“আমি তোমার জন্য এসেছ (পর্ব-ছয়)

আপনি আমার জন্য দোয়া করবেন বলেই উঠে দাঁড়াল আরাফ। আমি বললাম কিছুদিন পরে আজাদের বাসায় যাব কিন্তু আরাফ বাচ্চাদের মতো বায়না ধরলো আপনার জন্য তার কষ্ট হচ্ছে আপনার মুখটা না দেখে সে ঢাকা যাবে না, আপনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারপর ঢাকা যাবে আরাফের বাবার এসব কথা শুনে সবাই খুব খুশি হলো, দাদাুমনি আরাফের কপালে চুমু খেলেন বেঁচে থাকো দাদাভাই আল্লাহ্ তোমাকে দ্বীর্ঘায়ু দান করুন বলে বিদায় দিতে পারছিলেন না “যেতে নাহি দিব হায় তবু যেতে দিতে হয়” কথাটা আরাফের বার বার মনে হচ্ছিল।

আজাদ..! জ্বী -মা বলো। আমি একটু বাসার সামনে পর্যন্ত আরাফকে এগিয়ে দিয়ে আসি, কেন নয়! অবশ্যই চলে আমিও যাচ্ছি।
আরাফ দাদুমনির হাত ধরে রুমের বাইরে নিয়ে আসলেন বাইরে চাঁদের আলোয় সব আলোকিত যদিও চাঁদের নির্দিষ্ট কোন আলো নেই সে সূর্যের আলোয় আলোকিত….!

ওরা রাস্তায় রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে আছে মফস্বল শহর তাই রাত একটু বাড়লেই রিক্সার আনাগোনা কমে যায় রিক্সা পেতে কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হবে আজাদ আরাফের বাবা বাসার বিল্ডিং নিয়ে বাকি কিছু আলোচনা এখানে দাঁড়িয়ে শেষ করে নিচ্ছেন আরাফের এসব ভালো লাগছিলো না সে লজ্জা ভেঙ্গে দাদুমনিকে বললো। দাদুমনি প্লী..জ প্রিয়াকে একটু এখানে ডাকবে যাবার আগে পিচ্চিটার মুখটা একটু দেখে যেতাম করুন সুরে কথা গুলো আরাফ বললো দাদুমনির খুব মায়া হলো আরাফের চোখে পানি। দাদুভাই তোমার কি হয়েছে..? আমাকে বলো কাঁদছো কেন..? আরাফ অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলো কিন্তু কিছুই বলতে পারছে না প্লীজ দাদুমনি একবার প্রিয়াকে ডাক-না!

মিরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আরাফের বাবা আর আজাদের কথা শোনছিলো।
মিরা..! (শ্বাশুড়ী) মায়ের ডাক গলাটা ভেজা লাগছে মনে হয় এই মাত্র কেঁদেছে জ্বী মা বলুন।
বউমা প্রিয়াকে গিয়ে বল দাদুমনি তাকে বাইরে ডাকছে পড়া রেখে একটু সময়ের জন্য আমার কাছে আসতে বলো।
আচ্ছা মা বাসা খালি আমি রুমে গিয়ে প্রিয়াকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, আরাফ বাবা আন্টিকে ভুলে যেও না যখন আমাদের কথা মনে পড়বে সোজা চলে আসবে তোমার জন্য এই বাড়ির দরজা সব সময়ের জন্য খোলা থাকবে বলে মিরা প্রিয়াকে ডাকতে চলে গেল। এর মধ্যেই আজাদের কথাবার্তা শেষ একটা খালি রিক্সা পেয়ে গেল আরাফ ইসস রিক্সাটা একটু পরে আসলে কি আমার প্রিয়া এখনো আসে নাই ওরে একবার না দেখেই চলে যাব ভাবতেই আরাফের বুক ফেটে কান্না আসছিলো চোখ বন্ধ করে বললো হে বিধাতা রিক্সাটা যেন চলে যায় আমি প্রিয়ার সাথে একটু কথা বলে যেতে পারি।
স্যার আরেকটু সময় অপেক্ষা করতে হবে রিক্সাওয়ালার শরীরটা খারাপ তাই সে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে আর ভাড়া রিক্সা তো মালিকের বাড়ি পৌঁচ্ছে দিতে হবে ভাড়া নিয়ে গেলে ফিরতে দেরি হবে তাই সে যাবে না আপনি বরং আজ রাতটা এখানে থেকে যান স্যার কাল সকালে যাবেন সমস্যা কি..!

নাহ্ আজাদ আজ রাতেই ঢাকা ফিরতে হবে আজাদের কলেজ খুলা, আমারও কাজ আছে তারপর আরাফের মা টেনশন করবে আজেই ফিরবো।
আরাফ আল্লা আল্লা যপে চোখ খুললো আল্লাহ্ আমার কষ্ট বুঝছে রিক্সাটা চলে গেল আল্লাহ্ তোমাকে অনেক ভালোবাসি আমার প্রিয়াকে এনে দাও প্লীজ..প্রী..জ বলে চোখ খুলতেই দাদুমনি,বাচ্চা কন্ঠের আওয়াজ ওয়াও প্রিয়া আসছে।
আরাফ প্রিয়ার দিকে চেয়ে আছে রাতের আবছা আলো চারদিক অন্ধকার সেখানে এক টুকরো আলো সারা পৃথিবী আলোকিত করে রেখেছে সেটা প্রিয়ার মুখ সত্যি প্রিয়া কত সুন্দর এত কাছ থেকে কখনো সে দেখেনি আজ প্রথম দেখছে খুব ইচ্ছে করছে একবার প্রিয়ার হাতটা ধরে বলতে আই লাভ ইউ প্রিয়া।
তুমি আমাকে ভালোবাস..?
আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই তুমি রাজি..? কিন্তু প্রিয়া এসব আবেগ বুঝার বয়সে এখনো যায়নি পাশ থেকে একটা ট্রাক হন বাঁজিয়ে রাস্তা পার হলো কয়েকটা অট্রো রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে একটা কিউট বাচ্চাসহ একটা পরিবার রিক্সায় যাচ্ছে ওদের চোখ প্রিয়া আরাফের দিকে দেখতে দেখতে রিক্সাটা দূরে হারিয়ে গেল।

প্রিয়া আরাফ চুপচাপ নিরব দাঁড়িয়ে আছে কারো মুখে কোন কথা নেই আরাফ আজ কালো সার্ট,কালো প্যান্ট পড়েছে ফর্সা গায়ের রং গুন্ডা ছেলেটাকে ভালোই লাগছে। রাতে টিউব লাইটের উজ্জল আলোয় আরাফকে কিছুটা উল্লাসিত মনে হচ্ছে প্রিয়ার..!

আরাফ নিরবতা ভেঙ্গে বললো প্রিয়া, আমি চলে যাচ্ছি মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে আব্বু,মম এর কথা শুনবে, দাদুমনির খেয়াল রাখবে, নিজের যত্ন নিবে..!
প্রিয়া হ্যাঁ সূচক ছোট্র উওর দিল আপনিও ভালো থাকবেন। উওরটা আরাফের মন মতো হলো না সে প্রিয়ার কাছেও আশা করছিলো কেয়ারিং করবে তার ব্যাপারে প্রিয়ার কোন আগ্রহ লক্ষ করলো না হয়ত প্রিয়া ছোট বলে গুছিয়ে বলতে পারে নাই।
আরাফ প্রিয়ার মাথায় স্নেহের হাত রাখলো আর বলতে শুরু করলো প্রিয়া..! আমি দাদুমনিকে না
“আমি তোমার জন্য এসেছি পিচ্চি…!

তোমাকে একবার দেখার জন্য এসেছি,
একটু কথা বলার জন্য এসেছি,
তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে বলেই বাচ্চাদের মতো হাত দিয়ে চোখ মুছলো আরাফ চোখে কি জানি পড়ছে..! প্রিয়া কিছুই বুঝতে পারল না দু’জনে দু’জনের দিকে চেয়ে আছে নিস্তবতা বিরাজমান থাকে, দাদুমনি ওদের কথা শোনতে পারে নাই তবে বয়সের কারণে মনের দৃষ্টিতে অভিজ্ঞতার হিসাবে সবটা বুঝে নিল।
প্রিয়া আমি চলে যাচ্ছি তুমি কিছু বলবে না আরাফ জানতে চাইল..? প্রিয়া পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে কি বলবে বুঝতে পারছে না, তবু জোর করে মুচকি হাসল।
“আমি আসি” বলে বিদায় নেয় আরাফ।
দাদুমনির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আরাফ সামনে এগিয়ে যায় ততক্ষনে রিক্সা চলে আসে সবার কাছে বিদায় নিয়ে ওরা রিক্সায় চড়ে আরাফ হাত নেড়ে বিদায় জানায়।
দাদুমনি,আসাদ দু’ জনেই হাত নেড়ে বিদায় জানায় আরাফকে, প্রিয়ার হাতটা নেড়ে ছিলো কিনা কেউ খেয়াল করে নাই রিক্সাটা রাতের আধারে হারিয়ে গেল আজাদ সবাইকে নিয়ে রুমে ফিরল।

প্রতিদিন সকালে একটু হাঁটাহাঁটি করা মিসেস মনোয়ারার (আরাফের মা) অভ্যাস। আজ ব্যতিক্রম হল না। দোতলা সিঁড়ি রেখে নীচে নেমে আসলো সবকিছু পরিপাঠি আছে ড্রইংরুমে সোফায় বসল রাতে ভালো ঘুম হয়নি তাই ঘুম ঘুম চোখে চেয়ে দেখল দেওয়ালে ঝুলে আছে পারিবারিক একটা ছবি সন্তানেরা বড় হবার পর চাকরি সূত্রে সবাই আলাদা বাসা নিয়েছে স্ত্রী সন্তান নিয়ে আলাদা থাকে অফিস ছুটি,বা ঈদের ছুটি ছাড়া তেমন বাসায় আসে না। হয়না আগের মতো জমিয়ে আড্ডা রুমের দেওয়াল গুলোও অনেকদিন কোন হৈ চৈ শুনে না, তারাও ঘুমিয়ে আছে ছবিতে বড় ছেলে আরমান,মেজ ছেলে সায়মন, সেঝ ছেলে আরাফাত পাশেই একমাত্র মেয়ে আরিফা সবার হাসি মাখা মুখ, আরাফ সবার খুব ছোট তখনও কথা বলতে শিখছে সবেমাত্র, হামাগুরি দিতে শিখেছে বাবার কোলেই বসে আছে আরাফ খুব সুন্দর একটা পুরনো ছবিটা অনেক স্মৃতি মনে করিয়ে দিল মনোয়ারা মনের অজান্তে…

….চলবে।
সুরাইয়া নার্গিস আলিফ।

৩৯৯জন ২৩৩জন
100 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য