর গ্রামে একজনের বাড়িতে ছিল ওয়ান বেন্ডের একটা রেডিও। বাড়িটার নাম ছিল বড়বাড়ি। খবরের সময় হলে সারা গ্রামের মানুষ খবর শোনার জন্য ওই বড়বাড়িতে ভীড় জমাতো। মায়ের সাথে আমি আর আমার তিন বড়দিদিও খবর শুনতে যেতাম।শুনতাম পঁচিশে মার্চের কাল রাতের ভয়াবহ ঘটনার কথা, শুনতাম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, বাঙালী পুলিশ হত্যা ও গ্রেফতারের কথা। লোক মুখে শুনতাম ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-সহ দেশের বহু জেলা শহরে জ্বালাও পোড়াও এর কথা। আমার অভাগিনী মায়ের চোখে তখন ঘুম ছিল না। পেটে ক্ষুধা ছিল না। মুখে হাসি ছিল না, কাঁদতে কাঁদতে মায়ের চোখ নদীতে জল ছিল না।

স্বামী আর সন্তানের জন্য মায়ের কান্না-কাটি আর থামছিল না। পাগলের মত হয়ে আমার মা শুধু ঘুরে বেড়াতেন স্বামী সন্তানের খবর জানার জন্য। এদিকে ঘরে খাবার নেই। টাক-পয়সা কিছু নেই। তখনকার সময় গ্রামের স্বচ্ছল স্বাবলম্বী গৃহস্থদের বাড়িতে গিয়েও দুই কৌটা চাউল হাওলাৎ পাওয়া যেত না। কারো কাছে থাকলেও তখন কেউ কাউকে ধার বা উদার দিতে চাইত না। কারণ আমার বাবা আর বড়দার কোন খোঁজ-খবর ছিল না তাই। এভাবেই আমাদের খেয়ে-না-খেয়ে দিন কাটতে লাগল দিনের পর দিন।

যুদ্ধ শুরু হবার পর কেটে গেল দুই মাস। ১৯৭১ সালের মে মাসের দিকে আমার বাবা সহকর্মীদের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে অনেক কষ্টে বাড়িতে আসে। খবর পেলাম বড়দা শরণার্থী হয়ে চলে গেল ভারতে। তবু বাবার আগমনে মায়ের কান্না-কাটি কিছুটা দূর হলো। স্বামীকে পেয়ে সন্তান হারা ব্যথা বুকে চাঁপা দিয়ে এই হট্টগোলের মাঝেও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো।

অনেক কষ্ট করে এক পাড়া-পড়শী মুসলমান ব্যক্তির কাছে বাড়ির দলিল বন্ধক রেখে কিছু টাকা নিয়ে সংগ্রহ করা হলো। সেই টাকা দিয়ে বাবা মুড়ির ব্যবসা শুরু করলো আমাদের পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য। এর মধ্যে আমার জেঠামশাই বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প বসালো গ্রামটাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য। আমার জেঠামশাই ছিলেন তৎকালী পাকিস্তান সরকারের রিটায়ার্ড পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য। আমাদের বাড়িতে সন্ধ্যার পর বসতো মুক্তিবাহিনীদের পরিকল্পনার আসর। চলত চা পান, বিড়ি, তামাক টানার আড্ডা। কোথায় কীভাবে কী করবে? মুক্তিবাহিনীরা এসব নিয়ে শলাপরামর্শ করতেন আমার জেঠামশাই’র সাথে। আমি তখন খুবই ছোট, সেসব শলাপরামর্শের সময় আমি বসে থাকতাম বাড়ির উঠানের মাঝখানে, সবার সম্মুখে।

শলাপরামর্শ চলাকালীন সময়ে মা-জেঠীমা লাল চা করতো মুক্তিবাহিনীদের জন্য। আমি পরিবেশন করতাম তাদের মাঝে। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা চা পান করতেন। সবাই চা পান করতেন। আর জেঠামশাইর কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন। এভাবে চলতে থাকলো দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।

যুদ্ধ চলছিলো দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে আর লক্ষ মা-বোনদের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অবশেষে বিজয় অর্জিত হলো। পাকহানাদার বাহিনী পরাস্ত হলো। আল-বদর রাজাকার বাহিনীর শত কুচক্র শলাপরামর্শ ধূলিসাৎ হলো। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করলো। এরপর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি ২২ তারিখে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই দিনটিকে বাংলাদেশে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে এই ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ আমাদের বিজয় দিবস।

আর ক’দিন পরেই বিজয় দিবসের ঘণ্টা বেজে উঠবে। ১৬ই ডিসেম্বর ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা ঘটবে। জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত সামরিক কুচকাওয়াজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদস্যরা অংশগ্রহণ করবেন। এই কুচকাওয়াজ দেখার জন্য প্রচুরসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে সম্মিলিতভাবে গাইবে জাতীয় সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”। আসলে কি আজও বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ সত্যিকারভাবে এই দেশকে ভালোবাসতে পেরেছে? প্রশ্ন শুধু এখানেই থেকে গেল।

৩৪৮জন ৪৪জন
46 Shares

৪০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য