আমি তোমার জন্য এসেছি (পর্ব-৩৯)

রাত সাড়ে ১০টা বাজে ভাইয়া এবার তাহলে আমি যাই, তুমি সময় করে একদিন মাকে দেখতে যেও।

অবশ্যই যাব রোহানের বিয়েতে গেলে মাকে দেখে আসবো মাকে বলিও আমরা যাব।

আরমান বলছিলো ড্রাইভার গাড়ি করে তাকে বাসায পৌঁছে দিবে কিন্তু রাজি হয়নি। অনেক বছর পর বাংলাদেশে আসছি তাই রাতের ঢাকার সৌন্দর্য অবলোকন করবে।

সে নিজের গাড়িটাও সাথে আনে নাই বাসে আসছে, রাতে খাবার শেষে রিতা, আরমান এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আরাফ বাসা থেকে বের হলো সালাম স্যার বলে দারোয়ান গেইট খুলে দিল।

আরাফ রাস্তার সাইড ধরে হাঁটতে শুরু করে ভার্সিটির জীবনে এমন কত রাত রাস্তায় হেঁটেছি।

রাহাত, শীলা, মিলনকে নিয়ে নানা রকমের গল্প করতাম,কখনো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রমজান চাচার দোকানে ফুচকা খেতাম।

কতই না সুন্দর ছিলো সেই দিন গুলো ভাবতে ভাবতে আরাফ ধীর গতিতে হেঁটে চলল।

কিছুদূর যাবার পর শ্রেয়ার কল কোথায় তুমি.?

এত রাত হলো এখনো বাসায় ফিরছো না যে।

আরাফ দেখল রাত ১১ বাজে, এই তো আসতেছি রাস্তায়,মা খেয়েছেন.?

হ্যাঁ খেয়েছেন।

অমি কি করে.?

মায়ের রুমে ঘুমিয়েছে।

ওকে আমি আসতেছি বলেই আরাফ লাইনটা কেটে দিয়ে মোবাইলে হাতে আবার হাঁটতে শুরু করলো চেনা রাস্তা আর পুরনো স্মৃতি মনকে জাগিয়ে দিল..

হঠাৎ একটা বেপরুয়া বাস পাশ থেকে গেল আরাফ চমকে উঠল ড্রাইভার হয়ত নেশা করছে তাই বাসের এমন গতি।

আর হাঁট নিরাপদ না একটা সিএনজি বা অটো নেওয়া দরকার।

আকাশটা মেঘলা যেকোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে, আরাফ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা সিএনজি দেখতে পেল।

মিরপুর ২ যাবে.?

জ্বী স্যার উঠেন, আরাফ সিএনজিতে ওঠে বসল,রাতের চারপাশটা খুব সুন্দর শান্ত কোন হৈ চৈ নেই কোলাহল নেই।

দাঁড়াও এসে গেছি, স্যার ভাঙ্গতি নেই.?

নাহ্ পুরোটা রেখে দাও”

ড্রাইভার খুশি হয়ে আরাফকে নামিয়ে চলে গেল।

আরাফ বাসার গেটের সামনে দাঁড়াল দেখল গেট খুলা,ভিতরে ঢুকে আরাফ দারোয়ানের কাঁধে হাত রাখে।

দারোয়ান দাঁড়িয়ে পড়ে তার হাত পা কাঁপতে থাকে স্যার মাপ করে দেন, চোখটা একটু লেগে গিয়েছিলো। আরাফ হেসে বললো চাচা মাত্র রাত ১ টা বাজে এখনি ঘুমালে বাকি রাত কি করবেন।

দারোয়ার লজ্জা পেল।

চাচা রাত জাগাটা আপনার পেশা, আজ দিনের বেলা ঘুমান নাই.?

না স্যার।

কেন.?

দারোযান চুপ।

আচ্ছা বলতে হবে না।

স্যার।

বলুন।

আজ আপনার চাচীকে নিয়ে ঢাকা শহর ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম সন্ধ্যায় বাসায় ফিরছি।

খুব ভালো কাজ করছেন।

হ্যাঁ স্যার আমি প্রায় ২০ বছর ঢাকা শহরে বিভিন্ন বাসায় দারোয়ানের চাকরি করি।

আপনার চাচীর বহু বছরের সখ ছেলেমেয়েরা ছোট ছিলো তাই ঢাকা দেখার কোনদিন দেখাতে পারি না।

এখন সবাই বড় হইছে বিয়ে দিসি, তাই..

আমি বুঝতে পেরেছি।

আচ্ছা চাচা আপনি আপনি আমাদের এখানেই থাকেন, তাহলে চাচীকে কোথায় রাখছেন.?

জ্বী মানে।

ঢাকা শহরে আপনার চাচীর দূরসম্পর্কে এক ভাই, ভাবি গার্মেসে চাকরি করে ওদের বাসায় রাখছি।

কয়েকদিন পর বেতন পাইলে গ্রামে রেখে আসবো।

আরাফের মনটা খারাপ হয়ে গেল, বেচারা বউকে সাথে রাখতে পারছে না আত্মীয়ের বাসায় রাখছে।

চাচা শোনেন!

কাল সকালে গিয়ে চাচীকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবেন।

ওনি যে কয়দিন ঢাকা থাকবেন আমাদের বাসায় আপনার সাথেই থাকবেন।

দারোয়ান অবাক হয়! না স্যার সমস্যা নাই ওনি গ্রামের মানুষ ওখানেই ভালো আছেন।

আরাফ থামিয়ে দিয়ে বললো, আর কোন কথা নয়।

জ্বী স্যার।

আরেকটা কথা আপনারা যে কয়দিন মন চায় এখানে থাকবেন কোন সমস্যা নেই। কবে ঘুরতে যেতে চান আমাকে আগে জানাবেন।

আমি ড্রাইভারকে বলে দিব, আপনারা আমরা গাড়িতে ঢাকা শহর ঘুরে দেখবেন। দারোয়ানের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো।

স্যার আপনি মানুষ না ফেরেস্তা, আপনি আমার বয়সে ছোট না হলে পা ছুঁয়ে সালাম করতাম।

আরাফ হা হা হা হা করে হেসে দিল চাচা এভাবে বলছেন কেন! আমি একজন খুব সাধারন মানুষ।

আমি আপনার ছেলের মতো, আমার জন্য দোয়া করবেন।

স্যার মাথাটা একটু নিচু করবেন দারোয়ানের এমন কথায় আরাফ হেসে দিল কেন চাচা।

স্যার আপনি এত লাম্বার আপনাকে ছুঁতে পারবো না, মাথাটা নিচু করলে মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে দিলাম।

আরাফ শ্রদ্ধায় দারোয়ানের মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল, দারোয়ান পরম মমতায় আরাফের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করল।

দোয়া করি বাবা আল্লাহ্ আপনাকে ধনে,মনে, জ্ঞানে সম্মানে সর্বোচ্ছ মর্যাদা দান করুন।

আপনি সুখি হওন…

আচ্ছা চাচা আপনি গেটে তালা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন সমস্যা নেই।

আমি কিছুক্ষন রাত জেগে থাকবো কোন সমস্যা হলে আপনাকে জানাব।

আচ্ছা বাবা বলেই দারোয়ার তার রুমে ঘুমাতে গেল আর মনে মনে ভাবলো পৃথিবীতে এখনো কিছু ভালো মানুষ আছে..

আরাফ নিজের নিচের সিঁড়ি বেয়ে তিন তলার উদ্দেশ্যে হেঁটে উপরে চলে গেল..

প্রিয়া ফজরের নামাজ পড়ে কিচেনে ঢুকল দু-কাপ চা করে মামা আসব বলেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। শেখর সাহেব নামাজ পড়ে বসে ছিলেন মিতুর মা মেয়ের বিয়ে নিয়ে এই কয়দিন ধরে চিন্তার শেষ নেই। ভালো ভাবে মিতুর বিয়েটা হয়ে গেলেই একটু সস্তি।

আরে প্রিয়া মা যে ভিতরে আস বলতেই বেগম শেখর পিচনে ফিরলে এসো মা হাতে কি!

মামা,মামী তোমাদের জন্য সকাল সকাল আদার চা, রাতে শোনলাম বড় মামীর ঠান্ডা লাগছে হলকা কাশি আছে।

তাই দুজনের জন্যই আদার চা কাশিতে উপকারী, তাই মামী গরম চা খেয়ে নাও সব ঠিক হয়ে যাবে।

দেখলে প্রিয়া মা কতটা লক্ষী মেয়ে তোমার কত খেয়াল রাখে।

বেগম শেখর  চোখে জল নিয়ে বললেন ভাগ্য করে এমন মেয়ে মা হওয়া যায় বলেই প্রিয়ার কপালে একটা চুমু দিলেন।

বস মা।

মামী আমার জন্য দোয়া করো সারাজীবন যেন আব্বু,মম এর সেবা করতে পারি।

কেন রে মা, তোর তো আমরা বিয়ে দিব তোমার জামাই আর তুমি দুজনে মিলে মিরা,আজাদের দায়ীত্ব নিবে।

প্রিয়া কিছুটা লজ্জা পেয়ে, আচ্ছা পরে দেখা যাবে।  এখন চা খেয়ে বলো চা কেমন হলো.?

শেখর সাহেব বললেন খুব ভালো হয়েছে চা। বেগম শেখরও প্রিয়ার চায়ের প্রশংসা করলো, মিতু উঠেছে.?

না মামী উঠে নাই।

আরেকটু ঘুমাতে বলছি আজকের পর তো আর ঘুমানোর সুযোগ নেই।

শেখর সাহেব প্রশ্ন করলেন মিতু ঘুমাতে পারবে না মানে.?

মানে আজ মিতুর হলুদ সন্ধ্যা, কাল বিয়ে সব মিলিয়ে দু-বাড়িতে হৈ চৈ চলবে প্রচুর কাজ থাকবে ঘুমাবে কিভাবে!

ওহ্ তাই তো, বুঝতে পারলাম।

মামা,মামী চা শেষ করে কাপ দাও বাড়িতে অনেক মেহমান আমি সবার জন্য চা করেছি বাকিদের চা দিতে হবে।

শেখর সাহেব হাসলেন লক্ষী মা আমার নাও চা শেষ।

প্রিয়া কাপ নিয়ে চলে গেল।

মেয়েটার জন্য একটা ভালো ছেলে দেখনা বিয়ের তো বয়স হয়েছে।

হুম আমিও ভাবছি প্রিয়ার বিয়ের ব্যাপারে আজাদের সাথে কথা বলবো।

মিতুর বিয়েটা ভালো ভাবে শেষ হোক তারপর দেখবো বলেই শেখর সাহেব পাঞ্জাবী পড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

ভোরের সোনা রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে চুরি করে ভিতরে ঢুকে পড়ছে।

রোহান তাড়াতাড়ি ওঠ, ইসস মায়ের ডাক আরেকটু ঘুমিয়ে নেই আম্মু।

বলেই চোখ বন্ধ করলো, আম্মু ডেকে চলে যাবে আমি ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকি।

রোহান আলতু করে কপালে হাত লাগল রোহান চোখ খুলল আম্মু আরেকটু ঘুমিয়ে নেই।

না বাবা আজ আর নয় সকাল ৮ টা বাজে, বাইরে রুমে এসে দেখ কারা আসছে।

আম্মু কে আসছে.! না বলা যাবে না সারপ্রাইজ তুমি নিচে আস নিজের চোখে দেখবে।

ওকে আম্মু তুমি যাও, আমি ২ মিনিটের মধ্যেই আসছি….

আচ্ছা মিতুর কি ঘুম ভাঙ্গছে একবার কথা বলে খোঁজ নেই।

……চলবে।

১১৩জন ২১জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য