আমি তোমার জন্য এসেছি-(পর্ব-৭০)

আরাফ মুচকি হাসল জ্বী স্যার একটা গুড নিউজ আছে। ডাক্তার সুপর্ণা ফাল্গুনী শ্রেয়াদের পারিবারির ডাক্তার তিনি বিষয়টা কিছুটা জানতেন তিনিও হাসলেন।স্যার আমি শ্রেয়া কয়েকদিন পরেই বিয়ে করতে চলেছি সেই উপলক্ষে সবাইকে মিষ্টি মুখ করাতে চাই।

আরাফের কথা শোনে সবাই হাত তালি দিয়ে অভিনন্দন জানালেন আলহামদুলিল্লাহ্। ডাক্তার এম ইঞ্জা বললেন ডাক্তার মনির হোসেন মমি আপনি একটু ফাইল খাতাটা দেখুন। গতকাল থেকে (রাত-দিন) কোন কোন ডাক্তার, নার্স ডিউটি করেছেন,জ্বী স্যার বলেই ডাক্তার মনির হোসেন মমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।আরাফ সাহেব আপনি বসুন প্লীজ আমি দেখতেছি বলেই ডাক্তার মনির হোসেন মমি একটা ফাইল খুললেন।

খাতাটা হাতে নিয়ে ডাক্তার, নার্সদের লিস্ট বললেন..১)এম ইঞ্জা,২) এস.জেড বাবু,৩)কামরুল ইসলাম, ৪)সুপর্ণা ফাল্গুনী,৫)সুরাইয়া পারভীন,৬)প্রদীপ চক্রবতী,৭)খাদিজাতুল কুবরা,৮)আলমগীর সরকার লিটন,৯)সঞ্জয় মালাকার, ১০)বন্যা লিপি,১১)সাবিনা ইয়াসমীন,১২)তৌহিদ,১৩)ফয়জুর মহী,১৩)মোঃ মজিবুর রহমান,১৪)পর্তুলিকা,১৫)হালিম নজরুল, ১৬)আরজু মুক্তা, ১৭)কামাল উদ্দিন, ১৮)শায়লা খান, ১৯)ইসহাক,২০)উর্বশী,২১)নৃ-মাসুদ রানা,২২)ত্রিস্তান,২৩)শায়লা ইলিয়াস।

স্যার ওটিবয়, আয়া সহ সবমিলিয়ে ৩০ জন হবে বলেই থামলেন ডাক্তার মনির হোসেন মমি।কি আরাফ সাহেব ৩০জন সমস্যা হবে না তো বলেই রসিকতা করলেন ডাক্তার নিতাই বাবু।

নাহ্ স্যার আমি পিয়নকে মিষ্টি আনতে পাঠিয়েছি ফিরলেই আমি আর শ্রেয়া আপনাদের মিষ্টি দিতে আসবো।ডাক্তার ফয়জুল মহী বললেন, রোগীকে সুস্থ করে তুলা আমাদের কর্তব্য মনে করি তারপরও আপনার আপ্যায়ন আমরা গ্রহন করলাম।স্যার আপনাদের সবার ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ তাই এইটুকু আনন্দ শ্রেয়ার করার সুযোগ দিবার জন্য। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি বলেই আরাফ সবাইকে ধন্যবাদ দিল, আপনিও অনেক ভালো মানুষ আরাফ সাহেব।

গত দুদিন ধরে যেভাবে শ্রেয়ার সুস্থতার জন্য চিন্তায় অস্তির ছিলেন। রোগীর আত্মীয়দের মাঝে এমন মনোভাব আমরা এমন কম দেখেছি বললেন ডাক্তার কামাল উদ্দিন।আমি আসছি বলেই আরাফ রুম থেকে বের হয়ে আসল সোজা কেবিন ১৭ তে ঢুকল শ্রেয়া ঘুমাচ্ছে।আরাফ চেয়ে দেখল হাতের স্যালাইন খুলে দেওয়া হয়েছে আর বসল না।

রিহান,রাইসা সবাই মোটামুটি হাসি খুশি আরাফকে দেখেই রিহান ডাকল কাছে আয় দোস্ত।বিয়ের ছোটকাটো একটা লিস্ট করে ফেললাম, অফিসের কয়েকজন কর্মচারী আর কাছের কয়েকজনকে দাওয়াত দিব।সামনে শ্রেয়ার জন্মদিন ওই দিন আনুষ্টানিক ভাবে জামকালো একটা বিবাহ্ অনুষ্টানের তারিখ সবাইকে জানিয়ে দিব।ওকে দোস্ত তোরা যেটা ভালো মনে করিস তাই কর, জাপানে তোরা ছাড়া পরিচিত কেউ নাই।খাদিজাতুল কুবরা এসে হাজির ১৭ নাম্বার কেবিনের রোগীর ছুটির কাগজ পত্র রেডি আরাফ সাহেব আপনি আসুন।

সাইন করে নিয়ে যাবেন, দোস্ত আমি একটু দেখা করে আসি চলুন ম্যাডাম বলেই আরাফ চলে গেল।দেখলে রাইসা আরাফের প্রশংসা করার ভাষা আমার জানা নেই,গত দুদিন ধরে ছেলেটা যা করলো সারাজীবন ভুলব না।তুমি ঠিকই বলছো ছেলেটাকে আমিও যত দেখছি মুগ্ধ হইছি, আমাদের শ্রেয়া মানুষ চিনতে ভুল করে নাই।

কথা গুলো শ্রেয়ার ভাবী রাইসা,আর ভাই রিহান বলছিলো আসলেই আরাফ অনেক ভালো একজন মানুষ।আমার বোনটা সুখে থাকবে এটাই আমার শান্তি, আরাফের মতো মানুষকে জীবন সঙ্গী হিসাবে পাওয়া যেকোন মেয়ের ভাগ্য।আমাদের শ্রেয়াও ভাগ্যবতী বলেই হাসলো রাইসা, স্যার এই নেন মিষ্টি বলেই পিয়ন ১০ কেজি মিষ্টির ১০ টা পেকেট রাখল।

দুপুর ৩.১০ মিনিট আরাফ হাসপাতালের সব ফর্মালিটি শেষ করে শ্রেয়াকে নিয়ে ওয়েটিং রুমে আসল।রাইসা এগিয়ে গিয়ে শ্রেয়ার কাঁধে হাত রাখল জড়িয়ে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিল,পাশ থেকে পিয়ন বললো আরাফ স্যার মিষ্টি।ওহ্ ধন্যবাদ আপনারা সবাই গাড়িতে গিয়ে বসুন আমি শ্রেয়াকে নিয়ে ডাক্তার নার্সদের মিষ্টি মুখ করিয়ে আসছি।শ্রেয়া চল বলেই আরাফ হাত বাড়াল,শ্রেয়া মুচকি হেসে বললো আমি সুস্থ আছি একাই হেঁটে যেতে পারব।

আরাফ মিষ্টির পেকেট নিয়ে যাচ্ছে আমি পিচন পিচন, ততক্ষনে সবাই বুঝে গিয়েছে আমরা বিয়ে করবো।আরাফ ডাক্তার এম ইঞ্জার সামনে টেবিলে মিষ্টি রাখলো প্লীজ আপনারা সবাই খেয়ে নিবেন।আমাদের জন্য দোয়া করবেন,বিয়ের কার্ড পেয়ে যাবেন বলেই আমরা বিদায় নিলাম। রাতে আমরা বাসায় ফিরলাম ভাইয়া,ভাবী আমার মামা,মামী সবাই মিলে আলোচনা করলাম।কয়েক মাস পরে আমি জাপানের একটা হাসপাতালে ডাক্তার হিসাবে জয়েন করলাম।

তারপর ধুমধাম করে আমার সাথে আরাফের বিয়ে হলো শহরের নামকরা লোকেরা বিয়েতে আসল। আমাদের চার হাত এক হয়ে গেল,একই ছাদের নিচে বসবাস করছি ঠিকই কিন্তু গত ৬ বছরে দুটি মনের মিল হয়নি। জানো প্রিয়া আরাফ আমাকে বাঁচাতে সেদিন বিয়েটা করেছিলো। বলেই শ্রেয়া আরাফের দিকে তাকাল আলাফের চোখে পানি শ্রেয়াও কেঁদে ফেলল।উপস্থিত সকলের চোখে পানি মানুষ এতটা মহৎ হৃদয়ের হয় এই প্রথম মিতু জানলো।আরাফ ভাইয়ার মতো মানুষকে স্যালুট মনে মনে বললো রোহান।

মিরা আজাদের বুকে পড়ে কাঁদতে লাগলো আরাফ,শ্রেয়া, প্রিয়ার কষ্টটা আমি আর সহ্য করতে পারছি না গো..!দেখলে আরাফ কত বড় মনের একজন মানুষ আমরা তাকে চিনতেই পারি নাই।হিরাকে কাঁচ ভেবে একদিন ফেলে দিয়েছিলো প্রিয়া আজ তার জন্য বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে ফেলছে।মনোয়ারা বোবার মতো চেয়ে আছে আরাফ তার সন্তান এটা তার গর্ব।

শ্রেয়া বিছানা ছেড়ে ওঠে প্রিয়ার পাশে বসল পিচ্চি প্রিয়া আরাফের মনে প্রাণে শুধুই তুমি। আরাফ তোমাকে এখনো ভালোবাসে আমি জানি।আমি আরাফের স্ত্রী এই পরিচয়টুকু নিয়েই আমি সন্তুষ্ট আরাফ তোমাকে ভালোবাসে এটা নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নেই। আমাদের একমাত্র সন্তান অমি এটাই আমার জীবনের সেরা পাওয়া।আমি চাই গুন্ডা ছেলের জীবনে পিচ্চি প্রিয়া বেঁচে থাকুক, প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা হয়েহাজার বছর অানন্তকাল।

প্রিয়া তুমি আমার কথা শোনছো বলেই শ্রেয়া প্রিয়ার হাত ধরল।আরাফ প্রিয়ার মাথায় আস্তে করে হাত বুলিয়ে ডাকল পিচ্চি প্রিয়া শোনছো।আরাফ প্রিয়া তো ঘুমিয়ে পড়ছে!তার মানে সে আমাদের কোন কথা শুনে নাই বলেই শ্রেয়া আক্ষেপ করলো।

আরাফ প্রিয়ার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে আছে, এই মুখটা একবার দেখার জন্য সেই সুদূর জাপান থেকে ফিরে আসলাম। কিন্তু আমার দূভাগ্য প্রিয়া তোমার মুখের হাসিটা ধরে রাখতে পারলাম না চোখের জলে ভাসিয়ে দিলাম।প্রিয়ার নাক ডাকার আওয়াজ সবাই পেল, প্রিয়া ঘুমাচ্ছে আর ডেকো না বললেন প্রিয়ার বড় মামী।পাগলি একটা কথা গুলো শোনলে হয়ত নিজের মনকে শান্তনা দিতে পারত বলেই আরমান ওঠে দাঁড়াল।তুমি ঠিকই বলছো মেয়েটার হঠাৎ কি হয়ে গেল রিতা চল রুমে যাইনামাজ পড়বো।

পাশের মসজিদ থেকে মুয়াজিনের আজানের ধ্বনি শোনা গেল, চলেন বেয়াই সাহেব নামাজটা পড়ে নেই বললেন শেখর সাহেব।রহিমা বলেই ডাকলেন মনোয়ারা। পিচন থেকে জবাব আসল জ্বী খালাম্মা?মনোয়ারা অবাক হয়ে জানতে চাইল তুই ঘুমাস নাই।

রহিমা অবুঝের মতো কাঁদতে শুরু করে খালামা আপনাদের বাসায় কাজ করি আজ ২০ বছর।এ বাসার সবাই আমার বড় আপনজন,ছোট ভাইজান প্রিয়া আপামনিকে ভালোবাসা,বিয়ে ঠিক হওয়া। বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ায় ভাইজান রাগ করে জাপান চলে যাওয়া সব তো আমি জানি।ছোট ভাইজান প্রিয়া আপামনিরে কত ভালোবাসতো আপনারা জানেন না আমি জানি।

ভাইজান ছাদে ওঠে সারা রাত চিৎকার করে কাঁদতো।আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতো হে আল্লাহ্ তুমি প্রিয়াকে আমার করে দেও! নামাজ পড়ে কাঁদতো প্রিয়া আপামনির জন্য।সেদিন আপামনি ভাইজানের ভালোবাসা বুঝে নাই,আর আজ প্রিয়া আপামনি ভাইজানরে ভালোবাসে।কিন্তু ভাইজান শ্রেয়া ভাবীকে বিয়ে করে ফেলছে।প্রিয়া আপামনি,ভাইজান দুইজনের কষ্টটা বুঝতে পারছি বলেই রহিমা মনোয়ারার পায়ের কাছে পড়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে।

মনোয়ারা আর কাঁদতে পারে না,ওরে কেউ আমার কাছ থেকে সরা আমি আর পারছি না।রহিমা তুমি শান্ত হও ওদের কস্টটা আমরা বুঝতে পারছি কিন্তু আমাদের কিছুই করার নেই। বড় ভাবী আমি আমার মনকে বুঝাতে পারছি না তাহলে প্রিয়া আপামনি তার মনকে বুঝাবে কি করে।আমি কিচ্ছু জানি না রহিমা বলেই রিতাও কাঁদে রহিমার কান্না এবার সকলকে মর্মাহত করে দেয়।আজাদ চোখ মুছতে মুছতে বলে মিরা আমাকে নিয়ে চল ফরজ নামাজ পড়বো, চল বলেই মিরা ওঠে যায়।

রহিমা চল সবাইকে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দাও অজু করে নামাজ পড়বেএকে একে সবাই অজু করতে গেল।আরাফ শুয়ে আছে প্রিয়া তার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।শ্রেয়া এসে আরাফের পা ধরে বসে কাঁদতে শুরু করলো প্লীজ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দেও।আরে পাগল পা ছাড় ভাগ্যে যা ছিলো তাই হয়েছে এখানে আমাদের কারো কোন হাত নেই সব উপরওয়ালার লিখা।তবু আমি বাংলাদেশে আসার পর সব দেখে, শুনে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে…

…..চলবে।

১৭৬জন ৬০জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য