আমি তোমার জন্য এসেছি (পর্ব-৫৮)

সুরাইয়া নার্গিস ১৭ জুলাই ২০২০, শুক্রবার, ১২:৫২:২৩পূর্বাহ্ন উপন্যাস ২৬ মন্তব্য

“আমি তোমার জন্য এসেছি-(পর্ব-৫৮)

 

এটাই জগৎ এর নিয়ম, প্রিয়া সবাইকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করছে। এ বাড়িতে মিতু ভালোই থাকবে তাই কস্ট পাবার কিছুই নেই। বড় মামী তুমিও বড় মামার মতো পাগল হলে নাকি! তোমরা তো রোহানের বাবা মাকে দেখলে ওনারা কত ভালো মানুষ।রোহান ছেলে হিসাবে ভালো, তাছাড়া আমাদের মিতুও খুব লক্ষী মেয়ে দেখবে গুছিয়ে সংসার করছে।আমাদের কথা ওর মনেই পড়বে না বলেই প্রিয়া হাসল। মেয়েরা সুখে থাকলে বাবার মায়ের শান্তি বলেই মিরা মিতুর মাকে শান্তনা দিলেন।

বড় ভাবী দুদিন পর রোহান মিতুকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে যাবে, রোহানের বাবা মা জানিয়েছে বলেই থামলেন মেজ মামী।আস্তে আস্তে সবাই বিদায় নিল বিয়ে বাড়িতে কিছুটা নিরবতা। পিংকি, মাধবী বাসে চলে গেছে ওদের বাড়ি ফিরতে হবে তাই মিতু গেলে ওরা দেখা করতে আসবে।জিসানের স্ত্রী জেমীকে নিয়ে জীপে করে যাবে মেজ মামা,মেজ মামীর সাথে সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেছে।আজাদের শরীরটা বেশি ভালো না খাবারের পর থেকে বিশ্রামে আছে তাই মিরা, জিসান,বড় মামা,বড় মামী প্রিয়া ওরা রয়ে গেছে।

মিরা, বড় মামী,প্রিয়া আসরের নামাজ শেষ করেছে, তখন থেকে মিতু কেঁদেই চলছে।বেয়াই সাহেব এবার বিদায় দেন সন্ধ্যা হয়ে গেছে যেতে সমস্যা হবে বললেন শেখর সাহেব।ভাইজান আমি অনেকটা সুস্থতা বোধ করছি এবার বিদায় নেওয়া উচিত।বেয়াই সাহেবা বলেই মিতুর মা বেগম শেখরকে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন বোন আমার মেয়েটাকে দেখে রাখবেন।

এটা বলতে হবে না মিতু ভালো থাকবে চিন্তা করবেন না।রোহান, ফরিদ সাহেব একে একে সবার থেকে বিদায় নেওয়া হলো।প্রিয়া বের হলো মিতুও দরজার সামনে দাঁড়ানো চোখে পানিতে ঢলমল করছে মামীর চোখেও পানি।প্রিয়া আপ্পি আবার এসো তোমাদের সবাইকে খুব মিস করবো বলেই প্রিয়াকে জড়িয়ে ধরে মিতু কেঁদে ফেলল।প্রিয়া চারপাশটা ভালো করে দেখে নিল, শ্রেয়া ভাবী চলে গেছে! ওনার সাথে দেখা হলো না।

রোহান বললো প্রিয়া আপ্পি কয়েকদিন ধরে আরাফ ভাইয়া,আর শ্রেয়া ভাবীর বিশ্রাম নেই সারাক্ষন আমাদের বাসায়।বিয়ের পুরো আয়োজন আরাফ ভাইয়া দায়িত্ব নিয়ে একা হাতে করছেন, ভাবীর কথা আর কি বলবো।জন্মের পর থেকে জাপানে বেড়ে ওঠা তারপর বিবাহসূত্রে বাংলাদেশে আগমন অথচ দেখে মনেই হয়না।

অমায়িক ব্যবহারের একজন ভদ্রমহিলা, অমি সে তো ওরে বাবা!, বাবার মতোই খুব ভালো ছেলে।প্রিয়া মুখ খুললো ও তাই নাকি! শ্রেয়া ভাবী জাপান থাকে? হ্যাঁ আপু অমির মম।হ্যাঁ জানি ভদ্র মহিলা খুব ভালো বললো প্রিয়া। মিতু বললো জানো আপ্পি! আমার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক গত দুদিনে আমাকে এবাড়ির সব বুঝিয়ে দিয়েছেন।প্রিয়া এতক্ষনে অমির কথা ভুলেই গিয়েছিলো, মিতুর কথায় মনে পড়লো।

রোহান অমিদের বাসা কতটুকু দূরে প্রশ্ন করলো প্রিয়া! কেন মা জানতে চাইল ফরিদ সাহবে।বড় মামী বললেন হ্যাঁ এখানে আসার পর থেকে তোমাদের কি জানি আত্মীয় শ্রেয়া বউটা। আমাদের অনেক আপ্যায়ন করলো যাবার আগে তাকে একবার বলে যাওয়া উচিত। বাবা রোহান তুমি একটু খবর পাঠাও আমরা চলে যাব।আবার কখন দেখা হবে কে জানে একটু যেন দেখা করে যায়।

দেখলে আজাদ মেয়েদের হলো এই এক দোষ, আমরা পুরুষের সারা বছর  কথা বলেও কেউ কারো সম্পর্কে জানতে পারি না।আর মেয়ে মানুষ মানে ১ ঘন্টায় আরেকজনের সারাজীবনের কথা বের করে জেনে নেয়।এদের দক্ষতা কত একবার চিন্তা করেছো, বিয়ে বাড়িতে আসছি খাব চলে যাব বেস শেষ।

আর ওনি এখনো শ্রেয়া বউটা,আরেকজন কোলের বাচ্চা অমিকে খোঁজতে ব্যস্ত। বলেই হা হা হা হা করে হাসতে শুরু করলেন শেখর সাহেব।বড় মামীর মুখ দেখে কে! রাগে গদ গদ করছিলেন নতুন মেহমানের বাড়ি বলে দাঁতে দাঁত চেপে চুপ থাকলেন। মিতু বললো, আব্বু তুমি আবার মাকে ক্ষেপাচ্ছো কেন? প্রিয়া আপ্পিও তো চাচ্ছে শ্রেয়া ভাবির সাথে দেখা করতে।

বেগম ফরিদ যোগ দিলেন আপনারা পুরুষ মানুষ তো খুব ভালো সারাদিন বাইরে আড্ডা দেন বাড়িটা তো মেয়েদেরকেই সামলাতে হয়।আজাদ অসুস্থ শরীর তার উপর বড় ভাইজান,ভাবীর খুনসুটি মন দিয়ে উপভোগ করছিলো।বেয়াই সাহেব আপনি কি যে বলেন না বলেই ফরিদ সাহেবও হাসিতে যোগ দিলেন।আরে ভাইজান কি বলবো আমার ওনি তো কথায় আরো পটু ময়মনসিংহের মানুষ তো বুঝেনেই! ঝগড়ায় ১ নাম্বার বললে কম হবে যার শুরু আছে শেষ নেই হা হা হা হা।

বেয়াই সাহেব আপনি আবার কার কথা বলছেন? রাতে বাসায় থাকতে পারবেন তো,, হা হা হা হা। আরে আমাদের রোহানের মায়ের কথা বলছি ওনি তো আবার ময়মনসিংহের মানুষ হা হা হা হা হা।কি শুরু হয়েছে এসব আমার বাবা বাড়ি নিয়ে কুটা! এত বছর সংসার করার পর বলেই বেগম ফরিদ অভিমান করলেন।ইসস কি বলতে কি বলে ফেলেছি, ওগো শোন না বলেই ফরিদ সাহেব রোহানের মায়ের কাঁধে হাত রাখলেন।

কানে কানে বললেন এসব আমার মনের কথা না মজা করে বলছি রাগ করো না প্লীজ। দেখ না মেহমান কি ভাববে!  আমরা তো সত্যি সত্যি ঝগড়া করি না। একথা শোনে বেগম ফরিদের মুখে হাসি ফুটল।আঙ্কেল আমিও কিন্তু ময়মনসিংহের মেয়ে তাই সাবধানে কথা বলবেন, আপনার ধারনা ভুল ময়মনসিংহের মানুষ খুব অতিথি পরায়ন হয়।জানি মা-মনি তোমার আন্টিকে একটু খেপালাম আর কিছু না বলেই হাসলেন ফরিদ সাহেব।

মিরা মুচকি হাসল ঠেলার নাম বাবা এতক্ষন তো পুরুষ জাতীর সাহস দেখলাম এত তাড়াতাড়ি হার মেনে নিলেন!মিতুও ফুপির পিচনে গিয়ে দাঁড়াল ফুপি মনি তুমিও বুঝিয়ে দাও তো মেয়েরা ছাড়া সংসার চলে না।হা হা হা হা হার মানছি না গো সোনা, তোমাদের কাছে পরাজয় মেনে নিচ্ছি  আমরা শান্তি চাই শান্তি বললেন আজাদ।

মিরা এবার নড়ে চড়ে ধরল সবাইকে বলছি

>>হিসাব করে দেখেন আপনারা পুরুষেরা শুধু সংসারে কিছু টাকা প্রদান করার মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করেন।

>>আমরা নারীরা সেটা সংসারে কোথায় কিভাবে খরচ করলে ভালো হবে, সংসারের উন্নতি হবে সেভাবেই কাজ করি।

>>আপনারা সন্তান জন্ম দিয়েই বাহবা দেন, আমরা তার সেবা, সুশ্রুতা পদান করি

>>সারাদিন তাদের সকল প্রয়োজন, বায়না, চাহিদা,, দুষ্টুমির সাক্ষী হই।>>আপনার সকল কাজকর্ম আমাকেই দেখতে হয় সর্বোপরি আমরা দায়িত্ব পালন করি।

>>তারপর আপনাদের সংসারে আজীবনে বিনাবেতনে চাকরি করে যাই সংসারের মায়ায়।

>>আপনারা পুরুষের সংসারের খবর কতটুকু রাখেন? বছর শেষে সন্তানের স্কুলের ফলাফল খোঁজ নেন,ভালো ফলাফল গর্ববোধ করেন।

>>আপনি কি জানেন সন্তানের এই ভালো ফলাফলের পিচনে মায়ের অবদান কতটুকু।

>>তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, সকালের রান্নাতারপর স্কুল থেকে নিয়ে আসা প্রাইভেট,কোচিং সব একজন মা করেন।

>>তারপরও রেজাল্ট খারাপ হলে প্রথমে আঙ্গুলটা মায়ের দিকেই যায় তোমার আল্লা-দে আমার সন্তানটা পড়াশোনায় খারাপ করছে।

>>এতকিছুর পরও নারীকে শোনতে হয় তুমি বাড়িতে থেকে কি কাজ করো?সারাদিন শুয়ে বসে খাও আর কি! হায়রে নারী তোমাদের কোন অবদান পুরুষের চোখে পড়ে না।

প্রিয়া বললো, জানো আব্বু নারীদের কোন ঠিকানা হয়না “শিশুকালে বাবার বাড়ি, যৌবনে স্বামীর বাড়ি, বৃদ্ধাকালে সন্তানের উপর নির্ভরশীল” অথচ একবার ভেবে দেখ নারী ছাড়া কোন বাড়ি সম্পূর্ণ হয় না।

প্রিয়া মিরার কথায় সবাই চুপ এভাবে হয়ত আমরা পুরুষ জাতী নারীকে নিয়ে কখনো ভাবি না।

>>সত্যিই তো নারী মানে মা, যার গর্ভে আমাদের জন্ম।

>>নারী মানে স্ত্রী, যে আমার সন্তানে মা।

>>নারী মানে আমার রক্ত আমার সন্তান যার জন্য আমাদের বেঁচে থাকা।তারপরও সমাজে নারী কত অবহেলিত,মূল্যহীন ভাবতে ভাবতে রোহানের চোখেও পানি আসল।সবার চোখে পানি চলচল করছিলো।

আজাদ প্রিয়াকে জড়িয়ে ধরল আই লাভ ইউ মা! আই লাভ ইউ টু আব্বু বলেই প্রিয়া বাবার বুকে আশ্রয় নিল। জানো আব্বু

>>নারী একটু সম্মান,ভালোবাসা পেলে তোমাদের সংসারটাকে স্বর্গ বানিয়ে দিতে পারে।

জানি মা তুমি,মিরা আমার কাছে আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ট সস্পদ বলেই প্রিয়ার কপালে চুমু দিল, মিরাও এসে প্রিয়াকে জড়িয়ে ধর বললো বেঁচে থাকো প্রিয়া মা।

…..চলবে।

৫৩৭জন ৩৪২জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য