আমি তোমার জন্য এসেছি (পর্ব-৬৪)

সুরাইয়া নার্গিস ২৩ জুলাই ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৮:২৪:৪৫অপরাহ্ন উপন্যাস ১৭ মন্তব্য

আমি তোমার জন্য এসেছি-(পর্ব-৬৪)

 

প্রিয়া ওদের পিচু নিল।আরাফ আজাদকে নিয়ে লিফ্ট বেয়ে তিন-তলা ওঠে সোজা সদর দরজায় সামনে গিয়ে কলিংবেল চাপল। পিচনে ফিরে দেখল ততক্ষনে প্রিয়া,মিরা, শ্রেয়া,অমি, শেখর সাহেব,বেগম শেখর সবাই হাজির।রহিমা দরজা খোলেই সালাম দিল সবাই সালামের জবাব দিয়ে রুমে প্রবেশ করল।আজাদ দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলল দেয়ালে টানানো সাদা কালো ছবিটা দেখে আজাদ নিজের অজান্তে চিৎকার করে ওঠে। স্যার আমি মিরা,প্রিয়াকে নিয়ে আপনার বাসায় আসছি অথচ আজ আপনি বেঁচে নেই।

প্রিয়ার কন্ঠস্বর বাকরুদ্ধ, চোখের অশ্রু মনে হয় শুকিয়ে গেছে অনেকক্ষন আগে চারপাশ চেয়ে দেখে নিরবে।আরাফ আজাদকে সোফায় বসিয়ে দিল, মিরা,বেগম শেখর,তারপর জিসান, রোহান প্রিয়া বসল। শেখর সাহেব পাশের সোফায় বসলেন ফরিদ সাহেব,আরমানের পাশে রিতা দাঁড়িয়ে আছে।

শ্রেয়া অমিকে নিয়ে ভিতরে চলে গেল, আরাফ মনোয়াকে নিয়ে ফিরে আসলো রিতা শ্বাশুড়ী মাকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিলেন।আজাদ ওঠে গিয়ে মনোয়ারকে সালাম করলেন ভাবী কেমন আছেন?পাশে থেকে মিরাও সালাম করলো।আমি ভালো ভাই! তোমরা কেমন আছো? এতবছর পর ভাবীর কথা মনে পড়লো কত বছর পর তোমাদের দেখলাম।

ভাবী আপনাদের সবাইকে খুব মিস করতাম কিন্তু বাসার ঠিকানাটা ভুলে গিয়েছিলাম বলেই মাথা নিচু করে রাখল।রিতা আরমানের স্ত্রী প্রিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমূখ সত্যি আরমান দেখো প্রিয়া কত সুন্দর আরাফের পছন্দ আছে বলতে হবে।

প্রিয়া আমার জানার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর মনে হচ্ছে, কোন নিঁখুত শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় গড়া এই সুন্দর প্রতিমা।হ্যাঁ হাসপাতালে আমি প্রিয়াকে প্রথম দেখলাম মেয়েটা সত্যি অনেক সুন্দর বললো আরমান।জানো রিতা, বাবা প্রিয়াকে খুব ভালোবাসতেন, আরাফের বউ মানাতে চাইছিলো ভাগ্যে ছিলো না বলে হয়নি।হুম আমি সবটা জানি, আরাফের বউ শ্রেয়াও কিন্তু কম সুন্দর না বলেই হাসলো রিতা।

আজাদ ভিতরে চল, আপনারা সবাই আসুন ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নিবেন তারপর জমিয়ে আড্ডা দিব। নাহ্ আরমান ভাবীর কাছে একটু থাকি শরীরটা ভালো লাগছে! ওহ্ শিওর ওকে বলেই আরমান মায়ের পাশে বসল। এত রাতে কে আসলো রহিমা দরজাটা খোলে দেও বলেই রিতা ডাকলো।রহিমা কলিংবেল শোনেই ভিতর থেকে আসল, দরজা খোলার আগে প্রশ্ন করলো কে?

রহিমা আমি রোহানের আম্মু দরজা খোল, খালাম্মা বলেই রহিমা দরজা খুলে দিল।মিতু আর রোহানের মা রুমে ঢুকল, ওদের দেখে রোহান ফরিদ সাহেব চমকে ওঠল।কি ব্যাপার তুমি বউমাকে নিয়ে এত রাতে এখানে আসলে কেন? ফরিদ সাহেব প্রশ্ন করলো।আরে পরের বাসায় আসছে নাকি! আসেন আপা বলেই মনোয়ারা রোহানের মাকে কাছে ডাকল।

তোমার বাবার বন্ধু আকরাম সাহেবের স্ত্রী, আরাফের মা ওনি মনোয়ারা ভাবী যাও বউমা, সালাম করো বলেই মিতুকে ইশারা করলো।মিতু মনোয়ারকে সালাম করে ওঠে যাবে বেগম ফরিদ বললেন বউমা।  যখন একজন মুরব্বিকে সালাম করবে তখন আশেপাশে যতজন বয়স্ক সালামের উপযুক্ত সবাইকে সালাম দিবে/করবে।

মিতু প্রথমে শ্বশুড় ফরিদ সাহেব,শ্বাশুড়ী বেগম ফরিদ,বাবা শেখর সাহেব,মা বেগম শেখন,ফুপু মিরা,ফুপা আজাদ, ভাবী রিতা,ভাইজান আরমান সবাইকে সালাম করলো।মা মিতুর আরেকটা পরিচয় আছে বলেই আরাফ মিতুকে নিয়ে মনোয়ারার পাশে বসালেন, আম্মু মিতু আমাদের বোন।মনোয়ারা খুশি হয়ে মিতুকে মেয়ের স্নেহে বুকে জড়িয়ে নিলেন,বেঁচে থাকো মা বলে মিতুর কপালে চুমু দিলেন।

শ্রেয়া মনে মনে গর্ব করলো সবাই কত ভালো মানুষ সত্যি আমিও ভাগ্যবতী এত ভালো একটা পরিবারে বউ হয়ে আসলাম।আর বলবেন না ভাবী মিতু সম্পকে প্রিয়ার মামাত বোন আজাদ সাহেব তার ফুপা। অসুস্থ শোনার পর থেকে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বায়না করছিলো পরে জিসানের কাছে জানলাম। ওরা আপনাদের বাসায় আসছে তাই মিতুকে দেখাতে নিয়ে আসলাম, ফুপা তোমার শরীর কেমন আছে।

খুব ভালো আছি রে মা, বললো আজাদ আরাফের বাবা আমার স্কুলের শিক্ষক ছিলো। তারপর আকরাম স্যারকে প্রিয়ার দাদু মানে আমার আম্মা খুব ভালোবাসতেন নিজের ছেলের মতো। সেই দিক থেকে ব্যক্তিগত ভালো আমাদের গভীর সম্পর্ক ছিলো, জানি ফুপা বললো মিতু।প্রিয়া অন্যমনস্ক হয়ে সোফায় বসে আছে অথচ এই প্রিয়া একদিন মনোয়ারা আন্টি বলতে অজ্ঞান ছিলো।প্রিয়া! প্রিয়া ডাকল মিরা।

প্রিয়া এদিকে আস বলেই মিরা প্রিয়াকে সোফা থেকে তুলে এনে মনোয়ার পায়ের কাছে বসাল। প্রিয়া সালাম করার জন্য মনোয়ারার পা স্পর্শ করলো, রহিমা আমরা চশমাটা দে তো। আরাফ বালিশের কাছ থেকে চশমা নিয়ে মনোয়ারার চোখে পড়িয়ে দিল।মনোয়ারা পায়ের কাছে তাকায় প্রিয়া সালাম করছে,এটা কে? মিরা প্রশ্ন করে মনোয়ারা।ভাবী আপনার মেয়ে প্রিয়া।প্রিয়া বলেই মনোয়ারা ডুকরে কেঁদে ওঠে! এত বছর পর বড় আন্টির কথা মনে পড়ল তোর!বলেই প্রিয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে পাশ থাকা আজাদ,মিতু,মিরা সবার চোখে পানি।

এর মধ্যে রিতার মাধ্যমে মনোয়ারা প্রিয়া আরাফকে ভালোবাসার বিষয়টা জেনে গেছে। পাগলি আমার ছেলেটাকে ভালোবাসতে এতটা সময় নিলি কেন? জানিস না বাজারে ভালো জিনিসের মূল্য বেশি বিক্রেতার অভাব হলেও ক্রেতার অভাব হয় না। প্রিয়া অবুঝের মতো আজো মনোয়ারার মুখের দিকে চেয়ে রইল ঠিক ১২ বছর আগের মতো।মিরা বললো ভাবী আপনি শান্ত হোন “জন্ম,মৃত্যু,বিয়ে ” এই তিন বিধাতা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না।আল্লাহ্ চাইলে আমার প্রিয়ার জন্য আরেকজন আরাফের ব্যবস্থা করে দিবেন ইনশাল্লাহ্ বললো আজাদ।

প্রিয়া চুপচাপ কোন কথা বলে না। মা থাকনা এসব কথা ওরা তো কয়েকদিন থাকবে তারপর না হয় বলবেন বললো রিতা ।মাকে বলতে দাও বলুক মনের কষ্টটা হালকা হওক বললেন আরমান, মিতু সব আগেই জানতো।বেগম শেখরের চোখে পানি মনোয়ারার কথা শোনে, মিরার চোখে পানি।আজাদ ওঠে গিয়ে ফরিদ সাহেবের পাশে সোফায় বসলেন।শ্রেয়া সবার জন্য রাতের খাবার রেডি করে টেবিলে দিয়েছে রহিমা তাকে সাহায্য করতেছে।

খালাম্মা ছোট ভাবী টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়েছে,বড় ভাইজান,বড় ভাবী আপনারা মেহমানদেে নিয়ে টেবিলে খেতে চলেন।রাত অনেক হয়েছে সবাই চলুন খেয়ে নেন বলেই রিতা মিরা,প্রিয়াকে নিয়ে ভিতরে চলে গেলেন।আমি,মিতু আমরা খেয়ে এসেছি রোহান,ওর বাবা বাসায় গিয়ে খাবে আমি রান্না করে রেখে আসছি বললেন বেগম ফরিদ।না আপা, রোহানরা খেয়ে পরে যাবে মনোয়ারার কথায় রোহানের মা চুপ হয়ে যায়।আরাফ।জ্বী ভাইয়া।তুমি একটা কাজ করো ড্রাইনিং সবাই বসতে পারবে না, আমরা পুরুষদের খাবার এই রুমে নিয়ে আস। আমরা বিছানায় বসে খেয়ে নিব, আর মহিলারা ড্রাইনিং এ বসে খেয়ে নিব।

আমরাও তাই মনে হয়ে ছিলো বললেন মনোয়ারা, আমাকে ভিতরে দিয়ে আস।সবাই ফ্রেশ হয়ে সবাই খাবার খেতে বসেছে বিছানায় রোহান,জিসান,আরমান, ফরিদ সাহেব, শেখর সাহেব,আজাদ। আরাফ সবার প্লেটে খাবার দিচ্ছে, আরাফ তুমিও বসে যাও আমরা সবাই নিজে প্লেটে খাবার তুলে নিব।

আজাদের এমন কথায় ফরিদ সাহেবও যোগ দিলেন হ্যাঁ তুমিও বসো সবাই একসাথে খাওয়ার মজাই। এদিকে ড্রাইনিং মনোয়ারার পাশেই প্রিয়া বসছে, তারপর মিতু,বেগম ফরিদ। অন্যপাশে রিতা,শ্রেয়া,মিরা,বেগম শেখর মিরা ওঠে দাঁড়িয়ে বললেন আমি সবার প্লেটে খাবার দিচ্ছি।আপনারা সবাই বসে পড়ুন, নাহ্ আন্টি আপনি বসুন আমি, শ্রেয়া খাবারের দায়িত্বে আছি বললো রিতা।মনোয়ারা হাসলো আচ্ছা তোমরা বস মিরা, রহিমা আজকের সবার সেবা করবে বলেই থাকলো।মা যখন বলছে তখন কি আর বলবো চল আমরা খেতে বসি বলেই রিতা চেয়ার টেনে বসে পড়লো।

দারুন সব মজার খাবার প্রিয়া যা যা খেতে পছন্দ সব আইটেম টেবিলে সাজানো। মিরা অবাক দৃষ্টিতে মনোয়ারার দিকে তারায় ভাবী এত আয়োজন কে করলো! রহিমা মুচকি হেসে মনোয়াররার দিকে তাকায়,হ্যাঁ মা শ্রেয়া তো হাসপাতালে গিয়েছিলো বললো রিতা। মিরা আজকের সব রান্না আমাদের রহিমা করেছে, আমি ওরে দেখাইয়া দিয়েছি কোন কোন মসলা দিয়ে কিভাবে রান্না করতে হয়।মিরা মনে মনে আবেগ আপ্লুত হলো ভাবী এত বছর পরও আপনি প্রিয়ার পছন্দের খাবার গুলো মনে রেখেছেন! কি করে আজকের টেবিলের সব খাবার তো প্রিয়ার পছন্দের খাবার।

মা আপনি কষ্ট করে রান্না করতে গেলেন কেন? আমরা তো চলেই আসছিলাম বললো শ্রেয়া।রোহানের মা খেতে খেতে বললেন, আপা তার মানে সব রান্না আপনি নিজ হাতে করেছেন? রহিমা হেসে বললেন আজকের সব রান্না খালামা করেছেন, আমি ওনাকে সাহায্য করেছি মাত্র।

…..চলবে।

২৫৭জন ১২৬জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য