সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

“আমি তোমার জন্য এসেছ (পর্ব-৩১)

ফুল,ফল,পাখি,গাছ, প্রকৃতি সব মিলিয়ে সুন্দর কারুশিল্প কাঁথায় বেশ ফুটে ওঠেছে,,

ওগো শুনছো।

হ্যাঁ বলো! বলেই মিরা কাঁথা রেখে আজাদের দিকে ফিরে তাকাল।

হয়ত নিচের দিকে চেয়ে সেলাই করে চোখ দু’টো ক্লান্ত তাই মাথাটা সোজা করে বসল।

মিরা একবার প্রিয়ার রুমে যাবে বলতে গিয়ে আজাদ থেমে গেল..!

কি হয়েছে প্রিয়ার জানতে চেয়ে সামনে তাকাল মিরা আরে বাহ্ সবুজ আঁচল হলুদ জমিনের মাঝেখানে কালো রঙের আলপনা। ঠিক তার পাড় ঘেষেই কালো,হলুদ,সবুজ তিন রঙের সংমিশ্রনে মোটা সমান্তরাল রেখার মতো, টেনে টেনে লম্বা রেখায় শাড়ির শেষ প্রান্ত।

চোখ গুলো যেন অতিবেশি মায়াবী মম বলেই ডাক দিলে মিরার স্ব-জ্ঞনে ফিরে, মম আমি যাচ্ছি তোমরা সাবধানে থেকো।

প্রিয়া এমনি সুন্দর চোখে কাজল তাকে আরো বেশি সুন্দর লাগছে, মিরা আজাদের দিকে ইশারা করলো আজাদ চেয়ে দেখল। আজাদ বিছানা থেকে চশমাটা নিয়ে চোখে দিলে সামনে তাকাল ছোট্র প্রিয়া আজ অনেক বড় হয়ে গেছে থ্রি-পিচ ছেড়ে শাড়ী ধরেছে ।

অফিসে প্রিয়া শাড়ী পড়েই যায় এখন তাই মিতুর বিয়েতে প্রিয়া শাড়ী পড়েই যাচ্ছে। প্রিয়াকে শাড়ীতে দারুন লাগছে, ঠিক মিরার মতো দেখতে হয়েছে মেয়েটা, কপালে হলুদ রঙের টিপ।

মিরা মেয়েকে দেখে মুচকি হাসল, একদিন এভাবেই পরের ঘরে চলে যাবে শূণ্য হবে এই বাড়ি।

বাবা মায়ের চোখে সন্তানেরা সব সময় সুন্দর তবে প্রিয়া একটু আলাদা সুন্দর যে কারো নজর লাগবে আহামরী সুন্দরী সে।

মিরা কাঁথা সেলাই রেখে উঠে দাঁড়াল প্রিয়ার কাছে আসলো প্রিয়া মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করে দোয়া নিল। প্রিয়া শেখর ভাইজান, ভাবিকে আমার সালাম দিও। মিতু, জিসানকে আমার আদর দিও বলবা আমি সময় করে তোমার বাবাকে নিয়ে মিতুকে দেখতে যাব। বাস থেকে নেমে সোজা রিক্সা নিয়ে বাসায় পৌঁছে আমাকে ফোন দিও।

মিরা কথা শেষ করার আগেই আজাদ বললো, সাবধানে যেও মামনি।

মিরা চমকে উঠল সাবধানে যাবে মানে! তুমি প্রিয়াকে বাসে উঠিয়ে দিবে।

না মম থাক, আব্বু অসুস্থ বাসায় বিশ্রাম করুক আমি একাই যেতে পারব। আজাদ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল মেয়ে না মা কার কথায় সাড়া দিবে..!

তোমরা হয়ত ভুলেই গেছ তোমাদের মেয়ে প্রতিষ্টিত একজন সরকারী চাকরিজীবি নারী। তারপরও তোমরা আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করো কেন.? আমার কথায় একটা অফিস চলে, শিক্ষিত মেয়ে রাস্তাঘাটে নিজেকে সেইভ করার মতো জ্ঞান আছে, আমি একাই যেতে পারবো।

আজাদও মেয়েকে একা ছাড়তে সাহস পাচ্ছিল না, মিরার মতের গুরুত্ব দিয়ে পাঞ্জাবীটা পরে মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে গেল।

মিরা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই ফেল, মম এসব কি হচ্ছে আমি মিতুর বিয়েতে যাচ্ছি দু-তিন পরেই ফিরব।

মিরার কান্না থামছিলো না মায়ের মুখে এসব শোনে প্রিয়ার চোখেও পানি।

তুমি এমন ভাবে কান্নাকাটি করছো যেন মেয়েকে শ্বশুড়বাড়ী পাঠাচ্ছো হা হা হা হা করে হাসল আজাদ।

প্রিয়া মাকে শান্ত করে বুঝিয়ে বিদায় নিল, আজাদ প্রিয়া বাসের উদ্দেশ্য রওনা হলো।ওরা রুম থেকে বের হলো মিরা পিচনে ওদের যাওয়ার পথে চেয়ে রইল আজাদ, প্রিয়া রিক্সায় চড়ে কিছুক্ষনের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল।

রাহাতের ব্যবসায় একের পর উন্নতি হচ্ছে দেশের নামকরা ব্যবসায়ী সে একজন রাহাত গ্রুপের কর্ণধার। ৫ বছর আগে বিয়ে করেছে কলেজের বান্ধবী ঊর্মিকে ওদের ঘরে মনি,জনি নামে দুটো ছেলে মেয়ে নিয়ে তার সুখের সংসার। উর্মি আরাফের কথা এতবেশি শুনেছে যে ফেরেস্তার মতো মানুষটাকে একবার দেখার ইচ্ছা জাগে। রাহাত বাসায় ফিরেই ঊর্মিকে ডাকলো মনি,জনি স্কুল থেকে ফিরছে.? হ্যাঁ দারোয়ার নিয়ে আসছে, ওরা রুমে আছে। ওহ! আচ্ছা এক কাপ চা দাও তো খেয়ে তারপর গোসলে যাব, মা কোথায় ওনার রুমে আছেন।

তুমি বসো আমি চা নিয়ে আসছি, ঊর্মি চা বানাতে কিচেনে গেল। হাতের কাজ দুপুরের রান্নাও প্রায় শেষ।

ঊর্মি চা হাতে রাহাতের কাছে ফিরে আসলো, রাহাত খবরের কাগজ পড়ছিলো হঠাৎ মোবাইলটা বেজে ওঠল।

ঊর্মি ফোন হাতে নিয়েই বললো আরাফ ভাইয়া কল দিয়েছেন! রাহাত রিসিভ করেই বললো হ্যলো দোস্ত..

কেমন আছিস?

চায়ে চুমুক দিল।

কি???

তুই দেশে আসছিস!

কবে, কখন আমাকে জানালি না।

ঊর্মি পাশের সোফায় বসে পত্রিকা হাতে নিল ঘটনা কি বুঝতে পারছে না। আমি বিকালেই তোর সাথে দেখা করবো বলে মোবাইল রেখে দিল।কি ব্যাপার তোমাকে এত খুশি লাগছে যে?খুশি হব না আমার প্রাণের দোস্ত আরফ দেশে আসছে কিছুদিন হলো।

ওহ্ তাই নাকি!

হ্যাঁ। আজকেই বিকালে আরাফের বাসায় যাব দেখা করতে,ওরা স্ব-পরিবারে একেবারে চলে আসছে।

মাকে ডাকো এই সুখবরটা মাকে এখনি জানানো দরকার, মা মা তাড়াতাড়ি একবার এখানে আস।

আস্তে মা মনে হয় নামাজ পড়ছেন এত জোরে চিৎকার করো না, রাহাতের একমাত্র মেয়ে মনি দৌঁড়ে এসে রাহাতের কোলে বসল বাবা কে আসছে? মামনি আমার বন্ধু তোমার আরাফ চাচ্চু দেশে আসছে আমরা চাচ্চু বাসায় বেড়াতে যাব।

মনি খুশিতে লাফিয়ে উঠল অনেকদিন পর বেড়াতে যাবে বলে,খবরটা দিতে ভাই জনির রুমে চলে গেল।

ঊর্মি আমার চা শেষ যাই গোসলটা সেরে নেই বিকালে আরাফ এর বসায় যাব চলেই টাওয়াল নিয়ে বার্থরুমে প্রবেশ করলো।

প্রিয়া জানালার বাইরে চেয়ে আছে চোখে একটাই স্বপ্ন যদি মনের ভুলে রাস্তার পাশে আরাফকে দেখতে পারতাম।

চোখটা হঠাৎ ঝাঁপসা হয়ে আসে প্রিয়ার তার বা দোষ মন কাঁদলে তো চোখ সাড়া দিবেই কেউ দেখার আগেই প্রিয়া চোখ মুচল। আপা কোথায় যাবেন?জ্বী মহাখালি

ওহ্ আমিও ঢাকা যাব বলেই ভদ্র মহিলা প্রিয়ার পাশে বসল। আমার মামাত বোনের বিয়েতে যাচ্ছি।

ও আচ্ছা মহিলা একের পর এর গল্প বলছে বিরতিহীন ভাবে। মহিলা মানুষ মানেই এমন ১ ঘন্টা সময় পেলে ১ জীবনের ঘটনা বের করে জেনে নেয়।

প্রিয়া ওনার কথা শোনে মনে মনে হাসল ২০ মিনিটে সে তার জীবনের প্রায় সবকিছু বলে শেষ করে ফেলছে..

বাস চলতে চলতে প্রিয়ার গন্তব্য স্থানে চলে আসলো, প্রিয়া ভদ্র মহিলা থেকে বিদায় নিয়ে নেমে গেল।

প্রিয়া বাস থেকে নেমেই মামাকে ফোন দিল,তিনি কিভাবে যেতে হবে বলে দিলেন অনেক বছর পর আজ প্রিয়া মামা বাসা যাবে।

সব চেনা তবু কেমন জানি অচেনা মনে হচ্ছে ৬ বছরে নানা,নানু দুজনেই মারা গেছেন তারপর অনেক বছর আর যাওয়া হয়নি।প্রিয়া বাস থেকে নেমে চারপাশটা ভালো করে থেকে নিল, মিরার ফোন ফোন রিসিভ করেই প্রিয়া বললো হ্যাঁ মা আমি বাস থেকে নেমেছি বাসায় পৌঁছে তোমাকে কল দিব। ঢাকা শহরের অর্ধেকটা রাস্তা গাড়ি দখল করে রেখেছে, তারপর মানুষের ব্যস্ত চলাফেরা হেঁটে যাওয়ার অবস্থা নেই। প্রিয়া জ্যাম পার হয়ে স্টেশনের ডান পাশের বড় মিষ্টির দোকান দেখতে পেল, সেখানেও মানুষের ভিড় তারপরও প্রিয়া কিছু সময় অপেক্ষা করে সিরিয়াল নিয়ে মিষ্টি কিনল।

একটা রিক্সা নিয়ে মামার বাসার উদেশ্যে রওনা হলো পছন্দ রৌদ মামা হুটটা তুলে দেন, জ্বী মামা বলেই ড্রাইভার হুট উঠিয়ে দিল।

এদিকে রোহান সাহেবের একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা মিতুর জন্যও রোহানের বড় মামা ইন্ডিয়া থেকে বিয়ের শাড়ি,আর রোহানের জন্য পাঞ্জাবী আনিয়েছেন বউভাতের দিনে পড়ার জন্য। সব মিলিয়ে অন্য রকম বিয়ে, আরাফ দেশে আসার পর গতকাল রাতে সিফাত সাহেব তার স্ত্রী বাসায় আসছিলেন সবটা জানিয়ে গিয়েছেন।

…..চলবে।

২৬৭জন ১৭৩জন
0 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ