আমি বীরাঙ্গনা বলছি

রোকসানা খন্দকার রুকু ১৫ জুলাই ২০২২, শুক্রবার, ০৭:৫৬:৩৪অপরাহ্ন বুক রিভিউ ৮ মন্তব্য

” নামতা পড়ার মতো শুধু আউরিয়েছি আমি মেয়ে, আমাকে সব সইতে হবে, আমি হবো ধরিত্রীর মতো সর্বংসহা, প্রতিবাদের একটিই পথ, সীতার মতো অগ্নিপরীক্ষা বা পাতাল প্রবেশ। সীতা ছিলেন দেবী। তাই ও দুটোর কোনটাই আমি করতে পারিনি!

যখন চারিদিকে শুধু ছিঃ ছিঃ ধ্বনি শুনেছি, সমাজপতি, অতি আপন জনরা বলেছেন, মরতে পারলি না হতভাগী, আমাদের মারার জন্য কালা মুখ নিয়ে এসেছিস?

তাদের মুখ ফুটে বলতে পারিনি, – না মরতে আর পারলাম কই? তার পথও তো তোমরা করে দিলে না। বাঁচানোর জন্য হাত বাড়াওনি, মরার পথেও সহায়তা করোনি”। কথাগুলো বলছিলেন  একজন বীর নারী ( বীরাঙ্গনা) মিসেস টি নিয়েলসন। যার নাম ছিল তারা ব্যানার্জী।

দেশ স্বাধীন হবার পর এই বীরাঙ্গনাদের তাদের পরিবার ফিরিয়ে নেয়নি। লজ্জা, কুন্ঠাবোধ করেছে। অথচ তাদের জন্য দেয়া সরকারী সাহায্যে বাড়ি- ঘর তুলতেও লজ্জা হয়নি। পরিবার যখন অস্বীকৃতি জানিয়েছে তখন গভীর আঘাতে একজন তারা ব্যানার্জী থেকে মিসেস টি নিয়েলসন হয়ে বলতে পারেন- ” জন্ম দিলে জননী হওয়া যায় কিন্তু লালন পালন না করলে মা হওয়া যায় না”। আমি বাঙালি এ পরিচয় দিতে চাই না। আমাকে যে লালন পালন করেছে সেই আমার দেশ, আমার মা!

 

মেহেরজান, রীনা, শেফা, ময়না, ফাতেমা, মিনা এরা কেউ কেউ সেই পাকিস্তানি সেনাদের হাত ধরে সে দেশেই চলে যায়।  আমাদের ফালতু সো কলড্ রক্ষণশীলতা নির্মম ভাবে তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। দেশের জন্য যারা নির্মম নিয়তির স্বীকার তাদের বীরের বেশে বরণ না করে পরিহাস করা হয়েছে।

বীরাঙ্গনাদের রাখা উচিত ছিল সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে, কিন্তু রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় আমরা তাদেরকে পায়ে পিষে ফেলেছে। তাদেরকে ন্যূনতম সম্মানটুকু দেয়নি, তাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে মানুষের মতো বাঁচার অধিকার। কত শত অপমানে জর্জরিত হয়ে তারা বেঁচে ছিলেন, সেই তীব্র দুঃখবোধের গভীরতা বুঝতে চেয়েছিলেন একজন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,  তোরা আমার মা, জীবনের শ্রেষ্ঠ ধন স্বাধীনতার জন্য উতসর্গ করেছিস। তোরা শ্রেষ্ঠ বীরাঙ্গনা। আমি বলছি, তোদের চিন্তা কি?

শেখ মুজিবুর রহমান মারা যাবার পর বীরাঙ্গনাদের আর কোন পথই খোলা ছিল না। বীরাঙ্গনারা বলেছেন, ” নাহ্ নিজেকে আর বাঙালি বলে পরিচয় দেব না আমরা ‘ পিতৃহন্তা’।

 

নয়মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মোটামুটি ২লক্ষ ৪০ হাজার নারীর সম্ভ্রম হানী হয়। একই সাথে মা ও তার দশ এগারো বছরের কিশোরী কন্যাও ছিল। মা মেয়েকে বাঁচাতে নিজেকে এগিয়ে দেয় তাতেও লাভ হয় না। মেয়েও বলির শিকার হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের অপারেশন সার্চলাইটের মতো ঘৃনিত মানুষ হত্যার মাধ্যমে  বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানিরা ভেবেছিল এমন নরহত্যায় বাঙালি থেমে যাবে। এতেও যখন কাজ হলো না তখন জ্বালাও পোড়াও অভিযান শুরু করলো।

 

গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করার পরও পাকিস্তানিরা যখন দেখলো তাদের হার অনিবার্য। তখন তারা নারী ধর্ষণ শুরু করলো। গর্ভবতী নারীকেও তারা মুক্তি দেয়নি। ধর্ষণের এক পর্যায়ে হয়তো কারও জরায়ু বের হয়ে গেছে। হানাদাররা রেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে মাথায় পেচিয়ে জরায়ু ছিঁড়ে ফেলেছে। তাদের সামনেই নির্মম মৃত্যু হয়েছে গর্ভবতী মায়ের।

পাকিস্তানীরা এসব করেছে যাতে মুক্তিযোদ্ধারা দূর্বল হয়ে পরে। নিজেদের আত্নসমর্পন করে। আসলে সেসবের কিছুই হয়নি। মুক্তিযোদ্ধারা মরিয়া হয়ে আরও দূর্বার গতিতে যুদ্ধ করে গেছে অনুপ্রেরণা পেয়ে।

এসব নারীদের মুখোমুখি বসে যখন ডঃ নীলিমা ইব্রাহীম শুনছিলেন। তিনি দ্বিতীয় খন্ডের পর আর লিখতে পারেননি। মানষিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। না হলে হয়তো আমরা সকল বীরাঙ্গনাদের ইতিহাস জানতে পারতাম।

এতোক্ষণ বলছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহীম রচিত ” আমি বীরাঙ্গনা বলছি”। এটি কেন উপন্যাস নয়, কিংবা ইনিয়ে বিমিয়ে লেখাও নয়। মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো সাতজন নারীর নির্যাতন ও আত্নহুতির চাক্ষুষ লিখনি। ১৯৯৪ সালে রচিত এ বইটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নারীদের উপর নির্মম নির্যাতনের চিত্র। পড়লে শরীরের লোমকুপ রি রি করে ঘৃনায়।।।

ছবি- নেটের।

১৩৭জন ১৯জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ