“আমি তোমার জন্য এসেছি-(পর্ব-৬৫)

 

সবাই মিলে মজা করে খাবার খাচ্ছে সব খাবার দারুন মজার হয়েছে, সবাই চেটেপুটে খাচ্ছে।শেখর সাহেব বললেন আজাদ শুরু করো কাতল মাছের তরকারিটা বেশ মজার হইছে। আজাদ সামনে ভাত নিয়ে বসে থাকতে হয় না, আরাফ কাতল মাছের মাথাটা আজাদের প্লেটে তুলে দেও বললো আরমান। আঙ্কেল ইলিশ মাছ আপনার খুব প্রিয় বলেই মাছ ভাজা এক পিচ দিল, এক পিচ নিজের প্লেটে নিল আরাফ। আজাদের প্লেট থেকে খাবার মুখে দিল আর মনে মনে হাসলো, আরাফ ১২ বছর পরও মনে রাখছো ইলিশ মাছ প্রিয়ার প্রিয় মাছ।

আরামান কাতল মাছের মাথাটা নিজের হাতে আজাদের প্লেটে তুলে দিল। আজাদ এক চিমটে কাতল মাছ মুখে দিয়েই বলে ওঠল এত বছর পরও ভাবীর রান্না মাছের সাদ একই রকম আছে!আরমান, আরাফ অবাক হয়ে আজাদের দিকে চেয়ে থাকে!  আজাদ তুমি জানলে কি করে মা রান্না এসব রান্না করছে?

আরমানের কথায় আজাদ হেসে বললো হা হা হা সেই স্কুল জীবনের স্যারের কাছে গিয়ে পড়তাম।বেশিভাগ সময় স্যার, ভাবী জোর করেই খাওয়াতেন সেই সাদ কি ভুলা যায়, রান্নাটা ভাবীর মুখে দিয়েই বুঝছি।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রহিমা বলে জ্বী ভাইজান আজ সব রান্না খালাম্মা করেছেন।আজাদের কথায় সবাই মুগ্ধ হলো, সবার খাবার প্রায় শেষ পর্যায়ে ভিতর থেকে প্রিয়ার চিৎকারের গলা শোনা যায়।

আমি খাব না সব ভেঙ্গে ফেলবো, আমাকে মেরো না কথাটা শোনা মাত্র আরাফের বুকে ভিতরটা কেঁপে ওঠল! ভাতের প্লেট ফেলে দৌঁড়ে ভিতরে চলে গেল। আজাদ,আরমান,শেখর সাহেব,ফরিদ সাহেব,রোহান একে একে সবাই হাজির হলো।ড্রাইনিং সব খাবার ছড়ানো, ছিটানো প্লেট, গ্লাসের ভাঙ্গা টুকরো পড়ে আছে সারা ঘরময়।

মিরা, রিতা,মিতু কেউ প্রিয়াকে থামাতে পারছে না, প্রিয়া চিৎকার করেই চলছে! শেয়া প্রিয়ার হাতটা ধরতে চাইলো অমনি প্রিয়ার চিৎকারের মাত্রা দ্বীগুন বেড়ে গেল।কে আছো বাঁচাও আমাকে মেরে ফেলবে বলেই মনোয়ারা আঁচলে লুকাল। মিরা প্রিয়াকে স্পর্শ করতেই পারছিলো না পাশে দাঁড়িয় কেঁদেই চলছে।আজাদকে দেখেই মিরা কাছে গেল ওগো আমার প্রিয়া এমন করছে কেন! তুমি দেখ আজাদ অবাক দৃষ্টিতে প্রিয়ার দিকে চেয়ে থাকে।

আরাফ শ্রেয়ার পাশে দাঁড়াল ব্যাপার কি? শ্রেয়া আরাফকে জড়িয়ে ধরে কান্না ভেজা কন্ঠে বললো।প্রিয়ার প্লেটে মিরা আন্টি খাবার দিল কিন্তু প্রিয়া প্লেটে হাত দিচ্ছিল না,আমি বললাম প্রিয়া খাওয়া শুরু করো।তখনি প্রিয়া ড্রইনিং টেবিলের সব প্লেট ছুঁড়ে ফেল দিল, আর আমাকে দেখিয়ে বলতে শুরু করেছে আমাকে মেরো না। তুমি বিশ্বাস করো আমি প্রিয়াকে কিছু বলি নাই, প্রিয়া মা কি হয়েছে বলেই আতংঙ্কে তাকায় শেখর সাহেব।

মা এসব তুমি কি করছো? পাগলামী করো না আমার কাছে আস বলেই আজাদ তার মেয়ে প্রিয়ার দিকে দুহাত বাড়িয়ে দেয়।মনোয়ারা পরম স্নেহে প্রিয়াকে বুকে জড়িয়ে রাখে, মা তুমি শান্ত হও বলেই বেগম শেখর প্রিয়ার কাছে যায়। বিছানার কাছে যেতেই প্রিয়া বেগম শেখরকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়।মিতু না ধরলে হয়ত কোমরটা আর রক্ষা পেত না, আরামান কি করবে বুঝতে পারে না রিতি তুমি প্রিয়াকে ধরো।আমাকে থাপ্পর মারছে আগেই বলে রিতা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, বলো কি কখন?

শ্রেয়াকে মারতে চাইছিলো আমার দেইনি বলে আমার উপর ভিষন ক্ষেপেছে বলেই রিতা অমিকে কোলে নিয়ে অন্য রুমে চলে গেল।প্রিয়া চুপচাপ ওঠে গিয়ে ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো হাতে নিয়ে শ্রেয়ার দিকে এগিয়ে গেল! আরাফ বাঁচাও বলে শ্রেয়া আরাফের পিচনে আঁড়াল হলো।প্রিয়া এসব কি হচ্ছে বলে আরাফ ধমক দেয়! প্রিয়া আস্তে করে বলে তোমরা জানো না ও আমাকে মেরেছে বলেই শ্রেয়াকে দেখায়।

কাঁচের টুকরোটা আমাকে দাও,আমি শ্রেয়াকে মেরে দিব বলেই প্রিয়ার দিকে হাত বাড়ায়।প্রিয়া কাঁচের টুকরো দুটো আরাফের হাতে দেয়, তুমি ওর কাছে যেও না তোমাকেও মারবে বলে কান্না জুড়ে দেয়।রহিমা ভয়ে ভয়ে মনোয়ারার কাছে যায় খালাম্মা হঠাৎ কি হলো, আপামনি এমন করছে কেন?মনোয়ারা চোখ মুছতে মুছতে বলে আমি কিচ্ছু জানি না, সরি আমার কপাল। আরাফ তুমি প্রিয়াকে নিয়ে ড্রইং রুমে চল প্লীজ, আর রহিমা তুমি রুমটা পরিষ্কার করে ফেল।

প্লীজ ব্যাপারটা সবাই স্বাভাবিক ভাবে নেই আপনার সবাই খেয়ে নেন, আরাফ তোমরা আস। বলেই আরমান মায়ের রুমের দিকে গেল,আরাফ, প্রিয়া,রোহান, শেখর সাহেব সবাই মনোয়ার রুমে গেল।প্রিয়া আরাফের হাতটা তখন থেকেই ধরে রাখছে, সবাই বসল আরাফ চেয়ে দেখল প্রিয়ার চোখে কিসের যেন অপেক্ষা।

প্রিয়া তুমি খাবে না, ক্ষিদে পায়নি?  প্রিয়া অবুঝের মতো মাথা নাড়ল হ্যাঁ আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে।মিরার দিকে আঙ্গুল ইশারা করে বললো এরা আমাকে খেতে দেয় না। হে আল্লাহ এটা আমার মেয়ে বলেই আজাদ কাঁদতে কাঁদতে সোফায় লুঠিয়ে পড়ে।

এবার যেন আরাফের চোখের পানি বাঁধ মানে না চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা গরম লোনা জল গড়িয়ে পড়ে। প্রিয়া আরাফের কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিলো গালে পানি লাগায় উপরে তাকায়।তুমি কাঁদছো কেন? তোমার কি হয়েছে?আরাফ হেসে বলে কিছু হয়নি চোখে কি জানি পড়ছে। ওহ্। ওই মেয়েটা তোমাকে মেরেছে বুঝছি! কে মেরেছে আরাফ জানতে চায়।প্রিয়া আবার শ্রেয়াকে ইশারা করে।নাহ্ ও আমাকে মারে নাই, তোমাকেও আর মারবে না।

সত্যি বলছো,আমাকে মারবে না?নাহ্ মারবেনা।তুমি কে প্রিয়া জানতে চায়।আমার নাম গুন্ডা ছেলে।আচ্ছা তোমার নাম কি?আমার নাম কি! তুমি বলে দেও বলেই প্রিয়া আরাফের মুখের পানে চেয়ে থাকে।তোমার নাম পিচ্চি প্রিয়া, প্রিয়া হেসে ওঠে সুন্দর নাম বলেই হাত তালি দেয়।

ওনি মিরা আন্টি তোমার মম! ওনি আজাদ আঙ্কেল তোমার বাবা।প্রিয়া ভালো করে দেখে জবাব দেয় আমি এদের চিনি না তো! এরা কারা?শেখর সাহেব নিজেকে দেখিয়ে বলে প্রিয়া মামনি আমি তোর বড় মামা।প্রিয়া হেসে বলে আমি পিচ্চি প্রিয়া, তুমি কে?শেখর সাহেব চিৎকার করে ওঠে প্রিয়া তুই আমাকে চিনতে পারছিস না!

ওর কিছু খাওয়া প্রয়োজন রহিমা প্রিয়ার জন্য খাবার নিয়ে আস, আরাফ তুমি দেখ কিছু খাওয়াতে পার কি না বললেন ফরিদ সাহেব।ওর ঘুমের প্রয়োজন আমি একটা ইনজেকশন লিখে দিচ্ছি, আফাতত ঘুমিয়ে যাবে সকাল যা করার করতে হবে।রোহান যাও খাতা, কলম নিয়ে আস জ্বী ভাইয়া রোহানের হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে প্রিয়ার অবস্থা দেখে।

রোহান মিতুর দিকে তাকাল মিতুর চোখে পানি ঢলমল করছে, আজ আমাদের ফুলশয্যা ছিলো প্রিয়া আপ্পির অসুস্থ।হে আল্লাহ্ প্রিয়া আপ্পিকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দেও মনে মনে রোহান ফরিয়াদ করে। হা করো, প্রিয়া আরাফদের দিকে চেয়ে থাকে, আরাফ প্রিয়াকে ইলিশ মাছের ভাজি দিয়ে ভাত খাইয়ে দেয়।

প্রিয়া হাসি মুখে বলে গুন্ডা ছেলে তুমি খুব ভালো,  সবাই খুশি মেয়েটা কিছু খেয়েছে।শ্রেয়া অমিকে ঘুম পাড়িয়ে ভাবতে থাকে প্রিয়া হয়ত আমার আর আরাফের বিয়েটা মেনে নিতে পারছে না।ওরে সবটা জানানো উচিত, এখনি জানাতে হবে শ্রেয়া তড়িগড়ি করে মায়ের রুমে যায়।রুমে সবাই উপস্থিত আছে এখনি উপযুক্ত সময় সব বলতে হবে,  বউমা আস বলেই মনোয়ারা ডাক দেয়।

শ্রেয়া মনোয়ারার কাছে বসেই কাঁদতে শুরু করে মা আমার জন্যই প্রিয়া আজ অসুস্থ প্লীজ মা আমাকে ক্ষমা করুন।মিরা আন্টি, আজাদ আঙ্কেল আমি অপরাধী আপনারা আমাকে শাস্তি দেন  বলেই মিরার কাছে যায়।পাগলী মা আমার এসব কি বলছো, প্রিয়ার কিচ্ছু হবে না সব ঠিক হয়ে যাবে বলেই শ্রেয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে মিরা।প্রিয়া মাথা ওঠিয়ে মিরা,শ্রেয়ার কান্না দেখে হেসে ওঠে তোমাকে কে মেরেছে,তোমরা কাঁদছো কেন!তুমি আমাকে আর মারতে পারবে না! গুন্ডা ছেলে আমাকে আর মারতে দিবে না বলেই প্রিয়া হি হি হি হি করে হেসে ওঠে।

সবাই প্রিয়ার দিকে চেয়ে আছে ততক্ষনে রোহান,জিসান মিলে ফার্মেসি থেকে প্রিয়ার জন্য ইনজেকশন নিয়ে এসে হাজির।আরাফ প্রিয়াকে ইনজেকশনটা দেওয়া দরকার বলেই আরমান কাছে আসতে দেখে।প্রিয়া চিৎকার করে ওঠে গুন্ডা ছেলে ওরা আমাকে মারবে বলেই আরাফের বুকে মাথায় লুকায়।

প্লীজ ভাইয়া ইনশেকশন লাগবে না,আমি প্রিয়াকে ঘুম পাড়িয়ে দিব তোমরা টেনশন করো না প্রিয়া স্বাভাবিক হয়ে যাবে।ফরিদ সাহেব হাত ঘড়ি দেখে চমকে ওঠে ওরে বাবা রাত ১২টা বাজে রোহনের মা চল এবার বাসায় ফিরতে হবে।মিত বললো বাবা আমি থাকি প্রিয়া আপ্পিকে ছেড়ে যেতে মন চাইছে না বলেই চোখ থেকে পানি ফেলল।

শোন মেয়েটা কেমন জানি আপন হয়ে গেছে, বাসায় ফিরলেও রাতে আর ঘুম আসবে না।তুমি রোহানকে নিয়ে বাসায় যাও, আমি মিতুকে নিয়ে থাকি। রাতের ব্যাপারেই তো সকালে বাসায় যাব বলেই বেগম ফরিদ থামলেন, ভাইজান সবাই থাকুন। বাসায় ফোন করে বলে দেন যাবেন না,রোহানের মামা,মামী,চাচী,চাচী সবাই দেখে রাখবেন।ফরিদ সাহেব কিছুক্ষন ভাবলেন, বেয়াই সাহেব থাকুক সারা রাত গল্প করে কাটিয়ে দিব।সবাই এখানে কেন আমি ঘুমাতে পারছি না বলেই প্রিয়া চিৎকার করে ওঠল।  ভয়ে শেখর সাহেবের হার্টএটার্ক হবার উপক্রম, আরাফ প্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো।

…..চলবে।

৪৪০জন ৩২৯জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ