“আমি তোমার জন্য এসেছ-(পর্ব-৬১)

 

কেটে গেল অনেকক্ষন। আরাফ কাঁদতে পারছিলো না কারন তার চোখে কান্না মানায় না! আরাফ প্রিয়ার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেয়।পাগলি এসব কি করছো এবার কান্না থামাও।প্রিয়া মাথা তুলতে চায়না আরো কিছুক্ষন আরাফের বুকে জড়িয়ে থাকতে চায়, ১২বছর প্রতীক্ষার শেষ হলো আজ।আস্তে আস্তে শেখর সাহেব,বড় মামী,জিসান,ফরিদ সাহেব,রোহান, আরাফ প্রিয়ার কাছে চলে আসে তাতে দুজনের কারো খেয়াল নেই। প্রিয়া চিৎকার করে বলে চলে..

-গুন্ডা ছেলে তোমাকে আমি বড্ড ভালোবাসি।গত ৭ বছরে আমি প্রতিটাক্ষন তোমাকে মিস করছি, আমার প্রতিটা রাত কেটেছে তোমায় ভেবে চোখের পানিতে।তোমার ভালোবাসা বুঝতে না পারার অক্ষমতা,আমার কামখেয়ালি মনোভাব, হেয়ালিপনা সবকিছু আমাকে কষ্ট দেয়। আমি তো অবুঝ ছিলাম তাই সেদিন তোমার ভালোবাসার মূল বুঝতে পারি নাই যা আমাকে গত ৭টা বছর একটা রাতও শান্তিতে ঘুমাতে দেয়নি।

-গুন্ডা ছেলে, আমি যেদিন বুঝতে পেরেছিলাম ভালোবাসা কি! মায়া কি জিনিস সেদিন থেকেই তোমাকে ভালোবাসতে শিখছি।

-পিচ্চি প্রিয়া তুমি আমার ভালোবাসা বুঝতে অনেক বেশি দেরি করে ফেলছো।

ততদিনে তোমার গুন্ডা ছেলেটা তোমার থেকে অনেক দূরে চলে গেছে।

আজ শুধু হৃদয়ের রক্তাক্ত বেলকনিতে ঘুনে ধরা আসবাবপত্রের পরিত্যাক্ত বাড়িটাতে আজো তোমারী বসবাস।

-গুন্ডা ছেলে! আমার ঘুম ভাঙ্গলে প্রথমে তোমাকে খোঁজতাম যদি ভুল করেও তোমার দেখা পেয়ে যাই।

তাহলে ১২ বছর আগের সব অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিব তোমার কাছে।

-পিচ্চি প্রিয়া খুব ভালোবাসি তোমাকে আজো ১৫বছর আগে  ঠিক যতটা ভালোবাসতাম তার থেকে আরো একটু  বেশি।কিন্তু আজ আমি পরিস্থিতির স্বীকার সময়ের কাছে বন্ধি তোমার ভালোবাসা গ্রহন করতে পারবো না।

-পিচ্চি প্রিয়া আমার একটা কথার জবাব দিবে? খুব জানতে ইচ্ছে করে।

-বলো গুন্ডা ছেলে।আমি আজ তোমাকে সব বলতে চাই।

-আরাফ বলল, পিচ্চি প্রিয়া আমি গত ৭ বছর আগে তোমার জন্য একটা চিরকুট লিখে রেখে আসছিলাম,কিন্তু তুমি তার জবাব দাওনি।আমার অপরাধটা কি ছিলো বলবে???

-প্রিয়ার চোখে পানি গুন্ডা ছেলে আমরা তো তখন খুব ভালো বন্ধু  হয়েছিলাম।সেদিন তুমি আমার সাথে দেখা না করে চলে গিয়েছিলে বলে খুব কষ্ট হয়। রাগে, জেদ,অভিমানে আর ডাইরিটা পড়া হয়নি, দেখা হয়নি তোমার লেখা চিরখুট।

-পিচ্চি প্রিয়া আমি অনেক ঘন্টা,অনেক দিন,অনেক বছর তোমার ১ টা ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করেছি। তুমি আমাকে ভালোবাসো এই কথাটা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু তুমি জবাব দেওনি ব্যার্থ প্রেমিক হিসাবে হয়ত পৃথিবী ছাড়তে পারিনি! একদিন তুমি ফিরে আসবে এই বিশ্বাসে দেশ ছেড়েছিলাম।

-এবার প্রিয়ার অপরাধবোধটা অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরে। ইসস! কতটা কষ্ট হলে একজন মানুষ নিজের পরিবার ছেড়ে, দেশ ছেড়ে নিজের কাছ থেকে পালাতে চায়।

-গুন্ডা ছেলে আমি তিন বছর পর তোমার সেই ডাইরি খুলে চিরখুট পড়েছিলাম, আর মুগ্ধ নয়নে কেঁদেছিলাম।

-গুন্ডা ছেলে গত ৭ বছরে আমি প্রতিদিন তোমার দেওয়া নাম্বারে কল দিতাম, প্রতিবার জবাব আসতো সুইচ অফ।

-পিচ্চি প্রিয়া আমি তোমাকে ভুলার জন্য ১বছর পর সব ছেড়ে জাপানে পাড়ি জমিয়েছিলাম।

জাপানে গিয়ে নতুন মোবাইল নাম্বার নিয়েছিলাম, বিদেশে বাংলাদেশের নাম্বর ব্যবহার করা যায় না। তাই পুরনো নাম্বারটা বন্ধ করে ম্যানিব্যাগে রেখে দেই।

-পিচ্চি প্রিয়া আমি জাপানে চলে যাওয়ার পরও একটা মুহূত্বের জন্য মন থেকে তোমাকে সরাতে পারি নাই।

-গুড্ডা ছেলে বলেই প্রিয়া আরাফকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা জীবনে নতুন রুপে ফিরে এসেছে, এই সুখ যেন পৃথিবীর সকল সুখকে হার মানায়।

গুন্ডা ছেলে আজ আমি খুব,খুব খুশি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ মনে হচ্ছে। বলেই প্রিয়া হি হি হি হি করে হেসে ওঠে, আরাফ আলতু করে প্রিয়ার মাথায় বিলিকেটে দেয়।

-প্রিয়ার খুশিটা নষ্ট করার কোন অধিকার আরাফের নেই তবু সত্যিটা তাকে জানতেই হবে। কারণ সারাজীবন কাঁদার থেকে একদিন কাঁদা অনেক ভালো ভাবতে ভাবতে আরাফের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা নোলা জল গড়িয়ে পড়ে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়া আরাফের কান্না দেখে নিজেকে স্থির রাখতে পারে না,নিজের অপরাধবোধটা তাকে চেপে ধরে।শ্রেয়া আঁচলে মুখ লুকায় হে বিধাতা প্রিয়া কি পারবে পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজেকে কন্টোল করতে?আমিও যে আর ভাবতে পারছি না আমি সেদিন এত বড় অন্যায়টা কেন করলাম।

ছোট্র অমি বুঝতে পারে না কি হচ্ছে এখানে! মিষ্টি আন্টি, পাপা কেন কাঁদছে মম? কথাগুলো বলতে বলতে শ্রেয়ার পাশে দাঁড়ায়।মম তুমিও কাঁদছো, পাপা তোমায় বকেছে অবুঝ অমির আবার প্রশ্ন! না বাবা তোমার পাপা আমাকে বকে নাই।মিষ্টি আন্টি তোমার পাপার খুব ভালো বন্ধু ছিলো প্রায় ৭ বছর পর দেখা তাই ওরা আনন্দে কাঁদতে।তাহলে তুমি কাঁদছো কেন মম???

পাগল ছেলে তোমার পাপাকে আমি খুব ভালোবাসি তো। তাই ওদের খুশিতে আমার চোখে পানি চলে আসছে বলেই শ্রেয়া প্রিয়া,আরাফের দিকে তাকায় ।

মম আমিও মিষ্টি আন্টি,পাপাকে খুব ভালোবাসি আমিও ওদের আনন্দ কাঁদব বলেই বে করতে চাইল।

শ্রেয়া অমিকে থামিয়ে দিল বোকা ছেলে কাঁদে না বলেই শ্রেয়া হাসি দিল,অমিও মায়ের সাথে হাসল।

চারপাশে সবাই খুশি ওরা পরবর্তীতে কি হয় তা দেখার জন্য সবাই নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

-পিচ্চি প্রিয়া মাথা তুল সবাই আমাদের দেখছে তো! কি লজ্জার ব্যাপার বলেই হা হা হা করে হেসে দিল আরাফ।

-দেখুক আমি আমার ভালোবাসার মানুষের বুকে মাথা রেখেছি তাতে কার কি!

-আরাফ আস্তে করে বলে পিচ্চি প্রিয়া আমরা তো ভালো বন্ধু। এই কথাটা এখানে সবাই জানে না এভাবে আমাদের দেখলে কি ভাববে বলতো!

তুমি কত ভালো একটা মেয়ে, শিক্ষিত একজন ম্যাজিস্ট্রেট তোমার কত সম্মান প্রিয়া আরাফকে থামিয়ে দেয়। আমি গুন্ডা ছেলের পিচ্চি প্রিয়া এই পরিচয়টা নিয়ে সারাজীবন থাকতে চাই।

-প্রিয়া অবাক হয়ে অসহায়ের মতো আরাফের দিকে চেয়ে থাকে।গুন্ডা ছেলে আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, তুমি আমাকে ভালোবাস না? আমরা কি শুধু বন্ধু???আরাফ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়, সে একজন নারীর স্বপ্ন,একটা অবুঝ শিশুর বাবা সেখানে প্রিয়ার কোন জায়না নেই।অপ্রিয় হলেও এটাই সত্যি আরাফের হৃদয়ের সবটা জুড়ে শুধু প্রিয়ার বসবাস। এটা সমাজ,সংসার জানবে না মৃত্যু আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বুকের রক্তকরন হবে প্রিয়ার নামে।

আচ্ছা মিরা একটু নামবে তো নাকি! ১০মিনিট ধরে যে মেয়েটা গাড়িতে ওঠছে না। কি করছে একটু নেমে দেখ, না হয় আমাকে নামার পথ দেও।গাড়ি তো দখল করে বসে আছো নামার সুযোগ নেই,মিরা চেয়ে দেখল আজাদের সামনে ব্যাগ তাই নামতে পারছে না।মিরা আর গাড়িতে বসে থাকতে পারল না আজাদের কথায় প্রিয়ার জন্য নেমে পড়ল।মিরা! ডাকলো আজাদ।মিরা আজাদকে আশ্বস্থ করলো আমি প্রিয়াকে নিয়ে আসবো।

মিরাকে দেখা মাত্রই প্রিয়া চিৎকার করে ডাকলো মম,আব্বুকে নিয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে বের হয়ে আসো। আমি আরাফ ভাইয়াকে পেয়ে গেছি বলেই উচ্ছাসিত সুখে চেয়ে থাকে প্রিয়া।আরাফ এখানে বলেই মিরা গাড়ি থেকে নেমে আরাফের দিকে এগিয়ে যায়।আজাদ প্রিয়ার চিৎকার শুনে মনে মনে বললো রোহানদের বাসায় আসার পর আমি আরাফকে দেখেছি।কিন্তু কথা বলার শাহস হয়নি কারন প্রিয়ার করা ১২ বছর আগের অন্যায়টা আরাফকে কাঁদিয়েছিলো।আমার স্যার আকরাম সাহেব,মনোয়ারা ভাবীকে খুব কষ্ট দিয়েছিলো। সেটা আমাকে আছো কষ্ট দেয় বলেই আজাদ চোখ মুছল।

কিন্তু আমি বোবা দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম অবুঝ প্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারি নাই বলে নিজেকে ধিক্কার দিল।জানালা কাঁচটা তুলে ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালআজাদকে দেখা মাত্র চিৎকার করে ডাকলো আব্বু তুমিও আস আরাফ ভাইয়া।আসছি মা বলেই আজাদ গাড়ি থেকে নেমে এল দূরে চেয়ে দেখল তখনো প্রিয়া বাচ্চাদের মতো আরাফকে জড়িয়ে আছে।শরীরটা খারাপ লাগছে বলেই মিরার পাশে দাঁড়াল, আজাদ এটা সেই ছেলে যার সাথে প্রিয়ার বিয়ে হবার কথা ছিলো?

আজাদ কিছু বলার ভাষা পায় না, মিরা জবাব দেয় হ্যাঁ বড় ভাইজান কিন্তু প্রিয়া ছোট বলে আরাফ ভালোবাসা বুঝে নাই।প্রিয়া বিয়েটা ভেঙ্গে দেয়, তারপর আর যোগাযোগ নেই আজ মিতুর বিয়েতে  দেখা হলো।মিরা তুমি জানো আরাফ বিবাহিত মিতুর বিয়েতে গায়ে হলুদ নিয়ে আমাদের বাসা গিয়েছিলো বললেন বেগম শেখর।মিরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে বড় ভাবী শান্তনা দেয় কেঁদো না মিরা আমি ব্যাপারটা দেখছি।

ফুপি ওনি অমি যে বাচ্চাটা দেখছো তার বাবা, আর শ্রেয়ার ভাবীর স্বামী মিতুর বিয়েতে সবার সাথে পরিচিত হয়েছি।

……চলবে।

২৮৩জন ২০০জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ